চুরি বিদ্যা তিন শর্তের চক্করে

  • আতা সরকার

সালামত আলি। গাঁয়ের এক সম্পন্ন গৃহস্থ। গাঁয়ের নাম অদিতবাড়ি। জীবনের শুরুতে তার আর্থিক অবস্থা তেমন একটা ভালো ছিল না। নিজ গাঁয়েই অন্য ধনবান গৃহস্থদের জমি-জিরেতে কাম-কাজ করত। তবে সে খাটা-খাটনি করতে পারত খুব। ফাঁকি-জুকি দিতে একদম পছন্দ করত না। এজন্য সবাই তাকে কাজে নিতে চাইত। তাকে অন্যদের চাইতে মজুরিও দিত বেশি বেশি যাতে অন্য সময়ও তাকেই কাজে পাওয়া যায়।
সে ছিল খুব হিসাবি। অপ্রয়োজনীয় বা বাজে খরচ একদম করত না। নিজের খরচাপাতি কমিয়ে কিছু কিছু করে টাকা জমাতো। হাতে কিছু টাকা জমলেই জমি কিনত। এইভাবে সে নিজেই জমি-জিরেতের মালিক হয়ে ওঠে। নিজের জমিতে নিজেই হাল-আবাদ করত। প্রথম দিকে কিছু জমির মালিক হলেও অন্যের খেতে কাজ করতে কিন্তু বাদ দেয়নি। দিনের বেলায় অন্যের জমিতে কামলা খাটত, রাতে নিজের জমি চাষ করত।
রাতদিন খাটা-খাটনি করতে করতে দিনদিন তার আর্থিক অবস্থা ভালো হয়ে উঠতে থাকে। একসময় নিজের জন্য সুন্দর বাড়ি-ঘর বানায়। গ্রামের মধ্যে ভালোমানুষ হিসেবে তার খুব সুনাম।
সে বিয়ে করে। সংসার পাতে। এখন গাঁয়ের সমাজে গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবেও তার সম্মান।
তার চার ছেলে। হাসমত। কবির। জামিল। সগির।
বড় তিন ছেলে হাসমত কবির জামিল ঠিক বাপের মতোই। সংসারী। ভালো। তারা নিজেদের সংসারে কাজ করে। আবার বাবাকেও সাহায্য করে।
অন্যদিকে সব ছোট ছেলে সগির তার ভাইদের থেকে ঠিক উলটো। সংসারে তার তেমন একটা মনোযোগ নেই। গ্রামজুড়ে শয়তানি দুষ্টুমি করে বেড়ায়। গ্রামের লোকরা তার জ্বালায় অতিষ্ঠ। বিশেষ করে কারো বাড়িতে সে ঢুকলে সেই বাড়িটার কোনো না কোনো জিনিস হারাবেই। সবার ধারণা, যে জিনিসটা হারায় তা সবার অগোচরে সগিরই তুলে নিয়ে যায়। এসব তারই কাজ। এই বয়সেই সে চোর হিসেবে নাম করে ফেলেছে।
সালামত আলি তাকে খুব বুঝিয়েছে। কিন্তু বাপের কোনো উপদেশই তার কানে ঢোকেনি।
সালামত আলির বয়স হয়েছে। একসময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মনে ভাব জাগে, এই জগৎ সংসারে তার আর বেশি দিনের আয়ু নাই। সে তার চার ছেলেকেই ডেকে পাঠায়।
ছেলেরা এসে দাঁড়ায় তার বিছানার পাশে। কেউ রয়েছে শিয়রের পাশে তার কপালে হাত দিয়ে। কেউ রয়েছে পায়ের পাশে বাবার পা আঁকড়ে। কেউ ধরে আছে বাবার হাত।
সালামত আলি চোখ তুলে তার ছেলেদের দিকে তাকায়। একে একে সবাইকে দেখে। তারপর ধীর গলায় বলে: আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে। জীবনে আমি যা কিছু করেছি সেগুলোর সবই তোমাদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিয়েছি। এখন তোমরা সেগুলো তোমাদের কর্মযোগ ও কর্মফলে রক্ষা করবে। সম্পদ আরো বাড়াবে। আমার কাছে তোমাদের আর কিছু কি চাইবার আছে?
এসব কথায় ছেলেরা আকুল হয়ে ওঠে। বাবার হাত-পা জড়িয়ে ধরে।
হাসমত বলে: আপনি আমাদেরকে উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আপনার কাছে এখন দোয়া ছাড়া চাইবার আর কিছুই নাই। বাবা, আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন আমরা দুনিয়ায় সুখে থাকতে পারি। আমাদের যেন টাকা-পয়সার কোনোই অভাব না হয়।
কবির বলে: বাবা, আমারও কিছু চাওয়ার নাই। বড় ভাই আপনার কাছে যে দোয়া চেয়েছেন, আমিও সেই দোয়াই চাই।
জামিল বলে: বাবা, আমরা ভাইয়েরা যেন মিলেমিশে একসাথে থাকি, সেজন্য দোয়া করবেন। আর বড় ভাই যে দোয়া চাইলেন, সে দোয়া আমিও চাই।
সালামত আলির খুব ভালো লাগল। তিন ছেলেকেই সে প্রাণ ভরে দোয়া করল।
এদিকে ছোট ছেলে সগির বাবার পা ধরে চুপচাপ বসে রয়েছে। সে কোনো কথা বলে না। আপন মনে কী যেন ভাবছে।
তার প্রতি সালামতের চোখ গেল। বলল: তোমার বড় তিন ভাই আমার কাছে দোয়া চাইল। তুমি তো কিছু চাইলে না। তুমি ভালোমতো জীবনযাপন করতে চাও না? ভালো থাকতে চাও না?
সগির মৃদু কণ্ঠে বলল: আমার বড় তিন ভাই ভালো মানুষ, আপনার কাছে তাদের চাওয়াও ভালোমানুষের মতোই। তাঁদের মতো সেভাবে আমি কিছু চাই না।
সালামত শান্ত কণ্ঠে বলল: তোমার যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই আমার কাছে চাও। বলো বাবা, তোমার কী চাই?
সগির বলল: আমিও আপনার দোয়া চাই।
সালামত বলল: অবশ্যই আমি দোয়া করব।
সগির তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বলল: তবে আমার বড় ভাইদের মতো দোয়া নয়।
সালামত জিজ্ঞেস করল: তুমি কী দোওয়া চাও?
সগির মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বলল: বাবা, আমাকে দোয়া করেন যেন আমি চুরি বিদ্যা রপ্ত করে দুনিয়াতে নাম করতে পারি।
ছোট ছেলের এ ধরনের দোয়ার আবদার শুনে বাবা হকচকিয়ে গেল। বলল: এটা তুমি কেমন ধারার দোয়া চাইছ? চুরি করা তো মহাপাপ।
কিন্তু সগির নাছোড়। নামজাদা চোর হওয়ার জন্য সে তার বাবার দোয়া চায়। সালামত আলি তাকে একথা— ওকথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ছেলে তার কিছুই বুঝতে রাজি নয়। সেরা চোর তাকে হতেই হবে। আর এজন্য বাবাকেও দোয়া করতে হবে।
অগত্যা সালামত আলি বিরক্ত হয়ে বলল: ঠিক আছে ব্যাটা, তুমি যা হতে চাও তাই হবে। দোয়া করি, আল্লাহ তোমার মকসুদ পূরণ করবেন। তবে বাবা, আমার দোয়ার জন্য তিনটা শর্ত আছে। এই শর্ত তিনটা তুমি মানবে, এজন্য আমাকে কথা দিতে হবে।
সন্দেহে সগিরের ভুরু কুঁচকে গেল। বলল: আবার শর্ত মেনে কথাও দিতে হবে! কী কথা? চুরি করব না এই ধরনের কোনো কথাই কিন্তু দিতে পারব না।
সালামত আলি বলল: তুমি চোর হও, চুরি করো এই নিয়ে কিছু বলব না। শুধু শর্ত, তুমি তিন জায়গায় চুরি করবে না।
সগির বলল: মাত্র তিনটি জায়গা? এ ব্যাপারে কথা দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু তার আগে জেনে নিই, কোন তিনটি জায়গায়?
সালামত আলি বলল: চুরি যখন করবেই, তখন তিন লোকের ঘরে চুরি করো না। যে লোক বখিল কৃপণ তার ঘরে। যে লোকের বউ অবাধ্য তার ঘরে। আর তুমি যে লোকের উপকার করেছ তার ঘরে— এই তিনজনের ঘরে চুরি করবে না।
সগির মনে মনে ভাবল: এই তিন শ্রেণির লোকের ঘরে চুরির জন্য না ঢুকলে আমার কোনো ক্ষয়ক্ষতি নাই। পৃথিবীটা অনেক বড়। আরো অনেক লোকের ঘর আছে। তাদের ঘরে ঘরে চুরি করে শেষ করতে পারব না।
সগির বাবাকে কথা দিলো, বাবার কথামতো এই তিন ঘরে সে কোনোদিন চুরি করবে না।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোয়া করল: তুমি যা চাও তাই হবে। আল্লাহই তোমাকে হেফাজত করবেন।
দুই.
একদিন সালামত আলি পরিবার সংসার সন্তানদের মায়া কাটিয়ে পরকালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। ছেলেরা তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে কবরে রেখে এলো। তার রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়ার মহফিল হলো।
সময়ে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে এলো। যার যার সংসার নিয়ে ছেলেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বড় তিন ছেলের দিন ভালোই কাটে। দিনদিন তাদের আয়-রোজগার বাড়ে।
কিন্তু দিন কাটে না ছোট ছেলে সগিরের। কাটবে কী করে? হাল আবাদ সংসার ফেলে সারাক্ষণ ঘরে বসে শুধু চুরির ফন্দি-ফিকির করলেই কি দিন কাটে? এমনকি সে চুরি করতেও বেরোয় না। ঘরেই বসে থাকে। আর চুরির বুদ্ধি আঁটে।
এদিকে ঘরের খাবারের জন্য যতটুকু ধান-চাল ছিল তাও ফুরিয়ে আসতে থাকে। একসময় সগির গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। বউকে ডেকে বলে: বাড়িতে বসে থেকে কোনো লাভ হবে না।
বউ মুখ ঝামটা দিয়ে বলে: সেটা তো অনেকদিন থেকেই বলছি। তুমি তো কানেই নাও না।
সগির বলল: এতদিন ঘরে বসে বসে থেকে বুদ্ধি পাকালাম। এবার হবে বুদ্ধিমতো কাজ। দেখি, কোন দিকে যাই! কিছু উপায়-ব্যবস্থা করতে পারি কি না!
সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। সাথে নেয় নিড়ানি, কাস্তে আর একটা বস্তা। মনে মনে বুদ্ধি ঠাওরায়: কোন বাড়িতে গিয়ে কাজ নেবো! সুযোগ-সুবিধা পেলে সেই বাড়ির ধন-সম্পদ সোনা-দানা সব নিয়ে চম্পট দিব।
তিন.
সগির এই গাঁ ঐ গাঁ ঘুরে তার নিজের গ্রাম থেকে অনেক দূরে এলো। কাজেকম্মে যোগ দেওয়াও যে এত কঠিন এটা তার জানা ছিল না।
মাঠের কিষানদের সে জিজ্ঞেস করেছে, তাকে কাজে নিবে কি না। কিষানরা জানিয়েছে, খেত-খামারজুড়ে কামলায় ভরতি। এত কামলা থাকার পরও নতুন কামলার প্রয়োজন আছে কি?
গাঁয়ের সব গৃহস্থের বাড়িতে তো খোঁজ নেওয়া যায় না। আবার গরিব গৃহস্থের বাড়ি থেকেও হাতিয়ে নেওয়ার তো কিছু নাই।
একটা বড় জাম গাছের নিচে সে বসল। সাথে গামছায় বেঁধে নিয়ে এসেছিল চিড়া-গুড়। বসে বসে তাই চিবুতে লাগল।
বুড়ো মতো এক লোক অনেক আগেই গাছের নিচে বসে ছিল। সেদিকে খেয়াল নেই সগিরের। পথ হাঁটতে হাঁটতে তার খুব ক্ষুধা পেয়েছিল। এইজন্য তার সব মনোযোগ চিড়া-গুড়ের দিকে। বুড়ো ভুরু কুঁচকে সগিরের চিড়া খাওয়া দেখতে লাগল। কোনো কথা বলল না।
সগির দুই মুঠো চিড়া খেয়েই ঢেকুর তুলল। এইবার বুড়ো তার হাতে ধরা পানিভরতি একটা বদনা নীরবে সগিরের দিকে এগিয়ে দিলো। বলল: আরাম করে পানি খাও। চাপকলের বিশুদ্ধ পানি। পানি খেতে কোনো খরচ নাই, একদম ফি, বিনামূল্যে।
সগির দ্বিধা না করে বুড়োর হাত থেকে বদনাটা নিয়ে নিলো। মুখ হাঁ করে ঢকঢক পানি ঢেলে দিলো। বদনার পুরো পানি।
বুড়ো এবার জিজ্ঞেস করল : কোথা থেকে আসা হয়েছে?
সগির নিজের গ্রামের নাম বলতে যাচ্ছিল। মুহূর্তে সতর্ক হয়ে গেল। গ্রামের নাম মুখেই আটকে রইল, নিজের গ্রামের নাম কোনোভাবেই বলা যাবে না। চুরি-চামারি করে সে যদি এখান থেকে কেটে পড়ে, তাহলে তার গাঁয়ে গিয়ে খোঁজ-খবর তল্লাশি শুরু হয়ে যাবে।
সগির মুখে যা আসল তেমনই একটা গ্রামের নাম বলে দিলো: সোনাপুর।
বুড়ো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল: সেটা কোথায় গো?
সগির বলল: এখান থেকে চল্লিশ গাঁ দূরে।
বুড়ো আবার জানতে চাইল: যাওয়া হচ্ছে কোথায়?
সগির বলল: মনে করুন, এই গাঁয়েই!
বুড়োর প্রশ্ন: কার বাড়িতে?
সগিরের জবাব: যার বাড়িতে ঢোকা যায়।
: কেন?
: কাজের জন্য।
: কী কাজ?
: সব ধরনের কাজ। বাড়ির মালিক যা করতে বলবে, সব কাজ।
: কাজ পেয়েছ?
: এখনও পাইনি।
বুড়ো এবার গলা পরিষ্কার করল। বলল: তোমাকে কাজ আমি দিতে পারব, করবে?
সগির হাতে চাঁদ পেল। গদগদ হয়ে বলল: কাজ করতেই তো এসেছি। দিয়েই দেখুন।
বুড় বলল: তোমার সাথে চিড়ে-গুড় তো আরো রয়েছে? তোমার সাথে ঐ গামছার পোটলার মধ্যে?
সগিরের মনে সন্দেহ দোলা দেয়, বুড়ো চিড়া-গুড়ের সন্ধান করছে কেন? কাজের লোভ দেখিয়ে চিড়া-গুড়ে ভাগ বসাতে চায় নাকি?
ভয়ে ভয়ে আমতা করতে করতে সগির জবাব দিলো: তা খানিকটা আছে।
বুড়ো বলল: বেশ। ভালো। ওটা দিয়ে তোমার রাতের খাবার হয়ে যাবে।
সগির বুঝতে পারল না, বুড়ো কী বলতে বা বুঝাতে চাইছে। দ্বিধা নিয়ে বলল: তা হয়ে যাবে।
এবার বুড়ো কথা পাড়ল: দেখো, আমি তোমাকে আমার বাড়িতে কাজ দিতে পারি।
সগির আনন্দে লাফিয়ে উঠল: কাজ দেবেন! তাহলে আমি আপনার প্রতি খুব কৃতজ্ঞ থাকব।
বুড়ো বলল: তবে আমি কোনো বেলার জন্যই কোনো খাবার দিতে পারব না। বাড়িতে আমরা মাত্র দুজন আমি আর আমার ছেলে। দুইজনের জন্য রান্না আমি নিজের হাতেই করি। কিন্তু তাই বলে আমি তিনজনের রান্না-বান্না করতে পারব না। এমনকি আমার চুলোয় তুমি রান্নাবান্নাও করতে পারবে না। তোমাকে ঐ চিড়ে-গুড় খেয়েই থাকতে হবে।
সগির মনে মনে ভাবল, খাওয়া নিয়ে অত ভাবছে কে! একবার তোমার বাড়িতে ঢুকে নিই, তারপর বুঝবে কার খাবার কে খায়!
সগির নিজের মনের ভাব গোপন করে বলল: বেশ, আমার খাবারের ব্যবস্থা আমার মতো করে আমি নিজেই করব, আপনার কোনোকিছুই নেব না।
বুড়ো বলল: তবে পানি ফ্রি। যাতে ইচ্ছা পানি পান করতে পারবে। আমার চাপকল আছে। এখন বেতনের কথা বলি। বেতন তোমার চাওয়ার দরকার নাই। আগে তোমার কাজকর্ম দেখি। যেমন তুমি কাজ করবে, তেমন বেতনই আমি তোমাকে দেবো। রাজি?
সগির এবারও মনে মনে ভাবল, বেতন তুমি বুড়ো আমাকে আর কী দিবে, সব উসুল করে আমিই পগার পার হয়ে যাব। আমার নাগালটিও তুমি পাবে না।
প্রকাশ্যে বলল: আপনি বেতন যেমনটি দিবেন, তেমন নিয়েই আমি খুশি থাকব। তবুও তো আপনার মতো একজন মুরুব্বির সাথে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি।
সগিরের চাকরি হয়ে গেল।
বুড়োর পেছনে পেছনে নাচতে নাচতে সগির তার বাড়িতে এলো। আসার পথে সে একটা বিষয় দেখে সে খানিকটা অবাকই হলো। পথে বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে দেখা হয়েছিল। বুড়োকে দেখে তারা নিজেদের মুখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। বোঝা গেল, বুড়োকে গাঁয়ের লোকরা খুব একটা পছন্দ করে না। বুড়ো তার পরোয়াই করে না। সে নিজে ভুলেও কারো দিকে তাকায় নাই। গটগট করে করে তার বাড়ির দিকে হেঁটে গিয়েছে। ব্যাপারটা দেখে-শুনে সগিরের মন খানিকটা দমেই গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফক্কা হাতে ফিরতে হবে নাতো!
বুড়োর বাড়িতে ঢুকেই সগিরের মনটা খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল। বুড়োকে দেখতে যেমনই লাগুক, গাঁয়ের লোকরা তার সাথে কথাবার্তা না বলে যতই এড়িয়ে যাক, তাতে কিছুই যায়-আসে না।
বুড়োর বাড়ি আলিশান। ধন-সম্পদ মণিমাণিক্য ধান-চালে ভরপুর। এত বড়ো লোক কাছাকাছি থেকে এর আগে সে কখনও দেখে নাই। এই বাড়িতে অভাবের লেশমাত্র নাই। এসব ভোগ করার লোক মাত্র দুইজন, ভাবতেই তার অবাক লাগল।
আরো অবাক হওয়ার বিষয় তার জন্য অপেক্ষা করছিল। বুড়ো দুপুরের খাবার তখনো খায় নাই। সে তার জন্য এক মুঠো চাল আর ভাতের হাঁড়িতেই এক টুকরো আলু সেদ্ধর জন্য দিলো। ছেলে গিয়েছে বাজারে। তার জন্য এই বেলায় কোনো খাবার নাই। বুড়ো জানালো, রাতে বাপ-ছেলের জন্য দুই মুঠো চাল আর দুটো আলু সিদ্ধ চড়াবে।
সগির অবাক হয়ে বলল: এই যদি খাদ্যের তালিকা হয়, তাহলে এত সম্পদ জমিয়ে রাখা কার জন্য?
বুড়ো ফোকলা দাঁতে হেসে বলল: সম্পদ করেছি সম্পদ করার আনন্দে।
সগির মনে মনে বলল: বেশ, মনের আনন্দে সম্পদ করো; সুযোগ বুঝে সব হাতিয়ে নিয়ে যাবে। সুযোগটা একবার পেয়ে নিই।
বাড়িতে এসেই বোঝা গেল ঝক্কি কাকে বলে। বুড়ো এক সেকেন্ডও বসতে দিলো না সগিরকে। বিশ্রাম নেওয়ার কোনো চান্সই নেই। বাড়িতে পা দিতে না দিতেই তাকে কাজে লাগিয়ে দিলো। প্রথমে বাসন-কোসন মাজা-ঘষার কাজ। শেষ হতে না হতেই এক গাদা ময়লা কাপড় ধোয়ার কাজ এক রত্তি সাবান ব্যবহার করে কাপড়গুলোকে ঝকঝকে পরিষ্কার করতে হবে।
তখনো পাঁচটি কাপড় ধোয়া বাকি। এরমধ্যেই অর্ডার এসে গেল: ঘরদোর উঠোন বারবাড়ি সব মুড়ো ঝাঁটা দিয়ে ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার ঝকঝকে তকতকে করতে হবে। এরপরই বাড়ির চারপাশেই যেসব গাছপালা আছে সেগুলোর মগডালে উঠে বাড়তি ডালপালা কাটতে হবে ভোঁতা দা দিয়ে। ডালপালা কেটেই শেষ নয়, সেগুলো আবার কুড়োল দিয়ে ফেড়ে লাকড়ি বানাতে হবে।
এইভাবে একের পর এক কাজ আসতে লাগল। এদিকে বেলাও গড়িয়ে যেতে লাগল। সগির মনে মনে বলল: এত সব কাজ-কম্মোর চাইতে চুরি অনেক ভালো। কদিন আরাম করে শুয়ে-বসে খাওয়া-দাওয়া করা যাবে।
ভাবারও সুযোগ নেই। বুড়ো এসে সামনে হাজির। নাও, সন্ধ্যা হয়েছে। গরুগুলোকে গোয়ালঘরে তুলে মশা তাড়াও।
সন্ধ্যা হয়েছে। বুড়ো ঘরে বাতিও জ্বালাতে দিলো না। সগির গজগজ করতে করতে গরুগুলোকে গোয়ালঘরে তুলল। মশা তাড়ানোর জন্য খড় জোগাড় করে যেই না আগুন জ্বালিয়েছে, অমনি বুড়ো তেড়ে-মেড়ে ছুটে এলো। হাউমাউ করে বলল: অতগুলো খড় নষ্ট করলে পুড়িয়ে। আগুন নিভাও।
সগির বলল: খড়ে আগুন লাগিয়ে ধোঁয়া বানাচ্ছি। সেই ধোঁয়ায় মশা তাড়াচ্ছি।
ব্ুেড়া বলল: খড় ধ্বংস করে মশা তাড়ানোর দরকার নাই। হাত নেড়ে নেড়ে বাতাস করে করে গরুর গা থেকে মশা তাড়াও।
অগত্যা খড়ের আগুন নিভাতেই হলো। সগির আর কী করে, খানিকক্ষণ গোয়ালঘরে থেকে মশার কামড় খেয়ে খেয়ে গরুর গা থেকে মশা তাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
আর ওদিকে বুড়ো বাড়ির উঠোনে চাঁদের আলোয় বসে রইল। তার ছেলে গিয়েছে বাজারে। তারই ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ঝিমুতে লাগল।
সগির গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বুড়োর পেছন দিয়ে চুপিচুপি উঠোন পেরিয়ে ঢুকে পড়ল থাকার বড় ঘরটায়। বুড়োর আলমারি ও সিন্দুক খুলে যত টাকা-পয়সা গয়নাগাটি সোনাদানা আছে সব একটা বস্তার মধ্যে ভরল। বস্তাটা ঘাড়ে ফেলে সে বুড়োর বাড়ি থেকে সটকে পড়ার পাঁয়তারা করল।
এসময়ই বুড়োর ছেলে বাজার থেকে এসে পড়ল। বাড়ির উঠোনেই সওদাপাতি নামিয়ে রেখে বাপের মুখোমুখি বসল। সগির তখনো বস্তা কাঁধে বুড়োর ঘরে। ছেলেকে দেখতে পেয়ে চুরির বস্তাটা সে ঘরের মেঝেতে নামিয়ে রাখল। বাপ-ছেলে কথা বলতে থাকুক, ওদের গল্পের মাঝখানে সে সুযোগ বুঝে বস্তাসহ চম্পট দিবে।
বুড়ো কিন্তু টনটনে। বয়স হয়েছে বলে স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েছে এমন নয়। বাজার থেকে কী কী কিনতে বলেছিল তার সবকিছুই মনে আছে। পাই পাই করে সেসবের হিসাব নিচ্ছে। ছেলেটা হিসাবে উনিশ-বিশ করার কোনো কায়দা নাই। সে হিসাবপত্তর বুঝিয়ে দিতে দিতে মাঝে-সাঝেই কেন জানি কেঁপে কেঁপে উঠছে। কোনো জিনিসের দাম বাড়িয়ে বলতে গেলেই বুড়ো ধমকে উঠছে। বলছে, বাজারে যাওয়া-আসার সড়কের পাশে গাছতলায় বসে বসে বাজার দরের সব বিবরণ সে জেনে নিয়েছে। বুড়ো এখন ছেলের কাছ থেকে খরচের হিসাব নিচ্ছে আর তার মেজাজ গরম হয়ে উঠছে। মেজাজ গরম হচ্ছে তো ছেলের পিঠে দুই-চারটে কিল-চাপড়ও পড়ছে।
ছেলেটা শেষ পর্যন্ত ডুকরে কেঁদে উঠল। এরপরও রেহাই নাই। বুড়োর মুখ পাথরের মতো। গম্ভীর কণ্ঠে বলল: কান্নাকাটি করে লাভ নাই। হিসাবপত্র তোমাকে ঠিকঠাক মতো দিতেই হবে। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়েছি। টাকা জমাতে গিয়ে কতদিন ভাত না খেয়ে মুড়ি চিবিয়ে কাটিয়েছি। সেখান থেকে হিসাবে এক পয়সার গরমিল হলে তোকে কেটে-কুটে নদীতে ভাসিয়ে দেবো। এমন কুলাঙ্গার ছেলে আমার দরকার নাই।
এতসব হুমকি-ধামকির পরও শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, হিসাবে ঐ এক পয়সারই গড়বড়। এক পয়সা বাড়তি কীভাবে খরচ হয়েছে, ছেলে তা বলতে পারছে না।
রাগ মাথায় চড়ল বুড়োর। লাঠি দিয়ে ছেলেকে বেদম পিটিয়েও সে শান্ত হলো না। রাগটা যেন আরো চড়ে গেল। উঠোনেই পড়ে ছিল এক ধারালো দা। রাগের চোটে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সেটাই সে হাতে তুলে নিলো। বসিয়ে দিলো ছেলের ঘাড়ে। ছেলে মাটিতে পড়ে গেল। সাথে সাথেই মৃত্যু।
আড়াল থেকে সবই দেখল সগির। তার শরীর কেঁপে উঠল। কী নিষ্ঠুর বুড়ো! মাত্র এক পয়সার জন্য! এত ক…পণ! সগিরের এসময়ই তার বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা বলেছে কৃপণের ঘর থেকে চুরি না করতে। এই বুড়োর চাইতে কৃপণ আর কে হতে পারে! এই বুড়োর বাড়ি থেকে চুরি করা যাবে না।
সগির বুড়োর ঘরের মেঝের ওপর চুরির বস্তা ফেলে রাখল। বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে সে খালি হাতে বেরিয়ে এলো।
ঐদিকে বুড়ো ডাকাডাকি করেও সগিরের সাড়া-শব্দ না পেয়ে ঘরে ঢুকল। সগির কোথাও নেই। ঘরের মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে একটা বস্তা। তার মধ্যে তার ঘরের দামি দামি জিনিসপত্র। বুঝতে পারল, সগিরই চুরি করার মতলব করেছিল। কোন এক অজানা রহস্যময় কারণে চুরি না করে সে খালি হাতেই পালিয়েছে।
বুড়ো এই আশ্চর্য চুরির ঘটনা জানাল গাঁয়ের মোড়লকে। মোড়ল জানালো সরকারি উচ্চ মহলকে। শেষ পর্যন্ত খবরটা পৌঁছে গেল রাজদরবারে।
চার.
পথে হাঁটতে হাঁটতে সগির মনে মনে ভাবল, গ্রামের মানুষের ঘরে জিনিসপত্র তেমন নাই। শহরে বড়লোকের কাজ নিলে লাভ বেশি হবে।
সে চলে এলো শহরে। খুঁজে পেতে একটা বাসাবাড়ি তার খুব পছন্দ হলো। বেশ বড় সড় পাকা বাড়ি। অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী। ঘরে আবার লোকজনের সংখ্যাও কম। কেবলমাত্র জামাই-বউ। কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। গোটা কয়েক চাকর-বাকর বাবুর্চি রয়েছে। এরপরও তাদের নাকি আরো লোক দরকার। কী কী কাজের জন্য লোক দরকার, তা কেউ বলতে পারে না। বাড়ির বেগম সাহেবার ইচ্ছা হয়েছে, তাই লোক দরকার।
সগির চাকরি চাইলে সাথে সাথে তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। সগিরের খুব পছন্দ হলো এই বাড়িটা। আর যাই হোক, এরা কিপটে নয়। এই বাড়িতে কেনাকাটা জিনিসপত্রের কোনো ধরনের হিসাবপত্র হয় বলে মনে হলো না। চাকর-বাকররা যে যেদিকে যেভাবে পারে কামিয়ে নিচ্ছে।
চাকরদের মধ্যে সবচাইতে প্রবীণ লোকটা তাকে বলল: আসলে সাহেব আর মেমসাহেবার মধ্যে বনিবনা নাই। সাহেব উত্তরে গেলে মেমসাহেবা দক্ষিণে চলতে শুরু করে। সাহেব আয়-উপার্জন কামাই-রোজগার করে, মেমসাহেবা তার ভাইবোনদের সাথে নিয়ে সব উড়ায়। এসবের সুযোগ আমরাও নিই। সুবিধা-সুযোগ পেলে তুমিও নিতে পারো।
সগির গালে হাত দিয়ে ভাবে, আজব একটা বাড়ি তো! এই বেহিসাবি বাড়ি থেকেই চুরি করতে হবে। এমনভাবে চুরি করতে হবে যাতে এবাড়ি থেকে আর কারো চুরি করার মতো কিছুই না থাকে।
কাজের জন্য কেউ তাকে কিছু বলে না। হুকুমও করে না। সে বাড়ির বারান্দায় পাতা একটা ইজিচেয়ারে বসল। সেখানে বসে সে বাড়ির লোকজনের চলাফেরা কাজকর্ম খেয়াল করতে লাগল। সন্ধ্যা হলেই সে চম্পট দিবে। তার আগেই প্রত্যেকটা রুম থেকে গুছিয়ে নিবে দামি দামি জিনিসপত্র। এই বাড়ি থেকে যা জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়া যাবে, তা দিয়ে তার আর তার পরিবারের পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে। আর চুরি করতে হবে না। তবে এরপরও সে চুরি করবে। কুখ্যাত চোরের নাম-যশই তো তার চাই।
বাড়ির মালিক তার পাশ দিয়েই গ্যাঁট গ্যাঁট করে হেঁটে গেল। সগিরকে দেখলই না। বাইরে বেরিয়ে গাড়িতে চড়ল। সাথে সাথে ড্রাইভারও। গাড়িতে চেপে তারা বাইরে কোথাও চলে গেল।
মেমসাহেবা থাকে ভিন্ন আরেক রুমে। সাহেব চলে যেতেই সে বেরিয়ে এলো তার রুম থেকে। বাইরে তাকিয়ে দেখল সাহেবের গাড়িতে চড়া, ড্রাইভারের গাড়ি ছাড়া।
তার চোখ-মুখ আনন্দে ঝিকঝিক করে উঠল। সাথে সাথে কানে তুলে নিলো মোবাইল টেলিফোন। একনাগাড়ে কত জনের সাথে যে কথা বলল, তার হিসাব নাই। বলেই যাচ্ছে: ওরে আমার ঝিলমিল রিমঝিম বকুল চামেলি তারা ডান্ডি মন্টি হরবোলা ঠাণ্ডু বাঙ্কি, তোরা কে কোথায় আছিস? সাহেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। বাড়ি একদম খালি। সে আজ রাতের আগে ফিরবে না। সারাদিন তাহলে হুল্লোড় হবে আনন্দ হবে খানাপিনা হবে।
দেখতে না দেখতেই বাড়ি ভরে গেল নানান কিসিমের লোকজন দিয়ে মেমসাহেবার বয়সি সব পুরুষ নারী। এসেই সবাই কলবল। পুরো বাড়িতে হইচই। কেউ হাসে। কেউ কাশে। কেউ ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে। কেউ নাকি কান্না করে। কেউ ভেংচায়। কেউ লেংচায়। কেউ গান করে। কেউ হবে হাঁক-ডাক দেয়।
চাকর-বাকররাও ব্যস্ত। রান্নাঘরে বাবুর্চিরাও। হরেক পদ রান্নাবান্না হয়। সবাই মিলে গোগ্রাসে গিলে। খেতে খেতে খাবার কিছু আবার এদিক-ওদিক ফেলেও। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত।
চাকরদের প্রবীণজনকে জিজ্ঞেস করলে সে সগিরকে জানায়: এই যে এত মেহমান, এরা প্রতিদিন আসে। সাহেব না থাকলেই এদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এদের মধ্যে একজনও সাহেবের নিজের লোক কেউ নাই, এমনকি পিঁপড়াটাও না। এরা সবাই মেমসাহেবার ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব। সাহেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেই সাহেবের টাকাতেই এরা সবাই ফুর্তি-ফার্তা করে। সাহেব ফিরে আসার আগেই সবাই যে যার জায়গায় ফিরে যায়।
সগির জিজ্ঞেস করে: সাহেব এসব ঘটনার কথা জানেন না?
প্রবীণ বলে: আমরা কেউই সাহেবকে এসবের কথা কখনও বলি নাই, মেমসাহেবাও বলেন নাই। তবে সাহেব সবই টের পান।
সগির অবাক হয়ে বলে: সাহেব কিছু বলেন না?
প্রবীণ জবাব দেয়: না। কিছু বলেন না। নিজের মনেই নিজের দুঃখ চেপে রাখেন।
সগির আর কথা বাড়ায় না। অত কথা জেনে তার কী লাভ! এমন ধারা চললেই তো ভালো। চুরির কম্মোটা নিশ্চিন্তে করা যায়।
এই বাড়িতে অনেক রুম। সে ঘুরে ঘুরে সব কটা রুমেই যায়। রুমে রুমে সাজানো নানান কিসিমের দামি জিনিসপত্র। মেমসাহেবার ঘরেই সবচাইতে বেশি।
সে আর দেরি করে না। বস্তায় ধীরে ধীরে জিনিসপত্র ভরতে শুরু করে। লোকজন আনন্দে হট্টগোলে এতই ব্যস্ত যে কেউ তার প্রতি খেয়ালই করে না।
বস্তা ভরতে ভরতে সগির ঘেমে ওঠে। অনেক বস্তা হয়েছে। এতেসব নিয়ে যেতে হলে সাহেবের গাড়িটাই লাগবে। কিন্তু এরপরও অর্ধেক জিনিসপত্র ভরা হয় নাই।
এসময়ই গাড়ির হর্ন শোনা গেল। বোধহয় সাহেব ফিরেছে। চারপাশে ধুপধাপ আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আগত অতিথিরা যে যার মতো পালাচ্ছে। সগির আর বস্তা ভরা ক্ষান্ত দিয়ে একটা রুম থেকে বেরিয়ে এলো। দেখতে পেল, বেগম সাহেবা ধীর পায়ে তার রুমে গিয়ে ঢুকল।
একটু পরেই সাহেব বাড়িতে ঢুকল। নিজের রুমে যাওয়ার পথে বেগম সাহেবার রুমে উঁকি দিলো। সাহেব এগিয়ে যেতেই উঁকি দিলো সগিরও। মেমসাহেবা পালঙ্কের ওপর শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সাহেব যে ফিরেছে, যেন সেটা টেরই পায়নি!
সাহেব নিজের রুমে এসে কাপড়-চোপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঘরের কাপড় পরে নিলো। তারপর এলো ডাইনিং রুমে। সেখানে টেবিলের ওপর সাহেবের জন্য খাবার সাজানো রয়েছে। সগির দেখে অবাক হলো, টেবিলে একটা প্লেটে দুই টুকরো আটার রুটি। আরেক প্লেটে এত টুক সবজি। আরেক প্লেটে আধ-খাওয়া মুরগির রান।
সাহেবকে খাওয়াতে মেমসাহেবা এলো না। কোনো চাকর-বাকরও না। সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে নিজেই খেয়ে নিলো। তারপর নিজের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়ল।
সগির ভাবে, সারা বাড়িতে সবাই এখন ঘুমের ভান করছে। জিনিসপত্র সরানোর এখনই মোক্ষম সময়। এই বাড়ি থেকে চুরি করলে এটাই হবে সবচাইতে বড় চুরি। সারা শহরে হইচই পড়ে যাবে। এই সুযোগে তার অনেক কুখ্যাতি হবে।
কিন্তু কেন জানি এই বাড়ি থেকে চুরি করতে সগিরের মন সায় দেয় না। মনে পড়ে বাবার নিষেধের কথা শর্তের কথা। যে লোকের স্ত্রী অবাধ্য, তার বাড়ি থেকে চুরি করা বারণ।
মেমসাহেবার মতো অবাধ্য স্ত্রী আর কে আছে!
সগির চুরির কোন বস্তা না নিয়েই বড়লোকের বাসাবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
পরের দিন সকালেই হইচই পড়ে গেল। কে যেন জিনসপত্র দিয়ে বস্তা ভরে তেমনই রেখে দিয়ে গিয়েছে। একটা বস্তাও নেয়নি। একটা জিনিসও চুরি হয়নি।
বাড়ির সাহেব ঘটনাটা শহরের মেয়রকে জানাল। মেয়র জানালো আরো ওপর মহলে।
পাঁচ.
পরপর দুই বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে বিফল হলো সগির। মনটা তার খারাপই হলো। চোর হিসেবে তার নাম-ডাক যশ-খ্যাতি এখনও হচ্ছে না। এখন তো পেটের খাওয়া জোগাড় করাই দায়!
সে নদীর ঘাটে বসে উপায় ভাবতে লাগল। মনে মনে ভাবল, গাঁয়ে গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকলাম গৃহস্থ বখিল বলে চুরি করতে পারলাম না। শহরের বড় ব্যবসায়ীর বাড়িতে গেলাম, ঘরে তার অবাধ্য স্ত্রী রয়েছে বলে আর চুরি করা হলো না। এবার তাহলে যাই কোথায়?
ভেবে ভেবে সে ঠিক করল, নাম-যশের জন্য চুরি যদি করতেই হয় তাহলে দেশের মাথা রাজার বাড়িতেই চুরি করা ভালো।
সগির এবার রাজবাড়িতে এলো। আশপাশ ঘোরাঘুরি করে তার খুব পছন্দ হলো। এখান থেকে চুরি করতে পারলে, বিশেষ করে রাজার নিজস্ব মহল থেকে চুরি করতে পারলে তার একদিকে যেমন কুখ্যাতি জুটবে, অন্যদিকে এই ধন সে আর তার পরিবার সাতপুরুষ ধরে ভোগ করতে পারবে।
একে তাকে ধরাধরি করে সে রাজার বাড়িতে একটা চাকরিও জুটিয়ে নিলো। কাজ তেমন কঠিন কিছু নয়। রাজার ছোটো-খাটো ফুট-ফরমায়েশ খাটা। বড় বড় কাজ করার জন্য রাজার পুরনো চাকর-বাকররা রয়েছে।
ফুট-ফরমায়েশ খাটার সুবাদে রাজার নিজস্ব ঘরে ঢোকার সুযোগও তার জোটে।
সগির খুব মনোযোগ দিয়ে রাজার কাজ করে। ফুট-ফরমায়েশ খাটে। আর ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক এটা ওটা দামি দামি জিনিস সরিয়ে তার বস্তায় ঢুকায়। বস্তাটা রেখে দিয়েছে আড়ালে। এমন করতে করতে এটা সেটা ভরতে ভরতে একসময় বস্তাটা ভরে যায়। শুধু একটাই বস্তা হলেও এর মধ্যে রয়েছে সাত রাজার ধন। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ রাতে সুযোগ বুঝে বস্তা নিয়ে সে রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে।
রাত গভীর হয়। রাজবাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। পাহারাদারদের হাঁক-ডাক শোনা যায় মাঝে-মধ্যে।
সগির বস্তা কাঁধে নিয়ে নিজ ঘর থেকে চুপিচুপি বেরিয়ে আসে। আঙিনায় বস্তা রেখে দাঁড়ায়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে খেয়াল করে, কেউ কোথাও জেগে রয়েছে কি না। কোথাও থেকে কোনো আওয়াজ শুনতে পায়না।
বস্তাটা উঠাতে যাবে, এসময়ই সে শুনতে পায় কান্নার শব্দ। সাথে সাথে বিলাপ: হায়! হায়! এটা কী হচ্ছে? এত বড় সর্বনাশ কে ঠেকাবে?
সগিরের পিলে চমকে ওঠে। তার চুরি কি কেউ দেখে ফেলেছে? এই চুরির কথাই কেউ বলছে নাতো?
সে বস্তা আঙ্গিনাতেই রেখে একটু সরে আসে। কান পেতে খোঁজ করার চেষ্টা করে কোথা থেকে কান্না আর বিলাপের আওয়াজ আসছে।
আবার কান্নার শব্দ। রাজার মহলের পাশেই রাজবাড়ির নামাজঘর। সেখান থেকেই শব্দ আসছে।
সগির নিঃশব্দে পা ফেলে নামাজঘরের পাশে এসে দাঁড়ায়। দেখতে পায়, নামাজঘরের ভেতর এক দরবেশ বসে রয়েছেন। তাঁর দুই চোখই ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে।
সগিরের মনের ভেতর খুব অপরাধ বোধের জন্ম নেয়। সে দরবেশের সামনে এসে হাঁটু মুড়ে বসে। ভক্তি ভরে সালাম জানিয়ে সবিনয়ে জানতে চায়: আপনি কাঁদছেন কেন?
দরবেশ তাকিয়ে দেখেন সগিরকে। কথা বলতে গিয়ে তাঁর গলার স্বর বুজে আসতে ধরে। তিনি বলেন: বাবা, তোমাদের এই রাজা খুব ভালো লোক। বলো, ভালো না?
সগির বলল: আমি অল্প কিছুদিন হলো এখানে নোকরি করছি। রাজা হুজুরের সাথেই থাকি। আমি তাঁকে ভালো মানুষ হিসেবেই দেখেছি।
দরবেশ বললেন: তিনি রাজ্যের মানুষের কল্যাণের জন্যই কাজ করেন। তাঁর সারা সময়ের ভাবনা প্রজার হিত সাধন। এই নামাজঘরটা বানিয়েছেন বলেই এখানে বসে আমি ইবাদত করি, আল্লাহর বন্দেগি করি। রাজা আমাকে আর আমার মতো অন্য সবাইকেও সম্মান করেন, যত্ন করেন। অথচ আজ রাতেই রাজাকে সাপ কামড়াবে। এমন একজন পরোপকারী ভালো রাজা সাপের কামড়ে মরে গেলে এই রাজ্যের আর সাধারণ প্রজাদের কী হবে?
সগির একটুখানি ভাবল। তারপর বলল: সাপ কোথায় বলুন, ওটাকে আমি মেরে ফেলব।
দরবেশ বললেন: শুধু মারলেই তে হবে না, সাপের এক ফোঁটাও রক্ত বা মাংসের টুকরো রাজা যদি দেখতে পান, তাহলেও রাজা মরে যাবেন।
সগির জিজ্ঞেস করল: সাপ কোথায়?
দরবেশ বললেন: সাপ রাজার ঘরের দক্ষিণের জানালা দিয়ে ঢুকে রাজাকে ঠোকর দিবে।
সগির নামাজঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ওদিকে থেমে গেল দরবেশের কান্নাও।
সগির রাজবাড়িতে তার থাকার কক্ষ থেকে একটা দা নিয়ে এলো। এগিয়ে গেল রাজার ঘরের দিকে। দক্ষিণের জানালার কাছে এসে দা হাতে সাপের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
খানিক বাদেই সাপটাকে দেখতে পেল। সাপটা দক্ষিণের জানালা বেয়ে যেই না রাজার ঘরে ঢুকতে যাবে, অমনি তার ওপর দায়ের কোপ বসাল সগির। এক কোপেই সাপ দুই টুকরা।
সগির যত্নের সাথে সাপের রক্ত ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করল। সাপের টুকরো দূরে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে রাখল। দা-টাও পরিষ্কার করে ধুয়ে ঘরের ভেতর রেখে দিলো।
সব কাজ শেষ করে সগির এসে দাঁড়ালো আঙিনায় বস্তার পাশে। এবার তাকে পালাতে হবে। রাজার বাড়ির দামি দামি জিনিস চুরি করে।
বস্তায় হাত লাগাতে গিয়েই মনে পড়ল বাবার কথা: কারো উপকার করলে তার ঘরে চুরি করিস না।
বস্তা থেকে হাত সরিয়ে নেয় সগির। সাপের ছোবল থেকে রাজার জীবন রক্ষা করে সে তো রাজার উপকারই করেছে। তাহলে এখন তো আর রাজবাড়ি থেকে চুরি করা যায় না।
সগির রাজবাড়ি থেকে শূন্য হাতে বেরিয়ে এলো। দামি জিনিসপত্র ভরতি বস্তার মতোই পড়ে রইল রাজবাড়ির আঙিনায়।
ছয়.
সকালেই হইচই পড়ে গেল। চোর ঢুকেছিল রাজবাড়িতে। দামি দামি জিনিসপত্র বস্তায় ঢুকিয়েছিল। চুরি করে মালামাল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল পুরোপুরি। তারপরও চোর বস্তা নিয়ে যায়নি। নেয়নি কিছুই।
রাজাও দেখলেন ব্যাপারটা। মনে মনে ভাবলেন: এটা আবার কোন ধরনের আলামত! চোর জিনিসপত্র গোছগাছ করে বস্তায় ভরে আবার রাজবাড়িতেই রেখে গিয়েছে!
তিনি উজিরকে ডেকে বললেন: সারা রাজ্যে ঢোল পিটিয়ে দাও, যে চোর চুরি করে জিনিসপত্র সব রেখে দিয়ে চলে যায়, সে যদি ঘটনা স্বীকার করে, তাহলে তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে।
সগিরও এই ঘোষণা শুনতে পেল। এরমধ্যে সে আর কোথাও চুরি করতে পারে নাই। তিন তিনবার চুরি করতে গিয়ে বিফল হয়ে কেন জানি তার আর চুরি করতেও ইচ্ছা করে নাই।
সে মনে মনে ভাবল: রাজার কাছেই গিয়ে সব স্বীকার করব। পুরস্কার আর কী দিবে? চোরকে শাস্তিই দেওয়া হয়। তাকেও নিশ্চয়ই জেলে ভরা হবে। তাই হোক, জেলে অন্তত না খেয়ে মরতে হবে না।
একদিন যায়। দুদিন যায়। দিনের পর দিন যায়। কেউ এসে স্বীকার করে না রাজবাড়িতে চুরির দায়।
হঠাৎ একদিন সগির এসে হাজির। একসময় সে রাজার ফুট-ফরমায়েশ খাটত। তাকে দেখেই রাজা চিনতে পারলেন। বললেন: হ্যাঁরে, হঠাৎ তুই কোথায় গেলি? তোকে তো আর দেখিইনি।
সগির করজোড়ে বলল: মহারাজ, আমিই সেই চোর।
রাজা তো অবাক। অবাক উজির নাজির পাইক বরকন্দাজ সবাই।
রাজা জিজ্ঞেস করলেন: কিপটে বুড়োর বাড়িতে বস্তা তুই-ই রেখে গিয়েছিলি?
সগির দ্বিধা না করে অকপটে স্বীকার করল: জি মহারাজ।
রাজা আবার জিজ্ঞেস করলেন: শহরে বড় ব্যবসায়ীর বাসায় বড় বড় বস্তা বেঁধে রেখে ফেলে কে গিয়েছিল?
সগির মাথা নত করে বলল: মহারাজ, আমিই।
রাজা বললেন: ব্যাপারটা কী? তুই মানুষদের বাড়িতে চুরি করতে ঢুকে মালপত্র গুছিয়ে বস্তায় ভরে সেগুলো না নিয়ে চলে যাস কেন?
সগির বলল: মহারাজ, আমার বাবা মৃত্যুর সময় বলে গিয়েছেন যে লোক কৃপণ, যে লোকের স্ত্রী অবাধ্য, আর যার উপকার করব এই তিন ধরনের মানুষের বাড়িতে আমি যেন চুর না করি।
সগির এরপর সব ঘটনা খুলে বলল। শুধু রাজবাড়ির কাহিনিটা বলল না।
রাজা বললেন: বেশ। তোর কথা শুনলাম। জানলাম। বুঝলাম। কিন্তু আমার বাড়িতে মালপত্র ফেলে গেলি কেন? আমার বেলায় কোন কারণ?
সগির বলল: মহারাজ, আপনার বাড়ির সব দামি দামি জিনিস বস্তায় ভরেছিলাম। বস্তা নিয়ে যখনই বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলাম, এসময়ই নামাজঘর থেকে দরবেশের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। তাঁকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, সেদিন রাতে আপনার ঘরের দক্ষিণ জানালা দিয়ে একটা সাপ ঢুকে আপনাকে ছোবল মারবে। আমি জানতে পেরে রাত জেগে সেখানে অপেক্ষা করি। সাপটাকে দেখতে পেয়ে তাকে মেরে ফেলি। আল্লাহর রহমতে আপনি এখন আমাদের মাঝে সুস্থ দেহে বেঁচে রয়েছেন। এভাবে আপনার কাজ করতে পেরে আমি ধন্য। বাবার কথা অনুযায়ী আপনার ঘরে চুরি করি কীভাবে?
রাজা একথা শুনে উত্তেজনায় সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। আবেগে বলে উঠলেন: তুমিই তাহলে সেই লোক যে আমার জীবন বাঁচিয়েছ? দরবেশ বাবা এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে পুরো ঘটনাটাই আমাকে বলে গিয়েছেন। তখন থেকেই আমি তোমাকে খুঁজছি। তুমি আমার জীবন বাঁচিয়েছ। তাই তুমি এখন থেকে আমার প্রাণের বন্ধু।
তিনি উজিরের দিকে তাকিয়ে হুকুম দিলেন: ফেলে যাওয়া ঐ বস্তাগুলো আনিয়ে সোনা মানিক দিয়ে সেগুলো ভরিয়ে দাও আমার এই বন্ধুকে। আর ঐ কৃপণ বুড়োকে ধরিয়ে আনো, পুত্রহত্যার অপরাধে তার বিচার হবে। আর শহরের ঐ ব্যবসায়ীকে আমার ধিক্কার জানাও যে অবাধ্য স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করে।
রাজা সিংহাসন থেকে নেমে এসে সগিরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। বলেন: আজ থেকে তুমি আমার দরবারেই থাকবে আমার বন্ধু হয়ে।
সগির আনন্দে কেঁদে ফেলে। মনে পড়ে তার বাবার দোয়ার কথা। [লালমনিরহাটের লোককাহিনির ছায়ায়]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *