- আমিরুল মোমেনীন মানিক
চোখ দুটো বন্ধ করো। চলো, চলে যাই— আজ থেকে দেড় যুগ আগে। তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত আবির। একদিন হেড স্যার ক্লাসে জিজ্ঞেস করলেন— আচ্ছা, বড় হয়ে তোমরা কী হতে চাও?
ছাত্র-ছাত্রী সবমিলিয়ে ৩০ জন। এর মধ্যে আবিরসহ ২০ জনই জানালো ডাক্তার হবার স্বপ্নের কথা। আর পাঁচজন বলল— ইঞ্জিনিয়ার হব। বাকিদের মধ্যে তিনজন শিক্ষক আর দুই জন পাইলট হবে। কিন্তু কেউই বলল না সাংবাদিক বা শিল্পী হবার কথা।
সেদিন আবির আসলে তার স্বপ্নের কথাটি বলতে পারেনি।
আব্বু আম্মু মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন— তোমাকে ডাক্তার হতে হবে। সে কারণে মনের মধ্যে কবিতা, গান আর লেখালেখির প্রজাপতিরা উড়ে বেড়ালেও তা প্রকাশ করার সাহস পায়নি সে।
এইচএসসি পাশের পরের ঘটনা। আবীর অনেক ভেবে চিন্তে দেখল ডাক্তারি বিদ্যা তাকে দিয়ে সম্ভব হবে না। তাই আব্বু আম্মুর অসম্মতি সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় ভর্তি হলো সে।
মনের মধ্যে স্বপ্নগুলো সবুজ কচি পাতার মতো বেড়ে উঠছিল। মিডিয়ায় কাজ করার স্বপ্ন। অনার্স ও মাস্টার্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তা হবার মতো ভালো রেজাল্ট ছিল তার। কিন্তু না, ওসব কখনওই টানেনি আবিরকে।
সময়ের পরিক্রমায় এখন সে মিডিয়াতেই কাজ করছে। প্রতিদিন নতুন কিছু করার চেষ্ট করছে। যেখানেই ঘটছে ঘটনা সেখানেই ছুটে যাচ্ছে।
একটু খোলাসা করেই বলি। আবির এখন টেলিভিশনে রিপোর্টিং করছে।
আবিরের স্কুলের ওই বন্ধুদের কেউই ডাক্তার হয়নি বা হতে পারেনি। তার বন্ধুদের একজন দেশের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী।
দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন পাইলট। তিনজন স্কলারশিপ নিয়ে লন্ডনে বার এট ল’ শেষ করছে।
পঞ্চম শ্রেণিতে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবার যে স্বপ্নের কথা ওরা প্রকাশ করেছিল তা আসলে মন থেকে বলা কথা ছিল না।
দুই.
সকালের সূর্য দেখেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে— এই প্রবাদটি তোমরা সবাই জানো। ছোটবেলায় অনেকের মধ্যেই বিচিত্র প্রতিভার ঝলক দেখা যায়। কিন্তু নানা কারণেই সেসব প্রতিভার চর্চা অব্যাহত থাকে না। অনেক সময় অভিভাবকদেরও। অনীহা থাকে। তারা সন্তানকে নিজেদের স্বপ্নের মতো করে দেখতে চান। ফলে ছাইচাপা সেই প্রতিভা আলোর ঝলকানি দিয়ে আর জ্বলে ওঠে না।
তোমরা যারা বয়সে ছোট তাদের বলছি। মনের মধ্যে যাদের সৃজনশীলতার ঢেউ, অন্যায়-অবিচার দেখলে যারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠো অথবা টুকটাক লেখালেখি করো তারা কিন্তু একটা ব্যাপারে জোরালো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারো।
কী সেই সিদ্ধান্ত? খুব জানতে ইচ্ছে করছে?
হ্যাঁ, টেলিভিশন সাংবাদিক হবার সিদ্ধান্ত।
টিভি সাংবাদিকতার কথা শুনে তোমাদের কেউ কেউ হয়তো মনে করছ— যাক বাবা লেখাপড়ার ঝক্কি থেকে বাঁচা গেল।
কঠিন কঠিন গণিত-পদার্থবিজ্ঞান- রসায়ন বিজ্ঞান আর পড়তে হবে না।
আসলে অবস্থা কিন্তু তা নয়।
ভালো টিভি সাংবাদিক হতে চাইলে অনেক কিছু জানতে হবে। পৃথিবীর চলমান ঘটনার খোঁজখবর রাখতে হবে। ইংরেজি জানতে হবে। পারতে হবে শুদ্ধ উচ্চারণ। এর জন্য পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি কঠিন পরিশ্রমের কি বিকল্প আছে, বলো?
এইচএসসি শেষে মাথায় অন্য কোনো পোকা না ঢুকিয়ে সোজা ভর্তি হয়ে যাও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি দিচ্ছে। ইদানীং বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও এই বিষয়ে পড়াশোনা করানো হয়। কিন্তু চাইলেই তো এই বিষয় ভর্তি হওয়া যাবে না। এর জন্য ভর্তিযুদ্ধে নামতে হবে। প্রস্তুতির ঢাল তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। এরপর এ বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স করে সুযোগ বুঝে কাজ শুরু করতে হবে কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে। সেখান থেকেই প্রতিযোগিতা। আর এইসব প্রতিযোগিতার পাহাড় ডিঙাতে অবশ্যই দৃঢ় মনোবল রাখতে হবে। তা না হলে অল্প ঝড়েই পাটখড়ির মতো ভেঙে পড়বে।
তিন.
মানুষের সেবা করতে চাই, দেশের সেবা করতে চাই, মানবতার সেবা করতে চাই; সেজন্যই ডাক্তার হতে চাই, ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই— তোমাদের অনেকেই এ ধরনের কথা বলবে। তাহলে আমি বলব, টেলিভিশনে রিপোর্টিং করেও এর চেয়ে বেশি সেবা করা যায়।
প্রশ্ন করতে পারো— কীভাবে?
এই ধরো, সুদৃঢ় ইচ্ছে থাকার পরও কেউ চরম দরিদ্রতার কারণে পড়ালেখা করতে পারছে না অথবা কেউ সুদীর্ঘ সময় ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছে অথবা কোথাও অন্যায়, অবিচার আর বৈষম্য চলছে— এ কথাগুলো তুলে ধরে তুমি টনক নাড়িয়ে দিতে পারো। তোমার একটি রিপোর্টিং এর কারণেই বিপন্ন মানুষ বিপদ থেকে মুক্ত হতে পারেন।
এ ধরনের ভূরিভূরি উদাহরণ দেওয়া যায়।
আসলে রিপোর্টিং এর কারণে তুমি সহজেই পৌঁছে যেতে পারো সমাজের উঁচুনিচু সবস্তরের মানুষের কাছে। যা অন্য আর কোনো পেশাতে সম্ভব নয়।
এছাড়া বিদেশের নানা অজানা পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ তো আছেই। তবে, একথা কখনও ভুলো না, কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কখনওই কিন্তু তোমার হাতে এ ধরনের সফলতা ধরা দেবে না।
তোমার মনের মধ্যে যে সৃজনশীল চিন্তা আছে তার সঙ্গে সাবলীল স্ক্রিপ্ট, শুদ্ধ উচ্চারণ আর দৃষ্টিনন্দন ছবি যোগ করতে পারলেই একটি ভালো রিপোর্ট তৈরি হবে। আর এ ধরনের একটি রিপোর্ট তোমাকে পৌঁছে দিতে পারে সফলতার চূড়ান্ত চূড়ায়।
চার.
পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রিপোর্টারের নাম কি জানো?
নিশ্চয় তোমরা টিভি চ্যানেল সিএনএন এর নাম শুনেছ। সেই চ্যানেলের ক্রিশ্চিয়ান অ্যালান পো-ই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ও খ্যাতিমান রিপোর্টার। আর এই উপমহাদেশেও একজন খ্যাতিমান রিপোর্টার আছেন, যিনি নানা কারণেই আলোচিত। তাঁর নাম হামিদ মীর। পাকিস্তানের জিও টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্যাপক আলোড়িত হয়েছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকার কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে।
তোমরা নিশ্চয় বিবিসি, আল জাজিরা, এনডিটিভির নাম জনেছ। এসব চ্যানেলের সাংবাদিকরা সারা বিশ্বে চষে বেড়াচ্ছেন।
উদ্দেশ্য একটাই— তাজা খবর সংগ্রহ করা। আর সেসব খবরের পেছনে অসংখ্য রোমাঞ্চকর, শিহরন জাগানিয়া ঘটনা লুকিয়ে আছে।
তোমরা তো জানোই ঝুঁকি না নিলে বড় হওয়া যায় না। টিভি রিপোর্টিং এ খানিকটা ঝুঁকিও আছে। এক্সক্লুসিভ রিপোর্টের জন্যে দিনের পর দিন লেগে থাকতে হয়। অনেক সোর্স তৈরি করতে হয়। সম্পর্ক বাড়াতে হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা করতে হয়। এর জন্য সংশ্লিষ্ট ঘটনার ছবি তুলতে হয়। যদিও ক্যামেরাম্যান সে কাজটি করে দেন কিন্তু কেমন হবে সেই ছবি সে আইডিয়া রিপোর্টারকে দিতে হয়।
পাঁচ.
আবার ফিরে যাচ্ছি আবিরের কাছে। এখন সে বারুদঘষা টগবগে এক তরুণ। টিভি রিপোর্টিং করে সারাদেশে নিজের নাম ছড়িয়েছে। এই বয়সে তার পাইলট বা শিক্ষক বা প্রকৌশলী বন্ধুটিও এতটা নাম ছড়াতে পারেনি। ব্যতিক্রমী সৃজনশীল চিন্তা, চমৎকার স্ক্রিপ্ট আর মনোমুগ্ধকর কণ্ঠস্বরের কারণে দর্শকরা তাকে একটু আলাদাভাবেই চেনে।
ইতোমধ্যে নানা এক্সক্লুসিভ ঘটনাও যোগ হয়েছে তার রিপোর্টিং অভিজ্ঞতায়।
তোমরা যারা মাধ্যমিকে অথবা উচ্চমাধ্যমিকে; তাদের শিক্ষাজীবন শেষ হতে আরো বছর সাত আট তো লাগবেই। এই সময়ে দেশের ৩০টি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে যোগ হবে অন্তত আরো ১৫ থেকে ২০টি চ্যানেল। বাড়বে আরো প্রতিযোগিতা। বাড়বে রিপোর্টারদের বাজারমূল্যও।
সুতরাং, ভেবে দেখো। কী করবে?