- জুবায়ের হুসাইন
মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে প্রায়ই হেঁটে আসতে হয় অবনিলকে। আর অবনিলও স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে তাকিয়ে থাকে। তাকে সাজিয়ে রাখা সারি সারি মিষ্টি। কোনো কোনো দিন আবদার করে, ‘মিষ্টি কিনে দাও। মিষ্টি খাবো।’
কখনও মা ওকে নিয়ে দোকানের ভেতরে ঢোকেন। মিষ্টি কেনেন।
একদিন মিষ্টির দোকানের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল অবনিল। সেদিন সাথে ছিলেন বাবা। অবনিলের যে মিষ্টি প্রিয় বাবা সেটা জানেন। মিষ্টির দোকানের সামনে এসেই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল অবনিল। কাচের ভেতর দিয়ে তাকালো তাকের দিকে। সাজিয়ে রাখা মিষ্টিগুলো দেখছিল মন দিয়ে। বাবা জানতে চাইলেন, ‘মিষ্টি খাবে?’
অবনিল মাথাটাকে ডানে বামে ঝাঁকিয়ে জানান দিলো, ‘না।’
বাবা আবার জানতে চাইলেন। ‘তবে এখানে দাঁড়িয়ে আছ যে?’
‘মিষ্টি দেখছি।’
‘মিষ্টি কি দেখার জিনিস? মিষ্টি খাওয়ার জিনিস। কিনবে আর গপাগপ খাবে। কিনব?’
জবাব দিলো না অবনিল। উলটো জানতে চাইল, ‘আচ্ছা বাবা, বেশিরভাগ মিষ্টি গোল কেন?’
প্রশ্ন শুনে বাবা অবাক! অবাক হয়ে তাকালেন মিষ্টিগুলোর দিকে। তাইতো! বেশির ভাগ মিষ্টিই গোল। গোল, লম্বাটে, চারকোনা, তিনকোনা মিষ্টি দেখছেন আর ভাবছেন, কী জবাব দেওয়া যায়? শেষে অনেক ভেবে বললেন, ‘মনে হয় আমাদের খাওয়ার সুবিধার জন্য। আমাদের মুখও তো গোল। গোল মুখ দিয়ে গোল মিষ্টি ঢুকে যাবে।’
অবনিল বলল, ‘আমাদের মুখ গোল কে বলল? আমাদের মুখ তো লম্বা।’
সত্যিই আমাদের মুখ লম্বা। মোটা একটা রেখার মতো। বাবা ভাবতে লাগলেন এবার কী জবাব দেবেন। অনেক ভেবে বললেন, ‘মানে যখন আমরা হাঁ করি, তখন আমাদের মুখটা গোল হয়ে যায়। বিশেষ করে মিষ্টি খাওয়ার আগে। হাঁ করার সময় আমাদের সবার মুখই গোল হয়ে যায়। তাই মিষ্টিও গোল। গোল মুখের জন্য গোল মিষ্টি!’
মনে হলো অবনিল মেনে নিয়েছে বাবার কথাটা। বাবা খুব খুশি। খুশিতে অবনিলের চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে লাগলেন। বললেন, ‘এখন তোমার মুখটা কি গোল মিষ্টির জন্য হাঁ করতে চায়?’
অবনিল জবাব না দিয়ে বিশাল এক হাসি দিলো। সেই হাসিতে অবনিলের লম্বা মুখ আরো লম্বা হয়ে গেল। তারপর আর কি! তারপর লম্বা মুখটা গোল করার জন্য গোল গোল মিষ্টি কিনলেন বাবা!
দিন যাচ্ছে আর জুনাইরার চঞ্চলতা বাড়ছে। ওর জন্য আম্মু কোনো জিনিসপত্রই ঠিকমতো রাখতে পারেন না। লবণের কৌটা থেকে খানিকটা লবণ, তেলের বোতল থেকে তেল, শ্যাম্পু, হ্যান্ডওয়াশ, চালের ড্রাম থেকে চাল, ছাদে লাগানো গাছ থেকে পাতা ছিঁড়ে তার কুঁচি— প্রভৃতি একটা পাত্রে নিয়ে অদ্ভুত একটা দ্রবণ তৈরি করবে। আবার কখনও-বা কোনো সবজির টুকরো- হতে পারে ফুলকপির একটা ফুল, পিঁয়াজের কালির মাথার ফুল, আলু, রসুনের একটা কোয়া বা অন্যান্য জিনিস ওর খেলনার পাত্রে পানি-তেল প্রভৃতি দিয়ে মিশিয়ে তরকারি রান্না করবে। খেলনা ভাতের হাঁড়িতে ভাত রান্না করবে। এগুলো কিন্তু ও সত্যিই রান্না করে। ওর আব্বুর ছোটখালা মানে ওর ছোটদাদি ওকে মাটির একটা খেলনা চুলা বানিয়ে দিয়েছেন। চুলাতে রান্না চড়িয়ে দেয় ও। টুকরো কাগজ বা কুড়িয়ে আনা গাছের ডালপাতা ব্যবহার হয় লাকড়ি হিসেবে। এরপর রান্না করা ভাত তরকারি পাত্রে ঢেলে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখবে। আব্দু অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে খেতে দেবে। ও জানে আব্বু এগুলো সত্যি সত্যিই খাবে না। কিন্তু খাবার মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে খাওয়ার মতো মুখ নাড়ানো আর খাওয়া শেষে ‘দারুণ টেস্টি হয়েছে আম্মু তোমার রান্না।’ বলা লাগবে।
জুনাইরাকে তখন দেখে কে? বেজায় খুশি মনে ও ঘরময় ছুটবে।
রোজার সময় আব্বু হয়তো ঘরে নামাজ আদায় করছেন— সিজদায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে আব্বুর কাঁধে চড়ে বসবে। আব্বু একহাত দিয়ে মেয়েকে ধরে সিজদা থেকে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য উঠে দাঁড়াবেন।
এভাবে পিঠে রেখেই নামাজ শেষ করবেন। শেষে মেয়েকে নিয়ে রবের দরবারে দুহাত তুলবেন।
‘জুনাইরা, তুমি বড় হচ্ছ! আব্বু সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরল। তাকে একটু কম জ্বালাও!’ মাঝে মাঝে মা হাঁক ছাড়েন। জুনাইরার অমনি জবাব, ‘আমি কি গ্যাসলাইট না আগুন যে আব্বুকে জ্বালাবো? তুমিই বলো আব্বু, আমার দ্বারা কি তোমাকে জ্বালানো সম্ভব?’ তড়াং করে বাবার কোলের ওপর বসে পড়বে।
প্রচণ্ড হাসি পায় আব্বুর। কিন্তু হাসলে তো বিপদ! মেয়েকে তখন সামলানোই দায় হয়ে যাবে। তাই বলেন, ‘রানুর মা, তুমি আমার মেয়েকে গ্যাসলাইট বানিয়ে দিলে? কিন্তু কই, ও তো আমাকে জ্বালাচ্ছে না!’ মেয়ের হাসিভরা মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও হাসতে থাকেন।
‘তোমার এই অতি আদরই মেয়েকে একদিন মাথায় তুলবে।’ রান্নাঘর থেকে গজরাতে থাকেন আম্মু। ‘তখন আফসোস করেও কূল পাবে না, এই আমি বলে রাখলাম!’
আব্বু আর ওদিকে কান দেন না। অনেক আদরের মেয়ে তার। মাকে হারানোর চার বছরের মাথায় তার ঘরে এসেছে জুনাইরা। না জানি মায়ের কোন চাওয়া-পাওয়া তিনি পূরণ করতে পারেননি। জীবিত থাকা অবস্থায় মায়ের যথাযথ হক আদায় করা কোনো সন্তানের পক্ষেই সম্ভব হয় না। জীবনে মায়ের প্রয়োজনীয়তা মা না হারালে বোঝা যায় না। শত আফসোস করেও সেই শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। তাই মেয়েকে তিনি এতটা প্রশ্রয় দেন।
রহমত-মাগফেরাত শেষে নাজাতের দশক চলছে। ঈদের আমেজ বিরাজ করছে সবখানে।
ইতোমধ্যে তিন সেট ড্রেস কেনা হয়ে গেছে জুনাইরার। ছোটোমামা ছুটিতে আসার সময় আরও একসেট নিয়ে আসবে।
আব্বু বাসায় ফিরে বেশ অবাক হলেন। ‘আব্বু, আব্বু!’
বলে ছুটে এলো না জুনাইরা। বেসিন থেকে হাতমুখ ধুয়ে রুমে ঢুকলেন। জামা-কাপড় পালটালেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজছেন মেয়েকে। কাল রাতে ঘুমানোর আগে স্যান্ডউইচ আনতে বলেছিল মেয়েটা। তিনি জানেন এটা পেলে ও কতটা খুশি হবে! জান্নাতের তারাগুলো যেন ঝিলমিল করে হেসে উঠবে। ডাকলেন,‘আম্মু? আমার দুতত্ব (দুষ্টু) আম্মুটা কোথায় গেল?’
রান্নাঘর থেকে শোবার ঘরে এলেন আম্মু। পাশে বসে আস্তে করে বললেন, ‘ও আজ তোমার সামনে আসবে না।’
ভীষণ অবাক হলেন আব্বু। ‘আমার সামনে আসবে না মানে? কোথায় মেয়েটা? কী হয়েছে ওর?’
‘তুমি অত উতলা হয়ো না। আসলে ও একটা কাজ করে ফেলেছে কি না…’
সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন আব্বু। বুঝতে চেষ্টা করলেন ব্যাপারটা। ‘তোমাকেও দেখি চিন্তিত দেখাচ্ছে! আশা করি খারাপ কিছু হবে না!’
‘না না,’ তাড়াতাড়ি বললেন আম্মু। ‘খারাপ কিছু হবে কেন? আসলে…’ এই, তুমি কি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছ? সেই থেকে মেয়েটাকে দেখছিনে…! একটু শান্ত হলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলো কী হয়েছে। আমি জানি আমার মেয়ে এমন কিছু করবে না যা আমাকে কষ্ট দিতে পারে।
এতক্ষণ পড়ার ঘরে লুকিয়ে ছিল জনাইরা। আব্বুকে ওরও দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। তাই আর থাকতে না পেরে শোবার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো। থমথমে চেহারা।
ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন আব্বু। কী হয়েছে আম্মু তোমার? শরীর খারাপ করেনি তো? পেরেশান হয়ে উঠলেন তিনি।
সেদিন যে ড্রেসটা আমি আর তুমি মিলে চয়েজ করে কিনেছিলাম, ওটা আমি রানুকে দিয়ে দিয়েছি।
থেমে থেমে বলল জুনাইরা।
মেয়ের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন আব্বু বেশ কয়েক মুহূর্ত। তাকালেন আম্মুর দিকে। আস্তে আস্তে আব্বুর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেটা সংক্রমিত হলো মেয়ের মধ্যেও। পাশে এসে দাঁড়ালেন আম্মু। তিনিও বাদ রইলেন না।
এরপর তিনজন নিজেদেরকে জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে আব্বু বললেন, এবার ঈদটা সব ঈদের চেয়ে বেশি আনন্দে কাটবে। আরও কাকে কাকে ড্রেস কিনে দিতে চাও, তার একটা লিস্ট করো আম্মু। আমরা কাল ইফতার সেরে বাজারে যাব কিনতে। সময় তো আর বেশি নেই। ঈদের আগেই সেগুলো তোমার বন্ধুদের হাতে তুলে দেওয়া চাই।
জুনাইরার মনটা তখন চড়ুইছানার মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়তে শুরু ক