- সুরাইয়া মুমতাহানা আখতার
ছোট্ট রাওনাফ বায়না ধরেছে বাবার সাথে মেলায় যাবে। ও বাবা ও বাবা! জানো পাশের বাড়ির বুলবুলি ওর বাবার সাথে মেলায় গেছিল। মেলা থেকে একটা টিয়ে পাখি কিনে এনেছে। আমিও যাব বাবা। এভাবে বায়না করতেই লাগল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ জামাল মিয়া। খেতে খামারে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খায়। জ্যান্ত টিয়ে পাখি কেনার সামর্থ্য তার নেই। তবুও মেয়ের বায়না তিনি পূরণ করার চেষ্টা করেন। মেয়েকে নিয়ে মেলায় গেলেন। ওমা! মেলায় টিয়ে পাখি বেশ কয়েকটি আছে, কিন্তু এতো দাম! তিনি কী করে তা কিনবেন!
রাওনাফও বায়না করেই যাচ্ছে। বাবা আমার টিয়ে পাখি লাগবেই। ওতো টাকা দিয়ে টিয়ে কেনার সামর্থ্য জামাল মিয়ার নেই। তাই তিনি মেয়েকে ২০ টাকা দিয়ে মাটির টিয়ে পাখি কিনে দিলেন। মেয়ে তার কান্না কিছুতেই থামাচ্ছেন না। অনেক কষ্টে মেয়েকে বোঝালেন এই টিয়ে রাতে কথা বলে। মেয়ে শুনে ভাবল সত্যি তাই।বাড়ি এসে রাতের অপেক্ষায় থাকল। কই বাবা টিয়ে তো কথা বলে না।বলবে মা বলবে। এই বলে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। কষ্ট পেলেন মনে মনে। নিজের দরিদ্রতার জন্য আজ নিরুপায় হয়ে তাকে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে রাওনাফ ঘুমিয়ে পরল। সকালে উঠে যখন আবার কান্না শুরু করল পাখি কথা বলে না বলে, তখন তিনি উপায় না পেয়ে মেয়েকে বোঝালেন মা শোনো তুমি যখন ঘুমিয়েছিলে তখন এই টিয়ে অনেক কথা বলেছে। মেয়ে সেই আশায় রোজ রাতে জেগে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরে। টিয়ের কথা আর শোনা হয় না।
জামাল মিয়া কাজ করছিলেন একটা জমিতে। পাশেই একটা ছোটখাটো বনের মতো। সেখানে নানাপাখি নানা পাখি কিচির-মিচির করে। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন দুইটা টিয়া পাখি একটা ডালে বসে আছে । উনি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আর পাখিদের গতিবিধি লক্ষ করলেন। ওই গাছের গর্তে টিয়া পাখিদের বাসা। সেই বাসায় মনে হয় বাচ্চা আছে। কারণ পাখি দুটো একেকবার একেক জন খাবার নিয়ে আসে। জামাল মিয়ার চোখ চকচক করে উঠল আনন্দ। যেভাবেই হোক এই বাচ্চা চুরি করতেই হবে। তিনি তার মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারেন না লজ্জায়। টিয়ে পাখি আনার পর থেকে মেয়েটা ঠিকমতো খায় না ঘুমায় না। দেখে খুব কষ্ট হয়। অবুঝ শিশু তাকে এই টিয়ে পাখির বাচ্চা দিতে পারলে আর কোনো চিন্তা থাকবে না। এই ভেবে তিনি মনে মনে খুশি হলেন।
একটা নারিকেল গাছের গায়ে গর্ত করে টিয়ে পাখি বাসা বানিয়েছে। জামাল মিয়া ভালো গাছে উঠতে পারেন। তিনি খুব সহজেই গাছের গর্তে হাত দিয়ে দুটি পাখির বাচ্চার মধ্যে একটিকে নামিয়ে নিয়ে আসেন। এদিকে আশপাশের গাছ থেকে সব পাখি কিচির-মিচির শুরু করল। তিনি দৌড়ে বাড়ি এলেন পাখিটিকে নিয়ে। লুকিয়ে মাটির টিয়েটাকে হাতে নিয়ে আসল টিয়ে পাখির বাচ্চাটিকে বসিয়ে রাখলেন সেই জায়গায়। তারপর বললেন রাওনাফ, আয় মা দেখে যা, আজ তোর টিয়ে পাখি দিনের বেলায় আসল কথা বলা পাখি হয়ে গেছে। রাওনাফ ও দৌড়ে এসে দেখল সত্যি তো! ওর পাখি নড়াচড়া করছে। কী যে সুন্দর! একদম ছোট্ট। অল্প অল্প পাখাগুলো সবুজ হয়েছে। ঠোঁট লাল। খুশিতে ও লাফাতেই লাগল। এভাবেই কেটে গেল কয়েক দিন। টিয়ে পাখি আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। ওদের বাসার সামনে একটা সুপারি গাছে আরেকটি টিয়ে পাখি দেখা যায় রোজ। রাওনাফ তার টিয়া পাখিকে বন্দি করে রেখেছে। একটু একটু করে কথা বলা শিখল টিয়ে। খাঁচায় ছটফট করে টিয়েটা। বের হতে চায় কিন্তু রাওনাফ বের হতে দেয় না। ভাবে যদি উড়ে চলে যায়। টিয়ে পাখিটা মাঝে মাঝে মানুষের মতো কাঁদে আর বলে ছেড়ে দাও ছেঁড়ে দাও। সুপারি গাছের টিয়াটা খুব কিচির-মিচির করে তখন। দিন দিন কথা বাড়তেই থাকে টিয়ের। রাওনাফ টিয়ের নাম দেয় কথামালা। একদিন খাঁচাটিকে বাইরে একটা গাছের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। অমনি সুপারি গাছ থেকে নেমে আসে অন্য টিয়ে। রাওনাফ ওকে ধরতে গেলে উড়ে চলে যায়। কথামালা খাঁচার ভেতর কাঁদে আর বলে আমাকে ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও আমি মায়ের কাছে যাব। একদম মানুষের মতো কথা বলে টিয়ে কথামালা। দুইদিন থেকে কিছুই খেতে চায় না কথামালা। রাওনাফ কাছে যেতেই বলে ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও। কিন্তু রাওনাফের মন গলে না। পাখিটিকে কাছে রাখতে খুব ভালো লাগে কিন্তু খাঁচার পাখি বোঝে না সেকথা। সেই রাতে রাওনাফের খুব জ্বর আসে। রাওনাফের বাবা মেয়ের অসুখে খুব টেনশনে পড়ে যায়। জ্বর অনেক বেশি। কিছুতেই কমতে চায় না। রাওনাফের মা-বাবা সারারাত মেয়েকে পাহারা দেয় জেগে থেকে। ভোরের দিকে জামাল মিয়ার ঘুমে চোখ লেগে আসে। তিনি স্বপ্ন দেখেন তাদের টিয়ে কথামালা কাঁদছে আর বলছে আমার মা অসুস্থ এক শিকারি মাকে ধরতে এসেছিল, মা জখম হয়েছে। তাই মা আমাকে দেখতে চেয়েছে। টিয়ে পাখি কথামালা জামাল মিয়ার কাছে অনুনয়-বিনয় করে বলে, আমাকে ছেড়ে না দিলে আমার মা অভিশাপ দিবে তোমাদেরকে। আর তাতে রাওনাফের জ্বর ছাড়বে না। হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই জামাল মিয়ার বুক কেঁপে উঠল এমন স্বপ্ন দেখে। মেয়ের ঘরে
গিয়ে মেয়েকে দেখে তাড়াতাড়ি টিয়ে পাখির এর কাছে চলে গেলেন। দেখলেন তাদের টিয়ে পাখি কথামালা কিছু খায়নি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে খাঁচার ভেতর। মেয়ের কথা ভেবে তিনি আর দেরি করলেন না। তাড়াতাড়ি তাদের কথামালা, তাদের আদরের টিয়েকে ছেড়ে দিলেন খাঁচা থেকে। ছাড়তেই কথা মালা সুপারি গাছে গিয়ে অন্য টিয়ের কাছে গিয়ে বসল। আর সাথে সাথে দুই টিয়ে পাখি জামাল মিয়াকে ধন্যবাদ জানাল মানুষের মতো করে। তারপর তারা উড়ে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জামাল নেওয়া ঘরে এসে দেখলেন তার মেয়ে রাওনাফ দিব্যি উঠে বসে খেলছে। তিনি মনে মনে আল্লাহকে বললেন তিনি কখনও এমন অন্যায় করবেন না। কোনো পশু-পাখিকে বন্দি করবেন না। তিনি বুঝলেন তার অন্যায়ের জন্য তার মেয়ে অসুস্থ হয়েছিল।
বুঝলে বন্ধুরা ‘বন্যরা বনেই সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।’