ভূতুড়ে বাড়ি

  • নাসিরুদ্দীন তুসী

রোমহর্ষক, গা শিউরানো সে বাড়ির বিবরণ আজ আর দিতে পারব কি না জানি না। সেসব ঘটনা, সেসব মুহূর্ত আজ শুধু স্মৃতি, অনেক বছর আগের যদিও মনে হয় এইতো সেদিনের।
রাশেদ মামার ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা বলার ধরন দেখে আমরা নড়ে চড়ে বসলাম। আমি, চটপটি, ফুচকা, ফড়িং আর প্রজাপতি। নামগুলো মামার দেওয়া। তিনি এসব নামে ডাকতে ডাকতে আমাদের আসল নাম মনে হয় ভুলেই গেছেন।
মামা থাকেন ঢাকার মিরপুরে। কয়েকবছর কাটিয়ে এসেছেন দেশের বাইরে। অর্থ-বিত্ত-প্রতিপত্তি সবই হয়েছে তার। তবুও অহংকারী নন তিনি। দিলখোলা, মিশুক, ভালোমানুষ মামা গ্রামের বাড়িতে আসেন প্রতিমাসে। তিনি আমাদের আপন মামা নন কিন্তু আপনের চেয়েও বেশি। গ্রামে এলে বেশি সময় কাটান আমাদের ছোটদের সাথে।
মামা চমৎকার গল্প করতে পারেন। সেসব গল্প বানানো না সত্যি তা আমরা জানি না। কিন্তু শুনতে এত ভালো লাগে! দেশ-বিদেশের কতরকম অভিজ্ঞতায় তার জীবন পূর্ণ।
মামার নিকট আজ আমরা শুনব ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার গল্প। আমাদের অজ পাড়াগাঁয়ে এখনও বিদ্যুৎ এসে পৌঁছেনি। সন্ধ্যার পর পরই নেমে আসে ছায়া ছায়া অন্ধকারের। রাত বাড়ে। সাথে বাড়ে অন্ধকারের ঘনত্ব। জোনাকির আলো অন্ধকারের গলায় আলোকমালার মতো নিভে আর জ্বলে। সে বড়ই মনোহর দৃশ্য, কিন্তু একই সাথে ভয় জাগানিয়া! অবশ্য যত ভয় আমাদের ছোটদের। বড়দের মনে অন্ধকারের কোনো ভয় নেই। নেই ভূতের বা অশরীরী কিছুর ভয়।
রাশেদ মামা গলা থাকার দিয়ে নড়ে চড়ে বসলেন। কাচারি ঘরে আমরা বসে আছি মামাকে ঘিরে। হারিকেনের আলো নিভু নিভু। রাতের খাবার খেয়ে বসেছি গল্প শুনব বলে। গ্রামে অল্প রাতকেই মনে হয় অনেক রাত। বাইরে কোথাও তক্ষক ডাকছে— টোটঠ্যাং, টোটঠ্যাং, টোটঠ্যাং…..।
মামা শুরু করলেন-
আমরা তখন থাকতাম লক্ষ্মীপুরে। আমার বাবা চাকরি করতেন লক্ষ্মীপুরের সোনালি ব্যাংকে। আমি পড়ি লক্ষ্মীপুরের আইডিয়াল স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে। মা থাকতেন গ্রামে— রামগঞ্জে।
আমরা ছিলাম মেসে। একই মেসে থাকতেন জনতা ব্যাংকের তুষার কাকা ও রূপালী ব্যাংকের মোস্তফা কাকা। তাদের কাছে মাঝে মাঝে আসতেন এনসিসি ব্যাংকের মানিক আংকেল।
আমাদের বাসা ছিল হাসপাতাল রোডে। জব্বার মিয়ার বাসা ছিল মেইনরোডের পাশে। মানুষের চলাচল আর হৈ-হুল্লোড়ের শব্দে অনেক রাতেও ঘুমানো যেত না। বাসাটা সুন্দর ছিল। আমরা সবাই মিলে ভালোই ছিলাম। ঘুমের সমস্যা সবচেয়ে বেশি হতো তুষার কাকার। সহজেই তার ঘুম ভেঙে যেত আর সারারাত ঘুমাতে পারতেন না। তাই বাসা পালটানোর আগ্রহ তার খুবই। আমার আব্বু এবং মোস্তফা কাকাকে বাসা পালটানোর ব্যাপারে রাজি করালেন। আব্বুর বাসা পালটানোর খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তুষার কাকা আমাকে খুবই স্নেহ করতেন, তার হাতের লেখা ছিল সুন্দর। আমাকে তিনি তার মতো হাতের লেখা শেখালেন। তিনি ও মোস্তফা আংকেল আমার পড়ালেখায় সহযোগিতা করতেন। কাজেই তাদেরকে ছেড়ে থাকা সম্ভব না।
একদিন মানিক আংকেল একটা নতুন বাসার সন্ধান আনলেন। শহরের কাছে কিন্তু এত নির্জন যে মনে হবে গহিন গ্রাম।
তুষার কাকা একদিন দেখে আসলেন বাসা। তার খুবই পছন্দ হয়েছে। এই বাসাটা আরেকটু বড়, খোলামেলা। বাসার পেছনেই বিলের মতো। পাশে নারকেল-সুপারির বাগান, এরপর ঘন জঙ্গল।
কাকা প্রকৃতি পছন্দ করেন। এরকম বাসা তার পছন্দ হওয়াই স্বাভাবিক। তার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে আমরাও নতুন বাসায় যেতে রাজি হয়ে গেলাম।
কাকাদের লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় একজন বন্ধু ছিলেন ইউসুফ আংকেল। আমরা বাসায় ওঠার পর তিনি একদিন বাসা দেখতে এলেন। বাসায় এসে তিনি কেমন যেন অস্বস্তি প্রকাশ করে বললেন-এ বাসায় উঠতে গেলেন কেন, আমাকে আগে বলবেন না? আমি বাসা ঠিক করে দিতাম। আপনারা এখানকার নতুন মানুষ।
চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে দ্রুত বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। ব্যাপারটা আর কেউ খেয়াল করেনি আমি খেয়াল করলাম। কারণ আব্বু এবং তার বন্ধুরা দিনের বেলা চাকরিতে ব্যস্ত থাকতেন। তখন আমি স্কুলে থাকতাম। স্কুল না থাকলে একা থাকতে হতো বাসায়। তখনই লক্ষ্য করতাম বিষয়টা।
আমাদের আশে, পাশে আর কোনো বাসা নেই। প্রতিবেশী নেই কেউ। একা হলেই এ নির্জনতা টের পেতাম বেশি। তখন আরো টের পেতাম, বাসাটা সাউন্ড প্রুপ রুমের মতো। কানের ওপর কী যেন চাপ সৃষ্টি হতো। মনে হতো কান ফেটে যাবে। ভয়াবহ সেই অস্বস্তি!
স্কুলের মাঠে বিকেলবেলা ক্রিকেট খেলে একদিন বাসায় ফিরেছি। ঠিক সন্ধ্যাবেলা। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে মাত্র। তালা খুলে বাসায় ঢুকলাম আমি। আর তক্ষুনি মনে হলো অসংখ্য মানুষের যেন হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। যে— যে দিকে পারল পালিয়ে গেল নিঃশব্দে। অসংখ্য ছায়ামূর্তি যেন আমাকে ঘিরে থাকল। আমার গা শিরশির করতে লাগল। শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল বরফ-শীতল-ঠান্ডা স্রোত। কিন্তু ঘেমে জবজবে হয়ে গেলাম মুহূর্তে।
একবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার চিন্তা করলাম। পা দুটো যেন আটকে গেছে। কে যেন আমাকে টেনে নিয়ে গেল বাসার পেছনের দিকে। পেছনে নারকেল-সুপারি বাগানের পরে যেখানে ঘন জঙ্গল শুরু হয়েছে সেখানে দেখতে পেলাম বাঘ-সিংহ-হায়না আর ভয়ংকর সব জন্তু জানোয়ারের হুংকার! বাসার পেছনের বিলে অসংখ্য আজদাহা সাপের দাপাদাপি। সুপারি বাগান থেকে উঠে আসছে মানুষের লাশ। জীবন্ত কঙ্কাল। কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল মনে নেই। আমি তখন দোয়া-দরুদ কিছুই মনে করতে পারছি না। আয়াতুল কুরসি মনে পড়ে গেল হঠাৎ। অনেকক্ষণ পর বাসার গেটে কার যেন শব্দ পেলাম। মনে হয় বাবা, তুষার কাকা, মোস্তফা কাকারা এসেছেন।
গেটে এসে হতবিহ্বল অবস্থায় তাদের দরজা খুলে দিলাম। আব্বু আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন, না হলে পড়েই যেতাম। তুষার কাকা বললেন— রাশেদ, রাশেদ তুমি কি ভয় পেয়েছো?
আমি মাথা নাড়লাম।
এরপর আর কিছু মনে নেই। হাসপাতালে ছিলাম কয়েকদিন। আব্বু মওলানা সাহেবদের কাছ থেকে তাবিজ-কবচ আনলেন। আমরা ছেড়ে দিলাম সেই বাসা।
ইউসুফ কাকা ঘটনা জেনে বললেন, তখনই বলেছিলাম এ বাসায় ওঠা ঠিক হয়নি। এ জায়গাটা ছিল হিন্দুদের শ্মশান। অর্থলোভী ও সন্ত্রাসী হক রাজনৈতিক নেতা জায়গাটা দখল করে বিক্রি করে দিয়েছে এক প্রবাসীর কাছে। প্রবাসী ভদ্রলোক বাড়ি বানাতে গিয়ে হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। সেই বাড়িটাই ভাড়া নিয়েছিলাম আমরা। ভাগ্যিস আজ বেঁচে আছি।
গল্প বলা থামিয়ে রাশেদ মামা নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। আমাদেরও কারো মুখে রা নেই। রাত বাড়ছে। দূরে কোথাও ডাকছে হতোম প্যাঁচা। থমথমে এ পরিবেশে রাশেদ মামাকে আর জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না ঘটনাটা গল্প না সত্যি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *