ইর্ফু আর এর্ফুর গল্প

  • কাইজার চৌধুরী

ইর্ফু ওরফে ইরফান মিয়ার বাড়ি থেকে শহর ঢাকা ম্যালা দূরের পথ। ইর্ফু (মা ইরফানকে আদর করে সেই ছেলেবেলা থেকেই ইর্ফু নামেই ডেকে এসেছে) ওর সফরের প্রায় শেষ প্রান্তে এসে ভাবতে বসে— বাব্বাহ! এ কী কম ঝক্কিমার্কা কারবার! কদ্দূর হাঁটাহাঁটি, কদ্দূর নৌকোর দুলুনি অতঃপর বেঁটেখাটো এক মফস্সল এলাকায় এসে পাকাপোক্ত হয়ে চেপে বসো এক নড়বড়ে বাসের শক্তমক্ত আসনে। সম্মুখের দূরপাল্লা ভ্রমণের কথাটি স্মরণ করে পেছনপানের অভিজ্ঞতার ক্লান্তিগুলো ঝেড়ে ফেলবে বলে ইর্ফু ওর বাস-ভ্রমণের আদ্দেকটা সময় কাটিয়েছে ঝিমুনির প্র্যাকটিস করে। কিন্তু ওই প্র্যাকটিসই সার! বাসের একঘেয়ে ঝাঁকুনির দাপটে ঝিমুনি-ভাবটা বাসের জানালা গলে উড়ি গিয়ে কার চোখদুটোয় জুড়ে বসল, কে জানে! বাসের ভেতর ওর অবস্থানটা মোটামুটি বসবাসযোগ্য করে তুলতে ইর্ফুকে ভাই ঝিমুনি ছেড়ে ভাবাভাবি কর্মটিকে বেছে নিতে হলো।
আর সে কী ভাবাভাবি রে বাবা! প্রথমে নিজের সাজানো প্রশ্নের পর প্রশ্নে নিজেকেই জর্জরিত করে তোলা। অতঃপর প্রশ্নবাণে নিজকে ক্ষতবিক্ষত করে আহত মনে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার বৃথা চেষ্টা চালিয়ে প্রায় নিহত হবার জোগাড়। অবস্থাটা অনেকটাই এসএসসির ফেলটুস-মার্কা ছাত্রের মতন— মানে, প্রশ্নগুলো মুখস্থ সব, উত্তরগুলো কেবল গিলতে বাকি।
শহরে যাচ্ছিটাই বা কেন আমি, অ্যাঁ? —এমন এক যাচ্ছেতাই-গোছের প্রশ্ন দিয়েই ভাবাভাবির শুরু। পরবর্তী এলোমেলো প্রশ্নগুলোর ধরন অনেকটা একইরকমের।
—শহরে গিয়ে আমি থাকবই বা কোথায়?
—শহরে গেলেই যে খণ্টাখানেকের মাথায় খুইয়ে যাওয়া ভাইয়ের হদিস মিলবে, সে কথা কি কেউ হলফ করে কইতে পারবে? ভাইটি খোয়া পিছল আবার দিন-কুড়ি নয়, একদম কুড়িয়ে-বাড়িয়ে বছর কুড়ি আসে!
—কদ্দিন থাকতে হবে শহরে?
—আচ্ছা, কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করে, অমন হুট করে শহরপানে ছুট লাগানোটা ঠিক হচ্ছে কি? এটা বাজারে সদাই করতে যাওয়ার মতন হয়ে গেল নাকি? মানে, এই বাজারে গেলাম, —এই এক কেজি মসুরের ডাল কিনলাম— তারপর এই সুড়সুড় করে বাড়ি ফিরে এলাম— ব্যাপারটা এমনতর কিসিমের হয়ে গেল নাকি?
—ভাইকে খুঁজতে দু’দিনের বেশি তিনদিনে গড়ালে দুর্দিনের একশেষ। মানে, পকেটের টাকা যাবে ফুরিয়ে, তখন খাবার কেনার মুরোদ দূরে থাক, বাড়ি ফিরতে হবে, স্থলপথে হেঁটে আর জলপথে সাঁতার কেটে।
—আচ্ছা, আলফাজ কাকার ঠিকানাটা যেন কী? কোন এলাকার নামটি যেন করেছিল আলফাজ কাকা? শান্তিনগর নাকি ঢালকানগর? মালিবাগ নাকি মালিটোলা? আমলিগোলা নাকি পোস্তগোলা? গুলশান নাকি গোরস্থান? …নাহ, মনে পড়ছে না তো! আলফাজ কাকা তো বলেছিল মা’কে, আমার কি আর ঠিকানা মাত্তর একটা? না, ভাবি, না। একদম নো, নেভার। আমি দুদিন এইখানে তো তিনদিন ওইখঅনে— থিরি ডেইজ। পুরো শহরজুড়েই আমার বসতবাটী— বুঝলে কি না!
এতক্ষণ ধরে ইর্ফুর প্রশ্নের প্যাঁচালির আড়ালে আমার এই প্যাঁচাল শুনে তোমাদের মাথার ভেতর নিশ্চয়ই তালগোল জাতীয় কিছু ঢুকে পড়েছে। ব্যাপারটটা তাহলে খোলসা করেই কেঁচে গণ্ডূষ করে, কেমন?
হয়েছে কি— ইর্ফুর নাকি একটা যমজ ভাই ছিল কিংবা আছে— এমনটিই এক সংবাদ দিয়ে গেল আলফাজ কাকা— এই তো গত পরশুদিন। বলেছিল, ইর্ফুর মতনই দেখতে একজনকে নাকি পুলিশের দল পাকড়াও করে নিয়ে গ্যাছে। …এই না শুনে, মা তো ‘ওরে আমার ইর্ফু রে।’ বলে চোখ-টোখ উলটো জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। …জ্ঞান ফিরতেই মা শুনল, পুলিশের হাতের নাগালে একবার পড়লে আর রেহাই থাকে না কাকুর— পুলিশ ওই আসামিকে দুরমুশ-পেটা করে বিলকুল ননসেন্স মানে করে জ্যান্ত কবর দিয়ে ছাড়ে… হুঁ হুঁ বাবা, এর নাম হচ্ছে ঢাকার পুলিশ। …এই না শুনে, মা ফের জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান। এমনি করেই দফায় দফায় জ্ঞান হারিয়ে আর জ্ঞান ফিরিয়ে মা যা শুনল। তা অনেকটা এইরকম— এই তরশু নাকি তার আগের দিন ইর্ফুর মতন দেখতে একজন নাকি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। ছেলেটি যে কেবল ইর্ফুর মতনই দেখতে, তা নয়, ইর্ফুর নামের সাথেও নাকি বড্ড মিল— মূল নাকি ওর ও এরফান মিয়া। ‘মূল নাম’ বলা হচ্ছে এই কারণে যে, এরফান মিয়া অনেক ‘ওরফে’ নিয়ে চলাফেরা করে থাকে— এই যেমন, শহিদ মিয়া, গাজী মোল্লা, গনেশ চাকলাদার, টমাস রোজারিও, চাঁদাবাজা চন্দু— এমনতর আরো হাজারো নামধাম।
কথাগুলো বলতে বলতে আলফাজ কাকা খানিক উদাস হয়ে ছিল কি? কথাবার্তায় জড়তা? কিঞ্চিৎ আনমনা-আনমনা ভাব? …কে জানে! অতশত খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে গেছে নাকি ইর্ফু? একমনে শুনে গ্যাছে ওর হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের কথা— হারিয়ে যাওয়া কি চুরি হয়ে যাওয়া— ওই একই কথা! মা তো দ্বিতীয় নাকি তৃতীয়বার জ্ঞান ফিরে পাবার পর চিক্কুর তোড়ে জানান দিয়েছে— আমি জানতাম! আমি জানতাম, জন্মানোর পর আমার এর্ফুকে হাসপাতাল থেকেই চুরি করে নিয়ে গেছিল কেউ। …ওরে আমার ইর্ফু রে-এ-এ…। —বলেই ফের জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান। হাসপাতালের ডাক্তারসাহেবরা মা-বাবাকে বলেছিল, মায়ের নাকি যমজ ছেলে হবে। কিন্তু হাসপাতালের কাটাকুটি-ঘরের কাজ শেষ হবার পর জ্ঞান ফিরতেই, কোলের পাশে কেবল ইর্ফুকে পেয়ে মা তো অবাক! বাবা একটু সবাক হয়ে ডাক্তারসাহেবের কাছে এক জোড়ার পরিবর্তে হাফ-জোড়া ছেলে হবার কারণ জানতে চাইলে ডাক্তার-নার্স-কম্পাউন্ডার-ঝাড়ুদার-বয়-বেয়ারা মায় হাসপাতালের সক্কলে মুখ কাঁচুমাচু করে এ-ওর দিকে তাকিয়েছে শুধু। একজন বুড়ো মতন ডাক্তার তার পাকা চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেছেন শুধু— ‘মনে হয়, আমরা ভুল করেছিলাম। তাই না? ছেলে কিন্তু আপনার একটাই হয়েছিল।’ …এমনধারা ধানাই-পানাইয়ের পর জোড়া-ছেলের একজনের অন্তর্ধান-রহস্যের ব্যাপারে আরো অধিক অনুসন্ধান করবার জন্যে বাবা হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষের কাছে আর কোনো জোরাজুরির তাল ঠোকেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে বাবা নাকি বলেছে শুধু, ‘সবই আল্লাহর ইচ্ছা।’ মা-ও নাকি বাবার কথায় সায় দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছে, ‘হ্যাঁ, যা বলেছ।’ …তবে মা যে মনে মনে একটা দুঃখ, একটা কষ্ট চেপে রেখে চলেছিল, সেটা বড় হয়ে মায়ের এখন-তখন দীর্ঘশ্বাসের ধরন দেখেই ইর্ফু সমঝে নিয়েছিল। মায়ের কাছে ইর্ফু শুনেছে, মা-বাবা ঠিক করে রেখেছিল, দেখতে শুনতে এক অভিন্ন হবে বলে বানানে-উচ্চারণে কিছুটা হেরফের ঘটিয়ে নামুটিও হবে এক ও অভিন্ন— ইরফান মিয়া আর এরফান মিয়া, সংক্ষেপে মায়ের পছন্দ ইর্ফু আর এর্ফু। আর মেয়ে যদি হয়— থাক, মেয়ে যখন হবে না বলে বলছে ওরা, তখন ও-কথা থাক।…তবে, সবকিছু ওলট-পালট করে মায়ের কষ্টটা তিন-গুণ-দশ-গুণ বাড়িয়ে দিয়ে পিছল সেই হাসপাতালের এক মহিলা সিস্টার না কী যেন বলে তাকে— এই তো বছর তিনেক আগে এক দুপুরে ইর্ফুদের গাঁয়ের বাড়িতে এসে মায়ের কানে-কানে সেই সিস্টার নাকি বলে ছিল— ‘আপনার কিন্তু যমজ ছেলেই হয়েছিল। ছেলে জন্মানোর দিন, একজন এসে একটি বাচ্চাকে চুরি করে পালিয়ে ছিল— ওই চুরিতে আমি সাহায্য করেছিলাম, কিছু টাকাও আমার হাতে গছিয়ে দিয়েছিলেন তিনি— এখন আমার ভীষণ অসুখ, বেশিদিন আর বাঁচব না, আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিচ্ছেন জানি— তাই, মরে যাবার আগে আপনাকে কথাগুলো বলে গেলাম— এখন আমার মরেও শান্তি।… এই নাম শুনে— মায়ের যেমন অভ্যাস— ‘ওরে আমার এর্ফুরে! বলে এক চিক্কুর পেড়ে জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান। বাড়িতে কেউ ছিল না তখন। মায়ের চিক্কুর শুনে— হাঁসদুটো হড়কে গিয়ে পুকুরপানে ছুট লাগালো, গোয়ালের গরুটা খালি-পেটে জাবর কাটতে শুরু করল, আমগাছ থেকে টুপ করে দুটো পাতা খসে পড়ল, আকাশ থেকে একটুকরো মেঘে গলে গিয়ে ইর্ফুদের গেরামটাকে ভিজিয়ে দিলো। …আর পুকুরে গোসল-টোসল বিসর্জন দিয়ে ইর্ফু এক দৌড়ে বাড়ির মধ্যিখানের ঘরে ঢুকেই দ্যাখে, মা মেঝেতে পড়ে আছে। …সেদিন থেকেই মা’র চোখের দিকে চোখ রাখাই দায়। মায়ের দু’চোখে মেঘনার যত জল থৈ থৈ থেকে থেকে চাপা কান্না। রাত দুপুরে ‘ওরে আমার এর্ফু রে!’ বলে কেঁদে ওঠা। …তো, একদিন মা তার চোখের জল-নাকের পানি একাকার করে বাবাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল ঢাকা শহরে— বলেছিল, ‘আমি অতশত বুঝি না— শহর থেকে আমার ইর্ফুকে এনে দাও।’ বাবা ধীর গলায় বোঝাতে চেয়েছি ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ঢাকা শহরে কি একটা-দুটো মানুষের বাস, অ্যাঁ? ঢাকা শহরে কোটি মানুষের ভিড়ে কুটোবাছা করে এর্ফুকে খুঁজে বের করা কি চাট্টিখানি কথা! তাছাড়া, এর্ফু যে ঢাকা শহরেই আছে, তাই বা নিশ্চিত করে কে বলবে? ও তো ঘোড়াশালেও থাকতে পারে। নয়তো দেখা যাবে ভেড়মারায় ঘোরাঘুরি করে বেড়াচ্ছে। ছাগলনাইয়াতেও ঘুরে বেড়ালে ঠেকাচ্ছে কে? কত জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে বেড়াব আমি, অ্যাঁ? …মা তবুও নাছোড়। চোখের টলমলে জলে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেতাই কাণ্ড। ওতেও বাবাকে টলানো গেল না বলে মায়ের হাউমাউ চড়া সপ্তকে চড়াও হলো এতে কাজ দিলো। বাবা-মায়ের হাউমাউ থেকে মুক্তি পেতে ঘর ছেড়ে উঠোন। উঠোন পেরিয়ে মেঠো পথ। তারপর, খাল-নদীর পানিতে নৌকোর বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ। শেষতক ঢাকামুখো একটা বাস। এবং বাসটা কদ্দূর গিয়ে একটা বেসামাল গরুর মতন উলটোপথে বেয়ে আসা বেসামাল মহিষরূপী একটা টেরাক্কে ঢু মারতেই, বাসটা রাস্তার পাশ কেটে খালপাড়ে আর বাবা জীবনের পাশ কেটে পরপারে।
বাবা পরপারে পাড়ি দেবার পর, সংসার চালাতে মায়ের হিমশিম অবস্থা। আলফাজ কাকাকে বেশ ক’বার মিনতি করে মা আবদার জানিয়েছে। শহরে নিয়ে আলফাজ কাকা যেন ইর্ফুর ভবিষ্যৎটা ঝলমলে করে দেয়। শহরে যে আলফাজ কাকার বেশ রমরমা অবস্থা— সেটা আর বসন-ভূষণ আর বচন-বাচনের ঢং দেখেই দিব্যি বোঝা যায়। বহু বছর আগে গাঁ ছেড়েছিল ইর্ফুর একমাত্তর কাকা, তাও আবার বাবার সাথে কাইজ্জা করে। আলফাজ কাকার ধারণা, পারিবারিক ফসলিজমির যে অংশটুকু মেঘনা নদীটা খেয়ে নির্বংশ করে ফেলেছে, সেটা নাকি বাবার অংশ— আলফাজ কাকার নয়। এই নিয়ে প্রচুর কথা কাটাকাটি হাতাহাতি এবং লাঠালাঠি শেষে গেরামের সালিশের নির্দেশ মেনে আলফাজ কাকা কাকির হাত ধরে গাঁ ছেড়ে চলে গেল একদিন। যাবার কালে, বাবা আর মা’র দিকে তাকিয়ে নাকি দাঁত ঘষটে বসেছিল, আচ্ছা। এর বদলা আমি নেব।’…তো, গাঁ ছাড়ল বটে, ফিরল কিন্তু আলফাজ কাকা— বছর কয়েক বাদে। কাকার গায়ে চড়ানো শহরে পোশাক।, মুখে ‘ইয়েস-নো-ভেরি গুড’ —জাতীয় ইংরেজি বুলি আর কাকির গা-জুড়ে সোনা-রুপোর গহনার জেল্লা। তারপর সবাই ঘোর-চোখে তাকিয়ে দ্যাখে, বছর ঘোরে আর আলফাজ কাকার মুলিবাঁশের বসতবাড়িটি পাকা দালান হয়ে পাকাপোক্ত দাঁড়িয়ে পড়ে; বছর ঘোরে আর আলফাজ কাকা নতুন করে জমি-জিরোতের মালিক বনে বর্গা খাটিয়ে ঘরে ফসল তোলে বছর ঘোরে আর আলফাজ কাকা নতুন টুকুর ছুড়ে মাছ-চাষে ব্যস্ত হয়ে যায়। ষোলো বছর আলফাজ কাকা একটা মসজিদ বানিয়ে দিয়েছে, যেটা পেয়ে গায়ের মানুষের সে যে কী আনন্দ! আলফাজ কাকা নাকি গাঁয়ে একটা মাদ্রাসাও দাঁড় করিয়ে দেবে— এই না শুনে গাঁয়ের সবাই আলফাজ কাকার জন্যে দোয়া করতে-করতে পেরেশান।
জ্ঞান হতেই— মানে, ইর্ফুর বয়স যখন সাত কি আট, তখন থেকেই ইর্ফুরকে দেখে আসছে, আলফাজ কাকা বছরে একবারটি হলেও গাঁ ঘুরে যায়। পুকুরের মাছ, গাছের ডাব, মাচার লাউ, খেতের টমেটো আপন জমিতে ফলানো ধান মাড়াই করা চালের খিচুড়ি চেটেপুটে জমিয়ে আয়েশ করে কাটিয়ে যায় দিন পনেরো কুড়ি। ও-বাড়ির খাবারের ঘেরান ইর্ফুদের নাকে জ্বালা ধরিয়ে ছাড়ে। ইর্ফুদের বাড়িতেও ঢু মেরে যায় আলফাজ কাকা একবার-দু’বার। কাকার চোখে কপালে নজর পড়লেই বোঝা যায়, ওই চোখে কি কপালে পুরনো রাগ-দুঃখ-ক্ষোভের লেশটুকু নেই বড়লোক হলে বুঝি মানুষের রাগ-টাগ বাগে চলে আসে।
বাবা একবার আলফাজ কাকাকে জিজ্ঞেস করেছিল— নিজ কানে শুনেছে ইর্ফু— এত টাকাকড়ি জোগাড় করলি কেমন করে রে?’ জবাবে আলফাজ কাকা সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে (কাকা নাকি একসময় কালে-ভদ্রে চেয়ে-চিন্তে বিড়ি খেত) বলেছে— ‘এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট-টেন্ডার— ও তুমি বুঝবে না। নো, বুঝবে না তুমি।’
পাশ থেকে মা বলেছে। আমার ইর্ফুর জন্যে একটা কিছু করে দিতে পারো না?
আলফাজ কাকা ইর্ফুর দিকে একটা রহস্যমাখা দৃষ্টি বুলিয়ে বলেছে। দেব, দেবো না কেন? হোয়াই?
টাইম হোক, তখন দেবা।
না, আলফাজ কাকার ‘টাইম’ আর হয়ে ওঠেনি— আর এদিকে ইর্ফু গড়াতে-গড়াতে কেলাস ফোর এর দোরগোড়ায় পৌঁছুতে না-পৌঁছুতেই পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে বাবার সাথে খেপলা জাল আর হালের বলদ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাবা-মারা যাবার পর মা আলফাজ কাকার কাছে পুরানো আবদারটি মেলে ধরতেই কাকা ফের ইর্ফুর দিকে তাকি রহস্যময় চাউনিটা ছুড়ে বলেছে— হবে ভাবি। সব হবে। এভরিথিং হ্যাপেন। অত তাড়া কীসের? হোয়াই তাড়া?
তো দেখতে দেখতে এসে গেল পরশুদিন সেই দিনটি। আলফাজ কাকা ইর্ফুদের বাড়ি এসে উঠোন একটা মোড়ায় আসন পেতে মাকে বলেছে— ভাবি, অনেকদিন, আগে কথা দিয়েছিলাম, সময় বলে ইর্ফুর জন্যে কিছু একটা করব— বলছি কি সময় এখন এসে গ্যাছে। ইয়েস, টাইম্্ কাম্। ক’দিন পরেই ইর্ফুকে শহরে নিয়ে যাব আর মার ব্যবসার কাজে লাগিয়ে দেবো। ইয়েস!
