- শাহরিয়ার মাসুম
‘ঝ
পাং’ করে একটা শব্দ হলো। ভারী কিছু পড়ার শব্দ। শব্দটা এলো খোলা ম্যানহোল থেকে। বিল্টু ঠিক ম্যানহোলটার কাছাকাছিই ছিল। মাপতে গেলে বড়জোর দশ বা বিশ গজ হবে। কৌতূহলী হয়ে সে দৌড়ে গেল ম্যানহোলটার কাছে। কী পড়ল! কোনো মানুষকে তো সে যেতে দেখেনি। কিন্তু শব্দটা মানুষ পড়ার মতোই। কৌতূহল মেটাতে উঁকি দিলো ভেতরে। উঁকি দিয়ে যা দেখল, তাতে চোখ দুটি তার কপালে ওঠার জোগাড়। মাথায় শিংওয়ালা একটা কালো মতো লোক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। দু-দুটো শিং। একটা শিংয়ের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। ভাঙা শিং দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কথা। কিন্তু কিছুই বের হচ্ছে না। বিল্টু ভয়ে মুষড়ে গেল। এরকমও হয় নাকি! মানুষের মতো দেখতে। মাথায় আবার শিং। শিং ভেঙে গেছে, কিন্তু রক্ত বের হচ্ছে না। ছাগলের শিং ভাঙলে তো গলগলিয়ে রক্ত পড়ে। বিল্টু ভয়টা চাপিয়ে রেখে সাহস করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি, কে গো? এখানে পড়লেন কীভাবে?’
‘আমি চেরাগের দৈত্য।’ গোঙানি থামিয়ে বলল সে।
‘তুরাগের দৈত্য। মানে টঙ্গীর তুরাগ নদীর?’
‘না রে বাপু, চেরাগের। ল্যাম্প চেনো? ল্যাম্পের দৈত্য।’
‘রাস্তায় যে ল্যাম্পপোস্ট থাকে, সেই ল্যাম্পপোস্টের দৈত্য তুমি?’
‘না, আমি কুপির দৈত্য।’ কিছুটা বিরক্তির সুরে বলল দৈত্যটা।
‘কপি! মানে ফুলকপি বাঁধাকপির দৈত্য? ফুলকপির ভেতরেও দৈত্য থাকে?’
‘নারে বাপু, কপি না। সলতে লাগানো কুপি। টিম টিম করে জ্বলে। সেই কুপির আরেক নাম চেরাগ। আবার প্রদীপও বলে। আমি আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের দৈত্য।’
‘আলাউদ্দীন মামার কথা বলছ? রাস্তার মোড়ে মুদি দোকান আছে তার। তার আবার প্রদীপও আছে?’
‘আহা! তুমি তো দেখছি কিছুই জানো না! আরব্য রজনির গল্প পড়নি। আলাদিন ও তার আশ্চর্য প্রদীপের গল্প।
‘না, আমি গল্প পড়ি না। বই পড়তে মোটেও ভালো লাগে না।’
‘আফসোস, তাহলে কী করতে ভালো লাগে তোমার? স্কুল ফাঁকি দিতে?’
‘মোবাইলে কার্টুন দেখি, গেম খেলি। গল্পের বই পড়ার সময় কই? যাক, এত প্যানপ্যান করার সময় নাই। দোকানে যাচ্ছি ‘এমবি’ কার্ড কিনতে। মোবাইলে নেট নাই। কার্টুন দেখতে পারছি না। তা তুমি যার দৈত্যই হও না কেন, তোমার কাজকাম কী?’
‘আমি মানুষকে বর দিই? তুমি যদি আমাকে এই গর্ত থেকে উঠতে সাহায্য করো তাহলে তোমাকেও বর দেবো?
বিল্টু জিভ কামড়ে বলল, ছি। ছি। কী লজ্জা! বর দিয়ে ছেলেরা কী করবে? বর তো মেয়েদের হয়। আর আমার বড়াপু’র বর আছে। ব্যাংকে চাকরি করে।’
‘আরে বোকা! এই বর সেই বর না। এ বর মানে হলো ইচ্ছাপূরণ। আমি তোমার একটা ইচ্ছা পূরণ করে দেবো।’
‘হা, হা, হা। তুমি তো নিজের ইচ্ছাই পূরণ করতে পারো না। আমারটা করবে কী করে?’
একথা শুনে দৈত্যটা রেগে গেল কিছুটা। বলল, ‘মানে কী খোকা? কে বলল আমি আমি নিজের ইচ্ছাই পূরণ করতে পারি না?
‘বাহ্, পারলে আমার কাছে সাহায্য চাইছ কেন? গর্ত থেকে নিজেই তো লাফ দিয়ে উঠে যেতে পারো।’
এবার দৈত্যটা শরম পেয়ে গেল। মাথা নিচু করে বলল, একটা শিং ভেঙে গেছে তো। শক্তি কমে গেছে। প্লিজ তুমি আমাকে একটু উঠতে সাহায্য করো।
বিল্টু কথা না বাড়িয়ে দৈত্যটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। দৈত্যটা ওপরে উঠে বলল, এবার বলো, তোমার কী ইচ্ছে পূরণ করতে হবে? বিল্টু বলল, ‘তার আগে বলো, তুমি এই গর্তে কীভাবে পড়লে? তোমার তো অনেক শক্তি। মানুষের ইচ্ছা পূরণ করে দাও!’
‘আর বলো না, মোবাইলে ভিডিও দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। গর্তটা খেয়াল করিনি। এখন বলো, তোমার কী ইচ্ছা পূরণ করে দেবো?’
‘আমাকে এমন একটা এমবি কার্ড এনে দেবে, যা দিয়ে আমি সারাজীবন কার্টুন দেখতে পারব। কখনও ফুরাবে না।’
‘দৈত্যটা কিছুক্ষণ মাথা চুলকে বলল, আমি শুধু ছবি আঁকতে পারি। তোমাকে একটা ছবি এঁকে দেবো। অথবা চাইলে তোমাকে একটা ছবি আঁকার তুলি উপহার দিতে পারি। তুমি বাসায় গিয়ে ছবি আঁকবে।’
‘ধুর! কী যে বলো না! এটা কোনো ইচ্ছা পূরণ হলো? আমি ছবি দিয়ে কী করব? আমার লাগবে এমবি কার্ড। এমবি কার্ড না পারলে ওয়াইফাই কানেকশন এনে দাও বাসায়।’
দৈত্যটা কোনো কথা না বলে বিল্টুর হাতে একটা ছবি আঁকার তুলি ধরিয়ে দিলো। বিল্টুর মাথায় খানিকটা হাত বুলিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। বিল্টু তুলি হাতে দাঁড়িয়ে রইল। অনেক ডাকাডাকি করেও কালো দৈত্যটার কোনো হদিস পেল না। তুলি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। এমবি কার্ডও কিনতে গেল না।
বাড়িতে গিয়েই অঙ্কন খাতা নিয়ে বসে পড়ল সে। দৈত্যের দেওয়া তুলিটা দিয়ে খাতায় একটা আঁচড় দিলো। ওমা! সঙ্গে সঙ্গে তুলি থেকে রং বের হয়ে একটা লাল দাগ হয়ে গেল। বিল্টু খুব মজা পেয়ে গেল। তুলিতে আলাদা করে রং লাগাতে হবে না ভেবে। এর ভেতরেই রং আছে। সে একটা প্রজাপতি আঁকল। আর তখনি একটা মজার ঘটনা ঘটল। বিল্টু দেখল তার কাঁধের ওপর এসে একটা সুন্দর প্রজাপতি বসেছে। নানা রঙের মিশ্রণের নকশাখচিত ডানা। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সে। তার মনটাই ভালো হয়ে গেল। সে মনে মনে দৈত্যটাকে ধন্যবাদ জানালো। এরপর বিল্টু মেঘ আঁকল। অমনি আকাশ কালো হয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। মজা পেয়ে বিল্টু আঁকল বৃষ্টির ছবি। সঙ্গে সঙ্গে মুষলধারায় বৃষ্টি নামতে শুরু করল। বৃষ্টি দেখে প্রজপতিটা তার কাঁধ থেকে উড়ে চলে গেল। বৃষ্টি দেখে তো বিল্টু ভড়কে গেল। এ কোনো বিপদ ডেকে আনল সে! ঘরের চালে টিন আছে। কিন্তু সেই টিন ভেদ করে বৃষ্টিফোঁটা এসে তার বিছানা বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। বই খাতা সব ভিজে চুপ চুপ।
বিল্টু ভয় পেয়ে গেল খুব। এই বৃষ্টি সে কীভাবে থামাবে। সে দৈত্য আঙ্কেল, দৈত্য আঙ্কেল বলে চেঁচাতে শুরু করল। কিন্তু দৈত্যের কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ তার মাথায় বুদ্ধি এলো একটা। রোদের ছবি আঁকলেই তো বৃষ্টি থেমে যাবে। বিল্টু রোদের ছবি আঁকতে শুরু করল। আর ঠিক তখনি মায়ের গলার আওয়াজ পেল। ‘হ্যাঁরে বিল্টু, এই তো কয়দিন আগে কেক কেটে জন্মদিন পালন করলি। তোর বয়স এখন আট। এখনও যদি এভাবে বিছানা বালিশ ভিজিয়ে দিস!’
বিল্টু চোখ মেলে মায়ের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। হাতে তার তুলি টুলি কিছুই নেই। সে অনুভব করল তার পিঠের নিচের বিছানা ভেজা। প্যান্টও।