ছোলেমাল মামার গোলেমাল কাণ্ড

  • ফারুক হোসেন

মামার নাম কিন্তু সুলেমান । বড় হতে হতে নিকটজনেরা ডাকতে ডাকতে সেটা হয়ে গেছে ছোলেমান। স থেকে একেবারে ছ। মামার তাতে কোনো বিকার নেই। কারণ তিনি জানেন না, স আর ছ এর ফারাক। তাতে কিছু আসে যায় বলেও তার মনে হয় না। কিন্তু যখন সবাই ছোলেমান থেকে ছোলেমাল ডাকা শুরু করল, মামার কাছে তখন গোলমেলে মনে হলো। সবাই বলতে লাগল ছোলেমাল একটা গোলেমাল মানুষ। তার কাণ্ড কীর্তি সব আজগুবি। অবিশ্বাস্য। সে নাকি ভূতের সঙ্গে দেখা করে নিয়মিত। ভূত তাকে একা পেলে দেখা করে। তাদের মধ্যে তর্ক হয়। ঝগড়া হয়। মোটকথা ছোলেমাল মামার গোলেমাল কাণ্ড এখন রাষ্ট্র।
মাছ শিকার ছোলেমান মামার একটা বড় শখ। বৃষ্টি বা বর্ষার সময় বেড়ে যায় তার কাজ। তখন মাছ শিকারের সময়। এরক একদিন মামার কাণ্ড বলব আজ। তার আগে মামা সৌদি আরব ছিলেন বেশ কবছর। সেখানেও হয়েছে তার নানা কাণ্ড। দেশে ফেরার পর তার আগের অভ্যাসগুলো আবার জেগে উঠেছে। তার মধ্যে একটি কাজ হচ্ছে মাছ শিকার।
সেই সময়ের একদিন। সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে অঝোরে। একদিনের বৃষ্টিতে ডুবে গেছে মাঠ। নদী নালা পুকুর ডোবা উপচে পড়ছে পানি। এসময় নদীর মাছ উঠে আসে ওপরে। নতুন পানিতে মাছের শরীরে জাগে স্পন্দন। স্বচ্ছ পানিতে পরিষ্কার দেখা যায় মাছের ছুটোছুটি। বিশেষ করে কই, মেনি বাইম বড়ো পঁটি মাগুর শিং এ ধরনের মাঝারি সাইজের মাছের মেলা বসে মাঠের নতুন জোয়ারের জলে। রাতে মাছ শিকারের এটিই মোক্ষম সময়।
এক সময় নতুন পানি আসার পর কিংবা বর্ষার জলে রাতে মাছ শিকার করা ছিল ছোলেমান মামার নিয়মিত কাজ। গ্রাম ছেড়ে সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন সে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। মাছ শিকারের সেই নেশা তিনি ভুলেই গেছেন। বাড়ি আসার পরও সেসব কথা তাঁর খুব একটা মনে পড়েনি। আজকের বৃষ্টি আবার তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছে সেই নেশার কথা। মনে পড়ে যায় এক রাতের ভীতিকর পরিস্থিতি। ছোলেমান মামা ভুলতে পারেন না সেদিনের কথা-যেদিন মাছ শিকারের সময় তাঁকে ভূতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মামাকে বললাম:
আজকের রাতটা মামা তোমার রাত। এরকম রাতে মাছ না মারলে হয়? চলো মামা বেরিয়ে পড়ি রাতে। শুধু আমাদের গ্রামটাতেই ঘুরে আসব। এখন কিন্তু আর ভূত টুত নেই। মাছ ধরার জায়গাও কমে গেছে। বর্ষার জল জমবে কীভাবে। সব জায়গা মাটি ভরাট করে গড়ে উঠেছে বাড়ি। মিডেলইস্ট থেকে যারা ফিরছে তারাই করছে বাড়ি। তুমি কবে করবা মামা।
ছোলেমান মামা বললেন, সেসব কথা পরে হবে। আজ মাছ শিকার।
মামা রাজি হলেন। তিন ব্যাটারি টর্চ আমাদেরই আছে। কোঁচ নিতে হবে আলী চাচারটা। আলী চাচার কোঁচটার জুড়ি নেই। সাংঘাতিক ধার। মাছের গায়ে বেঁধে যায় সহজেই। প্রস্তুতির আর তেমন কিছু নেই। মাছ মারার মিশনটা যে জমজমাট হবে সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গ পালটে এলাম । মাছ শিকারের এক রাতের সেই ভীতিকর পরিস্থিতির কথা আবার উঠালাম। বললাম মামাকে:
মামা প্লি­জ, তোমাকে যে ভূতে আক্রমণ করেছিল সেই রাতের গল্পটা বলো না মামা। মনে আছে ?
মামা বললেন, গল্প কিরে, ওতো সত্যি ঘটনা।
ঠিক আছে সত্যি গল্প। বাস্তব কাহিনি। তো এবার বলো— মামাকে জড়িয়ে ধরলাম আমি।
মামা বললেন—
এরকমই এক রাত। তখন এই সিজনে অনেকেই মাছ মারতে বেরুতো। সন্ধ্যা রাতে রাস্তায় খেতের আইলে হারিকেন হাতে লোক গিজগিজ করত। মাছ পেতো। খলুই ভরে সবাই ঘরে ফিরত। বেশি শিকারির আনাগোনা তাই আমরা বেরুতাম একটু রাত করে ।
দেরিতে বেরুলে মাছ কমে যেত না মামা। মামাকে বললাম।
মাছের কি কোনো কমতি ছিল তখন। সবাই ধরছে। সবাই পাচ্ছে। প্রতিদিন। মাছ পাওয়া যাচ্ছে না এমন কথা শুনিনি কোনোদিন।
মাছ কিন্তু এখনও অভাব নেই মামা। বাজারে যাও, মাছে মাছে একাকার। কী মাছ চাও তুমি। সব আছে। তুমি যখনকার কথা বলছো তখনতো মানুষ আরো কম ছিল। এখন ১৮ কোটি মানুষ মাছ খাচ্ছে। কোনোদিন শুনিনি মাছ নেই।
ঠিক আছে, মাছ এখনও আছে কিন্তু সেই স্বাদ নেই। চলো আজ আমার মেইন কাজ। মাছ শিকার।
আগে সেদিনের ঘটনাটা শোনো। যেতে যেতে । সেদিন আমরা বেরিয়ে পড়লাম রাত বারোটার পরে। আমার সঙ্গে খলুই হাতে মনজু, তোর মনজু মামা। ফার্স্ট ক্লাস একটা হারিকেন আর একটা কোঁচ ছিল আমার। নিস্তব্ধ রাত। আকাশে মেঘের খেলা। তারাদের উঁকিঝুঁকি। ঠান্ডা বাতাস বইছে মৃদুমন্দ। চারদিকে মাছের গন্ধ। ব্যাঙের ডাকাডাকি। এপাশে-ওপাশে আর কোনো শিকারি আছে কি না বোঝা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল শুধু আমরাই।
শুধু তোমরা একা? ভয় করছিলনা— এত রাতে?
মাছের নেশা জাগলে কি আর ভয় থাকে? মাছ মারছিলাম একের পর এক। বড় বড় মাগুর। শোল। বোয়ালের পোনা। টেংরা। ভয় টয় ছিল না তখন। খলুই ভরে গেছে প্রায়।
এমন সময় মনজু ধমক দিয়ে ওঠে।
হ্যাট হ্যাট। মামা, বিড়ালতো মাছ খেয়ে ফেলল। অনেকক্ষণ ধরে সে খলুই টানছে পা দিয়ে। মাছও খেয়েছে দু-একটা বোধহয়। এত বড় বিড়াল আমি আগে দেখিনি। আমি পেছনে। মামা সামনে সামনে রাস্তার পাশের পানিতে টর্চ মেরে মেরে এগুচ্ছেন। হঠাৎ হঠাৎ মারছেন কোঁচ জোরসে। তুলে নিয়ে আসছেন মাছ। মামা বললেন, জানিস, চিংড়ি মারতে খুব সুবিধে। টার্গেট করতে হবে লেজ। তখন ঘাই পড়বে মাথার ওপর। চিংড়ির কাজ হলো পেছনে হাঁটা। মাথা টার্গেট করলে ঘাই পড়তে পড়তে সে পেছনে হেঁটে কেটে পড়বে। তাই টার্গেট করতে হয় লেজে। মামা বলতে না বলতেই একটা চিংড়ি তুলে নিলেন কোঁচ থেকে। বেশ বড়। লম্বা লম্বা দাড়ি তার। মনজু আমার কথা শুনল। কিন্তু কোনো সাড়া দিলো না। মনে হয় সে পেছনে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত।
পেছনে তাকিয়ে দেখি মনজু যেন একটু ভয় পেয়েছে। কই বিড়াল কই। দেখি বিড়ালটা একটু দূরে বসে তাকিয়ে আছে খলুই এর দিকে। তার চোখ দুটো যেন দুটো টর্চ লাইট। জ্বলজ্বল করছে। গায়ে তুলোর মতো লোম ধবধব করছে। সারা মাঠে আমরা এখন তিনজন। আমি মনজু আর বিড়ালটি। বিড়াল আর কী করবে। আমরা অন্য দিকে চললাম। এরই মধ্যে একবার পেছনে তাকিয়ে দেখি বিড়ালটাও উঠে দাঁড়িয়েছে। এক পা এক পা করে আমাদের দিকেই আসছে সে। মনে হলো বিড়ালটা আমাদেরকেই ফলো করছে। মাছ দেখতে দেখতে অনেকদূর গিয়েছি। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি খলুইয়ের সঙ্গে বিড়ালটা রীতিমতো ঝুলছে। মনজুরের সেদিকে খেয়াল নিই। হোপ- বলে ধমক দিতেই বিড়ালটা খলুই ছেড়ে দিলো। পাত্তা না দিয়ে আমরা আমাদের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর লক্ষ করলাম বিড়ালটা পেছন পেছন আসছে। কী মুশকিল। এ যে নাছোড়বান্দা। এর জন্য তো শিকার করাই যাবে না দেখছি। কী করা যায় কী করা যায় ভাবতে ভাবতে এদিক-ওদিক তাকালাম। দেখি পাশেই খেতের আইলে পড়ে আছে একটা কোদাল। আমি মনজুকে বললাম ধরতো । কোঁচ আর হারিকেনটা মনজুর হাতে দিলাম। পাশের খেতে গিয়ে তুলে নিলাম কোদালটা।
মনজু আমার ভাবভঙ্গী দেখে ভড়কে গেল। বলল-ঝামেলা করো না তো মামা। তাড়িয়ে দিলেই তো বিড়ালটা চলে যায়।
গেল আর কই। তুই চুপ কর। ও সহজে যাবে না। আসলে বিড়ালটার আচরণ একটু অন্যরকম মনে হচ্ছিল। মনজুকে বললাম, দ্যাখ আমি কী করি। বলেই কোদালটা পেছনে ধরে চুপ করে দাঁড়ালাম। বিড়ালটা পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো কাছে। দিলাম সজোরে এক আঘাত একেবারে বিড়ালের মাথায়। আশ্চর্য বিড়ালটা কোনো সাড়া-শব্দ করল না। আঘাত পেয়ে শুরু হলো শুধু দৌড়, রিয়েলি দেখার মতো। নিঃশেষ হয়ে গেল বিড়ালের অস্তিত্ব মুহূর্তেই।
মনজু এবার খুশি। বলল— দারুণ হয়েছে। বড় বাড় বেড়েছিল ব্যাটা।
আবার মনোযোগ দিলাম শিকারে। এর মধ্যে ঘটেছে একটা মজার ঘটনা। টর্চ মেরে দেখি বড় একটা মাছে লেজ । পানির সঙ্গে একটু একটু নড়ছে। ওপরের দিকটা কালো। একবার মনে হয় সাপের মতো। আবার মনে হয় মাছ। মাছ যদি হয় তবে দারুণ একটা কিছু হবে। বোয়ালের মতো মনে হচ্ছে পিঠের দুপাশ। আল্লাহ আল্লাহ করে ঘ্যাচ করে বসিয়ে দিলাম কোঁচ। বসে গেল কোঁচটা। এবার দেখি কোঁচের শরীরটা কাঁপছে। মানে মাছটা ( বা অন্য কিছু) প্যাঁচ মেরে মেরে ছুটতে চেষ্টা করছে। আমি আস্তে আস্তে পানিতে ডুবিয়ে দিলাম হাত। দুহাতে কোঁচসহ মাছটা স্পর্ষ করে বোঝার চেষ্ট করলাম মাছ কি না। মনে হলো মাছ। দুহাতে মাছ কোঁচ একসঙ্গে ধওে তুলে নিয়ে আসলাম ওপরে। দেখি সত্যিই বড়ো একটা বোয়াল। আনন্দে আত্মহারা আমরা। কিন্তু এটা সাপও হতে পারত।
বড়ো একটা ঝুঁকি নিয়েছিলে মামা। সাপ হলে খবর ছিল।
ঠিকই। এবার আসি আসল কথায়। বিড়াল কিন্তু একদম হাওয়া। ভাবলাম যাক, একটা ফাঁড়া গেছে।
অল্প কিছুক্ষণ পর একটু দূরেই দেখি একটা কুকুর। কুকুরটা যেন আহত। হাঁটার ভঙ্গি বেশ কষ্টের। খঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুচ্ছে। পানিতে টর্চ মেরে দেখি ইয়া বড় এক বাইম। দিলাম জোরে ঘাই। বাইমের শরীর পেঁচিয়ে ধরেছে কোঁচের শলাগুলো। মুহূর্তের মধ্যে দেখি একটা কুকুর খলুই কামড়ে ধরে টানছে। মনজু অপ্রস্তুত ছিল। কুকুরের টানে মাটিতে পড়ে গেল খলুই। বেশ কটা মাছ এদিক-ওদিক চলে গেল হেঁটে। কোনটা সামলাবো-কোঁচ না খলুই। কোনোমতে মাছসহ কোঁচ তুলে শুকনো জায়গায় রাখলাম। খুঁজে নিলাম সেই কোদালটা। মনজু আলটপকা নিয়ে নিলো টর্চটা। পেছনে ঘুরিয়ে প্রচণ্ড জোরে কোদালের আঘাত বসিয়ে দিলাম কুকুরের গায়ে। কুকুর একদম শুয়ে পড়ল মাটির সঙ্গে। আবার দ্রুত উঠে কেটে পড়ল। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ করল না। মজা করে আমরা কুকুরের যাওয়া দেখছিলাম। কোমর বাঁকিয়ে সে কোনোমতে হেঁটে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিল এই বুঝি শুয়ে পড়ল সে।
হঠাৎ কুকুরটা অদৃশ্য হয়ে গেল। এবারও আমি এই ঘটনায় অন্যরকম কিছু ভাবিনি। প্রথমে বিড়াল, তারপর কুকুর, এইবার কি অন্য কিছু আসবে? এমন কিছু তখনও ভাবিনি।
বেশ কটা মাছ হারিয়ে গেল খলুই থেকে। খুব কষ্ট হচ্ছিল। বড় শখের ধরা মাছ। বেশি কষ্ট হচ্ছিল মনজুর। সে গুনে গুনে বলল, অন্তত পাঁচটি মাছ নেই। তার মধ্যে সেই চিংড়িটা দেখছি না।
যাক আফসোস করতে না করলাম মনজুকে। অপেক্ষা করো পুষিয়ে নেবো।
আবার কিছুক্ষণ কাটালাম মাছ দেখতে দেখতে, ধরতে ধরতে। একটু ক্লান্ত লাগছে তখন। রাগও হচ্ছিল কুকুর ও বিড়ালের ওপর। বিড়ালটা কিন্তু আর আসেনি। বিড়াল আর কুকুরের মধ্যে দেখলাম, এত জোরে আঘাত করার পরও কোনো শব্দ করেনি। সাধারণত কী হয়। আঘাত করলে বিড়ালটার ম্যাও ম্যাও করে ওঠার কথা। কুকুরটাকে এভাবে মারলাম, তারও ঘেউ ঘেউ করে ওঠার কথা। কিন্তু কোনো শব্দই করল না ওরা। এই ব্যাপারটা বারবার আমার মাথায় আসছিল। আমি মনজুকে বুঝতে দেইনি।
