কেতকীর ঝোপে সে

  • শাহনেওয়াজ চৌধুরী

তার নাম সিকান্দার। একবার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন বলে তার নামের সঙ্গে ‘মেম্বার’ শব্দটি যোগ হয়েছে, এখনও তা বহাল।
তিনি যে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিলেন, তা জাহির করার জন্য সেকান্দার মেম্বার সব সময় উঁচু শব্দে কথা বলেন এবং ভুলভাল যা-ই হোক দৃঢ়তার সাথে কথা বলেন। তার যখন, যা খুশি তা-ই করেন। বকবক করেন। ঝগড়াও করেন। কার সঙ্গে না আবার ঝগড়া বেধে যায়— এই ভয়ে ছোট-বড় সবাই তাকে এড়িয়ে চলেন।
খেয়ালখুশি মতো কাজের মানুষটি আজ সকাল থেকে বড়শি পেতে খালপাড়ের কেতকীর ঝোঁপে বসেছেন। ঝোপটা পেরিয়ে পুবে কিছুদূর এগোলেই প্রাইমারি স্কুল। পশ্চিম থেকে ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকরা স্কুলে আসতে জানতে চেয়েছেন— ‘কেতকীর ঝোপের পাশে বসেছেন কেন? ওখানে সাপ থাকে যদি!’
সিকান্দার মেম্বার বলেন, ‘সাপ আমার কী করবে দেখবেন।’
তার সঙ্গে কথা বাড়ায় না কেউ, যদি আবার ঝগড়া লেগে যায়! তবে স্কুলে আজ তাকে নিয়ে বেশ হাসাহাসি! ঠাট্টা করে কেউ কেউ বলে—‘সিকান্দার মেম্বার আজ তিমি মাছ ধরব!’
কেউ কেউ দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে বিশালাকার দেখিয়ে বলে— ‘হ, হ, ভোৎকোরাল ধরব আইজ!’
একজন বলল, ‘কেয়ার ঝোপের পাশে মেম্বাররে সাপে না কাটলে অয়।’
স্কুলের জানালা দিয়ে সিকান্দার মেম্বারকে দেখা যায়। গুনগুন করে গান গাইছেন আর বড়শি হাতে ধরে জলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
কিছুক্ষণ পরেই ওরে… ওরে… অই… অই… বলে চিৎকার শোনা গেল সিকান্দার মেম্বারের।
কেউ গায়ে মাখল না। সিকান্দার মেম্বার কখন কী করেন বোঝা ভার! কে তার জন্য এগিয়ে গিয়ে ঝগড়া-বিবাদে জড়াবে!
সিকান্দার মেম্বারের হইচই চলতেই থাকল।
কেউ কেউ আশঙ্কা করে বলল, ‘ঐ কেতকীর ঝোপ থেইকা সিকান্দার মেম্বাররে সাপে কাটল না তো!’
কেউ বলল, ‘কারো লগে ঝগড়া লাগছে মনে অয়।’
সিকান্দার মেম্বারের অনবরত চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে একজন-দুজন করে স্যাররা এগোলেন তার দিকে।
কী ঘটল, কী কারণে সিকান্দার মেম্বার এত চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন— এসবের কারণ খুঁজতে ছাত্রছাত্রীরাও উৎসুক হয়ে স্যারদের পিছু নিলো।
ছাত্রছাত্রীরা দেখল— স্যাররাও সিকান্দার মেম্বারের বড়শির ছিপ টানছেন। চার-পাঁচজন মিলে পেরে উঠছেন না দেখে হাইস্কুলের ছাত্ররাও ছিপ টানতে লেগে গেল।
সবাই অবাক। বিশাল কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন সিকান্দার মেম্বার। বড়শিতে বিশাল এক রুইমাছ গেঁথেছেন!
যারা ঠাট্টা করেছিল, তারা বেশি অবাক হয়েছে! এই শুকনো খালে এত বড় রুইমাছ এলো কোত্থেকে!
রুইমাছটার ওজন কম নয়। হাইস্কুলের ছাত্ররা ওটাকে কাঁধে তুলে স্কুলের পেছনে সিকদার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছে। ওখানেই ওটার কাটাকাটি, মাপামাপি হবে।
হাইস্কুলের ছাত্ররা মাছটাকে কাঁধে তুলে বয়ে নিয়ে চলেছে আর তাদের সামনে সিকান্দার মেম্বার বীরদর্পে হেঁটে চলেছেন। তাকে বীরদর্পে হাঁটতে দেখে মজা পাচ্ছে সবাই।
কেউ কেউ টিপ্পনী কাটছে— ‘সিকান্দার মেম্বার বহু বছর পর আইজকা কেতকীর ঝোঁপে বইসা একখান বিশাল একখান কাজ কইরা ফেলছে!’
মাছটা কাটাকাটি, মাপামাপির পরে জানা গেল— আঠারো কেজি ওজন হয়েছে ওটার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *