- আশরাফুন্নেছা দুলু
একটি দোতলা বাড়ি। দোতলার বারান্দাটা বেশসুন্দর। সবুজ রং করা গ্রিল দিয়ে ঘেরা বারান্দার একপাশে উঠে এসেছে একটি মাধবীলতার ফুলের বাহারি গাছ। বারান্দার একপাশে একটি বাঁশের ফুলের ঝুড়ি টানানো থাকে। মাঝে মাঝে টুনিটুনি পাখি, কখনও বা চড়ুই দম্পতি এসে কিছুদিন থাকে, আবার চলে যায়।
সেই বাড়িতে বাস করত এক বুড়ো আর বুড়ি। তাদের ছেলেপুলেরা কেউ তাদের কাছে থাকে না। তবে গরমের ছুটিতে স্কুল বন্ধ থাকে যখন, তখন তাদের পোতা মানে ছেলের ছেলেরা, মেয়েরা দাদা-দাদির বাড়ি বেড়াতে আসত। তখন বুড়াবুড়ি আর নাতি পোতাদের খুব আনন্দে দিন কাটত। অনেকদিন হলো তারাও কেউ আর আসে না।
একদিন বুড়ি, বুড়াকে বলল? ঘরের মধ্যে থাকতে আর ভালো লাগছে না। কতদিন হলো বাচ্চাগুলোকে দেখি না। চলো না গো। একটু তাদের কাছে বেরিয়ে আসি কটা দিন।
অনেক কষ্টে দাদাকে রাজি করিয়ে দাদি চলল— ঢাকায়। ঢাকায় গিয়ে পোতাকে পেয়ে দাদা-দাদি তো খুব খুশি। আর দাদা-দাদিকে পেয়ে পোতাও খুব খুশি হলো।
এতদিন দুইদিন করে একমাস সাতদিন কেটে গেল ফেরার কথা বললেই তাদের পোতা রাগ হয়, কান্নাকাটি করে, খাবার খায় না। এ অবস্থায় আদরের পোতাকে ফেলে দাদা-দাদি আসবেন কী করে?
এমনি করে যাই যাই করে, কেটে গেল আরো কটা মাস।
এদিকে হয়েছে কি জানো?
খালি বারান্দার খালি বাঁশের ঝুড়িটা দেখে এক দোয়েল দম্পতি খুব খুশি হলো। সারাদিন তারা বাইরে ঘুরে বেড়ায়, আনন্দ করে, এ গাছ থেকে ও গাছে নেচে বেড়ায় কিন্তু সন্ধ্যা হলেই নীরবে এসে এই বাঁশের ঝুড়িতে আশ্রয় নেয়। ওদেরকেই বিরক্ত করেন। ওরা বেশ আরামেই শান্তিতে থাকতে লাগল।
একদিন দোয়েল দোয়েলীকে বলল— দোয়েল এবার যে কিছু খড়কুটো, জোগাড় করে আনতে হয়! আমাদের বাসাটা আরো আরামদায়ক করে এবং সুন্দর করে সাজাতে হবে।
দোয়েল বলল, কেন দোয়েলী, কোনো মেহমান আসবে নাকি?
দোয়েলী হাসতে হাসতে বলল, হ্যাঁ, আমাদের ঘরে মনে হয় বাচ্চা দোয়েল আসবে। তাই বাসাটা আরো মজবুত আর আরামদায়ক করতে হবে। দোয়েল আনন্দের সঙ্গে ফুড়ুৎ করে উড়ে গিয়ে কোথা থেকে শুকনো গাছের ডাল, কিছু খড়কুটো এন দোয়েলীকে দিলো।
তিনদিন তিনরাত ধরে তারা দুজনে মিলে তাদের ছোট্ট বাসাটিকে যে কী সুন্দর করে সাজানো? তোমরা দেখলে বুঝতে পারতে।
তারপর চারদিন ধরে দোয়েলী, ১টা করে ৪টা ডিম পাড়ল।
সে যে কী সুন্দর ডিম। বেশ মার্বেলের মতো বড়, কিন্তু লম্বা টাইপের ডিমগুলো হালকা হালকা ছাই রঙের ওপর আবার মোজাইক এর মতো ছিটেফোঁটা রং ছড়ানো। অদ্ভুত সুন্দর ৪টা ডিম পেড়ে দোয়েলী দোয়েলকে বলল, দোয়েল, এবার পাকা ২১ দিন এই ডিমে আমার বুকের গরম দিয়ে তাপ দিতে হবে। সমস্যা হলা, আমি যখন খেতে যাব, বা গোসল করতে যাব… তখন কী হবে?
দোয়েল-দোয়েলীকে অভয় দিয়ে বলল— আরে!
তোমার এত ভয় কেন, আমি আছি না!
তুমি যখন বাইরে যাব, আমি তখন ডিমে তা দিব দোয়েলের কথা শুনে দোয়েলী খুব খুশি হলো।
এরপর থেকে তারা দুজনে পালা করে ডিমে তা দিতে থাকল। আর অপেক্ষা করতে থাকল, তখন এসে মা-মা— বাবা-বাবা-চিক-চিক নিশ্বয়ই চিক-চিক চিহিই বলে ডাকবে।
একদিন এপ্রিল মাসের চৌদ্দো তারিখে এক সুন্দর সকালে ডিমগুলো ফুটে বেরুলো ৪ দিনে ৪টা বাচ্চা। গায়ে কোনো পশম নেই। একদম ১টা বড় বন্ধ ২টা চোখ আর ২টা পাখনা, ২টা পা। চোখ দুটো বন্ধই থাকে, হলুদ দুটো ঠোঁট হাঁ করে, শুধু খাবার চায় মা’র কাছে।
দোয়েল আর দোয়েলী। মা আর বাবা হলো পালা করে দোয়েল— যার খাবার খুঁজতে। নিয়ে আসে ঠোঁটে করে— কেঁচো, পিঁপড়ার ডিম, কিন্তু কখনও কাদামাটির ভেতরে পোকা। আর তাদের মা-দোয়েলীর, ঠোঁটে গুর দিয়ে যায়।
বাচ্চাগুলোর মা দোয়েলী সেই খাবার আবার একটু একটু করে ৪ বাচ্চার মুখের ভেতরে পৌঁছে দেয়। বাচ্চার তখন খুব আনন্দের সঙ্গে চিহিচিহি করে সেই খাবার খায়।
এই ফাঁকে দোয়েল বাবা উড়ে আসে, এসে বাচ্চাদের বলে; এই যে বাচ্চারা; আমি এসে গেছি এখন তোমরা আমার বুকের মধ্যে থাকবে, আর তোমাদের মা যাবেন খাবার খেতে। এরপরই দোয়েলী উড়ে যায়। দোয়েল বাচ্চাগুলোকে বুকের মধ্যে নিয়ে বসে থাকে। খুব অল্প সময়েই মা ফিরে আসে, এবং বাবা আবার উড়ে যায়— খাবার খুঁজতে। এমনিভাবে কদিন যেতেই বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটল, গায়ে সুন্দর পশম হলো। বাচ্চা অবাক হয়ে তাদের মা-বাবাকে দেখল। এত সুন্দর তাদের মা-বাবা।
দেখতে দেখতে দিন কেটে যায়। এবার বাচ্চাগুলো বেশ দুষ্ট হয়ে উঠেছে। ওরা এখন নিজেদের মধ্যে ঠোকরা-ঠুকরি করে। এ-ওকে ঠোঁট দিয়ে মারে। তারপরে এর-ওর খাবার কেড়ে খায়। আবার নিজেরাও খেলাও করে।
একদিন দোয়েলী বলল: তোমরা বাচ্চারা এখন বড় হয়েছ। এখন তোমাদের জন্য খাবার আনতে আমি যাব। তাই তোমরা বাসায় একা থাকবে কিন্তু খবরদার। মাথা তুলে যেন বাইরে দেখতে যাবে না। ততক্ষণে হুলো বিড়াল একবার দেখতে পেয়ে তোমাদের খেয়েই ফেলবে। শোনো, আমাদের নাকি বাচ্চারা যতদিন উড়তে না পারবে। ততদিন এ একটু কষ্ট করতে হবে। বাচ্চারা বলল, হ্যাঁ, মা তুমি যাও। আমরা একটু দুষ্টামি করব না।
মা বলল— সত্যি।
বাচ্চারা বলল সমস্বরে— সত্যি সত্যি সত্যি।
মা’টি নিশ্চিন্তে মনে উড়ে গেল খাবার আনতে।
এদিকে মা চলে যাবার আনন্দে বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করল, যে খাঁচাটি ছিঁড়ে ধপাস করে, নিচে পড়ে গেল। পড়ে থাকে কোথায়।
মাধবীলতার ঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে সেই হুলো বেড়ালটা— যে পাশের বাড়ি ছাদেই থাকে। গন্ধ পাচ্ছিল কদিন ধরেই। ব্যস, —সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিপুল বিক্রমে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ৪টা বাচ্চাকে সাবাড় করে দিলো। শুধু পড়ে রইল নিচে বাঁশের খাঁচা। আর কয়েক ফোঁটা রক্ত!!!
কিছুক্ষণ পরে আনন্দের সঙ্গে দোয়েল আর দোয়েলী এলো উড়ে মুখে অনেক খাবার। হায়। কোথায় আমাদের বাচ্চারা। নিজে পরে আছে শুধু তাদের বাসাটি। আর কয়েক ফোঁটা রক্ত, বুঝতে তাদের বাকি রইল না, এ সেই হুলো বেড়ালটারই কাজ।
দোয়েলী বাসটার পাশে বসে খুব কাঁদতে থাকল, আর ভাবতে থাকল, দোষটা তারই। বাচ্চাদের এরকম একা রেখে তার যাওয়া ঠিক হয়নি। দূরে গ্রিলে বসে দোয়েল মাথা নিচু করে ভাবতে থাকল আর কাঁদতে থাকল।
সে দোয়েলীর কাছে গেল আর করে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল— কি আর করবে দোয়েলী আমাদের জীবনটাই তো এমন। এমনি হুলো বেড়ালদের সঙ্গে যুদ্ধ করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।
উহ্্, চলো, অন্য কোনোখানে গিয়ে তো আবার বাসা বাঁধতে হবে। দোয়েল আর দোয়েলী, কাঁদতে কাঁদতে ঐ সবুজ গ্রিল দিয়ে উড়ে চলে গেল নতুন ঠিকানার খোঁজে।
ছোট বন্ধুরা: দেখলে তো, মার কথা না শুনলে কী হয়। মা’র কথা শুনে চুপচাপ বাসায় থাকলে আর আর হুলো বেড়াল ওদের দেখতে পারত। তাই মনে রাখবে মা হলো পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বন্ধু। মার কথা সবসময় মনে রাখতে হয়। আর জানা তো। দোয়েল পাখি কিন্তু আমাদের দেশের জাতীয় পাখি। এবং ওরা খুব নিরীহ পাখি বাংলাদেশের প্রতি অঞ্চলেই অনেক পরিমাণে এদের দেখা যায়। ওরা খুব শান্ত এবং সমঝোতায় বিশ্বাসী।