পুশমিপুলু

  • মূল: হফ লফটিং
  • অনুবাদ: আমীরুল ইসলাম

হফ লফটিং একজন বিশ্ববিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। গত শতাব্দীর শুরুতে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কালে তিনি ছোটদের জন্য সাহিত্য রচনা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার তৈরি এক চরিত্রের নাম ডা. ডুলিটল। ডা. ডুলিটলের মজার মজার কাহিনি তিনি লিখেছেন। ইংল্যান্ডে জন্ম নিলেও আমেরিকায় তার জীবন কেটেছে। জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৮৮৬, মৃত্যু সেপ্টেম্বর ১৯৪৭।
তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে:
The story of Doctor Dolittle (1920), The Voages of Doctor Dolittle (1922), Doctor Dolittle’s Circus (194), Doctor Dolittle Garden (1927), এর বাইরেও আরও অনেক বই আছে লফটিং-এর। লফটিং-এর লেখার অনুবাদ বা ভাবানুবাদ দেখা যায় না। তবে আমাদের দেশে স্বনামধন্য লেখক বিপ্লব দাশ ‘সদাশিবের সাঙ্গোপাঙ্গ’ নামে একটি বই লিখেছেন। সদাশিব নামের চরিত্রে ডা. ডুলিটলের দূরবর্তী ছায়া আছে। পুশমিপুলু দেইখা যাও-এইগা টাকা রাইখা যাও—এই ছড়াপাঠের রেশ এখনও আছে। তাই ‘ভয়েজেস অব ডা. ডুলিটল’ বইটির সংক্ষেপিত সংস্করণ হাতে পেয়েই অনুবাদ করে ফেলে।
অনেকদিন আগের গল্প এটা। জন ডুলিটল নামে একজন খুব নামকরা ডাক্তার ছিলেন। লোকে তাকে ডাক্তার ডুলিটল নামে খুব মান্য করত। কারণ তিনি অনেক বেশি জানতেন। আর খুব ভালো চিকিৎসা করতেন।
ডাক্তার ডুলিটল থাকতেন ইংল্যান্ডের ছোট্ট এক শহরে। লন্ডন থেকে একটু দূরে। শহরের নাম পুডেলবে। যখন তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন তখন তার পেছনে পেছনে ছুটত তার ভক্তরা। বড় একটা হ্যাট থাকত মাথায়। নীল রঙের কোট। হাতে একটা বড়া ব্যাগ। তিনি হাঁটতেন হন হন করে।
তার পেছনে সারি বেঁধে হাঁটত পশুপাখির দল। কুকুরের দলের সাথে বেড়াল। তার পেছনে গরুর পাল। গরুর পেছনে ঘোড়ার দল। তার পেছনে শূকরছানা। তারপর কোঁকর কোঁ ডাকতে ডাকতে ছুটছে এক ঝাঁক মুরগি। তারপর ভেড়া। ভেড়ার পেছনে কোলাব্যাঙ। সবার পেছনে টুকটুক করে কাছিম।
এই পশুপাখির দলই তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। ডাক্তার ডুলিটল আদতে একজন পশু চিকিৎসক। তিনি নিজেও পশুপাখিদের অনেক ভালোবাসেন। আর জীবজন্তুরাও তাকে প্রাণের অধিক ভালোবাসে।
অনেক দূরদূরান্ত থেকে পশুপাখিরা তার কাছে আসে। খুব যত্ন করে তিনি তাদের সুস্থ করে তোলেন। অনেকে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তার বাসাতেই থাকেন। থাকা-খাওয়ার জন্য পয়সা লাগে না। ডাক্তার ডুলিটলের বাসা ভরতি থাকে সবসময় পশু-পাখিরা। বাসার সব ঘরেই তারা থাকে। এমনকি ডুলিটলের ঘরেও তারা শুয়ে বসে থাকে। কেউ কেউ সুস্থ হয়েও বাসাতেই থেকে যায়। ডাক্তার আদর করে তাদের নানা ধরনের নাম দিয়েছেন। একা সাদা হাঁসকে তিনি ডাকেন ড্যাবড্যাব নামে। প্রিয় কুকুরটার নাম দিয়েছেন জিপ।
শূকর ছানার নাম গুবগুব।
প্যাঁচার নাম তুতু।
আর পোষা কাকাতুয়াকে তিনি ডাকেন পলিনেশিয়া নামে। কিন্তু এর বাইরেও তার বাসায় আরও অনেকে থাকে। তাদের তিনি নাম দেননি। তার বাসায় থাকে ইঁদুরের দল। ক্যানারি পাখি, মোরগ, মুরগি, খরগোশ, কাছিম, শজারু, কুমির ছানা, গিরিগিটি, রাকুন সবার নাম দেওয়া কি সম্ভব?
একদিন।
বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ঘনঘোর বৃষ্টি। পলিনেশিয়া কাকাতুয়া ডাক্তার ডুলিটলের হাতের ওপর বসল।
ওহ ডাক্তার… তোমার তো এখন পোষা প্রাণীর সংখ্যা অনেক। এখন তোমার পশুপাখিদের ভাষা শেখা উচিত। তা না হলে ওদের সঙ্গে কথা বলবে কীভাবে?
ডাক্তার ডুলিটল এতে রাজি হলেন। সামনে বিশাল বড় কালো বোর্ড। চেয়ারে বসেছেন ডুলিটল। চারপাশে পশু-পাখিরা তাকে ভাষা শেখাচ্ছে।
একদিন রাতে। ততদিনে ডাক্তার সাহেব পশু-পাখিদের ভাষা শিখে গেছেন। গভীর রাত। কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। দরজা খুলতেই ঝটপট ঘরে ঢুকল একটা বাঁদর।
বাঁদরটা জোরে জোরে চিৎকার করছে।
ডাক্তার। ডাক্তার। আমার নামি চিচি। এসই সুদূর আফ্রিকা থেকে আমি ছুটতে ছুটতে এসেছি তোমার কাছে।
আফ্রিকার বানরদের খুব খারাপ অবস্থা। তারা সবাই অসুস্থ। শুকিয়ে লিকলিকে হয়ে যাচ্ছে।
তারা তোমার কাছে মিনতি করেছে। যেন তুমি আফ্রিকা আসো। এবং ওদের সুস্থ করে তোলা।
ডাক্তার সবার পক্ষ থেকে আমার অনুরোধ। তুমি আফ্রিকা চলো। ডাক্তার ডুলিটলের মনটা ছিল শিশুর মতো।
হ্যাঁ। অবশ্যই আমি যাব। বানরদের কঠিন অসুখ হয়েছে। চিকিৎসা আমাকে করতেই হবে।
পরদিন ভোরবেলা। চিচি বানরের সাথে জিপ, ড্যাবড্যাব, গুবগুব, তুতু, পলিনেশিয়া, কাকাতুয়া সবাই যে যার পোটলাপুটলি বেঁধে হাজির হলো সাগর তীরে। একটা জাহাজ ভাড়া করল তারা। সাদা জামা পরা একজন নাবিক। জাহাজে করে যাবে তারা আফ্রিকা। সবাই একে একে জাহাজে চাপল। এক দুই তিন।
এইভাবে ছয় সপ্তাহ কেটে গেল। জাহাজ চলছে আর চলছে। চারপাশে ঢেউয়ের গর্জন। নীল সমুদ্র। কূল নাই। কিনার নাই। কত দূর চলেছে তারা জানে না। যেতে যেতে। যেতে যেতে। একদিন দেখা গেল চারপাশে উড়ে বেড়াচ্ছে কিছু উড়ন্ত মাছ। মাছগুলো উড়তে উড়তে বলল, আর মাত্র পঞ্চাশ মাইল। তারপরই তোমরা আফ্রিকার উপকূল পৌঁছে যাবে। কিন্তু তারপরই শুরু হলো প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। লাল আলোর আভা আকাশে। ঘূর্ণি খেয়ে বাতাস নাচছে। সাগরের ঢেউ যেন গড়িয়ে যাচ্ছে ছোট্ট জাহাজের ওপর দিয়ে। আকাশ বাতাস আর সমুদ্র যেন পাগল হয়ে গেছে।
তারপরই…
ধড়াস করে এক বিকট শব্দ হলো। জাহাজ আর নড়াচড়া করছে না। একদিকে কাত হয়ে জাহাজটা যে আটকে আছে। ঝড়বৃষ্টিও নেমে এলো। ঐ তো সমুদ্র তীর দেখা যাচ্ছে। দ্যাখো দ্যাখো। চিৎকার করে উঠল ডাক্তার ডুলিটল।