আমাদের পাশের গ্রামের যে মাদ্রাসাটা আছে না। তার সামনেই একটা মাঠ ছিল। মাঠটা এখন বিল্ডিং এ ভরে গ্যাছে। আমরা মাছ শিকার এর প্রায় শেষের দিকে। মাঠটা ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ঢাকা। এক কোনায় দাঁড়িয়ে আমরা সব গুছিয়ে নেওয়ার পথে। অন্ধকারেরও একটা আলো আছে। দেখতে পাচ্ছিলাম বেশ দূরেও। হঠাৎ দেখলাম অবছা দেখা যাচ্ছে সেই কুকুরটা। সে দাঁড়িয়ে সোজা আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। মনজুকে দেখালাম, ওই দ্যাখ সেই কুকুরটা। আমার বলার ভঙ্গি স্বাভাবিক। কিন্তু একটু ভাবছিলাম, কুকুরটা এইভাবে আবার দৃশ্যমান হলো। আর ভ্যানিসই বা হয়েছিল কী করে।
একটু পরেই দেখি, আবছা অন্ধকারে কুকুরটা বদলে যাচ্ছে। মনজুকে বললাম দ্যাখ দ্যাখ। দুজনে অবাক হয়ে দেখলাম কুকুর রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে সে বড় হয়ে গেল। সামনের দুপা বিলুপ্ত হলো নিমিষেই। একটা মানুষের রূপ পেল ধীরে ধীরে। তাকে ঢেকে ফেলল একটা সাদা শাড়ি। এখন যেন দাঁড়িয়ে আছে সাদা শাড়ি পরা এক বুড়ো মহিলা। মহিলা খুব ধীরে পা ফেলে চলে যাচ্ছে। চোখের সামনে ঘটল পুরোটা। অবিশ্বাস্য। কুকুর এখন সাদা শাড়ি পরা বুড়ি।
মনজুর গলা বসে গেছে। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, মামা এই তাহলে ভূত। একবার বিড়াল একবার কুকুর হয়ে এসেছিল। এখনতো মানুষ, আবার কীরূপে আসে কে জানে।
আমার মাথায় তখন ক্লিয়ার হলো, এত জোরে আঘাত করার পরও বিড়াল আর কুকুর কোনো শব্দ করেনি কেন।
আমি আর মনজু দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে সাদা শাড়ি পরা বুড়ির যাওয়া দেখলাম। ততক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। মাটিতে পড়ে থাকা মাছের উপর একটা ঘেন্না এসে গেল। মাছ ছাড়াই ঘরে ফিরলাম। এই মাছে ভূতের লোভ লেগেছে। ফিরে এলাম বাড়িতে। মাছ কোথায়, খলুই খালি কেন? হাজার প্রশ্ন সবার। আমরা তখনও সবকিছু বলিনি সবাইকে ওই রাতে। পরদিন সত্যি কাহিনিটা সবাইকে বললাম। কেউ বিশ্বাস করল না। সবাই বলল এটা তোদের চোখের ধাঁধা। কেউ কেউ বলল ওটা মেছো ভূত। মাছের পেছনে ছুটে বেড়ায়। কাঁচা মাছ খায়। ওটা যাকে ভর করে সে অনেক মাছ ধরতে পারে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে সেই কাহিনি, এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় আমাকে। এখন অগ্রগামী পৃথিবী। এসবের প্রসঙ্গ নেই। এসবের বাস্তবতাও নেই।
মামার কথা শুনতে শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিলো। শিকারে না যাওয়ার মনোভাব নিয়ে বললাম :
তাহলে কি শিকারে যাব মামা আজ? আমার একটু একটু ভয় হচ্ছে।
দূর বোকা। এখন আর ওরকম পরিবেশ নেই। ভূত টুতের কথাও শোনা যায় না।
তিরিশ বছর পর আমরা মাছ মারতে নেমে পড়লাম। খুঁজে টুজে একটা মরিচা ধরা কোঁচ পাওয়া গেল ভুট্টোর কাছে। ভুট্টোর বাবা মানে ইসাহাক চাচা এই কোঁচটা ব্যবহার করতেন। তিনিও চিরতরে চলে গেছেন কয়েক বছর হলো। ব্যবহার না করতে না করতে ভোঁতা হয়ে গেছে কোঁচ। তবুও শখ মেটাবার জন্য যথেষ্ট।
এবার আমি মামার সঙ্গী। হাতে একটা খলুই নয় , একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিলাম। মাছ পেলে তাতেই থাকবে। একটা টর্চ নিলাম, ওটা মামার নিজেরই। খুবই স্ট্রং। অনেক দূর চলে যায় আলো। পুকুর ঘাটে গিয়ে পানিতে টর্চ মেরে দেখলাম, আলোর মধ্যে মাটিও দেখা যায়। মাটিতে কিছু পোকামাকড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাছের মতোই একটা প্রাণী লেজ দুরিয়ে দুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনো মাছ নেই মনে হয় এই পুকুরে। মাছ পেতে হলে তো মাছ ফেলতে হবে। কেউ ফেলে না বোধ হয়। যাই হোক, এই টর্চে পরিষ্কার মাছ দেখা যাবে।
রাত বারোটায় সবকিছু নিস্তব্ধ হলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। শুধুু বর্ষা আছে, নেই বর্ষার সেই পানি। চারদিকে আগের সেই পানির থইথই নেই। বাড়ির পাশেই একটা খাল। খালের পানি টইটম্বুর। এই খালের পাশেই টর্চ মেরে মেরে মাছ শিকার শুরু হলো আমাদের । যেতে যেতে অনেক দূর পার হলো মামার। একটি মাছও চোখে পড়েনি তখনও। খাল ছেড়ে এসে একটা বড় পুকুর। পুকুরের পানি আর বর্ষার পানি এখন সমান। মাছ পুকুর থেকে চলে যেতে পারে। বাইরের মাছও পুকুরে চলে আসতে পারে। পুকুরের পাড় ধরে আমরা একটু একটু করে টর্চ মেরে দেখছি। এরই মধ্যে একটা বেলে মাছ শিকার হলো মামার কোঁচে। ব্যাগে সেটি রাখা আছে। এক এক করে মাছ ভরে উঠছে ব্যাগে। তবে আগের মতো সেই আনন্দ নেই মাছ শিকারে। পুকুরের পাড় ঘুরে এবার সেই মাদ্রাসা মাঠে এসে দাঁড়ালাম ছোলেমান মামাসহ।
হঠাৎ মামার চোখ পড়ল একটি বিড়াল চলে যাচ্ছে সামনে দিয়ে। বিড়ালটি বেশ হৃষ্টপুষ্ট। আয়েশে কোনো বাড়িতে তার দিন কাটে মনে হয়। বিড়াল কিন্তু আমাদের কাছে না এসে কেটে পড়ল। মাছের প্রতি তার কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না। ছোলেমান মামা বললেন, দ্যাখো সেই বিড়াল। যে গল্প তোমাকে বলেছিলাম, আবার সেই বিড়াল। কিন্তু এত রাতে কোত্থেকে এলো সে। এই পথ দিয়েই বা এলো কেন। নীরবে সে চলেও গেল। এসব ভাবতে ভাবতে বিড়ালটা হঠাৎ ডানপাশ থেকে বাম পাশে একদৌড়ে পার হলো। মনে হলো কেউ তাকে তাড়া করেছে।
বাদ দাও বিড়ালের ব্যাপার মামা। ওই রাস্তা ধরি । সেখানে সরু রাস্তা ধরে আমরা নদীর দিকে যাব। রাস্তার দুপাশে মাছ শিকার করতে পারব।
