বোনের বাসায় এসে আটকা পড়ে গেলাম। ভার্সিটির হলে ফেরা দরকার। সকালে ক্লাস আছে। ফিরতে পারছি না। বোনের মেয়ে জুহানা এসে আমার হাত আঁকড়ে ধরে বলল, তুমি চলে গেলে এই অন্ধকারে কি আমি বসে-বসে ভূত গুনব?
নদীর ঢেউ গোনার কথা শুনেছি, আকাশের তারা গুনতে শুনেছি। কিন্তু কাউকে কখনও ভূত গুনতে শুনিনি। জুহানা খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে পড়ে ক্লাস থ্রিতে। আমি বাসায় এলে শুরু হয় তার নানা রকমের গল্প, মামা, বলো তো বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢালার সময় ঢকঢক শব্দ হয় কেন?
ঘটনা সত্য, কিন্তু কারণ জানা নেই। জুহানা বলল, তখন বোতলের ভেতর বাতাসের চাপ কমে যায়। আর বাইরের বাতাস ঠেলে বোতলে ঢুকতে চায়। সহজে ঢুকতে পারে না। বাতাস ঠ্যালাঠেলি করে। তাতে অমন ঢকঢক শব্দ হয়।
তুমি এত কীভাবে জানো, মা?
বই পড়ে জানি, মামা। বই পড়লে অনেককিছু জানা যায়।
বিদ্যুৎ চলে গিয়ে বাসা অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অ্যাপার্টমেন্টে জেনারেটর আছে বলে বাসায় আইপিএস, ইউপিএস, চার্জার কিছু নেই। খুঁজে মোমবাতিও পাওয়া গেল না। জেনারেটর নষ্ট হয়েছে। কখন ঠিক হবে কেয়ারটেকার নিশ্চিত করে বলতে পারেনি।
বললাম, দোকান থেকে মোমবাতি নিয়ে আসি।
জুহানা বলল, অন্ধকার ভালো লাগছে, মামা। কতদিন অন্ধকার দেখিনি।
আপা বলল, জুহানা, আগামীকাল তোমার পরীক্ষা আছে, ভুলে গেছ?
জুহানা বলল, বিদ্যুৎ আসুক। অপেক্ষা করি, মা। ততক্ষণ মামা গল্প শোনাবে।
আমাকে গল্প শোনাতে হলো।
একদেশে ছিল এক কুকুর আর শেয়াল। তারা ছিল ভালো বন্ধু। কুকুর বাড়ি ফিরছিল। বনের ভেতর দেখে শেয়াল যাচ্ছে তার বাচ্চাদের নিয়ে। আকাশে মেঘ। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। কুকুর বলল, তোমার গর্ত তো অনেকখানি পথ এখান থেকে! ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। থাকার কোনো জায়গা ঠিক করেছ?
শেয়াল দুপাশে মাথা নাড়ালো। সে কাছে কোথাও থাকার জায়গা ঠিক করেনি। কুকুর বলল, বেশ চলো। তোমাকে থাকার জায়গা ঠিক করে দিচ্ছি।
কুকুর, শেয়াল আর শেয়ালের বাচ্চারা কাছেই এক গুহার ভেতর ঢুকে পড়ল। তাদের রেখে বেরুতে গিয়ে কুকুর দেখল বাইরে বিপদ। সিংহ আসছে। তারা যে গুহায় ঢুকেছে সেটা সিংহের গুহা।
শেয়ালের বাচ্চারা কান্না শুরু করল। শেয়াল তাকালো কুকুরের দিকে। কুকুর তাকালো শেয়ালের দিকে। তাদের কী করতে হবে বুঝে নিলো।
কুকুর জিগ্যেস করল, বাচ্চারা কাঁদছে কেন?
শেয়াল বলল, তারা সিংহের কলিজা খেতে চাইছে।
অসুবিধা কী! আমি তো সকালে সিংহের কলিজা নিয়ে এসেছি।
শেয়াল বলল, তারা বাসি কলিজা খাবে না। সিংহের তরতাজা কলিজা খেতে চাইছে।
কুকুর বলল, এখুনি সিংহের তরতাজা কলিজা নিয়ে আসছি। এক সিংহকে আমাদের এদিকে আসতে দেখলাম।
কুকুর আর শেয়াল কথাগুলো বলেছে জোরে। সিংহ সব শুনতে পেয়েছে। সে ভাবল সত্যি বুঝি কুকুর গুহা থেকে বের হয়ে তার কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে যাবে। সিংহ দৌড়ে দূরে চলে গেল। সিংহকে চলে যেতে দেখে শেয়ালের বাচ্চারা কান্না থামিয়ে খেলতে থাকল।
গল্প থেকে কী বুঝলে?
জুহানা কিছু বলছে না। সে চুপ করে আছে। তারপর আস্তে করে উঠে গেল। মায়ের মোবাইল ফোন সেটে আলো জ্বালিয়ে তার জন্মদিনের সবগুলো মোমবাতি নিয়ে এলো। বলল, মামা, বিপদে অস্থির না হয়ে শান্ত মাথায় ভাবলে সমাধান পাওয়া যায়। জন্মদিনের মোমবাতি একবার জ্বালানো হয়েছে। আর ব্যবহার করা হয়নি। এখন এগুলো জ্বালিয়ে পড়তে বসব। এই মোমবাতিগুলো হচ্ছে আমার জন্মদিনের সত্যিকারের উপহার।
জুহানা নয়টি মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে বসল।
মাঝে একবার পড়া থামিয়ে আমাকে জিজ্ঞ্যেস করল, মামা, তুমি এই গল্প কীভাবে জেনেছ?
বললাম, বই পড়ে। বই পড়লে অনেককিছু জানা যায়।
আমরা দুজন হাসছি। আমাদের হাসির ভেতর ঘর আলো করে বিদ্যুৎ চলে এলো।