ঐ তো আফ্রিকা। এখন আমরা তীরে নামব।
সবার চোখে মুখে আনন্দ।
পলিনেশিয়া চিৎকার করে বলল, দড়ি ধরে নামতে হবে। ড্যাবড্যাব তুমি দড়িটার শেষ মাথা ধরে উড়ে উড়ে তীরে যাও। তারপর পাম গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দাও।
যারা সাঁতার জানে না কিংবা পানিতে ভিজতে চায় না তারা দড়ি ধরে ধরে নামবে।
সবাই ঝুলতে ঝুলতে ঐ পারে গিয়ে নামবে। তারা সবাই না ভিজে খুব আরাম করেই সাগর পাড়ে নামল। সমুদ্র সৈকত মনোরম স্থান। চারপাশে শীতল বাতাস বইছে। একটু পরপরই পাম গাছ আছে সারি বেঁধে।
হঠাৎ করেই চিচি বলল, স…স…সসসস…
কারো ভারি পায়ের শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছি।
সবাই মিলে সামনে তাকালো। বন থেকে বেরিয়ে এলো এক সৈনিক। মুখে তার মুখোশ। বাঁ হাতে ঢাল। ডান হাতে বল্লম। পরনে আছে বর্ম। তোমরা নিশ্চয়ই সবাই এসেছ মহান রাজা জলিকিংকির রাজ্যে। চারদিকে যা কিছু দেখছ সব আমাদের রাজার সম্পত্তি।
এসো তোমরা আমার পেছনে পেছনে এসো। অল্প একটু হাঁটতেই গভীর বন। বনের ভেতর দিয়ে কিছুদূর হাঁটতেই বিশাল এক রাজপ্রাসাদ। উঁচু এক সিংহাসনে বসে আছেন মহান রাজা। তার ক্রুদ্ধ চেহারা। মাথায় বিশাল ছাতা। হাতে একটা লাঠি। তোমরা নিশ্চয়ই আমার রাজ্যে বিনা অনুমতিতে ঘুরে বেড়াতে পারো না। তারপর রাজা সেনাদলকে আদেশ দিলেন ডাক্তারকে বন্দি করো। সাথে সঙ্গীসাথি পশু-পাখিদেরও। কড়া নজরে রাখো ওদের। বন্দিশালায় বন্দি করো।
বন্দিঘরে শুধু একটা ছোট্ট জানালা। দেওয়ালের অনেক উঁচুতে। ছাদের পাশে সেই ছোট্ট ঘুলঘুলি। জানালায় অনেক শিক। আর দরজাটা শক্ত লোহার তৈরি। যেমন চওড়া তেমন ভারি। আর চারপাশে শক্ত ও পুরু পাথরের দেয়াল। এই বন্দিশালায় আলো নেই। বায়ু নেই। গুবগুব নামের শুয়োরছানা হাউমাউ করে কান্না শুরু করল। ডাক্তার ডুলিটলেরও চিন্তিত মুখ। এই বিপদে তিনি কী করবেন। বুঝে উঠতে পারছেন না। কিন্তু পলিনেশিয়া কাকাতুয়া বলল, আমি হয়তো জানালা গলে বাইরে বের হতে পারব। আজ রাতে আমি বন্দিঘর থেকে বের হয়ে প্রাসাদে উড়ে দেখতে চাই। তোমাকে মুক্ত করার কোনো উপায় আমি বের করবই। দেখা যাক কী করা যায়।
সেই রাতেই কাকাতুয়া বন্দিঘর থেকে বের হয়ে গেল রাজপ্রাসাদে। রাজার শয়নগৃহে। খুব ধীরে ধীরে রাজার বিছানার নিচে সে হাজির হলো।
তারপর সুরেলা কণ্ঠে বলতে লাগল, আমি ডাক্তার ডুলিটল। যেন ডাক্তার নিজেই কথা বলছে এমনভাবে কাকাতুয়া কথা বলতে লাগল।
রাজা তুমি আমায় দেখতে পাচ্ছ না। আমি আমাকে অদৃশ্য বানাতে পারি।
শোনো রাজা। মন দিয়ে আমার কথা শোনো। আমি তোমাকে সাবধান করছি। তোমার রাজ্যে আমাদের ঘুরে বেড়াবার অনুমতি দাও। শোনো রাজা তা না হলে আমি তোমাকে অসুস্থ বানিয়ে দেবো। বানরদের মতো তুমি রোগা হয়ে ধীরে ধীরে ঢলে পড়বে মরণের কোলে। এখনই তোমার সৈনিকদের পাঠাও বন্দিশালায়। তারা যেন এখনই দরজা খুলে দেয়। নইলে ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগেই তোমার গলা ফুলে ঢোল হয়ে যাবে।
রাজা ঘুমের ঘোরে কথাগুলো শুনলেন। তারপর ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠলেন। বিছানায় বসে তিনি কাঁপতে লাগলেন। এখন অনেক রাত। ভয়ে রাজা দরদর করে ঘামতে লাগলেন।
তিনি চিৎকার করে বললেন, সেনাদল তোমরা এখনই গিয়ে খুলে দাও বন্দিশালা। ডাক্তার ডুলিটল ও তার সঙ্গীসাথিরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে এলো বন্দিঘর থেকে। তখন ভোরবেলা। বনের ভেতর দিয়ে তারা হাঁটতে হাঁটতে… তারা একসময় পৌঁছে গেল বানরের রাজ্যে। খুব তাড়াতাড়ি ছুটল তারা। আর এদিকে সকালবেলা। রাজা বুঝতে পারলেন কাকাতুয়া তাকে বোকা বানিয়েছে। তখন ভীষণ রেগে গেলেন তিনি। রাগে ক্ষোভে তিনি ছিঁড়ে ফেললেন পরনের শার্ট। তিনি তার সেনাদলের সবাইকে ডেকে পাঠালেন।
কঠোর আদেশ দিলেন যাও বনে জঙ্গলে যাও। ডাক্তারকে ধরে নিয়ে এসো। তার কাকাতুয়া কেন আমাকে বোকা বানিয়েছে। চিচি বানরটা বনের আঁকাবাঁকা পথ খুব ভালো চেনে। রাজার সৈন্যদের চেয়ে সে বেশি পথ চেনে জঙ্গলের ভেতর। সে ডাক্তারকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বনের সবচেয়ে ঘন গাছপালার ভেতর দিয়ে তারা হাঁটতে লাগল।
পেছনে সৈন্যদের আগমনের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একটা বড় গাছের বিশাল গর্তের সামনে এসে তারা দাঁড়ালো। চিচি তখন বলল, আমরা এই গাছের গর্তে লুকিয়ে থাকি। সৈন্যরা তো প্রায় আমাদের কাছাকাছি এসে পড়েছে। একসময় তারা হয়রান হয়ে যাবে। ফিরে যাবে প্রাসাদে। আমাদের খুঁজে না পেয়ে। সৈন্যরা ওদের না পেয়ে একসময় ফিরে গেল। চিচি তখন ডাক্তারকে গাছের গর্ত থেকে বের হতে বলল। এইভাবে নানা ঝামেলা শেষে তারা বানর রাজ্যে পৌঁছে গেল।
তখন সন্ধ্যা হয়েছে। গাছে গাছে ঝুলে আছে অসংখ্য বানর। কেউ ডালে শুয়ে আছে। তারা তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ডাক্তার কখন আসবে?
ডাক্তারকে দেখেই তারা আনন্দে নাচতে লাগল খুশিতে। ডাক্তারকে তারা স্বাগত জানালো।
একদল সৈন্য কিন্তু তখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে ডাক্তারকে। তারা পেছন পেছন ছুটে বেড়াচ্ছে। একসময় তারা ডাক্তার ডুলিটলের দেখা পেল। তারা ছুটতে লাগল ডাক্তারকে ধরার জন্য।
তখন ডাক্তার আর তার সাথিরা প্রাণভয়ে ছুটতে লাগল। এত জোরে তারা এই জীবনে ছোটেনি। ছুটতে ছুটতে তারা একটা উঁচু পাহাড়ে উঠে পড়ল। নিচে কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে টলটলে এক নদী। নদীর ওপারে আসলে বানরের রাজ্য।
জিপ নামের কুকুরটা পাহাড়ের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, এত খাড়া পাহাড়। কী করে নদী পার হব। ওপারে যাব কীভাবে?
সবার একই প্রশ্ন।
তখন বানরের নেতা দুই হাত উঁচিয়ে বলল, প্রয়োজন একটা ঝুলন্ত সাঁকো। জলদি এসো। সবাই মিলে দ্রুত ঝুলন্ত সাঁকো বানিয়ে ফেলি। জলদি। জলদি বানাতে হবে। বানরের দল পরস্পর লেজ ধরে সাঁকো বানিয়ে ফেলল। হাত ধরে ধরে তারা ঝুলে পড়ল নদীর এই পার থেকে ঐ পারে। নদীর উপরে তখন বানরের তৈরি সাঁকো হয়ে গেল। ওদের নেতা চেঁচিয়ে বলতে লাগল, এসো সবাই এসো।
বানরের তৈরি সাঁকো দিয়ে দ্রুত তোমরা হেঁটে পার হয়ে যাও। ডাক্তার ডুলিটলও তার সঙ্গীরা প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেল। খুব সরু সাঁকো। নদীর অনেক উপরে সাঁকোটা দুলছে। বানরেরাও দুলছে। কিন্তু তারা সবাই নিরাপদেই নদীর ওপারে পৌঁছে গেল। ডাক্তার পৌঁছালো সবার শেষে। বানরের দলও ঝুলতে ঝুলতে ওপাড়ে চলে গেল। তাদের পেছনেই রয়েছে সেনাদল। ডাক্তারদের পালাতে দেখে নদীর তীরে এসে তারা অস্ত্র বের করল, বল্লম ছুড়ে মারতে লাগল।
তারা রাগে গরগর করছে। দাঁত কিড়িমিড়ি করছে। কিন্তু তাদের করার কিছু নাই।
ডাক্তার ডুলিটল ও তার সঙ্গীরা নিরাপদে বানরের রাজ্যে পৌঁছে গেছে। ডাক্তার দেখতে পেলেন, হাজার হাজার বানর রুগ্ণ ও অসুস্থ হয়ে আছে। ডাক্তার সকল বানরের জন্য ঔষধ তৈরি করলেন। তিন দিন তিন রাত তাদের চিকিৎসা চলল।
কেউ এলো জঙ্গল থেকে। কেউ এলো পাহাড় থেকে। কেউ এলো নদীর তীর থেকে। তারা সবাই এলো পাতায় ছাওয়া একটি ছোট্ট ঘরে। সেই ছোট্ট ঘরে ডাক্তার বসে আছেন। দিন রাত তিনি পরিশ্রম করে সবাইকে টিকা দিচ্ছেন।
একের পর এক টিকা দিচ্ছেন। কয়েকদিন বাদেই বানরেরা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল।
দিবারাত্র পরিশ্রম করে সবার চিকিৎসা করলেন। ডাক্তার অনেক ক্লান্ত হয়ে গেছেন। চিকিৎসা শেষে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তিন দিন একটানা ঘুমালেন। গরগর করে নাক ডাকলেন। কোনো নড়াচড়া নেই। ঘুম আর ঘুম।
ঘুম ভাঙার পর ডাক্তার ডুলিটল দেখলেন আর কোনো অসুস্থ বানর নেই। কোথাও কোনো রোগী বানর নাই। তারা সবাই সুস্থ হয়ে গেছে। তাই এবার ডাক্তার বললেন, এবার আমার ফেরার পালা।
এই শুনে বানরেরা খুব অবাক। তাদের আশা ছিল ডাক্তার বানরের দেশেই থেকে যাবেন।
সেদিন রাতে বানরের দল আলোচনায় বসল।
তাদের নেতা গভীরভাবে বলল, ডাক্তার ডুলিটল আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। আমাদের জন্য খুবই দুঃখের খবর। তাকে তো যেতেই হবে। আমাদের উচিত ডাক্তার ডুলিটলকে কোনো ভালো মানের উপহার দেওয়া।
চিচি তখন বলল, সত্যি কি তোমরা ডাক্তার ডুলিটলকে উপহার দিয়ে খুশি করতে চাও?
হ্যাঁ চাই।
তাহলে কোনো প্রাণী উপহার দিও তাকে। এমন প্রাণী দিও যে প্রাণী ডাক্তার কখনও দেখেনি।
ভালো বুদ্ধি দিয়েছ। তাহলে কি তাকে ইগুয়ানা উপহার দিব?
না।
কোনো একটা ওকাপি।
না।
একটা পুশমিপুলু।
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
কোনো মানুষ কখনও পুশমিপুলু দেখেনি। তাকে একটা পুশমিপুলু উপহার দেবো।
কিন্তু কোথাও কোনো পুশমিপুলু নাই। কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে একটা ব্যাপার আছে। ডুলিটল যখন আফ্রিকায় তখন খবর পাওয়া গেল কয়েকটা পুশমিপুলু হয়তো বেঁচে আছে।
এক বিচিত্র প্রাণী এই পুশমিপুলু। তাদের কোনো লেজ নেই। সামনে পেছনে তাদের দুটো মাথা। মাথায় দুটো শিং।
দুই মাথাওয়ালা প্রাণী পুশমিপুলু। খুব চালাক তারা। সহজে তাদের ধরা যায় না। যখন পুশমিপুলুরা একটা মাথা ঘুমায় তখন এর একটা মাথা জেগে থাকে। সেই মাথাটা দিয়ে তখন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। তাই তাদের কখনও ধরা যায় না। তাই পুশমিপুলুদের কোনো চিড়িয়াখানায় পাওয়া যায় না।
ডাক্তারকে পুশমিপুলু উপহার দিতে হবে। কীভাবে পুশমিপুলুকে ধরা যাবে সেই পরিকল্পনা করল বানরের দল।
ধীরে ধীরে তারা খোঁজ পেল পুশমিপুলুর। তারপর তারা হাত ধরাধরি করে গোল বৃত্ত তৈরি করল। পুশমিপুলু বানরদের দেখতে পেল। তাদের বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা করল। কিন্তু বানরদের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারল না বুঝতে পারল এই বাধা ভেঙে তার মুক্তি নাই। পুশমিপুলু হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল।
বানরদের সে জিজ্ঞেস করল কী চাও তোমরা?
বানর নেতা বলল, ডাক্তার ডুলিটলের সঙ্গে তোমাকে তার বাসায় যেতে হবে।
পুশমিপুলু মাথা নাড়ল। দুদিকের দুটো মাথা নড়ে উঠল।
না, না। কেন যাব আমি?
আর্তনাদ করে উঠল সে। তিন দিন তিন রাত ধরে বানরেরা তাকে বোঝালো।
তারপর এত আলাপ-আলোচনার পর সে বলল, তোমাদের সাথে আমি যাব। দেখব ডুলিটল কেমন দয়ালু মানুষ।
তবে ডাক্তার ডুলিটলকে এক পলক দেখেই পুশমিপুলু খুশি হলো। বুঝতে পারল ডাক্তার খুবই দয়ালু ভালোমানুষ।
পুশমিপুলু তখন বলল, সকল বানরের চেয়ে তুমি অনেক বেশি ভালো মনের মানুষ।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তোমার সাথে যাব।
তারপর ডাক্তার, ডাক্তারের পশুপাখি সঙ্গীসাথিরা ও পুশমিপুলু সবাই এলো ডাক্তারকে বিদায় দিতে। অনেক সময় লাগল। হাজার হাজার বানর হাত বাড়িয়ে দিলো ডাক্তারের দিকে। ডাক্তার সবার সাথে হাত মেলালেন। বানরেরা খুব কৃতজ্ঞ ডুলিটলের প্রতি। ডুলিটলই তাদের নতুন জীবন দিয়েছে। তারপর পুশমিপুলু, গুবগুব, ড্যাব ড্যাব, জিপ, তুতু, পলিনেশিয়া এবং চিচি সবাই মিলে জাহাজে চড়ে বসল ডাক্তারের সাথে। জাহাজ চলা শুরু করল। ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হয়ে গেল সেই সমতল ভূমি।
চারপাশে বিশাল সমুদ্র। বড় বড় ঢেউ। যেতে যেতে, যেতে যেতে জাহাজ বুঝি পথ হারিয়ে ফেলল।
কোথায় যাবে?
কোনদিকে যাবে?
জাহাজ এখন এলোমেলো ঘুরে বেড়াতে লাগল। সেই বিশাল সাগরে। খাবার ফুরিয়ে আসতে লাগল। বাতাসের শক্তিও ফুরিয়ে এলো। পুরনো পালগুলো বাতাস ধরে রাখতে পারছে না।
ডাক্তার ডুলিটল বললেন, আমার এখন ভয় লাগছে। আমরা কি আবার নিজেদের বাসায় ফিরতে পারব? তখনই আশ্চর্য শব্দ শুনতে পেল তারা। ধীরে ধীরে শব্দটা বাড়তেই লাগল।
পাখি
আর পাখি
লক্ষ লক্ষ পাখি।
খুব দ্রুত ডানা নেড়ে ওরা উড়ছে। এরা হচ্ছে সোয়ানো পাখির ঝাঁক।
পাখিরা জাহাজের কাছাকাছি এলো। তারা সাগরের পানির উপরে নাচানাচি শুরু করল।
জাহাজের পালের দড়িতে পাখিরা এস বসল। তারা দড়িতে পা আঁকড়ে ধরল। তারপর পাখিরা টেনে নিয়ে চলল সেই জাহাজকে। এখন ডাক্তার ডুলিটলের জাহাজ ছুটল দ্রুতবেগে। বাতাস বইছে দ্রুতবেগে। ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন জাহাজের ডেকে।
তার হ্যাট যেন উড়ে যাচ্ছে। দুই হাত দিয়ে হ্যাটটাকে ধরে রেখেছেন ডাক্তার ডুলিটল। সোয়ানো পাখির ঝাঁক উড়ে উড়ে চলেছে।
তারা উড়ছে আর উড়ছে। তারা টেনে নিয়ে চলল জাহাজটাকে। খুব দ্রুত জাহাজটা ইংল্যান্ডের উপকূলে এসে ভিড়ল।
শীতের সূর্য ঝকমক করছে। নিজের দেশে সুস্থ শরীরে ফিরলেন ডাক্তার ডুলিটল।
ডাক্তার খুব খুশি নিজের বাসায় ফিরে। রাতের খাবারের পর প্রতিদিন ডাক্তার তার সঙ্গীসাথি পশু-পাখিদের নিয়ে আগুনের সামনে বসে গল্প করেন। বাইরে প্রচণ্ড শীত। ঘরের ভেতরে আগুন জ্বলছে। তখন ডাক্তার জোরে জোরে তার লেখা পড়ে শোনায়। ডাক্তার নতুন একটা বই লিখেছেন। তাদের আফ্রিকা ভ্রমণের ওপর লেখা এই বই।
আফ্রিকার কথা তারা কখনও ভুলতে পারবে না। সেই দেশে পামগাছের ওপর বানরেরা খেলা করে। সেই দেশ যেখানে তারা পুশমিপুলুর দেখা পেয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *