খালামণির ভূত দেখা

  • হোমায়রা মোর্শেদা আখতার

মনন ওর মা-বাবার সাথে জামালপুর বেড়াতে যাচ্ছে। মননের ছোট খালামণি, খালাতো ভাইবোন আবনার ও স্রোতস্বিনী যাচ্ছে ওদের সাথে। ওরা মূলত যাচ্ছে রবিন মামার বিয়েতে। রবিন ও জেরিন মননের মায়ের ছোটখালা মানে রেনু নানির ছেলে মেয়ে। রবিন মামার বিয়ে উপলক্ষ্যে বাড়ি ভরতি মেহমান। ভীষণ আড্ডা আর গল্পগুজব চলছে। মননরা চার পাঁচ দিন জামালপুর থাকবে ভাবতেই মননের খুব আনন্দ হচ্ছে।
ভাদ্র মাস মানে শরৎকাল চলছে। এই আকাশ কাশ শুভ্র মেঘের ভেলা ভাসিয়ে দিচ্ছে, আবার সজল মেঘের আকুল কান্না হয়ে বৃষ্টি ঝরছে। মননের খুব ভালো লাগছে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে। মনন একটু-ভাবুক ধরনের।
তাই ওর মা ওকে আদর করে ডাকে মনন চিন্তামণি। এই নামটা শুনলে মননের খুব হাসি পায়। মনন খুব মন দিয়ে মেঘমুক্ত বিকেলের আকাশে রঙের খেলা দেখছিল। এর মধ্যে একখণ্ড কালো মেঘ এসে আকাশটাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢেকে দিলো। মনন অবাক হয়ে ভাবছিল এসব।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যারাত নামল কিন্তু কিছুতেই বৃষ্টি কমছে না। বৃষ্টির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে এ বৃষ্টি দুই তিন দিন স্থায়ী হতে পারে। মনন ওর মার কাছ থেকে শুনেছে এমন বৃষ্টিকে নাকি বলে ভাদইভাসা বানের বৃষ্টি।
এর মধ্যে ইলেকট্রিসিটিও চলে গেল। রেনু নানি খিচুড়ি আর গরুর মাংস রান্না করেছে। সবাই খুব মজা করে তা খেয়ে নিলো। ইলেকট্রিসিটি নেই তাই খাওয়ার পরে কোনো কাজও নেই। কারও ঘুমও আসছে না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে জেরিন খালামণি বলল চল আমরা ভূতের গল্প করি। আর এক কথাতেই সবাই রাজি হয়ে গেল। এমন গুমোট অন্ধকার রাতে গা ছম ছম করা ভূতের গল্প না হলে কি চলে। মননের মা, ছোট খালামণি পিয়া, জেরিন খালা মনি, আবনার, স্রোত আজওয়া, রাইসা, রাফিদ, মনন সবাই খাটে গোল হয়ে বসেছে। মননের রেনু নানির স্টকে অনেক ভূতের গল্প। ওরা সবাই জোর করে রেনু নানিকে এনে বসায়। রেনু নানি একটু বিরক্ত হলেও গল্প বলা শুরু করে।
এককালে নাকি রেনু নানির বাপের বাড়িতে ছিল ভূত পেতনিদের স্বর্গ রাজ্য। ভোররাতে কেউ পুকুর ঘাটে গেলে দেখতে পেতো ছোট ছোট বউ পুকুরে গোসল করছে। মধ্যরাতে স্টেশনে ট্রেনটা যখন থামত তখন যাত্রীরা ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরত। প্রায়ই শোনা যেত তাদের কারো কারো
সাথে ভূত পেতনিদের মোলাকাত হতো। হঠাৎ নাকি গাছের একটা ডাল সশব্দে নড়ে উঠত। হুট করে দেখা যেত বিলের দিকে আগুনে বলের নাচন। মনন রেনু নানিকে জিজ্ঞাসা করে নানি তুমি কখনও ভূত দেখেছ?
রেনু নানি হাসতে হাসতে বলে কতবার দেখেছি। একদিন খুব সকালে শিউলি কুড়োচ্ছি আমি আর রাশেদা। হঠাৎ দেখি বম্মা মানে আমার বড় দাদি পুকুর পাড়ে গড় গড় করে হেঁটে গেল। একটু পরেই ঘরে এসে দেখি বম্মা দিব্যি ঘুমাচ্ছে। আরেক দিন পুবদুয়ারি ঘর থেকে রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন ছিল শীতের রাত। হঠাৎ দেখি কলতলায় ছোট একটা বউ সাদা শাড়ি পরা গায়ে পানি দিচ্ছে। আমি তো চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছি। আর কিছু মনে নেই। আরেক দিন বাড়ির বউঝিরা বেশ কয়েকজন মিলে শহরে গেছি নাইট শোতে সিনেমা দেখতে। ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত এগারোটা বেজে গেছে। রিজার্ভ করে নিয়ে যাওয়া চার রিকশাতে আমরা সবাই ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি রুইয়ার বিলের ওপারে আগুনের গোলা নামছে। এরপর বাকি পথ চোখ বন্ধ করে এসেছি। ভূতের গল্প বেশ জমে উঠেছে। বাইরে বৃষ্টি তার অবিরাম গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশ একটা চনমনে রাত্রি।
এর মধ্যে হঠাৎ জেরিন খালামণি চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। কী হয়েছে? কী হয়েছে সবাই চিৎকার করে বেশ একটা শোরগোল বাঁধিয়ে ফেলে। জেরিন খালামনির চোখে-মুখে পানি দিতে থাকে মননের আম্মু। রুমা খালামণি জোরে জোরে বাতাস করতে থাকে। প্রায় ১৫/২০ মিনিট পড়ে জেরিন খালামণির জ্ঞান ফিরে আসে। ওতো ভয়েই অস্থির। সবাই জিজ্ঞেস করতে থাকে ওর কী হয়েছিল। ও তখন আস্তে আস্তে বলতে থাকে ও ভূত দেখেছে। দেখেছে অনেককাল আগে মরে যাওয়া ওর রাবু ফুপু দরজা ধরে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। তাই ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।
রাতে সবাই একটু বেশ ভয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কেবল ঘুম আসে না মননের। ও ভাবতে থাকে। মা পরিবেশটা সহজ করার জন্য হাসতে হাসতে বলে এই যে শুরু হলো আমার মনন চিন্তামণির চিন্তা। এর মধ্যে মননের সারিম ভাইয়ারা বিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছেন। সারিম ভাইয়া বলে আসলে জেরিন ফুপির মনে হয় হ্যালুসিনেশন হয়েছিল। একথা শোনার পড়ে মনন উইকিপিডিয়া, গুগল সার্চ করে করে হ্যালুসিনেশনের মানে খুঁজতে থাকে।
এরপর মনন জেরিন খালামণিকে বলে আসলে তোমার হ্যালুসিনেশন ঘটেছিল। আর ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
এরপর মননের মা বলতে থাকেন থাক থাক মনন চিন্তামণি। আর এতকিছু বলো না।
তখন মনন বলে বিষয়টি কিন্তু একদম হেলাফেলার নয়। কারো মধ্যে এরকম সমস্যা প্রকট হলে তাকে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নেওয়া উচিত। কারণ এটা এক ধরনের মনের রোগ। অপর্যাপ্ত ঘুম, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা থেকে এর রোগ হতে পারে। জেরিন খালামণির তো বিয়ের হইহুল্লোড়ে কতদিন থেকে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। তাই হয়তো এরকম হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *