- মুশফিকুর রহমান
স্কুলে যাওয়ার মন উঠে গেছে অনেকদিন আগেই। তারপরও স্কুলে যেতে হয়। অঙ্ক স্যার খুব কড়া। দেখতে বেশ মোটাসোটা, চুল নেই। যেটুকু আছে সেটুকু চুলও সাদা হয়ে গেছে। স্যার একটি সহজ অঙ্ককে এত পেঁচিয়ে ফেলেন যে, অঙ্ক দেখলেই মাথা চক্কর দেয়। তিনি ক্লাসে যে নিয়মে অঙ্ক করে দিবেন, সে নিয়মে অঙ্ক না করলে শূন্য দেন। শুধু তাই নয়, বেত দিয়ে মারেন। কোনোকিছু ছাড়লেও, বেত সাথে নিতে ভোলেন না। সবসময় বেত স্যারের হাতেই থাকে। স্যারের বেতের মার খেলে সে আর ২-৩ দিন স্কুলে আসে না। মানে আসতে পারে না। জ্বর আসে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
কিছুদিন আগের একটা পরীক্ষায় অনেকেই স্যারের নিয়মে অঙ্ক না করায় ফেল করেছে। স্যারের নিয়মে অঙ্ক না করায় আমিও ফেল করেছি। গতকাল অঙ্ক স্যারের বেতের মার খেয়ে, আজ অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্কুলে আসেনি। তারা হয়তো এখন উঠতেই পারছে না। তবে স্যারের বেতের মার খেলেও, আগে থেকেই কাপড়ের নিচে খাতা দেওয়ায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছি।
আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয় রতন। সেও এবার অঙ্কে ফেল করেছে। নিশ্চয় স্যারের নিয়মে অঙ্ক না করায় স্যার ফেল করিয়ে দিয়েছেন।
‘অঙ্কে ফেল করায় মা খেলতেও যেতে দিচ্ছেন না। এখন অঙ্ক মুখস্থ করিয়ে নেয়।’ রতনের কথাটি শুনে ক্লাসের সবাই হাসাহাসি শুরু করল।
নাহ্, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। কিছু একটা করতে হবে।—বললাম আমি।
‘কি করবি? প্রিন্সিপাল স্যারকে জানাবি?’ রতন জিজ্ঞেস করল।
‘নাহ্। স্যারের নিয়মে অঙ্ক না করে অন্য নিয়মে অঙ্ক করলে যদি শূন্য দেন, তাহলে সবাই অঙ্ক মুখস্থ করতে থাকবে। এটা এক ধরনের নকল। একসময় সৃজনশীলতা বলতে আর কিছু থাকবে না।’
কিছুদিন আগে শুনেছিলাম অঙ্ক স্যারের বাগানটিতে নাকি ভূত থাকে। আর স্যার ভূতকে খুব ভয় পায়। রতনকে আমার পরিকল্পনা জানালাম এবং রাতে দেড়টায় স্যারের বাগানে দেখা করার জন্য বললাম। প্রথমে অসম্মতি জানালেও পরে সে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়।
এই পোশাক পর তাড়াতাড়ি! রতনকে বললাম।
এখন রাত দেড়টা। আমি আর রতন, স্যারের বাড়ির পাশের বাগানে এসেছি। বিকেলে জগলু মামার দোকানে গিয়ে দুটো মুখোশ আর কালো পোশাক নিয়েছি। এই মুখোশ আর পোশাক সার্কাসে ব্যবহার করা হয়। মুখোশ পরে বোঝাই যাচ্ছে না, আমরা মানুষ। নিজেদের মুখ দেখে নিজেদেরই ভয় লাগছিল।
তারপর রতনকে বুঝে দিলাম কী করতে হবে। আমার কথামতো রতন কাঁঠাল গাছের পাশে লুকালো। আমি আমগাছে উঠলাম। আমি গাছে উঠে স্যারের জানালায় একটি ঢিল ছুড়লাম। স্যার চোর এসেছে ভেবে দৌড়ে এলো বাগানে। তখন আমি শব্দ করে হাসতে শুরু করলাম।
‘আমগাছটায় কে?’ ভয় পেয়ে স্যার বলল।
‘আমি তোদের স্কুলের ভূত। অনেকদিন ধরে দেখছি নিজের নিয়মে অঙ্ক না করলে শূন্য দিচ্ছিস। সেজন্য ছাত্র-ছাত্রীরা অঙ্ক মুখস্থ করতে শুরু করেছে। অনেক অত্যাচার করেছিস ওদের ওপর।’
নাক চেপে বিকৃত কণ্ঠে কথা বলছি। খুব উঁচুতে থাকায় স্যার আমাকে দেখতে পারেননি। তখনও স্যারের চোখে ঘুম কাটেনি। তাই কিছু বুঝে উঠতে পারেনি।
‘আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করব। তুই বাধা দেওয়ার কে? বিশ বছর ধরে আমি অঙ্ক পড়াই’ রেগে গিয়ে স্যার বললেন।
আমি চুপ হয়ে গেলাম। এমন সময় রতন পা টিপে টিপে এসে পেছন দিক থেকে স্যারের কাঁধে হাত দেয়। স্যার পেছনে ঘুরে রতনের মুখে টর্চ ধরার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আমরা তাড়াতাড়ি বাগান থেকে পালিয়ে যাই।
পরেরদিন ক্লাসে ঢুকতেই রতন বলল ‘জানিস? আমাদের অঙ্কের নতুন স্যার এসেছে।’
‘স্যার পালিয়ে গেছেন? হা হা হা!’
নতুন অঙ্ক স্যার খুব ভালো অঙ্ক বুঝিয়ে দেন। স্যার সবসময় বলেন ‘অঙ্ক কখনও মুখস্থ করবি না। বুঝে বুঝে করবি।’