ছোটদের প্রতি মাতা-পিতার দায়

  • শহীদুল ইসলাম ভুঁইয়া

ছোটদেরকে সময় দিতে হবে: মাতা-পিতা ও অভিভাবকগণের উচিত সন্তানকে সময় দেওয়া। কর্মজীবী, চাকরিজীবী মাতা-পিতার ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য। তাঁরা সকালে ঘর থেকে বের হন, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরেন। তাঁদের সন্তান দিনভর কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কী খাচ্ছে, কার সাথে আড্ডা দিচ্ছে— এসব খবর মাতা-পিতা রাখতে পারেন না। মূলত তাঁদের সন্তান বড় হয় মাতা-পিতার সাহচর্য ছাড়া। এসব ক্ষেত্রে মাতা-পিতাকে সতর্ক হতে হবে এবং তাঁদেরকে সন্তানের জন্য যেভাবেই হোক না কেন কিছুসময় বরাদ্দ করতে হবে। এটি সময়ের অপচয় নয়, বিনিয়োগ। মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততিসহ খোলামেলা পরিবেশে অনানুষ্ঠানিক পারিবারিক বৈঠক অত্যন্ত ক্রিয়াশীল ও ফলদায়ক।
২. ছোটদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে:
ছোটদের প্রতিটি জিজ্ঞাসার মার্জিত জবাব দেওয়া উচিত। তাকে যত ইচ্ছে প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব হবে বিরক্তিমুক্ত, দ্বিধামুক্ত ও সুষমামণ্ডিত। সর্বোপরি সরল ও সাবলীল। কেননা শিশু-কিশোরের কৌতূহলোদ্দীপক মনে অহর্নিশ নানা বিষয়ে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়, নানা জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খায়। কবির ভাষায় ‘মাথায় কত প্রশ্ন জাগে। দিচ্ছে না কেউ জবাব তার/ সবাই বলে মিথ্যে-বাজে বকিসনে আর খবরদার।’ যথাসময়ে প্রশ্নের জবাব না পেলে কৌতূহলের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তখন সে জবাব খোঁজে অন্যের কাছে। ভুল মানুষের কাছে ভুল জবাব পেলে তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে যা তার সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।
৩. মাতা-পিতা হবেন সন্তানের পরম বন্ধু:
মাতা-পিতা ও অভিভাবকগণকে এমন হতে হবে যাতে ছোটরা তাঁদেরকে প্রিয়তম বন্ধু বা প্রাণের দোসর মনে করে এবং অকপটে তাদের সাথে ভাব-ভাষা-ভাবনা প্রকাশে নির্দ্বিধ হয়।
৪. ছোটদের কাজের প্রশংসা করতে হবে:
ছোটদের প্রতিটি ক্ষুদ্র অথচ ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। এর ফলে তার ভেতরে ভালো কাজ করার প্রবণতা ও মননশীলতা বাড়বে এবং সে প্রণোদিত হবে, হবে উদ্দীপ্ত ও আত্মপ্রত্যয়ী।
৫. ছোটদেরকে আঘাত করা যাবে না:
ছোটদের ভুলের জন্য তাকে শারীরিকভাবে আঘাত বা বকাঝকা বা কটূক্তি অথবা ভর্ৎসনা নয় বরং তাকে সহজ করে সত্যটি বুঝিয়ে বলতে হবে।
৬. ছোটদের কাছে দৃষ্টান্ত হবেন মাতা-পিতা-শিক্ষক :
ছোটদের সামনে বা তাদের জ্ঞাতসারে এমন কোনো কাজ বা আচরণ করা সমীচীন না যা অন্যায় বা অনৈতিক। অনেক পিতাকে দেখা যায় সন্তানের সামনে ধূমপান করছেন অথবা স্ত্রীকে বৃথা অপমান করছেন অথবা বেশুমার মিথ্যে বলছেন। এগুলো সন্তানের মানসপটে পিতা সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয় এবং শ্রদ্ধা নষ্ট করে। সর্বোপরি বিরূপ প্রভাব ফেলে। মাতা-পিতার উচিত নিজেকে সন্তানের সামনে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে পেশ করা।
৭. ছোটদেরকে অন্যের সাথে তুলনা দিয়ে কথা বলা উচিত না:
শিশু কিশোরকে অন্য কোনো শিশু কিশোরের সাথে তুলনা দিয়ে কথা বলা সমীচীন না। অনেক মাতা-পিতাকে বলতে শোনা যায়, অমুক তো পারছে, তুই পারিস না কেন। তুই ভাত খাসনে— ইত্যাদি। এভাবে তুলনা দিয়ে কথা বলা মোটেও ঠিক না। মাতা-পিতার মনে রাখা উচিত যে, তাদের এ সন্তান এমন আরও পাঁচটি ভালো কাজ পারে যেগুলো হয়তো-বা ওর অন্য সহপাঠী বা সমবয়সিরা পারে না।
৮. ছোটদের সীমাবদ্ধতাকে অভিভাবকগণের আমলে নেওয়া উচিত:
মাতা-পিতা, অভিভাবকের উচিত ছোটদের সহজাত সীমাবদ্ধতাকে সর্বদা মমতার সাথে বিবেচনায় রাখা। মাতা-পিতা যখন সন্তানকে নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত দেবেন তখন তাঁদের নিজ সন্তানটির শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রাখা প্রয়োজন, যাতে সন্তানটি ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে।
৯. সন্তানের সাথে বৈরী আচরণ করা যাবে না:
ছোটদের সাথে এমন কোনো আচরণ বা ব্যবহার করা ঠিক না যা তার আত্মসম্মানবোধ বা ব্যক্তিত্ববোধকে আহত করে। অনেক সময় দেখা যায় যে, কোনো পিতা তাঁর সন্তানকে কোনো ভুলের জন্য সন্তানের কোনো বন্ধু বা সহপাঠীর সামনেই তীব্রভাবে গালমন্দ করছেন বা কান মলে দিচ্ছেন। এতে সন্তানটি ভীষণ লজ্জা পায়। মানুষের সামনে সে খাটো হয়ে যায়। অপমানবোধ হয়। হয়তো একসময় সে তার ভুল শুধরে নেয় বটে, কিন্তু ততক্ষণে সে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে।
১০. সন্তানের সমস্ত চাওয়া পূরণ বাঞ্ছিত নয়:
সব মাতা-পিতার জন্য সবসময় সন্তানের সব আবদার বা চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমত, ওদের কথা শুনতে হবে, বুঝতে হবে। অতঃপর বোঝাতে হবে। কাউন্সেলিং করতে হবে। অভিভাবকের সংগতি থাকলেও সবসময় সবরকম চাহিদা পূরণ বাঞ্ছিত না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়: ‘সুখে-দুঃখে, পাপে-পুণ্যে, পতনে-উত্থানে/ মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে।’
১১. সন্তানের বয়ঃসন্ধিক্ষণকে চিন্তা ও বিবেচনায় রাখা উচিত :
বয়ঃসন্ধিক্ষণ হচ্ছে মানবজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এ সময় তার দেহে ও মনে নানা পরিবর্তন আসে। পরিবেশগত কারণেও নানা প্রভাবে তারা প্রভাবিত হতে পারে। ফলে তাদের নানাবিধ বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা থাকে। মাতা-পিতা ও অভিভাবকগণের উচিত সংকট এড়ানোর লক্ষ্যে তাদেরকে আগাম তথ্য, জ্ঞান ও পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করা। এর ফলে তারা বিপদগ্রস্ত বা বিপথগামী বা বিড়ম্বিত হবে না।
১২. সন্তানকে পরিবারমুখী করতে হবে:
একটি ঘরকে কেন্দ্র করে একটি পরিবার গড়ে ওঠে। একটি পরিবারকে ঘিরে তর তর করে বেড়ে ওঠে কোমলমতি শিশু-কিশোর। পরিবার হলো একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান। পরিবার হলো শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। প্রতিটি শিশু-কিশোর যেন পরিবারমুখী হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকগণকে। শিশু-কিশোররা তাদের বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে যেন পরিবারকে গণ্য করে, সেভাবে-সেদিকে খেয়াল রেখে মাতা-পিতার উচিত পরিবারটিকে ফুলবাগিচার মতো পরিচর্যা করা। কেবল তা হলেই সেই বাগান থেকে তাজা ফুলের অকৃত্রিম সৌরভ পাওয়া যাবে। সেই সৌরভে স্নিগ্ধ ও সমৃদ্ধ হবে আমাদের গৌরবদীপ্ত নতুন প্রজন্ম।
১৩. সন্তানদেরকে মূল্যবোধ শেখাতে হবে:
মাতা-পিতার উচিত শৈশব থেকেই সন্তানকে নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষাদান। এটি তার অনাগত জীবনে পবিত্র ও পরিচ্ছন্নতার প্রলেপ দেবে। জীবন হবে চিন্তা ও চেতনায় উর্বর ও মুখর।
১৪. সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার নির্দেশনা হবে সমন্বিত:
অনেক পরিবারে দেখা যায়, সন্তানকে একই বিষয়ে মা বলছেন একরকম কথা, বাবা বলছেন ভিন্ন কথা। দুজনের নির্দেশনা দুরকম। এসব ক্ষেত্রে ছোটরা বিব্রত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সন্তানের উদ্দেশ্যে মাতা-পিতার প্রতিটি আদেশ-উপদেশ-সিদ্ধান্ত অভিন্ন হওয়া প্রয়োজন।
১৫. শাসন ও সোহাগের মাঝে ভারসাম্য থাকতে হবে:
সন্তানদেরকে শাসন-বারণ করতেই হবে। প্রেক্ষিত ও প্রেক্ষাপটের আলোকে শাসনের রকমফের ঘটতে পারে। তবে শাসন হবে মৃদু ও পরিমিত। শাসন যেন অতিশাসন বা অপশাসনে পর্যবসিত না হয়। শাসনের পাশেই অনিবার্যভাবে থাকতে হবে সোহাগ। শাসন ও সোহাগ- এ দুয়ের সমান্তরাল-সমন্বয়ের ফল্গুধারায় নিশ্চিত করতে হবে সন্তানের জন্য ‘সুশাসন’। তবেই আজকের ছোটরা আগামী দিনে জাতির সম্পদ হয়ে উঠবে। আলোকিত হবে বসুন্ধরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *