আমার বন্ধু ইসরাফিল

  • কাজল রশীদ শাহীন

আমার বন্ধুর নাম ইসরাফিল। ওকে খুঁজছি আমি। অনেক-অনেক দিন ধরে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে। আজও পায়নি ওর খোঁজ। তোমরা যদি পারো, আমাকে একটু সাহায্য করো, প্লিজ।
একটা ঘটনায় ইসরাফিল হারিয়ে যায় আমাদের জীবন থেকে। ঘটনাটা আমার মনে আছে হুবহু—
আমাদের এক স্যার ছিলেন। নাজমুল হক মনি, উনার নাম। আমরা ডাকতাম মনি স্যার বলে। বেশ মোটাসোটা মানুষ ছিলেন। সবসময় একটা হাত পাখা নিয়ে ঘুরতেন। বিশেষ করে গরমের দিনগুলোতে।
আমাদের বন্ধু ইসরাফিলের একটা রেকর্ড ছিল। ও কখনও পড়া পারত না ক্লাসে। একটা দিনের জন্যও না। স্যারের খুব ইচ্ছে ছিল ওকে নিয়ে। একদিনের জন্য হলেও একটা প্রশ্নের উত্তর দিক ইসরাফিল।
স্যার একদিন অনেক সহজ একটা প্রশ্নের দেখা পেয়ে আনন্দিত হলেন। ভাবলেন, আজ নিশ্চয় ইসরাফিলের পড়া না পারার রেকর্ড ভেঙে খানখান হবে। এরকম সহজ একটা প্রশ্নের উত্তর ও ঠিকঠাক দেবেই দেবে।
গালভরতি হাসি নিয়ে ইসরাফিলকে দাঁড় করালেন স্যার। বই খুলে প্রশ্ন করলেন।

  • ইসরাফিল
  • জি স্যার।
  • বলতো, মানুষ নিকটতম দূরত্বে কীভাবে যায়?
    এক. পায়ে হেঁটে।
    দুই. ট্রেনে চড়ে।
    তিন. হেলিকপ্টারে করে।
    চার. বাসে চেপে।
    স্যারের এই প্রশ্ন শুনে ইসরাফিল চিন্তায় পড়ে গেল। মাথা চুলকাতে লাগল। স্যার রেগে গেলেন। চোখ লাল করে বললেন,
  • এই গাধা তুই কি আমার কথা বুঝতে পারছিস না?
    ধর, এই যে তুই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিস না। এর জন্য তো তোকে পেটানো দরকার। অফিস থেকে বেত আনা দরকার। এখন কাজল অফিসে বেত আনতে যাবে। তোকে পেটানোর জন্য। তা হলে তুই বল,
  • কাজল, অফিসে কীভাবে যাবে?
  • এক. পায়ে হেঁটে।
    দুই. ট্রেনে চড়ে।
    তিন. হেলিকপ্টারে করে।
    চার. বাসে চেপে।
    ইসরাফিল অবাক চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরো ক্লাসে হাসির ঢেউ ছড়ালো। আমিই কেবল হাসলাম না। ইসরাফিলের অবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলাম। বন্ধুর জন্য মন খারাপ করা দুঃখে আমি বিমর্ষ হলাম। মনে হলো আমিই যেন ইসরাফিল। স্যার রাগে ঘেমে উঠলেন। পাখার বাতাসে সেই রাগ কমার নয়, কমছেও না।
    স্যার পায়চারি করা শুরু করলেন। চিৎকার করে বললেন,
    -কিরে হারামজাদা কথা কানে যায় না?
    বল, না হলে তোকে আজ মেরেই ফেলব।
    আমরা ভয় পেলাম। সম্ভাব্য রক্তারক্তির কথা ভেবে, একটা দুইটা সুরাও পড়লাম। স্যারের চিৎকার বেড়ে গেল। বললেন, কী হলো কথা বলছিস না কেনো? উত্তর দে? বল,
    -মানুষ নিকটতম দূরত্ব কীভাবে যায়?
    ইসরাফিল আরও অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুরো ক্লাস জুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা।
    স্যার বললেন,
    -ক্যাপ্টেন কাজল ছড়ি আনতে যাবে না। তোকে পেটানোর জন্য, তুই-ই অফিসে ছড়ি আনতে যাবি— এবং এটাই নিকটতম দূরত্ব। এখন বল,
    -এই নিকটতম দূরত্বে অর্থাৎ, এখান থেকে তুই অফিসে কীভাবে যাবি?
    এক. পায়ে হেঁটে।
    দুই. ট্রেনে চড়ে।
    তিন. হেলিকপ্টারে করে।
    চার. বাসে চেপে।
    ইসরাফিল আরও বেশি অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকালেন। স্যারও অবাক। অবাক মানে ভয়ংর রকমের অবাক। দুজনেই অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পুরো ক্লাস জুড়ে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। আমরা ইসরাফিলের বন্ধুরাও অবাক হয়ে একবার স্যারকে দেখি, আরেকবার ইসরাফিলকে।
    স্যার রীতিমতো হুংকার দিয়ে উঠলেন। বললেন,
    -বল হারামজাদা। অফিসে তুই কীভাবে যাবি? আজ তোকে বলতেই হবে—
    এক. পায়ে হেঁটে।
    দুই. ট্রেনে চড়ে।
    তিন. হেলিকপ্টারে করে।
    চার. বাসে চেপে।
    ইরাফিল, নীরব। কোনো কথা নেই ওর মুখে। কেবল চোখ জুড়ে রাজ্যের বিস্ময়। সেই বিস্ময় স্যারের রাগকে আরও বাড়িয়ে দিলো। তিনি হুংকার দিলেন, আফ্রিকার জঙ্গলে গরিলারা যেভাবে হুংকার দেয়। পুরো স্কুল কাঁপিয়ে স্যার বললেন,
    -বল, হারামজাদা। অফিসে ছড়ি আনতে তোর কীভাবে যেতে ইচ্ছে করছে?
    এক. পায়ে হেঁটে।
    দুই. ট্রেনে চড়ে।
    তিন. হেলিকপ্টারে করে।
    চার. বাসে চেপে।
    বল বল বল, কীভাবে তোর অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে। বল ইসরাফিল। আজ তোকে উত্তর দিতেই হবে। বল, এক্ষুনি বল একদম মুখে বুজে থাকবি না। আজ তোকে কথা বলতেই হবে। উত্তর দিতেই হবে। স্যার অনেকটা পাগলের মতো করে কথাগুলো বলতেই লাগলেন।
    আমাদের বন্ধু ইসরাফিল মুখ খুলল, অবশেষে। কথা বলল। উত্তর দিলো। ইসরাফিল বলল,
  • আমি হেলিকপ্টারে যাব স্যার। আমি হেলিপ্টারে যাব। আমার হেলিকপ্টারে যেতে ইচ্ছে করছে।
    ইসরাফিল বলতেই থাকল,
  • আমি হেলিকপ্টারে যাব স্যার, আমি হেলিকপ্টারে যাব। আমার হেলিকপ্টারে যেতে ইচ্ছে করছে।
    স্যার এবার বাঘ, সিংহ আর আফ্রিকার জঙ্গলের গরিলার হুংকার একসঙ্গে করে বললেন,
    -তবে রে হারামজাদা। আমি তোর হেলিকপ্টারে করে অফিসে যাওয়া শেখাচ্ছি।
    এই বলে স্যার রণমূর্তি ধরে ইসরাফিলের দিকে এগোতেই ইসরাফিল দিলো এক দৌড়। দৌড় মানে যেনতেন দৌড় নয়, একালের উসাইন বোল্টের চেয়েও দ্রুতগতির এক দৌড়।
    ক্লাস ছেড়ে, স্কুলের মাঠ পেরিয়ে, বড় রাস্তা ধরে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল সে। আর কোনোদিন যাইনি স্কুলে, কোনোদিনও না। পারিবারিক কারণে আমিও কিছুদিন পর ছেড়ে আসি মনি মাস্টারের স্কুল। কিন্তু ইসরাফিলকে ভুলিনি, ভুলতে পারিনি। আমি এখনও বন্ধু বলতে ইসরাফিলকে বুঝি। আমার বন্ধু ইসরাফিল, যে হেলিকপ্টারে করে ক্লাসরুম থেকে অফিসে ছড়ি আনতে যেতে চেয়েছিল।
    ইসরাফিলকে খুঁজি আমি, আজও। জানি না, আমার বন্ধু ইসরাফিল এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। আপনারা কি ইসরাফিলকে খুঁজে পেতে আমাকে একটু সহযোগিতা করতে পারবেন? যদি পারেন খুব ভালো হয়। আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আপনার প্রতি, আপনাদের প্রতি। আপনাদের কল্যাণ হোক।
    আমার স্কুলের নাম : বৈরাগীর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদীর পাড়ে তার অবস্থান। সময় ১৯৮৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *