ভূতের নাম মিশুকিসু

  • রশিদ হারুন

মাঝরাতে অনিকের বাসার ছাদে কে যেন শিষ বাজিয়ে গান গায়। মাপাদানি করে। খিলখিলিয়ে হাসে। আবার নাকি সুরে কান্নাও করে। এই সকল কর্মকাণ্ডে অনিকের ঘুম ভেঙে যায়। ওর বোন আদিতা ওকে জেলে থাকতে দেখে অব্যক হয়। বলে, তোর হলোটা কী? এই রাত দুপুরে না ঘুমিয়ে বসে আছিস কেন?
অনিক বলে, আপি, ছাদে কে যেন গান গায়।
গান। তোর মাথাটা তো আসলেই গেছে। খালি খালি তো আর গণিতে লাড্ডু পাওনি। এখন ঘুমো, সকালে স্কুল আছে না?
গণিতে লাড্ডু পাওয়ার খোঁচাটা পেয়ে বেশ কষ্টই পেল অনিক। সে তো লাড্ডু পায়নি। আসলে তিন নম্বরের জন্য সে গণিতে এ প্লাস অর্থাৎ ৮০ পায়নি। সেজন্য বাবা-মা কিছু না বললেও আপিটা তাকে সময় অসময়ে খোঁচায়। বলে, ওর ক্লাসে থাকতে আমি গণিতে ৯৮ এর কম কখনওই পাইনি। অথচ গবেটটা সামান্য ৮০ নম্বরও পেল না। আপি ভালো ছাত্রী, ভালো স্কুলে পড়ে। তাই আপির এত অহংকার। মনে কষ্টের ভাব নিয়ে বালিশে মাথাটা লগিয়ে ভাবতে থাকে অনিক— সামনের পরীক্ষায় তাকে গণিতে ভালো করতেই হবে। এমন সময় ওকে চমকে দিয়ে আদিতা বলে, চল অনিক, আমরা ছাদটা একবার দেখে আসি— কে ছাদে গান করে। অনিক কিছুটা অবাক হলেও মনে খুশির ভাব নিয়ে লাফ দিয়ে খাট থেকে নামে। তারপর দুভাই-বোন একসাথে রওয়ানা হয় ছাদের দিকে।
ওদের ফ্ল্যাটের ওপরেই ছাদ। তিন লাফেই অনিক পৌঁছে যায়। কিন্তু আদিতা কোথায়? আশেপাশে তাকিয়ে আদিতাকে দেখতে না পেয়ে গা ছমছম করে ওঠে ওর। ভাবে এক্ষুনি দৌড়ে পালাবে। তখুনি কে যেন ওর হাত ধরে টানে। একটা ছেলে ওর বয়সিই হবে। ধবধবে সাদা পোশাক পরা। ছেলেটাকে আগে কখনও দেখেছে বলে মনে পড়ে না। ছেলেটা ওকে বলে, আমাকে চিনতে পারোনি? আমিই তো প্রতিদিন তোমাদের ছাদে উঠে গান গাই, কান্না করি, হাসি।
অবাক হয়ে অনিক বলল, তোমার নাম কী?
আমার নাম মিশুকিসু।
এ আবার কেমন নাম?
হ্যাঁ, আমাদের ভূত সমাজে আমি তো খুব মিশুক তাই আমার নাম শুরু হয়েছে মিশু দিয়ে; আর কিসু হলো আমাদের বংশীয় উপাধি। যেমন, আমার বাবার নাম লেখুকিসু কারণ আমার বাবা একজন লেখক; দাদার নাম হস্তীকিসু; কারণ আমার দাদা দেখতে হাতির মতো। অনিক অবাক হয়ে ভাবে, সে এতক্ষণ একটা ভূতের সাথে কথা বলছে কিন্তু তার একটুও ভয় করছে না। কিন্তু ভূত আবার মানুষের মতো হয় কীভাবে!
মিশুকিসু বলে, তুমি তো জানো না, ভূতেরা সব ধরনের আকৃতি হতে পারে। আমি মানুষকে বেশি পছন্দ করি তাই মানুষের সাথে মেশার জন্য মানুষের আকৃতি হয়েছি। ও ভালো কথা, তোমার নাম তো অনিক আর
তোমার বোনের নাম আদিতা, তাই না?
ঠিক তাই, কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে?
ভূতেরা মানুষের সবকিছু জানে।
সবকিছু জানে! তাহলে আমি যে পরীক্ষায় গণিতে অ+ পাইনি তাও তুমি জানো?
হ্যাঁ।
তাহলে, কীভাবে গণিতে আরো ভালো করতে পারি, তাও তুমি বলে দিতে পারবে?
পারব। একটা সূত্র আছে। সূত্রটা তোমার পড়ার টেবিলে পাবে। তবে এখন আমাকে যেতে হবে, পরে আবার আসব।
আর একটু থাকো না, অনিক মিশুকিসুর হাত ধরে ফেলে।
না, না, আমাকে ছাড়ো, ভোর হয়ে আসছে। ভোর হওয়ার আগেই আমাকে ভূত রাজ্যে ফিরতে হবে। নইলে আমার বাবা-মা রাগ করবে।
ছাড়তে চায় না। মিশুকিসু জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়; অনিক এমন সময় একটা ধাক্কা খায়, আর ঘুম ভেঙে দেখে, আদিতা তাকে ঝাঁকাচ্ছে আর বলছে, এই অনিক, কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?
অনিক বুঝতে পারে সে যা কিছু দেখেছে সবই ঘুমের মধ্যে। কিন্তু এখনও যেন মিশুকিসু ওর চোখের সামনে ভাসছে। সাদা পোশাকের ভূত ছেলেটাকে ওর কেন যে এত ভালো লেগে গেল। মনের অজান্তে ওর চোখ চলে যায় পড়ার টেবিলের দিকে। মিশুকিসু বলেছিল সূত্র টেবিলে আছে। খাট থেকে নেমে পড়ার টেবিলে খুঁজতে থাকে অনিক। কোথায় সূত্র? এমন সময় টেবিল থেকে একটা কাগজ নিচে পড়ে যায়। কাগজটা খুলে অনিক দেখে বড়দের মতো হাতের লেখায় লেখা আছে— বার বার প্র্যাকটিস করো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *