- সরকার হুমায়ুন
একজন মরমি পির সাহেব প্রায়ই নির্জন বনে যেয়ে ধ্যানে বসতেন। সেই বনে বানর ছিল। বানর যেমন মানুষকে দেখলেই কৌতূহলী হয় ঠিক তেমনি একটি বানর পির সম্পর্কে খুবই কৌতূহলী হয়ে উঠল। যখনই সে দেখত যে, পির সাহেব নিঃশব্দে নীরবে গভীর ধ্যানে বসে আছে, কিছুই করছে না। তখনই বানরটি মরমি গুরুর পাশাপাশি আসতে চাইত। বানরের কৌতূহলের বিষয় ! এই লোকটি একা বসে কী করে? এটি তার কাছে মহারহস্যময় ব্যাপার।
অবশ্যই, একটি বানরের কাছে সবচেয়ে রহস্যজনক জিনিস
- একজন মানুষ কী করে চুপ করে বসে থাকে! কিছুই না করে!
অস্থিরতা, চঞ্চলতা এবং বাঁদরামি করা হলো একটি বানরের জন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা । তাই কাউকে চুপচাপ বিশ্রামে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে নীরবে বসে থাকতে দেখলে তার মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে…? এই মানুষটি কি পাগল হয়ে গেছে? তাই তাকে দেখার জন্য বানরটি কাছে আসতে শুরু করল। সে যত কাছে আসল ততই সে অবাক হয়ে গেল। শুধু মানুষটিই নিঃশব্দ ছিল না— মরমির অরার মধ্যে জায়গাটিও বেশ শান্ত ছিল। এমনকি বানরটি গুরুর কাছে আসার সাথে সাথে সে আবহটি অনুভব করতে পারত। মরমির অরায় থাকতে বানরের ভালো লাগত। এই থমথমে পরিবেশ বানরটি বেশ উপভোগ করত।
তারপর থেকে সে লোকটিকে ভালোবাসতে শুরু করল। কেবল তাঁর নিকটবর্তী হওয়া বানরটির অন্যতম শখ হয়ে উঠল। যখনই সে সময় সুযোগ খুঁজে পেত এবং পির বাগানে বসে ধ্যান করত, তখনই সে কাছে এসে তাঁর পাশে বসত।
একদিন সে হুজুরকে বলল, আপনি কী করেন? আমাকে বলুন। আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করছি। আমাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করুন
একথা শুনে পির সাহেব বানরটির দিকে তাকালেন। তার জন্য অত্যন্ত মমতা অনুভব করলেন। তিনি বানরকে বললেন, আমি কিছুই করি না। মনে মনে আছি ভালো বলে শুধু বসে থাকি। তুমিও এটা করতে পারো, এটি কোনো কাজ নয়। এটি একটি অকাজ। নিঃশব্দে বসে থেকে প্রকৃতি দেখি— বসন্ত ঋতু দেখি। ঘাস-ফুল কীভাবে নিজে থেকে বেড়ে ওঠে তা দেখি। এগুলো তুমিও দেখতে পারো। তুমি কেবল নিঃশব্দে বসো। যখন সঠিক মুহূর্তটি আসে তখন দেখবে হঠাৎ তুমি প্রচণ্ড আনন্দ উল্লাসে ভরে উঠবে। শান্তি এবং প্রশান্তিতে তোমার মনঃপ্রাণ পূর্ণ হবে ।
তোমার কিছু করার দরকার নেই। তোমার পক্ষ থেকে যা কিছু করবে তাই হবে ঝামেলা। অঙ্গ নড়াচড়া করলে এটি ঢেউ সৃষ্টি করে, তরঙ্গ তৈরি করে।
যখন তোমার মনে ঢেউ ওঠে, অস্থিরতা থাকে তখন আল্লাহ তোমার মনে প্রবেশ করতে পারে না। মন যখন নিঃশব্দে থাকে সবকিছু যখন নীরব এবং শান্ত থাকে তখন আল্লাহ তোমার মধ্যে প্রবেশ করে। মহান আল্লাহ নীরবতার দ্বার দিয়ে প্রবেশ করেন- তবে এটি তখনই সম্ভব যখন কেউ একেবারে অকর্মণ্য থাকে।
সুতরাং তুমি এটি করতে পারো, তুমি চেষ্টা করতে পারো। শুধু ভাবো আছি ভালো । তারপর আমার মতো বসে থাকো।
বানর নাসূচক মাথা নেড়ে বলল, এটা অসম্ভব। আমি ভেবেছিলাম আপনার কিছু কাজ থাকলে আমি করতে পারি। আমাকে বলুন, এটা করতে হবে— আমি করতে পারব। কিন্তু শুধুশুধু বসে থাকা, এটি অসম্ভব। আপনি যদি আমাকে আকাশের চাঁদটি আনতে বলেন, তবে আমি আনতে পারি। যদি আপনি আমাকে বলেন, হিমালয় পর্বতটি অপসারণ করতে।
আমি এটার জন্য চেষ্টা করতে পারব। যদি আপনি আমাকে বলেন, পদ্মা নদীর স্রোত উলটো দিকে চালাতে। আমি এটি চেষ্টা করতে পারি।
কারণ, প্রাচীন যুগে আমার জাত ভাই হনুমানের মতো বানরেরা এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করার জন্য পরিচিত ছিল। আমিও যেহেতু তাদেরই মতো বানর, সেহেতু আমার দ্বারা ওরকম অসাধ্যকেও সাধ্য করার সম্ভাবনা আছে। আমি অসাধ্যের ওপরও চেষ্টা চালাতে পারি। তবে কিছুই না করে নীরবে বসে থাকা, এটি পারি না! স্যার, এটা অসম্ভব।
এটা আমার স্বভাব প্রকৃতির বিরুদ্ধে। এটি আমাকে পাগল করে তুলবে। আল্লাহ যদি শুধু নীরবতার মধ্য দিয়ে আসে তবে আল্লাহ আমার জন্য নন এবং আমিও আল্লাহর জন্য নই।
গল্পকার গুরুজি গভীর সুরে বললেন, মানুষের মনও বানর ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ খুব একটা বদলায়নি। চার্লস ডারউইন বলেছিলেন যে, মানুষের বিবর্তন হয়েছে বানর থেকে। বিবর্তন আর পরিবর্তন এক জিনিস নয়। আমরা বিবর্তনকে পরিবর্তন মনে করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি।
মানুষের স্বভাব চরিত্রের গভীরে গেলে দেখা যায়— মানুষ এখনও অন্যান্য বানরের মতোই চঞ্চল। মানুষ খুব বেশি বিবর্তিত হয়নি।
সত্যিকারের বিবর্তিত মানুষ তখনই জন্মগ্রহণ করবে যখন তার অভ্যন্তরীণ বানর স্বভাব সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবে।
একেবারে অদৃশ্য। মানুষ মানে নো-মাইন্ড। ভেতরে মনোজগতে অবিচ্ছিন্ন বকবক, অন্তর কথা,
একাকিত্ব, দিনরাত্রি অব্যাহত থাকে, বছরের পর বছর, জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে মানুষ যা করছে তা হচ্ছে
অপ্রাসঙ্গিক। এটি ভেতরে মনের গভীরে অবিরত কাজ করছে । সেই বকবকই একমাত্র বিষয় যা অপ্রয়োজনীয়, একমাত্র পাপ, মূল পাপ। একবার সেই বকবক বন্ধ হয়ে গেলে যে কারো বেলায় অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে । এমন দুর্দান্ত রহস্য প্রকাশিত হয়ে ওঠে যে, সেগুলো ধারণ করাও কঠিন হয়ে যায়। এত বিশাল আকাশ হতে আপনার জন্য করুণা বর্ষণ শুরু হয়। যা আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না। এটা
অসাধারণভাবে আপনার বিস্তৃতি শুরু করে । তারপরে পুরো মহাবিশ্ব আপনার মধ্যে চলে আসে। এরপর আপনি মহাবিশ্বের মধ্যে কেউ একজন হিসেবে নিজেকে অনুভব করবেন। অথবা মহাবিশ্ব আপনার মধ্যে রয়েছে এমনটি অনুধাবন করবেন । তারপরে তারা- নক্ষত্র, চাঁদ এবং সূর্য আপনার হৃদয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে।
সবশেষে গুরুজি বললেন, তবে এর জন্য আপনার একজন খাঁটি পির দরকার। পির ছাড়া যদি এটি ঘটে তবে আপনি তাল-বেতাল হয়ে যেতে পারেন