লোকটাকে কেউ কেউ বলেন মোল্লা সাহেব। কেউ কেউ ডাকেন হোজ্জা। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন মোল্লা নাসিরুদ্দীন হোজ্জা। মোল্লা নাসিরুদ্দীন হোজ্জাকে লা হয় লোকসাহিত্যের প্রাণপুরুষ। আমাদের দেশে বহুল পরিচিত মজার এক চরিত্র।
একদিকে ইরান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান আর আফগানিস্তানের মানুষেরাও দাবি করেন, হোজ্জা তাদেরই দেশের লোক। চীনা লোককথায় তাঁর নামই হলো আফেন্দি নাসিরুদ্দীন। গ্রিসদেশের খ্যাতিমান ঈশপের সঙ্গে চীনা লোককথার মধ্যমণি আফেন্দি নাসিরুদ্দীনের অপূর্ব মিল রয়েছে। চীনদেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ঝিংঝিয়াং মুসলমান সংখ্যালঘু এলাকা। মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কালজয়ী সাহসী প্রতীক আফেন্দি নাসিরুদ্দীন। তাঁর অসাধারণ মজাদার ব্যাঙ্গাত্মক গল্পের প্রাধান্য চীনের সর্বত্র। বিভিন্ন দেশ হোজ্জাকে তাদের লোক দাবি করলেও শুধু তুরস্কেও আকসেইর শহরেই প্রতি বছর জুলাইয়ের ৫-১০ তারিখ পর্যন্ত ‘আন্তর্জাতিক নাসিরুদ্দীন হোজ্জা উৎসব’ পালন করা হয়ে থাকে। আকসেইর শহরে তাঁর কবরটি আজও বর্তমান।
নাসিরুদ্দীন হোজ্জা ছিলেন একজন দার্শনিক, জ্ঞানী, হাস্যরসের বুদ্ধিসম্পন্ন বুদ্ধিমান ব্যক্তি। তাঁর গল্প বিশ্বের প্রায় সর্বত্র বলা হয়েছে। নাসিরুদ্দীন হোজ্জা যিনি মোল্লা নাসিরুদ্দীন হোজ্জা নামেও পরিচিত (১২০৮-১২৮৫) ছিলেন একজন মধ্য এশিয়ার হাস্যরসাত্মক নায়ক। গল্প এবং ব্যঙ্গাত্মক উপাখ্যানের প্রধান চরিত্র। তিনি জন্মেছিলেন ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, তুরস্কের অন্তর্গত খোর্তা গ্রামে। তার সমাধি তুরস্কের আকসেহির শহরে।
নাসিরুদ্দীন হোজ্জা ছিলেন সুকবি এবং ইসলাম ধর্মে তাঁর পাণ্ডিত্যের জন্য ইমাম পদে নিযুক্ত হন তিনি। কিন্তু সমাজের অসংগতি ও আতিশয্য সহ্য করতে না পেরে জন্মভূমি ত্যাগ করে তিনি ইরানে চলে যান। ইরানের বাদশাহ তাঁর প্রতিভা ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে তাঁকে তাঁর দরবারে বরণ করে নেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত হাস্যরসিকতার চমৎকারিত্বে বাদশাহকে মুগ্ধ করে ক্রমে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন নাসিরুদ্দীন। ধারণা করা হয় বাদশাহ আকবরের রাজত্বকালে ইরান থেকে আসা জ্ঞানীগুণী লোকেদের মাধ্যমে নাসিরুদ্দীনের হাস্যরাত্মক গল্পগুলো উত্তর ভারতে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।
মোল্লা নাসিরুদ্দীনের হাস্যরসাত্মক গল্পগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো তীক্ষ্ম বুদ্ধিদীপ্ত এক গভীরার্থক দ্যোতনাগুণ। তাঁর প্রতিটি উক্তির মধ্যে রয়েছে শানিত বিদ্রুপের এক কটাক্ষ যার দ্বারা তিনি মানবজীবনের এক একটি চরম নির্বুদ্ধিতা ও সমাজজীবনের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলোকে প্রকটিত করে তুলতেন। বাদশাহর দরবারে কোনো এক অমাবস্যার রাতে পূর্ণিমার চাঁদ কোথায় তা মোল্লাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, পূর্ণিমার চাঁদকে এক এক ফালি করে আকাশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
হোজ্জা মানুষটা দেখতে ছিল ছোটখাটো আকৃতির, যাকে বেঁটে বলা যায়। মাথায় পরতেন পাগড়ি আর গায়ে চড়াতেন জোব্বা। সার্বক্ষণিক সঙ্গী থাকত একটা গাধা। হোজ্জাকে নিয়ে হাজারেরও বেশি গল্প চালু রয়েছে। কোনো কোনো গল্পে মনে হয় তিনি খুব বুদ্ধিমান একজন মানুষ। আবার কারো কারো মতে, কোনো কোনো গল্পে তার আচরণ একেবারেই বোকার মতো মনে হয়। তবে, এটা নিশ্চিত তার গল্পগুলোতে বুদ্ধিদীপ্ত ও মানবিক গুণাবলির উপাদানগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
সমাজের উচ্চ পর্যায়ের মিথ্যা অহংকার, লোভ, লালসা, ভোগ-দখল, ক্ষোভ, অন্যায়-অবিচার, অনাচার অর্থাৎ সমাজের রন্ধ্রে বন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতি অকপট হাস্যরসের আবরণে এঁকেছেন অনবদ্য ভাষায়, সাধারণ মানুষের বন্ধু আফেন্দি নাসিরুদ্দীন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যতসব অনিয়ম, অসংগতি।
এসব গল্প প্রায় হাজার বছর আগের অথচ এসব গল্পের পটভূমি সমাজে এখনও বিদ্যমান। আমরা যুগের পর যুগ পেরিয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করছি। কিন্তু আফেন্দি নাসিরুদ্দীনের অকপটে বলা গল্পের চৌহদ্দি যেন এখনও পার হতে পারিনি। হাজার বছরের অসংগতি নিয়েই যেন চলছে সমাজের ভাঙাগড়া। কিন্তু এমনটা কেন হয়ে চলেছে? আফেন্দি নাসিরুদ্দীন বর্ণিত সেই লোকগাথা কি শুধু চীনদেশেই সীমাবদ্ধ? না, সমগ্র বিশ্বজুড়েই যেই সেই অসংগতির লুকোচুরির খেলা। আর সেই লুকোচুরি খেলার বলি সমাজের সাধারণ মানুষ।
প্রখ্যাত রসজ্ঞ পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪) বাংলা সাহিত্যে প্রথম নাসিরুদ্দীন হোজ্জাকে পরিচিত করেন। আফগানিস্তান ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশেও নাসিরুদ্দীনের গল্পের খ্যাতি রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী (১৯১০-১৯৭৫)-র বই ‘ভিনদেশী এক বীরবল’-এ মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প বলেছেন এবং তাঁকে বাঙালি পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করেছেন। সত্যজিৎ রায় (১৯২১-১৯৯২)-র ‘মোল্লা নাসীরুদ্দীনের গল্প’ (মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প) অধিক জনপ্রিয় করে তোলেন। মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প শুধু শিশুদের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছেও দারুণ জনপ্রিয়।
সম্প্রতি তুরস্কের দুটি জিনিসের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে চা, অন্যটি নাসিরুদ্দীন হোজ্জার গল্প। ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই দুটি ঐতিহ্য বহনকারী শিল্প-সাহিত্য।
গত ২৮ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে মরক্কোর রাবাতে বসে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণের জন্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় কমিটির ১৭তম অধিবেশন। সেখানে তুরস্কের এ দুটি সাংস্কৃতিক উপাদান মনোনীত হয়।
চা হলো তুরস্কের পরিচয়, আতিথেয়তা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার প্রতীক। অন্যদিকে, নাসিরুদ্দীন হোজ্জা তুর্কি লোককাহিনিতে অনন্য স্থান ধারণ করে আছেন।
নাসিরুদ্দীন হোজ্জা তথা মোল্লা নাসিরুদ্দীনের নাম অনেকেরই জানা। মধ্যযুগে ত্রয়োদশ শতকে সেলজুক শাসনামলে ইরানের বৃহত্তর খোরাসানে তিনি বসবাস করতেন। মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশও নারিুদ্দীনকে তাদের দেশের বলে দাবি করে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরান, তুরস্ক এবং উজবেকিস্তান। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তার নাম বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়। সাধারণত অধিকাংশ সংস্কৃতিতে ‘হোজ্জা’ এবং ‘মোল্লা’ নামে পরিচিত তিনি। তার হাস্যরসাত্মক গল্প ও উক্তিগুলো তাঁকে বিখ্যাত করে রেখেছে আজও অব্দি।
জানা যায়, নাসিরুদ্দীন হোজ্জার সাহিত্যকর্ম মনোনয়নের জন্য আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানও আবেদন করে।