- ইমরুল ইউসুফ
লামিয়ার গোল্ড ফিস দুটি খুব সুন্দর। সে কয়েকটি অ্যাকোয়ারিয়ামের দোকান ঘুরেছে। তারপর মাছ দুটি পছন্দ করে কিনেছে। একেবারে ঝকঝকে তকতকে দুটি গোল্ড ফিস। কাঁচা সোনার মতো রং। হাঁসের মতো মায়াবী চোখ। কচ্ছপের মতো ভোঁতা মুখ। কাচের মতো মসৃণ গা। বেনারসির মতো ফিনফিনে লেজ। ম্যাজিক মশারির মতো নরম পাখনা। চীনাবাদামের মতো মোটা পেট। খাওয়া-দাওয়ায় হাঙরের মতো। যাকে বলে সোনায় সোহাগা।
সোনারঙা মাছ দুটি আলো ঝলমলে, তুলতুলে। পেটমোটা, নাদুসনুদুস। হাপুস হুপুস খায়। গাপুস গুপুস ঢেকুর তোলে। হাতির মতো থপথপ করে চলে। পেট নাচিয়ে, লেজ বাঁকিয়ে ঢেউ তোলে জলে। অ্যাকোয়ারিয়ামের স্বচ্ছ কাচে বাধা পেয়ে আবার ভেসে চলে। এদিক থেকে ওদিক। ওদিক থেকে এদিক। বারবার, শতবার, হাজারবার, লক্ষবার। সারাক্ষণ কী যে ভাবে লামিয়ার আদরের গোল্ড ফিস দুটি? মাছ কি সত্যিই কিছু ভাবে? ভাবে— আকাশ পাতাল। তা-না হলে লামিয়ার মাছ দুটি একবার ওপরে একবার নিচে যায় কেন? কেন একটি মাছ আরেকটি মাছকে তাড়ায়? কামড়ায়। লাফালাফি, দাপাদাপি করে। আড়ে লাফ দিয়ে অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে বের হতে চায়। খাবার নিয়ে মারামারি করে। টানাটানি করে লেজ ধরে। মারামারি করতে করতে পানিতে ইয়ে করে দেয়। খাবার দিতে দেরি হলে কেন পানির ওপরে এসে অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ করে! ক্ষুধা পেলেই খুঁজতে থাকে লামিয়াকে।
গোল্ড ফিস দুটিকে নিয়ে লামিয়া অনেক কিছু ভাবে। ভাবে— অ্যাকোয়ারিয়ামটি যদি আরও ছোটো হতো। তাহলে খুব ভালো হতো। অ্যাকোয়ারিয়ামটি ব্যাগে করে স্কুলে নেওয়া যেত। টিফিন পিরিয়ডে মাছ দুটির সঙ্গে কথা বলা যেত। তাদেরও টিফিন খাওয়ানো যেত। মাছ দুটিকে কানের দুল বানিয়ে দুই কানে ঝুলিয়ে দেওয়া যেত। বানানো যেত গলার লকেট! কারণ মাছ দুটি স্বর্ণালংকারের মতো সুন্দর। গোধূলিলগ্নে ডুবে যাওয়া সূর্যের মতো সুশ্রী।
লামিয়াদের স্কুলে পূজার ছুটি হয়েছে। ছুটির বিষয়টি সে তার বাবাকে আগেই বলে রেখেছিল। বলেছিল, এবার গরমের ছুটিতে তাকে সাজেক বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। লামিয়া তার বন্ধুদের কাছে শুনেছে সাজেক না কি অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা। ওখানের শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়গুলো সবুজে ঘেরা। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাস করে ধবধবে সাদা মেঘ। সারি সারি মেঘ ভাসতে ভাসতে আঘাত করে চোখে-মুখে। ভিজিয়ে দেয় চেখের পাপড়ি। মাথার চুল। নিচের দিকে তাকালে দেখা যায় পায়ের নিচে মেঘ। মাথার ওপরে আকাশ। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি।
সাজেকে বেড়াতে যাওয়ার দিন-ক্ষণ ঠিক হলো। দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল লামিয়ার চিন্তা তত বাড়তে থাকল। তার চিন্তা প্রিয় গোল্ড ফিস দুটি নিয়ে। মাছ দুটিকে এখন কে খাবার দিবে। চার পাঁচ দিন না খেলে তো মাছগুলো মারা যাবে। এখন কী করবে ভেবে পায় না লামিয়া। সে তার মাকে বলল, ‘মা, আমরা কয়েক দিন বাসায় থাকব না। মাছ দুটির তখন কী হবে? ওদের কে খাবার দিবে? কে অ্যাকোয়ারিয়ামের পানি পরিষ্কার করে দিবে?’ মা বললেন, ‘তুমি এত ভাবছ কেন? আমরা তো আছি। মাছ দুটিকে আরাফদের বাসায় রেখে যাব বুঝলে। কারণ ওদের বাসায়ও অ্যাকোয়ারিয়াম আছে। ভাই-ভাবি জানেন মাছের কখন খাবার দিতে হয়। কতটুকু খাবার ওরা খায়। পানি কখন পরিষ্কার করতে হয়— ইত্যাদি ইত্যাদি। তুমি তোমার কাজ করো— যাও।’
লাগেজ গোছানোর কাজ শেষ। বাসা থেকে একটু পরেই বের হতে হবে। লামিয়াদের বাসার কাছেই আবদুল্লাপুর বাস স্টেশন। তারপরও সবার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। সবাই খুব ব্যস্ত। লামিয়া বলল, ‘মা আমার মাছের কী হবে?’ ‘ও ভালো কথা মনে করেছিস। লামিয়ার বাবা শোনো। এদিকে এসো। অ্যাকোয়ারিয়ামটি আরাফদের বাসায় রেখে আসবে। আমি আগেই ভাবিকে বলে রেখেছি। কোনো সমস্যা নেই। তোমরা যাও।’ বললেন, লামিয়ার মা। লামিয়া বলল, ‘বাবা একটা কথা বলি। অ্যাকোয়ারিয়ামটি আমাদের সঙ্গে সাজেক নিয়ে যাই। ওদের ছাড়া আমি কী করে থাকব বলো?’ ‘বোকার মতো কথা বলো না মামণি? তোমাকে বুঝতে হবে— ‘মাছ দুটি আমাদের সঙ্গে সাজেক যাচ্ছে না। তবে ওরা আমাদের মতোই বেড়াতে যাচ্ছে।’ ‘কোথায় বেড়াতে যাচ্ছে বাবা?’ ‘কেন আরাফদের বাসায়! মাছ দুটি ওদের বাসায় চার-পাঁচ দিন থাকবে। খাবে-দাবে, ঘুমাবে। খেলাধুলা করবে। মজার না ব্যাপারটি?’ এই কথা শেষ হতে না হতেই লামিয়ার মা ও-ঘর থেকে উঁচু গলায় বললেন, ‘তোমরা বাপ মেয়ে কী শুরু করলে? এখনই অ্যাকোয়ারিয়ামটি আরাফদের বাসায় দিয়ে এসো। হাতে কিন্তু মোটেও সময় নেই।’
কলিংবেল চাপতেই দরজা খুলল আরাফ। সঙ্গে তার ছোটো বোন আমব্রিন। লামিয়ার বাবার হতে অ্যাকোয়ারিয়াম দেখে আমব্রিন খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল। আনন্দে হাত তালি দিতে দিতে বলে, ‘কী মজা, কী মজা। আমাদের নতুন মাছ। আমাদের নতুন মাছ।’ লামিয়া বলল, ‘আন্টি, অ্যাকোয়ারিয়ামটি কোথায় রাখব?’ আরাফের আম্মি বললেন, ‘ডিপ ফ্রিজের ওপরে রাখো।’
লামিয়া ডিপ ফ্রিজের কাছে গেল। দেখল— সেখানে ছোটো ছোটো আরও দুটি অ্যাকোয়ারিয়াম। তাদের অ্যাকোয়ারিয়ামটির মতোই— গোলগাল, ছোট-খাটো। একটি অ্যাকোরিয়ামে চারটি গাপ্পি মাছ। আরেকটিতে লাল কালো রঙের তিনটি মলি মাছ। লামিয়ার বাবা বললেন, ‘চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে। ঘুরে আসার পর আবার এসো। তখন মন দিয়ে মাছের খেলা দেখো। চলো। ভাবি আমরা আসি— এই কথা বলে তারা চলে যায়।’
পাশাপাশি তিনটি অ্যাকোয়ারিয়াম। স্বচ্ছ জলে রংবেরঙের মাছ। সবমিলিয়ে ডিপ ফ্রিজের ওপরটি এখন যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে আরও রঙিন। দুটি গোল্ড ফিস পরিবর্তন করে দিয়েছে সেখানের পরিবেশ। গোল্ড ফিস দুটি অন্য অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছের চঞ্চলত বাড়িয়েছে। আনন্দ বাড়িয়েছে। গোল্ড ফিস দুটিও আনন্দে আত্মহারা। যেন অনেক দিন পর দেখা হয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। আত্মীয়ের সঙ্গে। মাছগুলো তাই মনের আনন্দে এলোমেলো ছুটতে থাকে।
ঢাকা থেকে গাড়ি ছুটে চলেছে সাজেকের উদ্দেশ্যে। অথচ লামিয়ার মনে কোনো আনন্দ নেই। গাড়ির সিটে মন খারাপ করে বসে আছে। তার মন পড়ে আছে মাছগুলোর কাছে। কিন্তু লামিয়া জানে না তার প্রিয় মাছ দুটি বেশ ভালোই আছে। আনন্দে আছে। লামিয়ার গোল্ড ফিস দুটি অন্য মাছদের সঙ্গে খাতির করার চেষ্টা করছে। মুখ উঁচিয়ে, লেজ নাড়িয়ে, পেট বাড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এসব দেখে আরাফ বলল, ‘মা দেখে যাও মাছেরা কী করছে। গোল্ড ফিস দুটিকে কাছে পেয়ে আমাদের মাছগুলো মনে হয় খুশি হয়েছে।’ ‘হ্যাঁ, খুশি হওয়ারই কথা। আমাদের মাছগুলো এই বাসায় পুরাতন অর্থাৎ ওল্ড ফিস। এর সঙ্গে যোগ হলো গোল্ড ফিস। এজন্য ওরা আনন্দিত হয়েছে। খুশি হয়েছে। এত ভালো খবর। একবার চিন্তা করে দেখো মাছেরাও কত সামাজিক। ওরাও মিলেমিশে থাকতে চায়।’ বললেন আরাফের আম্মি।
দিনদিন মাছগুলো আরও সামাজিক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অ্যাকোয়ারিয়ামে থাকলেও তাদের মধ্যে মহব্বত অনেক বেশি। আলাদা পাত্রে থাকলেও মাছগুলো একসঙ্গে খায়। ঘুমায়। একটি অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছের খেলা দেখলে আরেকটি অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছও খেলা শুরু করে। বেড়াতে আসা গোল্ড ফিস দুটিও যেন আরাফদের হয়ে গেছে। বেড়াতে আসা মাছ আর বাসার মাছের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সব মাছই এখন আরাফদের।
দেখতে দেখতে পাঁচদিন পেরুলো। লামিয়াদের সাজেক ট্যুর শেষ হলো। বাসায় ফিরে লামিয়া অস্থির হয়ে উঠল। যেন এখনই তার মাছ চাই। বলল, ‘মা, আমার মাছ দুটিকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। চলো ওদের নিয়ে আসি।’ ‘একটু ফ্রি হই। তারপর যাচ্ছি মা। এত ব্যস্ত হচ্ছা কেন? আমি আরাফের মায়ের কাছে খোঁজ নিয়েছি। মাছেরা ভালো আছে।’ বললেন লামিয়ার মা।
লামিয়া সন্ধ্যার পর মাকে নিয়ে আরাফদের বাসায় যায়। দেখে তার মাছ দুটি সাঁতরে বেড়াচ্ছে। আর মুখে বুদ্বুদ তুলছে। অন্য অ্যাকোয়ারিয়ামের গাপ্পি ও মলি মাছও তাই করছে। দেখে খুবই ভালো লাগল লামিয়ার। মনে মনে বলে, মাছও অনুকরণ প্রিয়!
লামিয়ার মতো গোল্ড ফিস দুটিরও বেড়ানো শেষ। ‘ভাবি আমাদের অ্যাকোয়ারিয়াম নিয়ে গেলাম।’ এই কথা বলে লামিয়ার মা অ্যাকোয়ারিয়ামটি হাতে নেয়। আর তখনই অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। গোল্ড ফিস দুটি অস্থির হয়ে ওঠে। অ্যাকোয়ারিয়ামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত দ্রুত ছোটাছুটি করতে থাকে। তাদের দেখাদেখি অন্য মাছগুলোরও অস্থিরতা বাড়ে। মুখ দিয়ে চিঁ চিঁ শব্দ করতে থাকে। যেন চিৎকার করে বলতে থাকে— নিও না। ওদের নিও না। আমাদের প্রিয় বন্ধুদের নিয়ে যেও না। ওরা আমাদের কাছেই থাক। আমরা এ বাসার ওল্ড ফিস। বাসায় গোল্ড ফিস দুটি আসার পর আমাদের আনন্দ আরও বেড়েছে। আমাদের চেয়ে বড়সড়ো মাছ দুটিকে দেখে সাহস পেতাম। নিরাপদ মনে হতো আমাদের। হঠাৎ লামিয়ার মায়ের হাতে থাকা অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে একটি গোল্ড ফিস লাফ দেয়। একটির দেখাদেখি আরেকটি মাছও দেয় জোরসে এক লাফ। টুপ করে গিয়ে পড়ে ফ্রিজের ওপরে থাকা অ্যাকোয়ারিয়ামে।