মামা বললেন ঠিক আছে। একটু এগুতেই কীসের শব্দে নীরবতা ভাঙল মধ্য রাতের। আড়মোড়া ভেঙে রাস্তার ওপর শুয়ে পড়ল একটা কুকুর। এবার মামা তার ধৈর্য রাখতে পারলেন না। মামা বললেন, ওকে মরাবই। মামা আগে কোঁচ দিয়ে তাকে একা খোঁচা দিতেই কুকুরটি শব্দ করে উঠল। মনে হলো সে ব্যথা পেয়েছে। খোঁচা খেয়ে জায়গা বদল করে একটু দূরে গিয়ে সে আবার শুয়ে পড়ল। মাছের দিকে তার কোনো নজর আছে বলে মনে হলো না। কুকুরটিই বা এখানে কী করছে। এই গভীর রাতে সে এখানে কোত্থেকে এলো। মনে হলো কেউ তাকে এখানে রেখে গেছে।
মাছের ব্যাগটা সামলে নিলাম আমি। আগের গল্পটা শুনে ভালোই হয়েছে। সতর্ক হতে পারছি আমরা । মামাকে বললাম মামা আমি মাছের ব্যাগটা সামলাই।
মামা বললেন ভাগনা, ব্যাপারটা কী বলোতো। তিরিশ বছর পরে মাছ শিকারে এসে আবার সেই বিড়াল, আবার সেই কুকুর। এরকম মিলে গেল কেমন করে।
কিন্তু আগের মতো এরা নয় মামা।
তা ঠিক, কিন্তু এতটা মিলল সেটা ভেবে দেখেছিস।
সেটা আমি ভেবেছি। আমাদের আগের গল্পটা জানা আছে, তাই আমাদের মাথায় এটা আসছে। তা না হলে, এটা নিয়ে আমাদের ভাববার কথাও নয় মামা।
মামা একটু একটু করে কুকুরটার কাছে গেলেন। টর্চ মারলেন তার চোখের ওপর। মনে হলো অসুস্থ কুকুরটা। আলোর ঝলকানিতে সে চোখ বন্ধ করে ফেলছিল বার বার। কী করুণ চাউনি। মামার মায়া হলো। একটা মাছ ছুড়ে দিলো ব্যাগ থেকে। কুকুরটি ফিরেও তাকালো না। মাছটা পেয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। কুকুরটাকে পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে গেলাম। মাঠ পেরিয়ে মাদ্রাসা ভবনের কোনায় মোড় নিয়ে বাগানের দিকে পা রাখলাম আমরা। এই বাগানটি পার হলেই আরো একটি জলাশয় আছে।
বাগানের ভেতরে ঢুকেই আমরা দুজনেই স্তব্ধ। একটু দূরেই বেশ কটা গাছ খুব ঘনঘন। আঁধারটা যেন সেখানে একটু বেশি। তার মধ্যেই একটা সাদা শাড়ি ওপর থেকে ঝুলছে। মনে হয় কোনোকিছু আড়াল করে আছে শাড়িটা। আর ওপর থেকে ঝুলানো সাদা শাড়িটার ওপাশে একজন মানুষ আছে বলে মনে হলো।
একটু একটু করে আমরা এগুচ্ছি।
মামা বললেন, ভয় পাচ্ছিস না তো?
না মামা।
ভয়তো একটু পাচ্ছিস, গলা শুনলেই বুঝা যায়। তোর কি মনে পড়ছে না সেই কাহিনিটা। আগে বিড়াল , তারপর কুকুর, শেষে সাদা শাড়ি পরা বুড়ো মহিলা হয়ে যাওয়া।
সে তো মনে পড়ছেই মামা। এতটা মিলে যায় কী করে। কিন্তু বিড়াল আর কুকুরটা তো অত খারাপ নয়।
তা ঠিক, ভূত তো ওদের বেশে আসতে পারে , তাই না?
তুমি কি মামা ভূত বিশ্বাস করো এখনও?
না করেও বা কী করব? আগের ঘটনায় তো সত্যিই রকম কিছু একটা হয়েছিল। ভূত বা অলৌকিক কিছু।
এবার তা নয় মামা। এবারের ব্যাপারটা কেমন গোলেমালে লাগছে আমার কাছে।
এবার কিন্তু এর শেষ দেখতেই হবে। শাড়িটার ওপাশে সত্যিই বুড়ি আছে কি না দেখতে হবে। যদি থাকে তাহলে গল্পটা সত্যিই গোলেমাল ভাগনা।
মামা তুমি এ নিয়ে ফান করছ। আমার কিন্তু একটু একটু ভয় হচ্ছে।
চলো এগোই।
চলো, এবার ছোলেমাল মামার গোলেমালটা কী দেখব।
মামাকে আমিও ছোলেমাল বলে ফেললাম। মামা কিন্তু তার দিকে কোনো মনোযোগই দেয়নি। শুনলে মাইন্ড করতে পারত।
মামা আমি একটু একটু করে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে শাড়িটা কেবল লম্বা হচ্ছে। আরো কাছে গেলাম, আরো লম্বা শাড়ি। রাতের বাতাসে শাড়ি একটু একটু নড়ছে। যেই শাড়িটা একটু সরে গেল, মনে হলো সেখানে কেউ বসে আছে, মানুষের মতো, সাদা শাড়ি পরা।
এ যে বুড়ি মহিলা মামা। মামার কানের কাছে আস্তে আস্তে বললাম।
সত্যিই তো। বলেই মামা পেছন ফিরে দেখলেন। বললেন, আরে কুকুরটাতো এখনও আছে। কুকুরটা মহিলায় রূপান্তরিত হলেতো তাকে দেখা যেত না।
ঠিক বলেছ মামা।
মামা বললেন সাহস হারালে চলবে না। এর শেষটা দেখতে চাই।
আমি বারবার দেখছি মাছের ব্যাগ। সব ঠিক আছে।
আরেকটু এগুলাম মামা আর আমি। মাছ শিকারে এসে কী করছি আমরা দুজন। ভূত অনুসন্ধান ? মামা এগুচ্ছে, আমিও এগুচ্ছি। এবার একদম কাছে।
আমরা এখন অনেক কাছে। মামাও দেখলেন, আমি। শক্ত হয়ে বসে আসে বুড়ো মহিলা। একদম ভূতের মতো স্থবির হয়ে। হয়তো মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। মামা আমাকে বললেন, টর্চটা ধর।
টর্চটা হাতে নিলাম মামার হাত থেকে। মামা কোঁচটাকে ঘুরিয়ে নিলেন। যেই দিকটায় সিক আছে সেই দিকটা সরিয়ে নিলেন ওপরের দিকে। শুধু লাঠির অংশটা ধরলেন শক্ত করে। মনে মনে কী যেন পড়লেন মামা। দোয়া টোয়া হয়তো। মামার মতলব কী, বোঝা গেল না। তিনি কি বুড়িকে মারবেন ? নাকি খোঁচা দেবেন।
মামা এবার চিৎকার করে উঠলেন, আর বললেন, আজ বুড়ি তোর গল্প শেষ। মামা এবার কোঁচটি ঘুরিয়ে ধরলেন এবং বুড়িকে মারার জন্য উদ্যত হলেন।
এবার বুড়ি ভয় পেয়ে গেল যেন। উঠে দাঁড়ালো সে। তার চেহারা উলটো দিকে। গাছে বাঁধা সাদা শাড়িটা আস্তে আস্তে ঝরে পড়ল মাটিতে। বুড়ি উলটো দিকে ফিরেই দাঁড়ালো। পরনের শাড়িটা বুড়ি খুলতে শুরু করল এবার।
এ কী! কী করছে বুড়ি।
বুড়ি পুরোটা শাড়িই খুলে ফেলল। দেখি তার পরনে টি শার্ট আর পায়জামা। এবার সে মুখ ফেরালো আমাদের দিকে।
এ যে মনজু মামা।
মনজু তুমি এই কাজ করলে, একটু রেগে গেল মামা।
মজা করলাম, আগের গল্প আবার তৈরি করলাম।
মামা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মনজু ভেতরে ভেতরে এতটা, কখনও ভাবতে পারেননি মামা। আমিও অবাক হয়ে গেলাম। মনজু মামা কি করে এই প্ল্যানটা আঁটলেন। তার মানে বিড়াল, কুকুর এবং সাদা শাড়ি, সবই মনজু মামার আমদানী।
কী করে করলি তুই এটা, মামা বললেন।
মনজু মামা বললেন, আমি চাইলাম তোর ছোলেমাল মামার গোলেমাল কাণ্ডটাকে একটু ইতিহাস বানিয়ে রাখি। একটা ভূতের গল্প বানাই।
সেদিন রাতে শিকারে গেলাম ঠিকই। আশ্চর্য, সেই সেই আগের মতো জলাধার, মাছও নেই, ভূতও নেই। অথচ আগে জলের ধারা ছিল, মাছ ছিল, ভূতও ছিল।
মধ্যরাতে মনজু মামা চিৎকার করে বলে উঠল, দুটোই ছোলেমাল মামার গোলেমাল কাণ্ড।
ছোলেমান মামা বললেন, কাণ্ডতো আমি ঘটাইনি। কাণ্ড ঘটালি তুই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *