- মো. মোশাররফ হোসাইন
আমাদের শৈশব অর্থাৎ ঘাটের দশকের কথা। যদিও শৈশবের কিছু সময় কেটেছে গ্রামে এবং কিছুসময় শহরে। তবে শৈশবের ঈদের আনন্দটুকু গ্রামেই উপভোগ করতাম বেশি।
আমাদের গ্রামটি জেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে। পৌরসভার পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নে। এটাকে একেবারে নিভৃত পল্লি বলা চলে না। কারণ এ গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ছিল শহরকেন্দ্রিক। যদিও যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেই ভালো ছিল না। যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিল রিকশা। তাও কাঁচা রাস্তা। কোথাও উঁচু-নিচু আবার খানা-খন্দক। মাঝেমধ্যে যাত্রীদের রিকশা থেকে নেমে তা ঠেলতে হতো। কাঁচা রাস্তায় চলত বড় কাঠের চাকাওয়ালা গরুর গাড়ি।
আমাদের গ্রামের তৎকালীন দু-একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে আমাদের পরিবারটি ছিল অন্যতম। তবে শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসেবে আমালের পরিবারের মর্যাদা ছিল কয়েকটি গ্রামের মধ্যে জালাসা। দাদা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তৎকালীন ইউলিয়ন কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও গ্রাম পঞ্চায়েত। বাবা সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষকতার কারণে শহরে অবস্থান করতেন। বড় চাচা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বিভিন্ন মহকুমা, জেলা ও ঢাকায় তাঁর পোস্টিং। আরেক চাচা এলাকার প্রসিদ্ধ আলেম হলেও কর্মস্থল ছিল রাজশাহীতে। পরবর্তীতে গ্রামে এসে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ঈদ ও বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে বাধা চাচারা বাড়ি আসতেন। তখন পুরো গ্রাম যেন আলোকিত হয়ে উঠত। তাছাড়া ঈদ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত সকল চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে আসতেন। পুরো গ্রাম তখন এক মিলনমেলায় পরিণত হতো।
আমাদের গ্রামটি শহরের নিকটবর্তী হলেও তৎকালীন সময়ে ছিল না কোনো বিদ্যুৎ বা পাকা রাস্তা। তখনও গ্রামের কেউ টেলিভিশন কি জিনিস চোখে দেখেনি। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারের কাছে ছিল রেডিও। গ্রামে এটাকে বলা হতো ট্রাঞ্জিস্টর। কোনো জরুরি খবর শুনতে মানুষ জড়ো হতো ট্রাঞ্জিস্টরওয়ালা বাড়িতে। রেডিও বা ট্রাঞ্জিস্টর চলত অ্যান্টেনা দিয়ে। তাও অনেক সময় ভালোভাবে গান বা সংবাদ শোনা যেত না। তাই রেডিওর সংবাদের ওপর ভরসা না করে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেই একযোগে রমজান ও ঈদের চাঁদ দেখতে বাড়ির একপাশে বা খোলা মাঠে জড়ো হতো। যদিও রমজানের ঈদের চাঁদ দেখতে ছোটদের উৎসাহ ও উদ্দীপনাটা ছিল খুব বেশি। কে কার আগে চাঁদ দেখতে পারবে এ নিয়ে চলত প্রতিযোগিতা। রমজানের ২৯ তারিখ থেকেই চাঁদ দেখা শুরু হতো। ঐদিন দেখা গেলে সবাই আনন্দে-উল্লাসে ফেটে পড়ত। আর না দেখা গেলে ছোটরা হতাশ হলেও ৩০টি রোজা সম্পাদন হবার কারণে মুরুব্বিরা আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করতেন ও শেষ তারাবির নামাজে শরিক হতেন।
ষাটের দশক ছিল পাকিস্তান আমলের শেষ দশক। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। যে কয়টি ধনি পরিবার ছিল তারাই শুধু ঈদের জামাকাপড় কেনার সামর্থ্য রাখত। বাকিরা যার যার পুরনো কাপড় ঈদের পূর্বেই ধোলাই করে রাখার ব্যবস্থা করত। আবার ইস্তিরি করার সামর্থ্যও সবার ছিল না। তখনকার ইস্তিরি করায় আয়রনটি ছিল লোহার তৈরি। ভেতরে কয়লা দিয়ে আগুন ধরিয়ে গরম করা হতো। বাড়ির মধ্যে আমাদেরই একমাত্র একটি ইস্তিরি করার আয়রন ছিল, যা সবাই ব্যবহার করত।
ঈদের আগেই অসচ্ছল পরিবারের লোকজন আমাদের বাড়িতে আসত জাকাত, ফিতরা ও ঈদের জামাকাপড়ের জন্য। আমরাও নিজেদের ব্যবহৃত ভালো জামাকাপড় বিলিয়ে দিয়ে তাদেরকেও ঈদের আনন্দে শামিল করার চেষ্টা করতাম।
যদিও তৎকালীন সময়ে মানুষের আর্থিক-অনটন ছিল তবুও রমজানের মাঝামাঝি সময়ে প্রত্যেক ঘরে ঘরে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের প্রস্তুতির ধুম পড়ে যেত। ঘরে ঘরে মহিলারা চাউলের গুঁড়া দিয়ে হাতে তৈরি চুটকি ও সেমাই তৈরি করে রোদে শুকিয়ে রাখত। আবার সেমাই তৈরির মিশিন দিয়ে লম্বা সেমাই তৈরি করা হতো। সেমাই তৈরির মেশিনটি ছিল পিতলের। হাত দ্বারা ওপরের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে সেমাই তৈরি করা হতো। এর নিচের অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্রওয়ালা বিভিন্ন সাইজের ডাইস ছিল। যাতে মোটা ও চিকন সেমাই তৈরি করা যেত। পরে রোদে শুকিয়ে টিনে যত্ন করে রাখা হতো ঈদের দিনের জন্য। এখন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাতে তৈরি চুটকি, পিঠা ও সেমাই তৈরি খুব একটা দেখা যায় না। সেমাই ও পিঠা তৈরির এ আয়োজন গ্রামে একটি উৎসবের আমেজ তৈরি হতো।
আমার দাদা ছিলেন গ্রামের সকলের মুরুব্বি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। আমাদের সমাজের মসজিদটি তাঁরই হাতের তৈরি এবং তিনিই ছিলেন এর সভাপতি। ঈদের দিন খুব ভোরে আমরা দাদার সাথে পুকুরে আনন্দের সাথে দলবেঁধে গোসল করতাম ও গোসল শেষে নতুন জামা কাপড় পরতাম। তখন এক অভূতপূর্ব স্বর্গীয় আভা আমাদের মনে বয়ে যেত। দাদা সবসময় আতর ও সুরমা ব্যবহার করতেন। তিনি ১৯৬১ সালে জাহাজে করে হজে গিয়েছিলেন। তখন জাহাজই ছিল হজে যাওয়ার একমাত্র পথ। মক্কা শরিফ থেকে তিনি আতর ও সুরমা নিয়ে এসেছিলেন ধনুর পরিমাণে। আমৃত্যু তাঁকে এগুলো ব্যবহার করতে দেখেছি। হজে ব্যবহৃত তাঁর এহরামের কাপড় ও জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে রেখে দিয়েছিলেন সযতনে তার কাফনের কাপড়ের জন্য। দাদার মৃত্যুর পর দাদার ইচ্ছানুযায়ী সেই এহরামের কাপড় দিয়েই তাঁকে কাফন পরানো হয়। ঈদগাহে যাওয়ার আগে দাদা আমাদের সযতনে আমাদের চোখে সুরমা লাগিয়ে দিতেন ও পাঞ্জাবিতে লাগাতেন সুমিষ্ট সুগন্ধি আতর যার সৌরভে সারাঘর মৌ মৌ করে উঠত।
এদিকে দাদি, মা-চাচি ও বোনেরা থাকতেন ঈদের ফিরনি, পায়েস, সেমাই, জর্দা ও মিষ্টান্ন তৈরিতে ব্যস্ত। রমজানের ঈদের কিছু মিষ্টি খেয়ে করে তকবিরের সাথে ঈদের জামাতে যাওয়া সুন্নত। আমরাও দাদা, বাবা, চাচা, ভাইদের সাথে মিষ্টি মুখ করে সদলবলে দাদার সাথে মসজিদের সামনের ঈদগাহ যেতাম। ঈদগাহে যাবার পূর্বে আমরা সকল মুরুব্বিদের পায়ে ধরে সালাম করতাম।
আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেবকে সবাই কারি সাহেব বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর হাতেই আমাদের আরবি পড়ার হাতেখড়ি। ভোরে মসজিদের পাশেই মক্তব বসত। গ্রামের সব ছোট ছেলে মেয়ের ফজরের নামাজের পরপরই মক্তবে আসা ছিল বাধ্যতামূলক। উচ্চোঃস্বরে কোরআন তিলাওয়াত, কায়দা, আমপারা পড়ার শব্দে পুরো গ্রাম মুখরিত হয়ে উঠত। কারি সাহেবকে সবাই সম্মান করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ জুমার নামাজও তিনি পড়াতেন। কিন্তু ব্যতিক্রম হতো তখনি যখন আমার বাবা মসজিদে হাজির হতেন। আজ্ঞামতি করার সাহস পেতেন না।
আমার বাবা ছিলেন একজন ইংরেজি শিক্ষিত স্কুল শিক্ষক এবং উঁচুমানের আলেম। তিনি কলকাতা জলিরা বেতে কিবার শাস্ত্রে এবং ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রথম ব্যাচে ভাজির পারে রোটল (তামিল) পাশ করেন। তাঁর নামের শেষে লেখা হতো (এমএফ) মমতাজুল ফোফাহা এবং (এমএম) মমতাজুল মোতাছিসিলা অর্থাৎ ডাবল টাইটেল। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ভূষিত হয়ে বিরল সম্মান পেয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে বাবা ঈদগাহে উপস্থিত থাকলে ঈদের জামায়াতে তিনিই ইমামতি করতেন। নামাজ শেষে আমরা মুরুব্বিদের পায়ে ধরে কদমবুসি (সালাম) করতাম ও কোলাকুলি করতাম। সামর্থ্যবান কেউ কেউ ছোটদের ঈদের বকশিশ দিতেন। এতে ছোটদের ঈদের আনন্দ আরও বেড়ে যেত। দিন শেষে কে কত বকশিশ পেল এ নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। যারা কম পেত তারা খুব মন খারাপ করত। অন্যরা সান্ত্বনা দিত। ঈদের জামায়ত শেষে মহা আনন্দে আমরা দলবেঁধে গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। সবার ঘরে কিছু না কিছু খেতে হতো। বিকেলে শিশু কিশোর, যুবক সবাই মিলে বিভিন্ন খেলায় মেতে উঠতাম। পুরো গ্রাম অন্যরকম এক আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠত। সন্ধ্যা নামলেই যার যার ঘরে এসে পরের দিন নানাবাড়ি, খালাবাড়ি, ফুপুবাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতাম। ঈদের পর গ্রামে গ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের কথা স্মরণ করলে আজ মনে হয় আমাদের শৈশবের সেই ঈদের আনন্দ ও খুশি আজকের মোবাইল, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যুগের শিশু কিশোররা কল্পনাও করতে পারবে না।