বৃষ্টি ফোঁটার ইচ্ছে

  • আশিক মুস্তাফা

বড্ড মন খারাপ সৃষ্টির। একরোখা মেয়েটা শুনতে চায় না কারও কথা। শুনবেই বা কেন, তার ইচ্ছেরও তো দাম আছে; নাকি! বড় বৃষ্টিরা এমনই। ছোটদের কোনো কথাই শুনতে চায় না। দিতে চায় না গুরুত্ব। অথচ সে এখন কত কী ভাবতে পারে! বড়দের চেয়েও চিন্তা-ভাবনা বেশি করতে হয় তাকে। দিনমান রাজ্যের ভাবনা তার। এই সেদিনও কালবৈশাখি ঝড়ের মধ্যে তাকে ঝরে পড়তে বলা হয়েছিল। তাও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট রাজার আমবাগানে। সে ভাবে, কালবৈশাখি ঝড়ের সঙ্গে তো শিলও পড়ে। এই শিলাবৃষ্টিতে ঝরলে বাগানের আমগুলো যে নষ্ট হয়ে যাবে। তাও আবার রাজার আমবাগান বলে কথা! তার মতো করে কে এমন ভাবে। শুধু কি তাই, গেল পৌষের শেষ বিকেলেও তাকে পুরান ঢাকার র‌্যাংকিন স্ট্রিটের স্কাই ভিউ বাড়ির ছাদে ঝরে পড়তে বলেছিল। বলেই শেষ না; একেবারে ঝরিয়েই দিচ্ছিল বড়রা! অল্পের জন্য সে কোনোরকম মেঘের ভেতর মুখ লুকিয়ে থাকল। সে ওইদিন কেনবা ঝড়ে পড়বে পুরান ঢাকায়। সে তো জানে, সেদিন পুরান ঢাকার ছোট-বড় সবাই সাকরাইন উৎসব পালন করে। ছোটরা বছরজুড়ে টাকা জমিয়ে চোখদার, পানদার, বলদার, দাবাদার, লেজওয়ালা, পতঙ্গসহ কত কত নামের বাহারি ঘুড়ি কিনে উড়ায় সেদিন। র‌্যাংকিন স্ট্রিটের স্কাই ভিউ বাড়ির ছাদে মহল্লার ছোটরা সেদিন জড়ো হয়। তারা হল্লা করে উড়ায় ঘুড়ি। কে কার ঘুড়ি কত ওপরে তুলতে পারে, চলে সেই প্রতিযোগিতা। সেইসঙ্গে ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই তো আছেই। এই আনন্দের মাঝে কার ঘুড়িতে ঝরে পড়ে তার আনন্দ নষ্ট করবে সে? না, না, এ হতে পারে না। অথচ সেদিন তার সঙ্গে বেড়ে ওঠা দৃষ্টি নামের আরেক বৃষ্টি মেয়েও ঝরে পড়তে চায়নি। তাকে ঝরিয়ে দিয়েছে বড়রা। এমনই করে বড় বৃষ্টিরা। ছোটরা যেন তাদের জন্য বোঝা। ঝরিয়ে দিতে পারলেই বাঁচে। তা না হলে আষাঢ় না আসতেই তাকে কারওয়ান বাজারের আলুপট্টির ডাস্টবিনে ঝরতে বলবে কেন বড়রা? সে ছোট বৃষ্টির ফোঁটা হয়েছে বলে তাকে যেখানে-সেখানে ঝরতে হবে। তারও তো একটা ইচ্ছে থাকতে পারে! অথচ কেউ শোনে না তার সেই ইচ্ছের কথা। সেদিন কৃষ্টি খালা বলে, ‘তুই হচ্ছিস সবচেয়ে ছোট বৃষ্টির ফোঁটা। আমাদের ছোট্ট মোট্ট আদুরে মেয়ে। এত আদর দিয়ে পুষতেছি তোকে। অথচ দিন কয়েক পরেই তোকে ঝরে পড়তে হবে। এটাই বৃষ্টি ফোঁটাদের নিয়ম। মেঘের ভেতর জন্ম নেওয়া বৃষ্টি ফোঁটাদের যে-কোনো দিন যে-কোনো সময় ঝরে পড়তে হয়। কেউ ঝরে টিনের চালে, কেউ ছাদে, কেউ জলাভূমি-মাঠে।’ কিন্তু সৃষ্টি এসবের কোথাও ঝরতে চায় না। তাকে কত বুঝিয়েছে তার মা বৃষ্টি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। সে ঝরে পড়বে না এসবে। তার একটাই কথা— আমি ঝরব আমার ইচ্ছেয়। কিন্তু কী তার ইচ্ছে? এই ইচ্ছের কথা জানতে চাইলেই বলে, ‘সময় হলেই জানতে পারবে। নিজের ইচ্ছের কথা সময়ের আগে জানাতে নেই। তাতে ইচ্ছে আর ইচ্ছা থাকে না; কিচ্ছা হয়ে যায়!’ কৃষ্টি খালা বলে, ‘এমন পাকা কথা কোত্থেকে রে পাস সৃষ্টি?’ ছোট সৃষ্টি কথা বলে না। মেঘের গায়ে লেপটে থাকে। আর ছড়া কাটে—
মেঘ উড়ে যায়
মেঘ ঘুরে যায়
মেঘের রঙে দুপুর।
রং উড়ে যায়
রং ঘুরে যায়
মেঘের ভেতর উপুড়।
মেঘ রেঙে যায়
রং মেঘে খায়
আকাশ ভরা আলো
ছোট্ট আমি উড়তে পারি
ইচ্ছে মতো ঝরতে পারি
আজ কিংবা কালও!
ছড়া কাটতে কাটতে মেঘের গায়ে মাথা এলিয়ে দেয় আদুরে মেয়ে সৃষ্টি। তুলতুলে নরম মেঘ তার মাথায় বিলি কেটে দেয়। প্রশান্তি নেমে আসে তার চোখে-মুখে।

ছড়া কাটতে কাটতে মেঘের গায়ে মাথা এলিয়ে দেয় আদুরে মেয়ে সৃষ্টি। তুলতুলে নরম মেঘ তার মাথায় বিলি কেটে দেয়। প্রশান্তি নেমে আসে তার চোখে-মুখে।
তখনই ঝড় ওঠে প্রকৃতিতে। টগবগিয়ে ছুটে চলে মেঘ। শরীর ভারী হয়ে আসে সৃষ্টির। মেঘ আর তাকে ধরে রাখতে পারে না। ঠিক সন্ধ্যায় ঝরিয়ে দেয় এখলাসপুর গ্রামের শেষ বাড়িটার ওপর। ঠিক যেখানে ছোটরা ঈদের চাঁদ দেখতে জড়ো হয়েছে। ছোট বৃষ্টির ফোঁটা গিয়ে পড়ে চাঁদ দেখা দলের সবচেয়ে ছোট মেয়ে মাইসুনের নাকের ডগায়। সে একটু হকচকিয়ে উঠলেও মাথা পেছনে হেলিয়ে বৃষ্টি ফোঁটার ভেতর দিয়েই খোঁজে ঈদের বাঁকা চাঁদ। ঠিক যেন বন্দুকের নিশানার মতো। হাততালি দিয়ে বলে— ‘চাত, চাত।’ সবাই ‘চাঁদ উঠছে র‌্যা-এ-এ…’ বলে চেঁচাতে থাকে।
এদিকে নিজের কোলে থাকা ছোট্ট মাইসুনের দিকে অবাক হয়ে তাকায় তার বাবা। দেখেন, মেয়ের নাকের ডগায় জমে আছে বৃষ্টির ফোঁটা। কী আশ্চর্য, এই সন্ধ্যার আধো অন্ধকারেও যেন মুক্তো দানার মতো জ্বলজ্বল করছে বৃষ্টির ফোঁটাটা! এমন খুশি আর আনন্দ নিয়েই সে ঝরতে চেয়েছিল?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *