- রেজাউল করিম খোকন
আমার বয়স তখন চার-পাঁচ হবে। স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি তখনও। এখনকার মতো সেই সময়ে তিন, সাড়ে তিন বছরেই স্কুলে পাঠানোর চল ছিল না। আমরা তখন থাকতাম চট্টগ্রামের শহরতলিতে শিল্পকারখানাপূর্ণ একটি এলাকায় বাসা বাড়িতে। আমরা ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমাদের বাসার পাশেই ছিল পোস্ট অফিস। ওটাও একই মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ডাকঘর হিসেবে পরিচালিত হতো। আমি এবং আমার পিঠাপিঠি ভাইটি তখন সবে বর্ণমালার বই নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছি। আমাদের সারাদিনের বেশিরভাগ সময় কাটত সেই পোস্ট অফিসে। সেখানকার সবাই আমাদের দুই ভাইকে অনেক আদর করতেন। আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের চমৎকার আন্তরিকতা ছিল। আমার বাবা ছিলেন ডাক্তার মানুষ। সময়ে-অসময়ে, অসুখ-বিসুখে তাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন তিনি। যে কারণে আমাদের সাথে বেশ হৃদ্যতা ছিল পোস্টমাস্টার সাহেব থেকে শুরু করে অন্য সবার।
আমাদের বাসার সামনে ছিল একটি রাস্তা। শিল্প এলাকার লোকজন যাতায়াত, গাড়ি চলাচল করত সেই রাস্তায়। তবে এখনকার মতো এত বেশি লোকজনের সমাগম ছিল না। কারণ, তখন লোকসংখ্যা ছিল আজকের তুলনায় অনেক কম। রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে গাড়িও চলত কম।
রাস্তার ওপারেই ছিল রেললাইন। চট্টগ্রাম শহর থেকে দোহাজারি পর্যন্ত ট্রেন চলত রেললাইন ধরে। সারা দিনে বেশ কয়েকটি ট্রেন যাতায়াত করত। কোনোটা যাত্রীবাহী, আবার কোনোটা ছিল মালগাড়ি। যেখানে বিভিন্ন ধরনের মালামাল বহন করা হতো। আমরা যখনই রেললাইন ধরে ট্রেন ছুটে আসার শব্দ কিংবা হুইসেল শুনতাম, সঙ্গে সঙ্গে বাসার সামনে বেরিয়ে আসতাম ঘর থেকে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেই ট্রেনের ছুটে চলা দেখতাম। এ কাজটিতে আমাদের কোনো বিরক্তি কিংবা একঘেয়েমি আসত না একদম। আমরা দু’ভাই চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে রেলগাড়ির ঝমাঝম শব্দ শুনতে শুনতে তার ছুটে চলা দেখতাম।
জানালা দিয়ে সেই রেলগাড়িতে বসা লোকজনের মুখ দেখা যেত। জানালার ধারে বসা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, কিশোরীদের মুখগুলো দেখতে দেখতে দ্রুত চোখের আড়াল হয়ে যেত। এক পলকে দেখা মুখগুলো কোনো কোনো সময়ে মনে গেঁথে থাকত। তখন খুব বেশি বয়স না হলেও মনের কোণে বিভিন্ন প্রশ্ন জাগত । এই মানুষগুলো কোথা থেকে আসছে, আবার কোথায় যাচ্ছে? তাদের বাড়িঘর কোথায়?
সেই সময়টাতে বাসার সামনের রেললাইন ধরে ছুটে চলা রেলগাড়িগুলো আমাদের সারা মনজুড়ে রাজত্ব করত।
আমরা বছরের বিভিন্ন সময়ে কুমিল্লায় নানাবাড়ি-দাদাবাড়িতে বেড়াতে যেতাম। সেখানে যাওয়ার বাহন ছিল যথারীতি রেলগাড়ি। আমরা চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে চড়তাম। সেটা ছিল গাড়িগুলোর সূচনা স্টেশন। মানে এখান থেকে ঢাকা, সিলেট, নোয়াখালী, চাঁদপুর, বাহাদুরবাদ ঘাট— বিভিন্ন গন্তব্যে স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যেত ট্রেনগুলো। ফলে চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চড়তে কোনো সমস্যা হতো না। প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ধারিত বগিতে ধীরে সুস্থে ব্যাগ, সুটকেস নিয়ে উঠত যাত্রীরা। আমাদের চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা ট্রেন ভ্রমণটা তেমন দীর্ঘ হতো না। সকালে চড়লে কুমিল্লা পর্যন্ত পৌঁছুতে তখন দুপুর গড়িতে যেত। রেলগাড়িতে চড়ার পর আমাদের মনটা অনেক আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে যেত। জানালার ধারে বসা নিয়ে আমাদের দু’ভাইয়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, ঝগড়া এবং অবশেষে কান্নাকাটি শুরু হতো। যার অবসান ঘটত আম্মার বকুনির মাধ্যমে।
তখনকার দিনে ট্রেনগুলো বিভিন্ন স্টেশন ধরে ধরে গন্তব্যের দিকে যেত। প্রতি স্টেশনে লোকজন নামত, আবার নতুন যাত্রী উঠত। পাশাপাশি হকারের আনাগোনা ছিল। সাথে ভিক্ষুকও থাকত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুরে সুরে গান গেয়ে ভিক্ষা চাইত। হকাররাও বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে, ছড়া কেটে তাদের বিভিন্ন জিনিসের গুণাগুণ বর্ণনা করে যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করত। তখন অন্যসব হকারের চেয়ে ট্রেনের যাত্রীদের সবার কাছে চানাচুরওয়ালার কদর বেশি দেখা যেত। তারা সব যাত্রীর চাহিদামতো চানাচুরের সাথে লবণ, মরিচ, পেঁয়াজকুঁচি. সরষের তেল মাখিয়ে টিনের কৌটায় নিয়ে তার মুখ বন্ধ করে বেশ কয়েকবার সুন্দরভাবে ঝাঁকিয়ে তারপর কাগজের ঠোঙা বানিয়ে তাতে করে পরিবেশন করত । আমার আম্মা ছিলেন সেই চানাচুরের পাঁড় ভক্ত। ট্রেনে চড়লেই তাঁর চানাচুরওয়ালার তেল, লবণ, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আদা, টমেটো কুুচি মাখানো চানাচুর খাওয়া চাই…। এমনও দেখা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত যেতে তার কয়েকবার চানাচুর খাওয়া হয়ে যেত। তখন আমরা খুব ছোট হলেও আম্মার কাছে তার কেনা চানাচুর খাওয়ার বায়না ধরতাম। এই চানাচুর তোমারা খেতে পারবে না। এটাতে কাঁচামরিচ, আদা, পেঁয়াজ দেওয়া আছে। তোমরা খেলে অনেক ঝাল লাগবে। পেট ব্যথা করবে, আম্মা বারবার বলতেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমাদের বায়না আর কান্নাকাটির চাপে পড়ে একসময় কাঁচামরিচ পেঁয়াজ আদা বেছে বেছে ফেলে দিয়ে খেতে দিতেন তিনি। আসলেই অন্যরকম স্বাদ ছিল সেই চানাচুরের। এত এত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মুখে যেন সেই চানাচুরের স্বাদ অনুভব করি। আম্মার সঙ্গে ট্রেনে যেতে যেতে চানাচুরওয়ালার কাছ থেকে কেনা চানাচুরের ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম উঠেছিলাম আমরাও।
এখনও আন্তঃনগর ট্রেনে এক শহর থেকে অন্য শহরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত উন্নত, আধুনিক, আরামদায়ক পরিবেশে যাতায়াত করতে করতে সেই সময়ে ভ্রমণকালীন অভিজ্ঞতার কথা মনে হলে সেই সব হকারের নানা ভঙ্গিতে বিচিত্র সুরে যাত্রীদের আকর্ষণের চেষ্টা, উৎপাত এবং চানাচুর খাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। তখনকার দিনে গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘসময় ধরে গাদাগাদি করে বসে থাকাটা অনেক সময় অসহ্য মনে হতো। জানালা দিয়ে আসা বাইরের বাতাসের ঠান্ডা গরম স্পর্শ শরীরে অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে দিত। তা না হলে ভ্যাপসা গরমে সেদ্ধ হতে হতে পুরো পথ পাড়ি দিতে হতো।
যেহেতু আমাদের নামতে হতো কুমিল্লা রেলস্টেশনে, পথের মধ্যে হওয়ায় সেখানে স্টপেজ সময়টা খুব বেশি হতো না। তাড়াহুড়ো করে সেই কম সময়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে নামতে হতো ট্রেন থেকে। অনেক সময়ে দরজায় ভিড় ভাট্টা বেশি থাকায় জানালা দিয়ে আমাদের ছোটদের নামানো হতো। স্টেশনে আমাদের নিতে কেউ না কেউ থাকতেন। তারাই ট্রেনের জানালা দিয়ে আমাদের নামিয়ে আনতেন ট্রেন থেকে। রীতিমতো একটা যুদ্ধ চলত ব্যাগ সুটকেস নিয়ে কুমিল্লা স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে। একই অবস্থা হতো আবার সেখান থেকে ট্রেনে চড়তে গিয়ে। তখনও আমাদের ছোটদের জানালা দিয়ে ট্রেনের মধ্যে তোলা হতো অনেক দ্রুত, অল্প সময়ের মধ্যে।
পথিমধ্যে স্টেশন হওয়ায় কুমিল্লায় ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে এবং একইভাবে ওঠার সময়ও এ সমস্যা মুখোমুখি হতে হতো সবার। নির্ধারিত স্টপেজ সময়ের মধ্যে এই ওঠানামার কাজটা করতে হতো। ঠিকঠাকভাবে সময়ের মধ্যে উঠতে কিংবা নামতে না পারলেও ট্রেন ঠিকই ছেড়ে দিত। যে কারণে বেশ একটা হুড়োহুড়ি লেগে যেত যাত্রীদের মধ্যে। তবে এখন সেই সমস্যাটি বোধ হয় আর নেই। কারণ, এখন ট্রেনের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। যাত্রীরা নির্ধারিত বগির নির্ধারিত সিটে বসে ভ্রমণ করেন। নিজের স্টেশন এলে ট্রেন থেকে নামার এবং সেখান থেকে নতুন যাত্রীদের ওঠার যথেষ্ট সময়ও পান। আগের মতো হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি করতে হয় না। ধীরেসুস্থে, নির্বিঘ্নে ওঠানামা করতে পারেন।
মজার ব্যাপার হলো, চট্টগ্রামে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে রেলগাড়ি চলত তেমনিভাবে কুমিল্লায় আমার নানাবাড়ি ছিল রেলস্টেশনের খুব কাছেই। নানাবাড়িতে ঘরের জানালা দিয়ে সারাদিন কত ট্রেনের ছুটোছুটি দেখতাম অনেক সময় আমার ছোট মামা রেলস্টেশনে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। কুমিল্লা রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা রেললাইনে ছুটে চলা ট্রেনগুলো দেখতাম। ট্রেনের যাত্রীদের ওঠানামা দেখতাম।
বর্ষার দিনে দাদা বাড়িতে যেতে হলে নৌকায় যাওয়া লাগত। পায়ে হেঁটে যাওয়া লাগত অন্য সময়ে। তখনও গ্রামের রাস্তাঘাট হয়নি বললে চলে। বর্ষার দিনে সবকিছুই পানির নিচে তলিয়ে যেত। তবে স্বাভাবিক সময়ে খেতের আল ধরে হেঁটে যেতে হতো। ওটাই ছিল লোকজনের চলাচলের রাস্তা। বর্ষার দিনে যেহেতু হেঁটে যাওয়ার উপায় ছিল না। তখন নৌকাই ছিল একমাত্র বাহন, ট্রেন থেকে নেমেই স্টেশনের কাছে ঘাটে আমাদের জন্য নৌকা রেডি হয়ে আছে দেখতাম আমরা। সেই নৌকায় চড়ে বসতেই মাঝি দাঁড় বাওয়া শুরু করত। এখনকার মতো মোটর বা ইঞ্জিন লাগানো নৌকা ছিল না তখন।
আমার নানা ছিলেন আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তখন ব্রিটিশ শাসন। তিনি পরিবার নিয়ে মানে আমার নানি, আম্মা-খালা-মামাদের সবাইকে নিয়ে আসামের হাফলঙ থাকতেন। কুমিল্লা থেকে সেখানে যাওয়ার ট্রেন ভ্রমণের স্মৃতিগল্প কত শুনেছি আম্মা এবং নানির মুখে। কুমিল্লা থেকে ট্রেনে করে আসামের হাফলঙ পর্যন্ত যেতে নাকি তখন বেশ কয়েকদিন লেগে যেত। তারা সবাই একটানা দীর্ঘ সময়ের ট্রেন ভ্রমণের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে গাড়িতে চড়তেন। দুই-তিন দিনের খাবার-দাবার রান্না করে সঙ্গে নিতেন। যাতে পথে খাওয়া-দাওয়ার কষ্টে না পড়তে হয় সেজন্যই এ ব্যবস্থা। সেখান থেকে আবার কুমিল্লায় ফেরার সময়েও একই ব্যবস্থা চলত। আমরা সুযোগ পেলে ভাই-বোনেরা আম্মা এবং নানির কাছে তাদের আসাম যাওয়ার ট্রেন ভ্রমণের নানা গল্প শুনতে চাইতাম। বেশ মজা লাগত তাদের সেই সময়ের রেল ভ্রমণের অভিজ্ঞতার গল্প শুনতে।
রেলগাড়িতে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতে আমার সব সময় ভালো লাগত। তবে ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সব সময় মধুর কিংবা আনন্দময় ছিল বলা যাবে না। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হতে বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল। কারণ, পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের পূর্বমুহূর্তে বিভিন্ন রেল সেতু ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করে গিয়েছিল। এর মধ্যে ভৈরব সেতুর মতো বড় সেতুসহ আরও বেশ কিছু ছোট ছোট সেতু ছিল। ছোট ছোট সেতুগুলো অল্পদিনেই মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হলেও ভৈরব সেতুটির ক্ষতির পরিমাণ ছিল খুব বেশি। যা মেরামত করতে দীর্ঘ সময় লাগছিল। কিন্তু ততদিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল, ভেঙে ভেঙে ট্রেন চলত। ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে ট্রেন ভৈরব রেল সেতুর এক প্রান্ত আশুগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার পর যাত্রীরা ফেরিতে করে নদী পার হয়ে ওপারে ভৈরব পর্যন্ত যেত। ভৈরব রেলস্টেশনে চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি ট্রেন অপেক্ষমাণ থাকত। ফেরি থেকে নেমে যাত্রীরা সেই ট্রেনে চড়ে বসতেন। এভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেন যোগাযোগ চলছিল।
তখন আমরা ঢাকায় মামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম আম্মাসহ ভাই-বোন সবাই। ঢাকা থেকে ফেরার সময় ফেরিতে করে নদী পার হয়ে ভৈরব স্টেশনে চট্টগ্রাম অভিমুখী ট্রেনে চড়ে বসেছিলাম। আমার বয়স তখন ১০-১১ হবে। ছোটবেলায় শারীরিকভাবে অনেকটা দুর্বল ও ক্ষীণ স্বাস্থ্যের ছিলাম। আশুগঞ্জ ট্রেন থেকে নেমে কিছুটা পথ হেঁটে আমাদের ফেরি ধরতে হয়েছিল। আবার ভৈরব প্রান্তে পৌঁছার পর ফেরি থেকে নেমেও বেশ কিছুটা পথ হাঁটতে হতো। এতটা ধকল সইতে না পেরে ভৈরব স্টেশনে দাঁড়ানো ট্রেনের বগিতে বসার পর আমি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। আমাকে নিয়ে তখন আম্মা বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমাকে নিয়ে তার উৎকণ্ঠা দুশ্চিন্তা চলছিল। জানালার পাশে বসা আম্মা তখন নিজের কথা ভাবছিলেন না। আমার কেমন লাগছে, শরীরের অস্বস্তি কমছে কি না ইত্যাদি জানতে চাইছিলেন। তখন ভৈরব রেলস্টেশনের কুখ্যাতি ছিল ট্রেনের জানালার ধারে বসা যাত্রীদের কানের দুল, গলার চেনই, হাতঘড়ি, ব্যাগ হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। আম্মা অবশ্য ব্যাপারটি জানতেন। অন্যান্য সময় সতর্ক থাকলেও সেদিন তাঁর সন্তানের হঠাৎ অসুস্থতায় সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন। আমাকে নিয়ে তাঁর উৎকণ্ঠা, ব্যস্ততার ব্যাপারটি হয়তো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফরমে সুযোগের সন্ধানে থাকা ছিনতাইকারীর নজর এড়ায়নি। সে দ্রুত সুযোগ নিতে মোটেও দেরি করেনি সেদিন। চোখের পলকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে আম্মার একটি কানের দুল ছিনতাই করেছিল। কানের দুল এক হ্যাঁচকা টানে ছিনতাই করতে গিয়ে আম্মার কানের লতি ছিঁড়ে ফেলার অবস্থা হয়েছিল। আম্মা ব্যথায় চিৎকার করে উঠতেই ট্রেনের বগিতে থাকা অন্যান্য যাত্রীরা সচকিত হয়েছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ট্রেন থেকে নেমে ঐ সময়ে ছিনতাইকারীর পিছু ধাওয়া করার উপায় ছিল না আর। ততক্ষণে আম্মার কান রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল।
তখনকার দিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনে যে কয়টি জনপ্রিয় ট্রেন ছিল তার মধ্যে গ্রীণ অ্যারো, বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস প্রভৃতির কথা বলা যায়। পরবর্তী সময়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং দ্রুতগামী ট্রেন হিসেবে এসেছিল উল্কা। আমাদের ট্রেনে ভ্রমণের মাধ্যম ছিল প্রধানত এই ট্রেনগুলো। আমার জ্ঞান হওয়ার পরও অনেকদিন কালো কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেন চলতে দেখেছি। কুঁ-কুঁ-উ, ঝিক-ঝিক ঝিক শব্দে ছুটে যেত কালো কয়লার ইঞ্জিনের ট্রেনগুলো।
বড় হয়ে যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়তে ভর্তি হলাম, তখন চট্টগ্রাম শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত ক্যাম্পাসে যাওয়া আসার বাহন ছিল শাটল ট্রেন। শহরের বটতলী চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ট্রেনটি সকালে ছেড়ে যেত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। আমি ট্রেনে চড়তাম শহরের ষোলশহর স্টেশন থেকে। পথিমধ্যে হওয়ায় ষোলশহর স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়াটা ছিল অনেক কষ্টের। বলা যায়, দুঃসাধ্যের। রীতিমতো যুদ্ধ করে চড়তে হতো ট্রেনে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে বসত। এতটা দুঃসাহসী হয়ে উঠতে না পারায়, আমি তখন ছাদে চড়ে ট্রেন ভ্রমণের কথা ভাবতে পারিনি। আমরা প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়ার জন্য ট্রেনের অপেক্ষায় থাকলেও আগের স্টপেজ থেকেই ট্রেনের সবকটি বগি পরিপূর্ণ হয়ে আসত। আমাদের কোনোভাবেই ভেতরে ঢোকার কিংবা সিটে বসে যাওয়ার উপায় ছিল না। কতদিন কোনোভাবে পা-দানিতে পা রেখে দুহাতে ট্রেনের হ্যান্ডেলে ঝুলে ঝুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে গেছি তার হিসাব নেই। আবার অনেক সময় পা-দানি এবং দরজায় বসে পা ঝুলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে— তার কথা মনে হলে এখন অবাক লাগে। এমনও দিন গেছে দুই বগির মাঝখানের জয়েন্টে (তখনকার ট্রেনের বগিগুলো ছিল পৃথক পৃথক, এখনকার মতো এক বগি থেকে অন্য বগিতে যাওয়া আসার কোনো পথ ছিল না) কোনোভাবে শক্ত করে ধরে বসে ভয়ে আতঙ্কে বিশ্ববিদ্যালয় গেছি মহান সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে। ভিড়ের কারণে চড়তে না পারলে বিকল্প উপায় হিসেবে হাটহাজারী, নাজিরহাট, রাঙামাটি লাইনের বাসে করে যেতে হতো। সেটা আমার একদম ভালো লাগত না। আমি সবসময় ট্রেনে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে পছন্দ করতাম। অনেক ভিড়, অনেক কষ্ট, অনেক বিড়ম্বনা হলেও শাটল ট্রেনে চড়ার পর সেটা দরজার হ্যান্ডেল ধরে ঝুলেই হোক কিংবা দরজার পা-দানিতে পা রেখে বসে হোক সবকিছু ভুলে যেতাম সব ছাত্র-ছাত্রীর হইচই, উচ্ছ্বাস, গান, হাসি-কৌতুক, মজার মজার সব নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যে। চট্টগ্রাম শহর থেকে যে লাইন ধরে যে শাটল ট্রেনটি করে বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া-আসা করত তা ছিল নাজির হাট পর্যন্ত। ঐ লাইনে সাধারণ যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেনও চলাচল করত। ঐ রেললাইন ছিল বেশ নড়বড়ে, স্লিপার ছিল না বললেই চলে। আমাদের ট্রেন হেলেদুলে চলত। নতুন কেউ চড়লে হঠাৎ ট্রেনের এমন দুলুনি দেখে ভয়ে, আতঙ্কে চিৎকার করে উঠত। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ঐ লাইন দিয়ে রেলগাড়ি চলত। একবার আমরা সকালে শহরের ষোলশহর ছেড়ে শাটল ট্রেনে করে বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছি। কিছুদূর চলার পর হঠাৎ মনে হলো, হেলেদুলে চলতে থাকা আমাদের ট্রেনটি যেন একদিকে হেলে পড়ে যাচ্ছে। ভয়ে, আতঙ্কে আমরা চিৎকার শুরু করলাম। আমি বুঝে নিয়েছিলাম, ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে যাচ্ছে এক পাশে। কী করব, না কী করব— ভেবে পাচ্ছিলাম না। সারা শরীরের রক্ত চলাচল থেমে গিয়েছিল। কেউ কেউ ভয়ে আতঙ্কে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ট্রেন থেকে লাফও দিয়েছিল। যে যাত্রায় ট্রেনটির কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হলেও একেবারে পড়ে যায়নি। আমরা সেদিন বড় একটি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। সেই ঘটনায় যারা প্রাণ বাঁচাতে ট্রেন থেকে লাফ দিয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ আহত হয়েছিল। এর মধ্যে আমার সহপাঠী এক বান্ধবী লাফ দিয়ে পড়ে পা ভেঙে ফেলেছিল। তাকে বেশ কিছুদিন ভাঙা পা নিয়ে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল।
এখন বাংলাদেশ রেল যোগাযোগে যুগান্তকারী নতুন নতুন অধ্যায় সংযুক্ত হচ্ছে। এক সময়ে যে পথে ট্রেন চলত না সেই পথে ঝকঝকে নতুন ট্রেন ছুটছে যাত্রী নিয়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সহজ ও সাবলীল হয়েছে। সেই পদ্মা সেতু দিয়ে একসঙ্গে বাস, ট্রাক, কারসহ বিভিন্ন যানবাহন যেমন চলাচল করছে একইভাবে রেললাইন দিয়ে ট্রেনও ছুটে চলেছে। এখনও পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেনে চড়ে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তবে আমার ভীষণ ইচ্ছে ট্রেনে চড়ে পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে ফরিদপুর, খুলনা, কুষ্টিয়া বেড়াতে যাব। এখনও বাংলাদেশের কত কিছুই তো দেখা হয়নি। ওদিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল ট্রেনে চড়ে সৈকত নগরী কক্সবাজারে যাওয়ার। পর্যটকদের সেই স্বপ্ন, সাধ শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়েছে। এতদিন দোহাজারি পর্যন্ত কিছু লোকাল ট্রেন চলাচল করত। তবে এখন দোহাজারি ছাড়িয়ে সৈকত শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপলাভ করেছে। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনন্য রূপ-লাবণ্য উপভোগ করতে করতে আধুনিক ট্রেনে চড়ে লোকজন কক্সবাজার যাচ্ছেন। ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার যেতে আর এখন কিছু বিলাসবহুল বাস সার্ভিসের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে না পর্যটকদের। এ পথে ট্রেন ভ্রমণ উপভোগের ভিন্ন মাত্রা নিয়ে এসেছে। এটাও আমাদের জন্য পরম এক প্রাপ্তি।
ঢাকা শহরে আমার বাসা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছাকাছি। প্রতিদিনই বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ হঠাৎ ট্রেন ইঞ্জিনের হুইসেল বেজে ওঠার শব্দ শুনে মনটা উদাস হয়ে যায়। সেই ছেলেবেলায় বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা নানাবাড়ির জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে রেলগাড়ি ছুটে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে কোথায় হারিয়ে যাওয়া সময়গুলোর কথা মনে পড়ে যায়। আজকাল অবসর জীবনে বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে যেতে হয় সকাল কিংবা বিকেলে। হাঁটতে হাঁটতে বাসা থেকে কিছুটা পথ পেরোলেই খিলগাঁও রেলগেটে চলে যাই। সেখানে গেলেই চোখে পড়ে হুইসেল বাজিয়ে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে দ্রুত ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটে যাওয়া হরেক রকম ট্রেন। কোনোটির বগির রং সবুজ, কোনোটির রং নীল আবার কোনোটির রুপালি সাদা। আবার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই পথে কত ট্রেন কমলাপুর স্টেশনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। যাত্রীরা তখন গন্তব্যে পৌঁছে ট্রেন থেকে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তারা তাদের ব্যাগ-সুটকেস, বাক্সপ্যাটরা গোছাতে সচেষ্ট।
আমি হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে পড়ি। আশপাশের সবকিছু ভুলে ঠায় দাঁড়িয়ে সেই সব ট্রেনের ছুটে যাওয়া মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকি। আমি তখন সেই পাঁচ-ছয় কিংবা দশ-বারো বছরের বালকটির মতো হয়ে যাই। যে একসময় রেললাইন ধরে ছুটে চলা ট্রেনগুলো এভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখত…
আমি তখন ভুলে যাই আমার বয়স হয়েছে। এভাবে সেই বালকটির মতো অবাক বিস্ময়ে ঘোরের মধ্যে রেলগাড়ির ছুটে চলার দৃশ্য দেখাটা আমাকে আর মানায় না—।