আলফাজ কাকার কথা শুনে মা তো খুশিতে আটখানা। ঘরে ইর্ফুর জন্যে তুলে রাখা দুটা গুড়ের মোয়া ছিল— মা মোয়াদুটো কাকার হাতে তুলে দিলো। মা’র ঠোঁটের পুব-পশ্চিম জুড়ে হাসির রেখা।
আলফাজ কাকার মুখে হঠাৎ গম্ভীর।
কী ব্যাপার? মুখের হাসি মুছে টুছে মা জিজ্ঞেস করেছে। হঠাৎ মুখটা কালো হয়ে গেল কেন তোমার?
আলফাজ কাকা তখনই আমতা-আমতা করে এরফান, মানে এর্ফুর কথাটা, পেড়ে বসে। ব্যস! ‘ওরে আমার এর্ফু রে।’ হাঁক ছেড়ে শুরু হয়ে যায় মা’র দফায় দফায় জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবার পালা।
মা শেষবারের মতন জ্ঞান ফিরে পেতেই আলফাজ কাকার মোবাইল ফোনটা টুংটাং করে বেজে ওঠে। কাকা ফোনটা কানের কাছে ধরে, কীসব শুনে-টুনে তড়াক লাফিয়ে ওঠে। মোয়াদুটো মেঝেতে গড়ায়। এরপর আলফাজ কাকার সংলাপগুলো অনেকটা এইরকম— ‘কী?… হোয়াট? …কী বলছিস!! হোয়াট সেয়িং?! …এটা কেমন করে সম্ভব!?! …অ্যাঁ? …হাউ সম্ভব? …ঠিক বলছিস তো??… আমি তো নিজ হাতে….! …তুই ঠিক ঠিক মাটি…? …ঠিক আছে, আমি আসছি। আই কামিং!… আশ্চর্যবোধক আর প্রশ্নবোধক চিহ্নে ভরাট সংলাপ আউড়ে আলফাজ কাকা ম’াকে বলল, আমি আজ যাই— আই গো— পরে দ্যাখা করব। এবং বলেই গটগট করে শহরের পথ ধরল।…
এই তো গেল গত পরশুর কথা।
আর আজ এ কী হলো?
আজ এই হলো যে মা’র বাক্স থেকে শ’কয়েক টাকা হাতিয়ে মাকে না জানিয়ে ইর্ফু বর্তমানে শহরের পথে বাসের ঝাঁকুনি খেতে ব্যস্ত। আসল উদ্দেশ্য, চুরি কি হারিয়ে যাওয়া ভাইকে উদ্ধার করে মায়ের সামনে দাঁড় করিয়ে মাকে চমকে দেওয়া।
…মাকে চমকাবে কী?! শহরে ঢোকার পরক্ষণ থেকেই তো ইর্ফুরই খোদ চমকানোর দশায় পেল। প্রথমটায় অবশ্যি ইর্ফু চোখে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। মানে, চারচক্রযানটি ইর্ফুকে একরকম চক্রান্ত করে যখন শহরের এক কোনায় নামিয়ে দিলো, তখন ইর্ফুর চোখের বাইরেও অন্ধকারটা ‘বসে পড়াব কি পড়ব না’ করে মাথা ঘামাতে ঘামাতে মাতোয়ারা প্রায়।
…বাসটিকে বশে এনে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছুনোর আগেই থামিয়ে দেওয়ার পেছনে একটি ঘোর চক্রান্ত যে ছিল, সেটা গেঁয়ো ইর্ফু টের পেলে তো!
হয়েছে কি, চলতি পথে দু’পাশের দৃশ্য যখন গাছপালার পরিবর্তে দালানকোঠা উঁকি দিতে লাগল, ইর্ফু সমঝে নিল— ঢাকা আগত প্রায়— বলতে গেলে ইর্ফুকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। হঠাৎ বাসটা একটা রাস্তার বাঁধার দাঁড়িয়ে পড়ল— কেন, কার অনুরাধে কে জানে— আর অমনি বাসে চড়ে বসে চোখে ঘোর লাগানো। বন্দুক কাঁধে পুলিশের দুই সেপাই এবং চড়ে বসতেই বাসটা ফের চালু হয়ে পথচলা শুরু করে দিলো।
সেপাইদের দেখে ইর্ফু খানিক চমকে স্মরণ করে, ওর মতো দেখতে ওর ভাই এর্ফুই হবে নির্ঘাত— পুলিশদেরই হেফাজতে এখন। এখন এর্ফুর এত্তেলা নিতে ইর্ফু কি এই সেপাইদের শরণ নেবে? জিজ্ঞেস করবে কি— ‘ভাই, আমার মতন দেখতে— আমার ভাই এর্ফুকে কোথায় আটকে রেখেছেন আপনারা, একটু যদি বলে দিতেন!’
এদিকে সেপাইদ্বয় বাসে উঠেই একজন আরেকজনকেও গলায় বিস্ময় মাখিয়ে বলে, আচ্ছা! আমরা সবকিছু ফেলে হঠাৎ বাসে উঠে পড়লাম যে? কী ব্যাপার?
দ্বিতীয়জনও গলায় বিস্ময় গলিয়ে বলে, কী জানি। হঠাৎ বাসটা থেমে গেল, আর কে যেন আমাদের ঠেলে বাসে ভেতর ঢুকিয়ে দিলো।
কোথায় যাচ্ছেরে বাসটা?
কে জানে! আগে তো কোথাও একটু বসে জিরিয়ে নিই, তারপর দ্যাখা যাবে।
সেপাই দুজন বাসের পেছনের দিকে দুটো ফাঁকা আসনের দিকে যেতে যেতে আচমকা ইর্ফুর দিকে নজর পড়তেই দুজনার তো মূর্ছা যাবার জোগাড়। থমকে দাঁড়ায়, ওরা চোখ পিটপিট করে ইর্ফুর দিকে তাকায়। আপনাআপনি চোখ কচলে ইর্ফুর। আগাপাশতলা পর্যবেক্ষণ করে দুজনের কী একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে মাথা দোলাতে দোলাতে তক্ষুনি অ্যাবাউট টার্ন করে চকিতে বাসচালকের আসনের ধারে।
এরপর সেপাই দুজন মুখজোড়া নামিয়ে বাসচালকের দুই কানে কী কথা পাঁচকান করতেই বাসচালকের চিঁহিঁ চিঁহিঁ প্রতিবাদ শোনা গেল— ওমা! সে কি! এ কেমন করে সম্ভব! আমাকে তো গাবতলী গিয়ে গাড়ি থামানোর কথা!
সেপাইদের একজন বলে তখন, আপনি গাবতলী যাবেন কি বেলতলা যাবেন— সে আপনার ব্যাপার। এখন…।
দ্বিতীয়জন বাক্য সম্প্রসারণ করে এখন আমরা যা বলছি সেটি না করলে বাসসুদ্ধ সক্কলকে জেল হাজতে পুরে রাখব, এই বলে রাখছি।
পুড়ে!! বাসচালক আঁতকায়।
পুড়ে নয়, পুরে। ‘ড়’ আর ‘র’-এর পার্থক্য বোঝেন না, কেমন তর বাঙালি আপনি, অ্যাঁ?
দ্বিতীয়জনের সংহার মূর্তি।
প্রথমজন উপসংহার টানে একজন ইয়েকে বাসের ভেতর আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে আমাদের স্যার আপনার নামে ফৌজদারি মামলা ফুঁকে দিতে পারেন, জানেন সেটা?
অগত্যা—।
বাসচালকের অনিচ্ছা আর বাসযাত্রীদের হল্লাবাজিতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাসটি বিপথগামী হয়ে আঁকাবাঁকা পথ ধরে থানার সদর দরজার ধারে দাঁড়িয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে যেন।
সেপাইদ্বয় তখন তিন লাফে ইর্ফুকে দ্বিতীয়বারের মতন চমকে দিয়ে ইর্ফুর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তী সংলাপগুলো এই রকম:
এক নং সেপাই: ব্যাটার বুকের পাটা দেখেছিস?
দুই নং সেপাই: দেখছি তো! আমাদের দেখতে পেয়েও কোনো হেলদোল নেই।
এক নং: পালানোর কোনো চেষ্টাই করছে না!
দুই নং: অথচ থানার গাড়ি থেকে কেমন ফুড়ুক করে পালিয়ে গেল— টেরটিও পেলাম না আমরা আশ্চর্য!
ইর্ফু: মানে? …পা….? এ…?
এক নং: চোপরাও!!!
দুই নং: খামোশ!!!
এক নং: স্যার এই জন্যেই তো একে কোর্টে হাজির করতে পারলেন না।
দুই নং: এই যে স্যারকে জজ সাহেব কি কম কথা শুনিয়েছেন?
এক নং: পত্রিকাগুলোও তো কম লেখালেখি করেনি এ ব্যাপারে।
দুই নং; এখন আমাদের স্যার চাকরি থেকে ইস্তফা না দিলেই হয়। স্যারের এতদিনের সুনাম…।
এক নং: দুঃখ সইতে না পেরে স্যার তার মাথায় পিস্তল চেপে আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারে।
দুই নং: হায় হায়! তখন আমাদের কী হবে?
পারস্পরিক সারগর্ভ: (কিংবা স্যারগর্ভ) বাক-বিনিময়ের পর সেপাই দুজন অতঃপর ইর্ফুকে নিয়ে তৎপর হলো।
এবং পরবর্তী কথোপকথনের ধরন অনেকটা এইরকম:
এক নং সেপাই: এই যে এরফান মিয়া…।
ইর্ফু: অ্যাঁ… আমি… ই….।
দুই নং সেপাই: খামোশ!!! একদম কথা বলবি না!
ইর্ফু: মানে…!
এক নং সেপাই: চোপরাও!!! একদম চুপ! কোনো কথা নয়। হাতদুটো হ্যান্ডস-আপ করে ওপরে তুলে ধরো।
ইর্ফু: কিন্তু…।
দুই নং: খামোশ থাকতে বললাম না? তাকাও মিউ মিউ করতে লেগেছিল?
ইর্ফু: (সংলাপহীন)।
একজন: আমার নাম কনস্টেবল হরিচরণ।
দুই নং: আমার নাম কনস্টেবল হরণাম।
এক নং: হরিহর আত্মা বলে মানে সবাই আমাদের দুজনকে।
দুই নং: আমাদের চোখ ফাঁকি দেবে, এমন ইতর-ছ্যাঁচড় আজতক জন্মায়নি।
এক নং: এখন সুবোধ বালকের মতন উঠে পড়, নিয়ে যাই তোকে আমাদের পূজনীয় স্যার গামা দারোগার কাছে।
দুই নং: অনেক দুঃখ দিয়েছিস তুই আমাদের স্যারকে— এখন তোকে দেখতে পেয়ে স্যারের মনে শান্তি আসে যদি।
ইর্ফুর মুখে কুলুপ। হাতদুটো হ্যান্ডসআপ অবস্থায় উঁচু করে হরি-হরের সাথে বাস থেকে নেমে পড়তেই বাসটা সজীব হয়ে পড়িমরি ছুট লাগিয়ে নিমিষে পগার পার।
থানার বড়কর্তা-গামা দারোগা নামে যাকে চেনে সবাই— গেল দু’দিন থেকে এখন অব্দি নিজের আপিস-কামরায় মাথায় হাত রেখে ভেবে-ভেবে সারা। এরফান মিয়া ওরফে অনেক কিছুর সন্ধানের ব্যাপারটা তাকে যাকে বলে কুরে কামড়ে খাচ্ছে। আদালতে নিয়ে যাবার সময় প্রিজন ভ্যান থেকে দিন দুপুরে ব্যাটা পালিয়ে গেল কেমন করে হে?
থানার সকলের যদিও বিশ্বাস, শহর সেরা সন্ত্রাসী এরফান মিয়াকে পাকড়াও করেছেন দেশ সেরা গামা দারোগা, তবে গামা দারোগা তো জানেন, এক মাঝরাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিল এরফান মিয়া। বলেছিল, গামা দারোগার সাথে নাকি ওর অনেক কথা আছে। একটু ধৈর্য ধরে যদি…। কিন্তু না, এরফান মিয়ার কথা শোনার মতন ধৈর্য ছিল না গামা দারোগার। পরের দিনই কোর্টে চালান দেবার কালে…। আদালত চত্বরে প্রিজন ভ্যানটি ঢুকেছে… গামা দারোগার জিপটি ভ্যানটির পিছু পিছু… গামা দারোগা জিপ থেকে নামলেন… ভ্যানের দরজা খোলার নির্দেশ দিলেন… তালা খোলা হলো… দরজা খোলা হলো… গামা দারোগা বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখলেন, প্রিজন ভ্যানের অন্দর খাঁখাঁ করছে… মেঝেতে হাতকড়াটা পড়ে আছে…! উফ্্! সেই মন-হাহাকার করা দৃশ্যটি মনে করলে তার লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে আসে।
…গামা দারোগার দাদার নাকি বড্ড সাধ ছিল, নাতি বড় হয়ে তার কালের সেরা গামা পালোয়ানের মতন মস্ত পালোয়ান হবে। নাতির নাম তাই ‘গামা’ রেখেছিলেন। কিন্তু দাদা তার শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করতেই বাড়ির সকলে মিলে দাদার ইচ্ছেটাকে তুচ্ছ করে তেতো উচ্ছে জ্ঞান করে গামাকে পুলিশ লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলো; পালোয়ানি যুগও ততদিনে নিঃশেষিত প্রায়। …তবে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে গামা দারোগা যে কালক্রমে খ্যাতির চুড়োয়, সে কি আর বলতে! তার প্রতাপে শহরের তাবৎ দুষ্টু-প্রকৃতির গণ্যমান্য রথী-মহারথী থেকে শুরু করে নগরের নগণ্য ইতর ছ্যাঁচড় সবাই এক পাতে পান্তা খেয়ে চলেছে। …কিন্তু এখন? এখন ওই ওরফে সর্বস্ব এরফানের দিন দুপুরে হাপিস হয়ে যাবার কারণে পান্তাভাতে ছাই পড়ার জোগাড়। জজ সাহেবের বকাঝকা, পত্র-পত্রিকায় কূটকচাল আর পুলিশ মহলে গামা দারোগাকে নিয়ে বেচাল বোলচাল— যাবতীয় ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে কেটে গেল বেশ ক’টি অস্বস্তিকর প্রহর। এক্ষণে গামা দারোগা ইস্তফাপত্রটি লিখে, আত্মহত্যা নাকি দেশান্তরী হবার নিমিত্তে আপিস ঘর থেকে বেরুবেন বলে যেই না চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, অমনি ঘরের ভেতর ইর্ফু-সমভিব্যাহারে হরি-হরের প্রবেশ।
চোখের সামনে ইর্ফুকে দেখেই গামা দারোগার কী যেন হয়ে গেল; চোখ গোল গোল করে ধপাস বসে পড়েন তার আসনটিতে। মুখে বোল ফোটাতে ভুলে গেলেন তিনি বলেন কেবল— এ… এ…।
কী… মানে…. কোথায়…? ব্যস, ওইটুকুই।
ইর্ফুও কিছু বলার চেষ্টা চালিয়ে যায়। আ…ই…ই…এ…! ব্যস, ওইটুকুই।
ইর্ফু বাড়তি কোনো স্বরবর্ণ মুখে জোগান দেবার আগেই সেপাই হরিচরণ গর্জে ওঠে, চোপরাও! স্যারকে ড্যাঙানো হচ্ছে! আসপদ্দা কত!
সেপাই হরনাথ পাশ থেকে সমান মেজাজে গর্জায়, খামোশ! বেয়াদব আর কাকে বলে।
সেপাই হরিচরণ গামা দারোগার মুখোমুখি হয়ে স্যালুট ঠুকে বলে, এই নিন স্যার, আপনার ভ্যান-পালানো কয়েদি— এরফান মিয়া।
অবাক গামা দারোগা বাক ফিরে পেয়ে মুখ ফুটে বলেন, একে পেলে কোথায়?
সে ম্যালা কথা স্যার, পরে বলব! ভাগ্যিস, আমি আর হরনাম বুদ্ধি খাটিয়ে উঠে পড়েছিলাম একটা ঢাকামুখো বাসে। ওখানেই পেলাম ওকে। এ ব্যাটা একটা দিন কোথায় কাটিয়েছে, ফের কোন মতলবে ওই বাসটিতে চেপে বসেছিল তা জানি না— কাল সকাল একটু পেটাই করলেই সব গড়গড় করে বলে দেবে।
সেপাই হরনাথ স্যালুট ঠুকে বলে, হুঁ হুঁ বাবা। আমরা হচ্ছি গে হরিহর। আমাদের কবল থেকে আসামি ফেরার হয়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াবে— সেটি কি কখনও হতে পারে? স্যার, একে এখন হাজতে পুরে রাখুন।
ইর্ফু আরো এরকবার গলা চড়িয়ে কিছু একটু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগেই ওকে হাজতখানার ভেতরে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইর্ফু ভাবল, যাকগে, যা হবার ভালোই হয়েছে, থাকা-খাওয়ার একটু বন্দোবস্ত তো হলো! কাল সকালে যা বলার দারোগা সাহেবকে বলা যাবে না হয়।
সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো না।
রাত দুপুরেই কী যে হলো, ঘরের ভেতর দারোজা সাহেবসহ সকলে— এক ইর্ফু বাদে— আচমকা ঘুমে কাত! চারদিক থেকে নাক ডাকার শব্দ। তারপরেই… ঘরের বাতিগুলো দূরের একটি বাদে… দপ্্ করে নিভে গেল…. আধো… আলো আধো আঁধারে বন্ধ দরজা ফুঁড়েই যেন মনে হলো ছায়ামূর্তির মতন একজন ঘরে ঢুকল।… ইর্ফু চোখ কচলে দেখল— তাইতো! দরজা ভেতর থেকে বন্ধ অথচ ঘরে মানুষ ঢুকে পড়ল— এ আবার কেমনতর ব্যাপার। আবার ঘরে সবাই হঠাৎ ঘুমিয়েই বা পড়ল কখন; একটু আগেই তো আফিসের কাজকম্ম করে যাচ্ছিল। আশ্চর্য!… ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে হাজতঘরটির দিকে এগোয়। দাঁড়ায় গরাদের ওপরে— ইর্ফুর মুখোমুখি। ইর্ফু জীবনে কখনও কোনো ভূত দেখেনি, তবে লোকটিকে দেখেই ইর্ফু ভূত দ্যাখার মতন চমকে উঠল। আবার একবার মনে হলো, ওর সামনে কেউ একটা আয়না বসিয়ে দিয়েছে, নইলে লোকটাকে অবিকল ওর মতনই দেখতে লাগবে কেন?
লোকটি মুচকি হেসে বাক্য হারা ইর্ফুর দিকে তাকিয়ে কয়— কিরে? অত অবাক হয়ে এত কী দেখতে লেগেছিস? আমি এরফান- মানে এর্ফু তোর যমজ ভাই!
লোকটি কথা শুনে ইর্ফুর যা হাল হলো, তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে ইর্ফু একটু হাসল। একটু কাঁদল। একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল। দুটো খাবি খেল। একটু বেকুবের মতন তাকালো। সবশেষে চক্ষু চড়ক গাছ করে ফের হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে থাকল।
এর্ফু দেরাজ থেকে হাজতখানার চাবি করে করে হাজকের তালা খুলে স্তম্ভিত ইর্ফুকে বের করে আনতেই, ইর্ফু ওর কুড়িবছর আগে হারিয়ে যাওয়া ভাইকে জাপটে ধরে। কুড়িটি বছরের চল্লিশটি ঈদের কোলাকুলি শেষে এর্ফু বলে এখন বেরিয়ে পড়া যাক।
ইর্ফু উশখুশে গলায় বলে, কিন্তু… কিন্তু… পুলিশে যদি ফের ধরে বসে? তখন কিন্তু অনেক পেটাই খেতে হবে।
এর্ফু বলল, ওসব আমার ওপর ছেলে দে। এখন তোকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে— তোকে ছেড়ে মা বেশ চিন্তায় আছে রে!
কিন্তু… কিন্তু… তুই আমার সাথে যাবি না? আমি তো খুঁজে বের করে, তোকে বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছি। মা সেই কবে থেকে তোকে দেখবে বলে অপেক্ষা করে আছে।
এর্ফু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে চাইল। পারল না। দুঃখ মেশানো গলায় বলল, এখন ওটা সম্ভব নয়।
…পরে একদিন যাব। তাছাড়া মা’র সাথে আমি দেখা করেই এসেছি।
তার মানে!!! —ইর্ফুর বিস্ময়।
এত মানে খুঁজতে হবে না।
পরে শুনবি আমার কথা। এখন চল তো। কথা না বাড়িয়ে চটজলদি বেরিয়ে পড়ি।
ঘরের দরজটা খুলে ওর দুজনে যখন বেরিয়ে এলো, গামা দারোগা আর তার সহকর্মীরা সক্কলে তখনও ঘুমিয়ে তাল।
রাস্তার ধারেই একটা সিএনজি অটোরিকশা দাঁড়িয়ে।
এর্ফু বলল, নে এখন, এটাতে উঠে বস। অনেকক্ষণ হলো এটাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
এর্ফু আর ইর্ফু পাশাপাশি বসে পড়তেই সিএনজি চালক আপনা থেকেই তার বাহনটিকে হনহনিয়ে হটিয়ে নিয়ে চলল।
এর্ফু তখন শুনিয়ে যায় ওর নিজের গল্প­ যেটা গুছিয়ে বলতে গেলে অনেকটা ওইরকম শোনাবে…।
সবকিছুর মূলে যে আলফাজ কাকা সেটা মালুম হলো কাকার। সাথে বাড়িতে গিয়ে। জীবনে কখনও নিজ বাড়ি দেখা হয়ে ওঠেনি কি না, তাই কাকার সঙ্গ নিতে হলো। তো, বাড়ি গিয়ে মাকে দেখতে পেলাম, তোকে দেখতে পেলাম— বাবার দেখা পাইনি বলে মনে বড় কষ্টরে। এই রকম করেই আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে গল্পটা শুরু করেছিল এর্ফু।
ইর্ফু হাহাকার করে ওঠে, হায়, হায়! আগেও একবার বলেছিলি তুই মা’র সাথে দ্যাখা করেছিল, এখন বলছিল বাড়ি গিছলি!! কই? কখন? দ্যাখা দিলি না কেন? কী বলছিস এসব?
ইর্ফুর হাহাকারে এতটুকু বিচলি হলো না ওর সদৃশ্য ভাইটি। সহজ ভঙ্গিতে বলে গেল, ছিলাম এই তো সেদিন— সেদিন আলফাজ কাকা মাকে শোনালো আমকে নাকি মেরে ফেলার জন্যে পুলিশ ধরে নিয়ে গ্যাছে। আমি দ্যাখা দিইনি ইচ্ছে করেই— তাই তোরা কেউ দেখতে পাসনি আমাকে।
আশ্চর্য তো! ইর্ফু বলে।
এর্ফু হেসে বলে, তারপর তুইও হুট করে মাকে কিছু না বলে এই ঢাকার পথে ছুট লাগালি। আমিও ‘তুই’ সেজে মা’র সাথে গল্প করলাম কত। মা একটু টের পায়নি। তারপর মাকে এটা সেটা বুনিয়ে আমিও এক উড়ালে (ইর্ফু ভ্রু কুঁচকালো) ঢাকার পথে। দেখা মিলল থানার দুই সেপাইয়ের সাথে। কায়দা করে— অনেক মন্ত্র-তন্ত্র পড়ে (ইর্ফু ফের ভুরুতে গিঁট) সেপাই দুজনকে তুলে দিয়েছিলাম তোর বাসে। আর হ্যাঁ, বাকিটা তো তুই জানিস। আমি কিন্তু বাসের ছাদে বসে ফুরফুরে হাওয়া খেয়ে গেছি।
আশ্চর্য তো! ইর্ফু বলে ফের।
এরপর এর্ফু ওর গল্পটা এরইরকম বলেছিল—।
আসলে সবকিছুর মূলে যে আলফাজ কাকা, সেটা টের পেলাম এই তো সেদিন। আলফাজ কাকা আর কাকিকে এতকাল ধরে আমার বাবা-মা হিসেবে জেনে এসেছি। তা জানব না কেন? জন্ম থেকেই তো ওদের বাড়িতে দিন কেটেছে আমার। কেবল কদিন আগেই কাকা আর কাকির কথাবার্তা আড়াল থেকে শুনে জাতে পারি, জন্মের সময় হাসপাতালের একজনকে টাকা দিয়ে আমাকে চুরি করে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল আলফাজ কাকা। আমাকে কোলে করে মহিলারা ঢাকার পথে পথে ভিক্ষে করে বেড়াতো। ভিক্ষে করে পাওয়া টাকাকড়ির একটা অংশ যেত কাকার পকেটে। একটু বড় হলে আমাকে দিয়েও ভিক্ষে করিয়েছে।
তারপর রাস্তার মোড়ে মোড়ে জুতো পালিশ করেছি, ফুল বিক্রি করেছি। বই-খাতা বিক্রি করেছি, বাসা-বাড়ির জিনিসপত্তর বিক্রি করেছি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম ছেলেপুলেরা ইশকুলে যাচ্ছে— কাকা আর কাকি কত করে বলেছি আমাকে ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দিতে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। আরো একটু বড় হলে পকেট কাটতে শিখলাম, ছিনতাই করতে শিখলাম। গাড়ির কলকবজা থেকে শুরু করে আস্ত গাড়ি চুরি করতে শিখলাম, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে শিখলাম, ছুরি-চাকু চালাচালি করে মারামারি করতে শিখলাম— আরো কত কী যে করেছি!
তারপর ওইদিন যখন শুনতে পেলাম আমাকে চুরি করে এনেছে ওরা, আর কিছুদিন পরেই আমাকে দিয়ে জালিয়াতি-জোচ্চুরি-খুন খারাবি করিয়ে ছাড়বে— তক্ষুনি ঠিক করলাম নাহ্্, অনেক হয়েছে, এর একটা শেষ হওয়া দরকার। তাই গামা দারোগার কাছে ধরা দিয়ে সব জারিজুরি ফলস করে, কাকা-কাকিসহ দলের সবাইকে ধরিয়ে দেবো বলে এক রাতে আমি সোজা থানার পথে। আর ওই চলতি পথেই, ফুটপাতে আমার পিঠেপুলি করল যেন কে! (ইর্ফু চোখ বড়-বড় করে তাকায় এর্ফুর দিকে)। ওই গুলি পিঠে করেই ফিরলাম ঘরে। শুনি আলফাজ কাকা আমাকে নিয়েই কাকির সাথে গল্প করছে। শুনি, গুলি খেয়ে আমি নাকি শেষ। বর্তমানে মাটি চাপা পড়ে আমার দুর্দশার একশেষ নাকি। (ইর্ফুর চোখ এবারে ছানাবড়ার মতন)। এখন আলফাজ কাকা নাকি পরদিনই বাড়ি গিয়ে মা’কে আমার সম্পর্কে মিছে কথা শুনিয়ে তোকে ঢাকায় এনে তার দলে ভেড়াবে— সবাই ভাববে, আমিই বুঝি…। সব শুনে মেজাজ তিরিক্ষি করে চলে যাই ফের গামা দারোগা বরাবর। …তো, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই… ওমা!… উনি কোনো প্রশ্ন-উত্তরের ধারে না গিয়ে আমাকে সোজা হাজতে পুরে রাখলেন। পরদিন কোর্টে নিয়ে যাবার সময় হঠাৎ মনে হলো— আরে! আলফাজ কাকার সাথে আমিও যাই না কেন বাড়িতে! দ্যাখা হবে মা’র সাথে! তোর সাথে। ভাগ্য ভালো থাকলেও জেনেও যাব, আমার পিঠে পুলিটাকে চালিয়েছিল। ব্যস, যেই না ভাবা, অমনি পুলিশের গাড়ির দরজা ঠেলে সোজা একটা রেলগাড়ির ছাদে। ছাদের নিচের কামরাটিতে আলফাজ কাকা তখন গুনগুন করে গান গাইছিল।…তোর চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুই জানতে চাইছিস— আমাকে কে গুলি করেছিল সেটা আমি জানতে পেরেছি কি না, তাই না। (ইর্ফু মাথাটাকে ওপর নিচ করে)। জানতে পারিনি আবার! খুব পেরেছি!…আলফাজ কাকার! আমি যে গামা দারোগার সাথে হাত মেলাতে যাচ্ছি, সেটা কাকা কেমন করে জানি টের পেয়ে গিয়েছিল।
এর্ফুর গল্প শেষ।
সিএনজিটা ততক্ষণে একটা বাসস্ট্যান্ডে এসে ভিড়েছে। শয়ে শয়ে বাস দাঁড়িয়ে। একটা বাসকে বাছাই করে এর্ফু বলল, ‘এটাতে উঠে পড়।’ টিকিটটা পরে কিনিস— ভোররাতে ছাড়বে গাড়িটা। …শহরে আর আসিস না রে! খারাপ হয়ে যাবি— একদম খারাপ হয়ে যাবি— ভেরি ভেরি ব্যাড— আমার মতন। মাকে বলিস, আমি মাঝেমধ্যে বাড়ি এসে দ্যাখা করে যাব। খিচুড়ি খাব। পিঠে খাব। ঈদের নতুন জামা পরব।’… চোখ টোখ খামোকা মুছে এর্ফু সিএনজিতে চেপে বসে। এবং… এবং… বলতে না বলতেই এর্ফু সিএনজিসুদ্ধ এমন অদৃশ্য হয়ে গেল যে ইর্ফু হতভম্ব হবার সময়টুকুও পেল না।
দরজা ঠেলে থানা ভবনের ভেতরে ঢুকেই সোজা লক-আপের ভেতর। তার আগে ফেলে যাওয়া চাবিটা দিয়ে লকআপের তালা টালা লাগিয়ে চাবিটা ফের দেরাজে পুরে রাখতে ভোলেনি। খানিকবাদে ঘরের আলোগুলো জ্বলে উঠল। ঘরের বাসিন্দারাও আড়মোড়া দিয়ে ঘুমের চটকা ভাঙে।
গামা দারোগা দুটো হাই তুলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন রাখেন— ‘কী ব্যাপার? ঘুমিয়ে পড়েছিলাম নাকি? এই বলে তাকান তিনি দেওয়াল ঘড়িটার দিকে। শেষবার যখন চোখ পড়েছিল ঘড়িটার ওপর, তখন রাত এগারোটা পেরিয়ে গ্যাছে— বাড়িতেও ফিরতে হতো মিনিট পনেরো বাদে। এখন চোখ কচলে তাকিয়ে দ্যাখেন, ঘড়ির বারোটা বেজে আরো দু’ঘণ্টা পেরিয়ে গ্যাছে।…গামা দারোগা চোখ কচলান। মাথা চুলকান।…এ কেমন করে হলো হে? কোনোদিন তো এমনটি হয় না!
লকআপের দিকে চোখ গেল।
এর্ফু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসছে।
কিরে? হাসছিল যেন? এতে এত হাসাহাসির কী হলো? রেগেমেগে কন গামা দারোগা।
হাসব না কেন হুজুর। ডিউটির সময় দিব্যি ঘুমুতে লেগেছেন আপনারা সবাই— তা দেখে হাসি পাবে না তো কী? এদিকে, কখন আপনার ঘুম ভাঙবে, কখন সবকথা আপনাকে খুলে বলব আমি— সে অপেক্ষায় থেকে থেকে আমারই পা-দুটো ধরে এলো— এর্ফু বলে।
কী কথা বলার আছে তোর, অ্যাঁ?… গামা দারোগা গলা হাঁকড়ে শুধান।
‘কী কথা? তাহলে বলছি শুনুন।’
—এই বলে, ইর্ফুকে বলা ওর খানিক আগের গল্পটা ফের শুনিয়ে যায় এর্ফু— এবারো গামা দারোগার কাছে। তবে গল্পের শেষে বলতে ছাড়ে না— আর হ্যাঁ, আশুলিয়ার ধারে যে চালকলটা আছে, তার পেছনে নতুন একটা কবর দেখতে পাবেন আপনি। কবরটা ফের খুঁড়লেই অনেক প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন— পেয়ে যাবেন আমার আলফাজ কাকার ফেরেরবাজির যত খবরাখবর।
গামা দারোগা গল্প শোনার ফাঁকে ফাঁকে আনমনে আড়িতে গেছেন। —ওমা!… তাই নাকি!! …আহারে!! …কী আশ্চর্য!!! …কই, তোর শরীরে কোনো রক্ত টক্ত দেখেছি বলে মনে তো পড়ছে না!!!
এর্ফুর বয়ান শেষে গামা দারোগার তাকে এতদিন লাগাতার খুঁচিয়ে যাওয়া প্রশ্নটি করেই ফেলেন নির্দ্বিধায়। —হুম! সব তো বুঝলাম— শুনলাম— জানলাম— তবে সবার আগে একটা কথা বল তো আমাকে। তালা লাগানো পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে তুই পালাতে পারলি কেমন করে শুনি?
কেমন করে? দেখতে চান? সত্যি-সত্যি দেখতে চাইছেন তো? …তাহলে দেখুন… এই… এমন করে! —এই না বলে এর্ফু গরাদ ফুঁড়ে, হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে, থানার দরজা নয়— বারো ইঞ্চি পুরু দেওয়াল ফুঁড়ে— থানা থেকে বেরিয়ে গেল।
ওই না দেখে, গামা দারোগা তার দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রথমবারের মতন মূর্ছা গেলেন।
তারপর অনেকদিন কেটে গ্যাছে। ইর্ফুর গেরস্থালির কাজকম্ম বেড়েছে। এই পুকুরে-নদীতে মাছ ধরো, এই খেয়া পারাপারের বন্দোবস্ত করো, এই শাক-সবজি কিছুটা ঘরে তোলো— কিছুটা শহরে পাঠাও, এই ধান শুকোতে দাও— আরো কাত কাজ যে! …এর্ফু আসে কালেভদ্রে। খিচুড়ি খেয়ে যায়। পিঠে খেয়ে যায়। মায়ের আদর নিয়ে যায়। ও নাকি বর্তমানে দূর এক শহরে নতুন এক দারোগার বড় এক চ্যালা বনে গিয়ে সেই শহরের তাবৎ মস্তান-দুষ্কৃতির অপকর্ম কি আস্তানার খোঁজখবর দিয়ে যাচ্ছে।
আলফাজ কাকা, কাকি আর ওদের দলের সবাইকে জেলে পুরে, গামা দারোগা একবার ইর্ফুদের বাড়ি ধরনা দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য— গাঁয়ে আলফাজ কাকার অবৈধ সম্পত্তির হিসেব-নিকেশ করা। তো, এক ধানখেতের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ইর্ফুকে লাঙল হাতে দেখতে পেয়ে কালবিলম্ব না করে মূর্ছা ছিলেন নাকি, দুর্ধর্ষ গামা দারোগা— দীর্ঘ কর্মজীবনে এটা তার নাকি দ্বিতীয়বারের মতন মূর্ছা যাওয়া— শোনা কথা অবশ্যি! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *