মায়ের গল্প

  • আশরাফুল আলম পিনটু

‘আজ টিফিনে তোমার মা কী দিয়েছে?’
‘এই যে দেখো, বাক্সটা খুলে নিই আগে।’
‘ওয়াও! নুডুলস! ভারি মজা!’
‘নুডুলস বুঝি তোমার খুব ভালো লাগে?’
‘হুঁ। খুব খুব।’
‘আমার খুব একটা ভালো লাগে না। দেখি, তোমার মা কী দিয়েছে?’
‘আজ কিছু দেয়নি। সকালে নাশতা বানাতে দেরি হয়ে গেছে।
বাবা তাই ইশকুলের সামনের দোকান থেকে শিঙাড়া কিনে দিয়েছে।’
‘ও! শিঙাড়া আমার খুব মজা লাগে। সমুসাও। কিন্তু মা বলে, দোকানের ওসব খেলে নাকি পেটের অসুখ হয়।’
‘হয়ই তো। আমার মা-ও সেকথা বলে।’
‘এসো, আমরা ভাগাভাগি করে খাই। মা বলেছে, বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে খাবে।’
‘আমার কথা তোমার মাকে বলেছ?’
‘হ্যাঁ বলেছি। তুমি আমার বন্ধু যে!’
‘বন্ধুই তো! জানো, আগের ইশকুলে আমার একটাও বন্ধু ছিল না। এখানে তোমাকে পেয়েছি। তুমি খুব ভালো।’
‘তুমিও ভালো। আমি তো এই ইশকুলে ওয়ান থেকে পড়ছি। আমারও কোনো বন্ধু ছিল না।’
‘ওয়ান থেকে থ্রি। এখনও বন্ধু নেই?’
‘না। তুমি নতুন ভর্তি হওয়ায় বন্ধু পেলাম। এখন তুমি বন্ধু। আমার কথা তোমার মাকে বলেছ তো?’
‘বলেছি। মা শুনে খুব খুশি। ক্লাসের অন্যরা তো খুব পাজি।’
‘হ্যাঁ। ফার্স্টবয়টা কেমন যেন! মিশতেই চায় না। কথাও বলে না।’
‘না বলুক। কথা বলতে বয়েই গেছে আমাদের।’
‘দাঁড়াও না, একবার ফার্স্ট হয়ে নিই আগে! মন দিয়ে পড়ছি।’
‘আমার মা-ও বলেছে, মন দিয়ে পড়াশোনা করতে। কিন্তু আমরা দুজনই যদি ফার্স্ট হয়ে যাই তখন!’
‘হি হি হি! তাহলে খুব মজা হবে, তাই না!’ ‘হি হি হি!’
‘শোনো, ওই গুন্ডামতো ছেলেটার ধারেকাছে যাবে না। খুব পাজি!’
‘আমারও সে রকম মনে হয়েছে!’
‘আমাকে একদিন ঘুসি মেরেছিল।’
‘শুধুশুধু মারল?’
‘শুধুশুধুই তো। ওর স্কেলটা নিয়ে খাতায় দাগ টেনেছিলাম বলে। খুব লেগেছিল।’
‘তোমার মাকে বলোনি?’
‘বলেছি। মা বলল, মেরেছে মারুক। তুমি কারও সঙ্গে মারামারি করবে না। টিচাররা খারাপ বলবেন।’
‘ও। আমার মা-ও সে কথা বলে। পাজি ছেলেরাই মারামারি করে। আমি তো আর পাজি ছেলে নই।’
‘আমিও না। ভ্যানে চড়ে সোজা ইশকুলে আসি। আবার ভ্যানেই বাড়ি যাই। তুমি কীসে আসো?’
‘আমি তো নতুন ভর্তি হয়েছি। মা বলেছে কদিন যাক ভ্যান ঠিক করে দেবে। বাবাই এখন আনা-নেওয়া করছে।’
‘তোমার মা আসে না?’
‘আসবে বলেছে। নতুন জায়গা তো। কদিন পরে আসবে। তোমার মা আসে না কেন?’
‘ওমা, আসবে কেন! আমি তো ভ্যানে আসা-যাওয়া করি।’
‘ও, তাই তো। তোমার মায়ের বানানো নুডুলস খুব মজার হয়েছে।’
‘মাকে বলব রোজ দিতে।’
‘রাগ করবে না?’
‘না। তোমার ভালো লেগেছে শুনলে রোজ দেবে।’
‘তোমার মা খুব ভালো। আমিও তোমার জন্য রোজ কিছু আনব। বলো, তোমার কী ভালো লাগে? মাকে বললে বানিয়ে দেবে।’
‘রাগ করবে না?’
‘রাগ করবে কেন? তোমার কথা বলেছি তো। মা বলেছে বন্ধুকে একদিন নিয়ে এসো বাড়িতে।’
‘তোমার মা খুব ভালো।’
‘হ্যাঁ। খুব ভালো। জানো, আমাকে রোজ আদর করে গোসল করায়। গা-হাত মুছে দেয়। খাইয়ে দেয় নিজের হাতে।’
‘তাই! তুমি নিজের হাতে খেতে পারো না?’
‘পারি। তবে মায়ের হাতে খেতে মজা লাগে। তুমি খাও না?’
‘না, আমি একা একা খাই। এবার থেকে মায়ের হাতে খাব।’
‘ইশকুলে আসার সময় আদর করে মা আমাকে ড্রেস পরিয়ে দেয়। চুল আঁচড়ে দেয়।’
‘আমারও। বাড়ি ফিরলেই জড়িয়ে ধরে মা আমাকে আদর করে।’
‘আমাকেও।’
‘জানো, আমি রাতে একা একা ঘুমাই।’
‘একা ঘুমাও! ভয় করে না?’
‘ভয় করবে কেন! মা তো রোজ রাতে এসে রাজা-রানির গল্প শোনায়। কিন্তু গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে। খুব ঘুমকাতুরে তো। হি হি হি!’
‘হাসছ যে!’
‘হাসব না। আমাকে ঘুম পাড়াতে গেলে মা নিজেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর আমি জেগে থাকি। কেমন মজার কাণ্ড, তাই না!’
‘হি হি হি! হাসির কাণ্ডই বটে।’
‘দেখো, আমি একদিন রাজকুমারের মতো ঘোড়ায় চড়ব। গল্পটা বইয়ে পড়েছি। ডালিম রাজকুমার।’
‘তোমার বুঝি অনেক গল্পের বই?’
‘হ্যাঁ। মা কিনে দিয়েছে। আরও দেবে। আমি এখন গল্পের বই পড়তে পারি তো।’
‘আমিও পারি। কিন্তু মা বলে সবসময় গল্পের বই পড়তে হয় না।’
‘ঠিকই তো বলে। আগে ক্লাসের পড়া। তারপর গল্পের বই।
আমি তো তাই করি। মা নিষেধ করে না।’
‘তোমার মা খুব ভালো।’
‘তোমার মা-ও। নইলে আদর করে খাইয়ে দেয়!’
‘সবার মা-ই ভালো। দেখো না, রোজ রোজ মায়েরা এসে কেমন আদর করে ওদের টিফিন খাওয়ায়।’
‘আবার কারও কারও মা সেই সকাল থেকে ছুটি পর্যন্ত ইশকুলেই বসে থাকে।’
‘ভ্যানে আসা-যাওয়া করে, তবু অনেক মা চলে আসে ইশকুলে।’
‘ওদের খুব মজা, তাই না?’
‘হ্যাঁ। মায়ের হাত ধরে হাঁটতে আমার ইচ্ছে করে। আমার মা যদি ওদের মায়ের মতো আসত!’
‘একদিন আসতে বললেই তো পারো।’
‘হ্যাঁ। বলব। আসতে বলব একদিন।’
‘কী ব্যাপার! চোখ ডলছ কেন? পানি পড়ছে যে! কাঁদছ?’
‘তোমার মাকেও একদিন আসতে বলো না কেন?’
‘বলব। আমি ভাবছি, আমিও একদিন মাকে আসতে বলব।’
‘কী হয়েছে তোমার? তুমিও চোখ ডলছ যে! কাঁদছ নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন? কাঁদছ কেন?’
‘কাঁদছি, হাজার বললেও আমার মা কোনা দিনই আসবে না।’
‘কেন আসবে না?’
‘আসবে কোত্থেকে! আমার যে মা নেই!’
‘আমারও মা নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *