বাংলাদেশের সোনার সন্তান আমাদের বিজ্ঞানীরা

  • শাকিব হুসাইন

আমাদের এই বাংলাদেশ যেমন লাখো সূর্য সন্তানের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে তেমনি এদেশকে বহির্বিশ্বে প্রতিনিধিত্ব করতে অনেক জ্ঞানী-গুণীর অবদান অনস্বীকার্য। তার মধ্যে বিজ্ঞানীরা এমনই একজন সোনার সন্তান। আমাদের দেশের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী বহির্বিশ্বে অসংখ্য সুনাম কুড়িয়েছে। দেশকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। আজ তেমনি কয়েকজন বিজ্ঞানীদের গল্প শোনাবো তোমাদের। তাহলে আর দেরি কেন?
জগদীশ চন্দ্র বসু (১৮৫৬-১৯৩৭)
আচ্ছা বলো তো বেতার তরঙ্গ প্রথম কে আবিষ্কার করেছিলেন? গাছেরও প্রাণ আছে? এই কথাটি প্রথম কে বলেছিল? জানি জানি বুঝতে পেরেছ তোমরা। নিশ্চয়ই জগদীশ চন্দ্র বসু। হ্যাঁ, তিনিই প্রথম বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার করেন। জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০শে নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি (বর্তমান বাংলাদেশ) অঞ্চলের মুন্সীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিল ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। জগদীশ কলকাতা হেয়ার স্কুল থেকে পড়াশোনা করে ১৮৭৯ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। বাবার ইচ্ছা ও তার আগ্রহে তিনি ১৮৮০ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান পাঠের উদ্দেশ্যেই লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান, কিন্তু অসুস্থতার কারণে বেশিদিন এই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি তার ভগ্নীপতি আনন্দমোহন বসুর আনুকূল্যে জগদীশ চন্দ্র প্রকৃতিবিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে কেমব্রিজ ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ট্রাইপস পাশ করেন তিনি। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাঠ সম্পন্ন করেন। জগদীশের আঠারো মাসের সেই গবেষণার মধ্যে মুখ্য ছিল অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা। ১৮৯৫ সালে তিনি অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং কোনো তার ছাড়া এক স্থান থেকে
অন্যস্থানে তা প্রেরণে সফলতা পান। ১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানী র্হেৎস প্রত্যক্ষভাবে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এ নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন যদিও শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। জগদীশচন্দ্র তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। এ ধরনের তরঙ্গকেই বলা হয় অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে থাকে।
আইনস্টাইনে তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, ‘জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে-কোনোটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।’ তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো অনেক কিছুই করতেন। এদেশের বিজ্ঞানকে নিয়ে যেতেন আরও অনন্য উচ্চতায়। এই মহান বিজ্ঞানী ২৪ নভেম্বর ১৯৩৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬)
মেঘনাদ সাহা ৬ অক্টোবর, ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গের ঢাকা জেলার অন্তর্গত শেওড়াতলী গ্রামে (বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার অন্তর্গত) জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের টোলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। সেই সময় তাঁর গ্রামের বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার করার সুযোগ ছিল। তাঁর পিতা ছোটবেলায় তাঁর বিদ্যাশিক্ষা অপেক্ষা দোকানের কাজ শেখা আবশ্যক মনে করেন। কিন্তু তার দাদা জয়নাথ এবং তাঁর মায়ের ঐকান্তিক চেষ্টায় এবং তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁর ইতিহাস এবং গণিতের মেধার কথা তাঁর পিতার কাছে অবগত করলে তাঁর পিতা তাঁকে হাই স্কুলে ভর্তি করতে সম্মত হন। এরপর তিনি শেওড়াতলী গ্রাম থেকে সাত মাইল দূরে শিমুলিয়ায় মধ্য ইংরাজি বিদ্যালয়ে (মিডল স্কুল-ব্রিটিশ আমলে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি পড়ার স্কুল) ভর্তি হন। এত দূরে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করে তার পক্ষে পড়াশোনা করা দুরূহ হওয়ার পাশাপাশি মেঘনাদের বাবার পক্ষেও আর্থিক সামর্থ্য ছিল না শিমুলিয়া গ্রামে মেঘনাদকে রেখে পড়ানোর। তখন মেঘনাদের বড় ভাই এবং পাটকলকর্মী জয়নাথ শিমুলিয়া গ্রামের চিকিৎসক অনন্ত কুমার দাসকে মেঘনাদের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করায় তিনি রাজি হন। সেখানে তিনি শিমুলিয়ার
ডাক্তার অনন্ত নাগের বাড়িতে থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ লাভ করেন। এই স্কুল থেকে তিনি শেষ পরীক্ষায় ঢাকা জেলার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে বৃত্তি পান।
এরপর ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পরে কিশোরীলাল জুবিলি হাই স্কুলের একজন শিক্ষক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে তাদের স্কুলে ভর্তি করে বিনা বেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকেই তিনি ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গের সমস্ত বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় মাসিক ৪ টাকার সরকারি বৃত্তিসহ উত্তীর্ণ হন। এই পরীক্ষায় গণিত এবং ভাষা বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ নম্বর অধিকার করে।
বিদ্যালয় শিক্ষার পর তিনি ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বৈশ্য সমিতির মাসিক দুই টাকা বৃত্তিও লাভ করেন। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে গণিতে অনার্স নিয়ে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেই সময় ১৯১১-১৯১৩ সাল পর্যন্ত দু’বছর ইডেন ছাত্রাবাস এবং পরে একটি মেসে থেকে পড়াশোনা করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৩ সালে গণিতে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম হন।
মেঘনাদ ১৯২৮ সালে তার সমস্ত গবেষণার ফলাফল একত্র করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রির জন্য আবেদন করেন। তাঁর সব গবেষণা বিবেচনা করার জন্য উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর থিসিস পেপার বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। বিদেশে অধ্যাপক ডাবলু রিচার্ডসন, ড. পোর্টার এবং ড. ক্যাম্বেল তাঁর থিসিস পেপার পর্যালোচনা করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯১৯ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করেন।
তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯১৬-১৯, ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণাগারে ১৯২০-২১ ও এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২২-৩৮ পরে পুনরায় কলকাতায় ফিরে আসেন। তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
কুদরাত-এ-খুদা (১৯০০-১৯৭৭)
কুদরাত-এ-খুদা ১৯০০ সালের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের মাড়গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পির পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। একদিন খুদার এক মামা তাদের বাড়িতে আসেন। তিনি তখন কলকাতায় পড়াশোনা করছেন। তিনি খুদাকে বাংলা বর্ণমালার বই দেন। বিকালবেলা খুদাকে খেলতে দেখে, তার মামা, সেই বইটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় বালক খুদা সব মুখস্থ উত্তর দেন। তিনি বালক খুদার প্রতিভা দেখে তাঁকে মাদ্রাসা থেকে ছাড়িয়ে এনে মাড়গ্রাম এম.ই. স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তিনি চলে আসেন কলকাতা উডবার্ন এম.ই. স্কুলে এবং কলকাতা মাদ্রাসায়। কলকাতা মাদ্রাসা থেকে তিনি ১৯১৮ সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর তিনি ভর্তি হন বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখান থেকেই তিনি ১৯২৫ সালে রসায়নে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএসসি পাশ করেন। পাশ করার পর তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান ডক্টরেট করার জন্য। সেখানে তিনি স্যার জে এফ থর্পের অধীনে থিসিস করেন। প্রফেসর থর্প কুদরাত-এ-খুদাকে স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে দেন। ফলে তিনি চার বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ কাজ করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে ঝঃধরহষবংং ঈড়হভরমঁৎধঃরড়হ ড়ভ গঁষঃরঢ়ষধহসবঃ জরহম বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি ১৯২৯ সালে রসায়নে ডি.এসসি. ডিগ্রি লাভ করেন।
ডক্টর অব সায়েন্স (ডি.এসসি. ডিগ্রি) লাভ করার পর দেশে ফিরে এসে প্রাথমিকভাবে তাঁর কোনো চাকরি জোটেনি। আড়াই বছর বেকার ছিলেন তিনি। সেসময় প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি নিয়ে গবেষণা থিসিস লিখেন তিনি।
কুদরাত-এ-খুদা ১৯৩১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি এ কলেজে বিভাগীয় প্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক তাকে ইসলামিয়া কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং ১৯৪৬ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যক্ষ হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর ড. কুদরাত-এ-খুদা পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং জনশিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব নেন (১৯৪৭-১৯৪৯)। অতঃপর তিনি পাকিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োজিত হন (১৯৫০-১৯৫৩)। ১৯৫৩-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগারসমূহের পরিচালক ছিলেন। অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে গড়ে তোলেন বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণাগার। বাংলাদেশের দেশীয় শিল্পের বিকাশ হয় তার হাত দিয়ে। ১৯৬৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য যে শিক্ষাকমিশন গঠন করা হয়
কুদরাত-এ-খুদা তার সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট প্রণীত হয়।
তিনি অনেক গবেষণা করেছেন। পারটেক্স কাঠ কুদরাত-এ-খুদার বিশেষ অবদান। পাটকাঠি থেকে মণ্ড তৈরি করে সেই মণ্ড থেকে অতি উন্নতমানের দৃঢ় তক্তা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। এছাড়াও তিনি আরও বিভিন্ন গবেষণা করেছেন। তিনি অনেক বই লিখেছেন। তার মধ্যে বিজ্ঞানের সরস কাহিনি, বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনি, বিজ্ঞানের সূচনা, পরমাণু পরিচিতি ইত্যাদি। অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। এই মহান বিজ্ঞানী ৩ নভেম্বর ১৯৭৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
ওসমান গণি (১৯১২-১৯৮৯)
ওসমান গণি কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের বৈরাটিয়াপাড়া গ্রামে ১৯১২ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৫ সালে প্রথম ভারতীয় মুসলমান হিসেবে উক্ত বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৩৮ সালে কৃষি রসায়ন বিষয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ওসমান গণি ১৯৪০ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৪৫-১৯৪৯ সালে তিনি বাংলার সরকারি কৃষি রসায়নবিদ এবং পরে পূর্ব পাকিস্তান সরকার কৃষি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান এবং মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হন এবং পরে ভূ-বিজ্ঞান বিভাগেরও প্রধান হন। ১৯৬১-১৯৬৩ পর্যন্ত পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাংলাদেশের প্রথম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৩-১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওসমান গণি ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান একাডেমি অব সায়েন্সেসের একজন সহকারী নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ওসমান গণি শিক্ষা ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান গবেষণায় অবদান রাখায় পাকিস্তান সরকার ১৯৫৯ সালে ‘সিতারা-ই-কায়েদ-ই-আজম’, ১৯৬৪ সালে ‘সিতারা-ই-পাকিস্তান’ খেতাব দেয়। এছাড়া ১৯৬৭ সালে আমেরিকার নর্দার্ন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.এসসি ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি ১৯৮৯ সালের ২১ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
জামাল নজরুল ইসলাম (১৯৩৯-২০১৩)
জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৩৯ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বয়স যখন মাত্র ১ বছর তখনই তার বাবা কলকাতায় বদলি হন। জামাল নজরুল প্রথমে ভর্তি হন কলকাতা মডেল স্কুলে। এই স্কুল থেকে পরবর্তীতে শিশু বিদ্যাপীঠে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এই বিদ্যাপীঠেই পড়েন। পরবর্তীতে আবার মডেল স্কুলে ফিরে যান। কলকাতায় মডেল স্কুলের পর চট্টগ্রামে চলে আসেন। এখানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষা দেন। পরীক্ষায় বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তাঁকে ‘ডাবল প্রমোশন’ দিয়ে সরাসরি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে নেওয়া হয়। নবম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি এই স্কুলে পড়াশোনা করেন। এখানে পড়ার সময়ই গণিতের প্রতি তার অন্যরকম ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। অনেক অতিরিক্ত জ্যামিতি সমাধান করতে থাকেন। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে গিয়ে ভর্তি হন লরেন্স কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি সিনিয়র কেমব্রিজ ও হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ করেন। এ সময় নিজে নিজে অনেক অঙ্ক কষতেন। বিভিন্ন বই থেকে সমস্যা নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন যা পরবর্তীতে তার অনেক কাজে আসে। উল্লেখ্য, হায়ার সিনিয়র কেমব্রিজে তিনি একাই কেবল গণিত পড়েছিলেন। এটা বেশ উচ্চ
পর্যায়ের গণিত হওয়ায় সবাই নিতে চাইত না। এ সময়ই গণিতের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। লরেন্স কলেজের পাঠ শেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়তে যান। খান থেকে বিএসসি অনার্স করেন। বিএসসি শেষে ১৯৫৭ সালে ইসলাম কেমব্রিজে পড়তে যান। কেমব্রিজের প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে ১৯৫৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এখান থেকেই ১৯৬০-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রায়োগিক গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে এসসিডি (ডক্টর অফ সায়েন্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ডের ডক্টরাল-উত্তর ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইসলাম কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অফ থিওরেটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে (বর্তমানে ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমি) কাজ করেন ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এখানে তিনি আইনস্টাইনের তত্ত্ব নিয়ে কাজ করতেন এবং এই সূত্রে স্টিভেন হকিংয়ের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৮১ সালেই তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিলেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুই হাজার আটশ টাকা বেতনে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি থেকে ১৯৮৫ সালে তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালে তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মেডেল পান। এছাড়াও অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন। দি আল্টিমেট ফেইট অফ দি ইউনিভার্স (১৯৮৩)-কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।
ক্লাসিক্যাল জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৪)-ডব্লিউ বি বনোর এর সাথে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি (১৯৮৫)-কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত।
এই মহান বিজ্ঞানী ১৬ মার্চ ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
অরুণ কুমার বসাক (১৯৪১- বর্তমান)
অরুণ কুমার বসাক ১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর পাবনার শহরের রাধানগর মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ছেলেবেলা পাবনা শহরেই কাটে। অরুণ কুমার বসাক ১৯৫৭ সালে পাবনার রাধানগর মজুমদার একাডেমি (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) পাবনা হতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ঢাকা এর অধীনে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। স্কুল জীবন শেষ করে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৫৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে তিনি রাজশাহীতে এসে রাজশাহী সরকারি কলেজে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন (উল্লেখ্য তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বিএসসি কোর্স চালু ছিল না) এবং ১৯৬১ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক পাশ করেন। অনার্স শেষ করে অরুণ কুমার বসাক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করে সেই বছরই ২ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বর (৭৫%) পাওয়ার সম্মাননা হিসাবে ১৯৬৫ সালে তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন এবং সেই কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু প্রগতিশীল চিন্তাধারার পক্ষে অবস্থান গ্রহণের জন্য বিমানবন্দরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার পাসপোর্ট জব্দ করে। ফলে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণে লন্ডন যেতে ব্যর্থ হন। এরপর পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে তার পাসপোর্ট নতুন করে ইস্যু করা হয়। ঐ বছরই তিনি কমনওয়েলথ পোস্ট গ্রাজুয়েট স্কলারশিপ লাভ করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড গমন করেন সেখানে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরে তিনি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করেন।
এ পর্যন্ত অরুণ কুমার বসাক ৫৫টি এমএসসি, ২টি এমফিল এবং ৬ জন পিএইচডি গবেষণাপত্রের তত্ত্বাবধান করেছেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জার্নালে তার ১৩৯টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে ৮৬টি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক জার্নালে ২৫টি দেশীয় জার্নালে এবং বাকিগুলো বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক কনফারেন্সে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তার আরো কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি নিউক্লীয় তত্ত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছেন। অরুণ কুমার বসাক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিষয়ক গবেষণাধর্মী কলাম লিখেছেন। তার লেখা স্নাতক কোর্সের জন্য ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান নামে একটি বই ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়।
আব্দুস সাত্তার খান (১৯৪১-২০০৮)
আব্দুস সাত্তার ১৯৪১ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার খাগাতুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রতনপুর উচ্চ বিদ্যালয় এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগ থেকে ১৯৬২ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করতে যান এবং ১৯৬৮ সালে রসায়নের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ঐ বছরই তিনি ধাতব প্রকৌশল নিয়ে গবেষণা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। তিনি নাসা ইউনাইটেড টেকনোলজিস এবং অ্যালস্টমে কাজ করার সময়ে ৪০টিরও বেশি সংকর ধাতু উদ্ভাবন করেছেন। এই সংকর ধাতুগুলো ইঞ্জিনকে আরো হালকা করেছে, যার ফলে উড়োজাহাজের পক্ষে আরো দ্রুত উড্ডয়ন সম্ভব হয়েছে এবং ট্রেনকে আরো গতিশীল করেছে। তার উদ্ভাবিত সংকর ধাতুগুলো এফ-১৬ ও এফ-১৭ যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আব্দুস সাত্তারের গবেষণা এবং মহাকাশে তার প্রয়োগের জন্য তিনি নাসা, আমেরিকান বিমানবাহিনী, ইউনাইটেড টেকনোলজি এবং অ্যালস্টম থেকে অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ব্রিটেনের রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির একজন পেশাদার রসায়নবিদ এবং নির্বাচিত ফেলো। তিনি স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে যুক্তরাজ্য থেকে পেশাজীবী বিজ্ঞানী হিসেবে রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি এবং এর আগে ১৯৯৬ সালে যুক্তরাজ্যের রয়েল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি থেকে ফেলো নির্বাচিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সোসাইটি অব মেটালসেরও সদস্য তিনি। ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান এফ-১৫ ও এফ-১৬-এর ইঞ্জিনের জ্বালানি খরচ কমানোয় বিশেষ অবদান রাখার জন্য পান ইউনাইটেড টেকনোলজিস স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড। ১৯৯৪ সালে পান উচ্চগতিসম্পন্ন জেট বিমানের ইঞ্জিন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে অবদানের জন্য ‘ইউনাইটেড টেকনোলজিস রিসার্চ সেন্টার অ্যাওয়ার্ড অব এক্সিলেন্স’ পদক।
১৯৯৩ সালে পান ‘প্রাট অ্যান্ড হুইটনি’র বিশেষ অ্যাওয়ার্ড। পেশাদার বিজ্ঞানী থেকে অবসর নেওয়ার পরও তাঁর বিজ্ঞানের সেবা থেমে থাকেনি।
এই মহান বিজ্ঞানী ৩১ জানুয়ারি ২০০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মাকসুদুল আলম (১৯৫৪-২০১৪)
মাকসুদুল আলম ফরিদপুরে ১৯৫৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। মাকসুদুল আলম গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে স্বাধীনতার পর মাকসুদুল আলম চলে যান রাশিয়ার। সেখানে মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অণুপ্রাণবিজ্ঞানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর (১৯৭৯) ও পিএইচডি (১৯৮২) সম্পন্ন করেন। পরে জার্মানির বিখ্যাত মাক্স-প্লাংক ইনস্টিটুট ফুর বিয়োখেমি (মাক্স প্লাংক জৈবরসায়ন ইনস্টিটিউট) থেকে ১৯৮৭ সালে প্রাণরসায়নে আরেকটি পিএইচডি উপাধি অর্জন করেন।
জার্মানিতে তিনি কাজ করার সুযোগ পান প্রাণরসায়নের ডিটার উস্টাহেল্ট (উরবঃবৎ ঙবংঃবৎযবষঃ) ও গেরাল্ড হেইজেলবাওয়াদের (এবৎধষফ ঐধুবষনধঁবৎ) সঙ্গে। জার্মানির পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে সামুদ্রিক জীবপণ্য প্রকৌশল কেন্দ্রে (গধৎরহব ইরড়ঢ়ৎড়ফঁপঃ ঊহমরহববৎরহম ঈবহঃবৎ) সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ওই কেন্দ্রে কাজ করার সময় লবণ-আকর্ষী আর্কিয়ার ভৌত-তড়িৎ রূপান্তর (ঞৎধহংফঁপঃরড়হ) সংকেতকে বিশ্লেষণ করেন। ২০০০ সালে তিনি ও তাঁর সহকর্মী র‌্যান্ডি লারসেন সহ আটজন বিজ্ঞানী আর্কিয়াতে মায়োগ্লোবিনের মতো এক নতুন ধরনের আমিষ আবিষ্কার করেন। এ দুটিকে নাম দেন গ্লোবিন-যুগল সংবেদক (মষড়নরহ-পড়ঁঢ়ষবফ ংবহংড়ৎং) এবং প্রোটোগ্লোবিন (ঢ়ৎড়ঃড়মষড়নরহং)। এই প্রাচীন আমিষগুলো থেকে প্রাণের উদ্ভবকালে অক্সিজেন কেমন করে ব্যবহৃত হতো তার হদিস পাওয়া যায়।
২০০৩ সালে তিনি হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ে বংশানুসমগ্র বিজ্ঞান, প্রোটিনসমগ্র বিজ্ঞান ও জৈব তথ্যবিজ্ঞানে অগ্রসর গবেষণা কেন্দ্র— (অফাধহপবফ ঝঃঁফরবং রহ এবহড়সরপং, চৎড়ঃবড়সরপং ধহফ ইরড়রহভড়ৎসধঃরপং (অঝএচই)) প্রতিষ্ঠা করেন। যার ফলশ্রতিতে হাওয়াইয়ান পেঁপের জিনোম অনুক্রম বের করা হয়। এ কাজ সম্পন্ন করার পর বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের প্রচ্ছদে স্থান পান তিনি। বংশানুগতভাবে পরিবর্তিত এই পেঁপের জিন নকশা উন্মোচনের পর তিনি পাটের জিন নকশা উন্মোচনের কথা ভেবেছিলেন। সে সময় কয়েকবার বাংলাদেশও এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ডাক পড়ে মালয়েশিয়ায় রবার গাছের জিন নকশা উন্মোচনের জন্য, ওই কাজেও তিনি সফল হন।
পরে ২০০৯ সাল থেকে তিনি মনোনিবেশ করেন তোষা পাটের (ঈড়ৎপযড়ৎঁং ড়ষরঃড়ৎরঁং) জিন নকশা উন্মোচনে নেতৃত্ব দানে। পাটের বেস-জোড়া ১২০ কোটি: এরা কোনো অনুক্রমে আছে, তা এই আবিষ্কারের ফলে জানা গেছে। এর সুফল হিসেবে মিহি আঁশের পাট, শীতকালীন পাট, সহজ-পচনশীল পাট, পোকা-প্রতিরোধী পাট, ঔষধি পাট, তুলার মতন শক্ত আঁশের পাট প্রভৃতি উদ্ভাবন করা সহজ হবে।
২০১২ সালে পাটের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাক মাক্রোফোমিনা ফেইজেওলিনার জিনোম অনুক্রম উদ্ঘাটনে বাংলাদেশের একটি গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন।
বাংলাদেশ সরকার তাঁর অবদানের জন্য ২০১৬ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করে। তিনি ২০ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মোবারক আহমদ খান (১৯৫৮-বর্তমান)
মোবারক আহমদ খান শিক্ষাজীবনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর পলিমার এবং তেজস্ক্রিয় রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ছিলেন এবং বর্তমানে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
মোবারক আহমদ খান ২০০৯ সালে পাটের তৈরি ঢেউটিন উদ্ভাবন করেন যা জুটিন নামে পরিচিত। জুটিন তৈরিতে তিনি পাটের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন পলিমারের মিশ্রণ। ২০১৬ সালে তিনি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক ফরমালিনের বিকল্প হিসেবে অ-ক্ষতিকারক চিতোজান তৈরি করেন। সম্প্রতি তিনি পাট থেকে পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ তৈরি করেছেন। এছাড়াও তিনি পাট দিয়ে অসংখ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস উদ্ভাবন করেছেন।
পাট বিষয়ক গবেষণায় সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি মোবারক আহমদকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক প্রদান করে। এছাড়া তিনি ২০১৬ সালে জাতীয় পাট পুরস্কার ও ২০১৭ সালে ফেডারেশন অব এশিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি পুরস্কারে ভূষিত হন। বিশ্বের বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার কাজের ওপর নথিপত্র প্রকাশ করে। ১৯৯৮ সালে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্যসূত্রের প্রকাশনা ‘হুজ হুতে’ তার নাম প্রকাশ করা হয়।
তাঁর বিভিন্ন আবিষ্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পাট থেকে উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগের পাটের তৈরি জুটিন নামক ঢেউটিন, পাটের তৈরি হেলমেট ও টাইলস। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদানের জন্য তিনি ২০২৪ সালে স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত হন।
আব্দুল্লাহ আল মামুন (১৯৬৬-বর্তমান)
১৯৬৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। এবং তিনি ধামরাইয়ের কুশুরা আব্বাস আলী উচ্চ বিদ্যালয় হতে মাধ্যমিক শেষ করেন এবং সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করেন। মামুন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানের ওপর বিএসসি ও এমএসসি করেন। কমনওয়েলথ স্কলারশিপ এবং ফেলোশিপ প্ল্যানের অংশ হিসেবে তিনি ইউনির্ভাসিটি অব এসটি এন্ড্রুস থেকে প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানের ওপর পিএইচডি লাভ করেন। বিজ্ঞানী মামুন চার শতাধিক গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। ইনস্টিটিউট অব ফিজিক্স (লন্ডন) ডাস্টি প্লাজমার ওপর লেখা তার পাঠ্যবই প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি পদার্থবিজ্ঞানে তাকে স্বর্ণপদক দেয়। (জুনিয়র ২০০৪, সিনিয়র ২০০৯)। এছাড়াও আরো বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *