- আবিদ আজম
মা, মা, মা?
কী?
তোমাকে ভালোবাসি।
ভীষণ ভালোবাসি।
সবচেয়ে বেশি।
বলেই আদুরে মেয়েটি চুমু খায় মাকে। আবারও চুমু খায়। ভীষণ ভালোবাসা নিয়ে আকুল হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে। তাকিয়েই থাকে। মায়ের শরীরের ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করে। এই সুবাসের সাথে কোনোকিছুর তুলনা হয় না। আবার কথা বলে মেয়েটি।
মা, মা…
কী? বলো।
আরেকটা কথা।
বলে ফেলো।
আই লাভ ইউ। বলেই আবার চুমু খায় মায়ের গালে। হেসে ওঠেন মা। ভীষণ লজ্জা পায় মেয়েটা। মায়ের কাছ থেকে দৌড়ে পালায়। ইউনিফর্ম গায়ে ব্যাগ কাঁধে স্কুলের দিকে পা বাড়ায় সে।
খ.
মা, মা
কী, কী?
দেখোতো আমার আঁকা ছবিটা কেমন হয়েছে?
বাহ্, চমৎকার। খুব সুন্দর।
আমি আরেকটি ছবি আঁকছি।
শেষ হলে তোমাকে দেখাব।
মা, মা। আরেকটা কথা।
কী বলবি, বল।
বলেই মা কন্যার দিকে তাকান। কৌতূহল জাগে। মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলবে মেয়ে। নাড়ি ছেঁড়া ধন। বড় আদরের ধন। প্রথম সন্তান। ওর জন্ম হবার পর মাতৃত্বের স্বাদ পান মা। শ্রেষ্ঠ এক অনুভূতি।
ধরো আমি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়ে যদি মারা যাই, তুমি মানুষকে কী বলবা?
মা কোনো জবাব দেবার সুযোগ পান না। কিছু বলতে গিয়েও চুপসে যান। খুব অপ্রস্তুত হন। অবাক হন।
আবার কথা বলে মেয়ে।
দৃঢ় এবং দীপ্ত কণ্ঠে বলে—
বলবা যে শহিদ হয়েছে। আমার মেয়ে শহিদ হয়েছে।
নিজের ছোট মেয়ের কথা শুনে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেন মা। চিৎকার করে ওঠেন।
তুমি এসব কী বলো? আমরা তোমাকে আদর দিয়ে বড় করেছি ভালো কিছু করার জন্য। তুমি মারা যাবে কেন?
চোখ ভেসে যায় মেয়ের। মায়ের চোখেও অশ্রু। বিস্ময়।
মারা যাব না। শহিদ হব হয়তো। ঠিক জানি না। শহিদেরা কি কখনও মরে বলো? তারাতো চির অমর।
গ.
তার নাম নাঈমা সুলতানা। মাত্র ১৬ বছরের ফুটফুটে এক কিশোরী। উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। নাঈমার ইচ্ছা লেখাপড়া করে ডাক্তার হবার। চলনে-বলনে, মেধা ও মননে অন্যদের চেয়ে তাকে আলাদা করা যায় সহজেই। অনুকরণীয় একজন। লেখাপড়ায় তার কৃতিত্ব অসাধারণ। আঁকাআঁকিতেও আছে দারুণ মনোযোগ।
দেশজুড়ে চলছে সরকারি চাকরিতে অন্যান্য কোটাবিরোধী আন্দোলন। সেখান থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন পরিণত হয়েছে স্বৈরাচারবিরোধী এক মহা গণবিপ্লবে। একসময় যা ফ্যাসিবাদ পতনের এক দফায় উপনীত হয়। আন্দোলনে শিশু-কিশোর ভাই-বোনেরা অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিচ্ছে। দেশজুড়ে নির্মম গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে খুনি হাসিনা সরকার। গণহত্যাকারী কিছু দুষ্টু পুলিশ তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খুনের নির্দেশদাতা মন্ত্রীদের আন্দোলনের ভিডিয়ো দেখিয়ে বলেন, স্যার, গুলি করি, মরে একটা। বাকিডি যায় না। সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। কী আশ্চর্য। দেশের শান্তি ও ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য মরতে রাজি ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা। তবুও তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল। শত চেষ্টা করেও কোনোকিছুতেই আন্দোলন দমানো যাচ্ছে না।
দেশজুড়ে চলছে কার্ফিউ। ইন্টারনেট বন্ধ রেখে চালানো হচ্ছে নির্মম হত্যাকাণ্ড। খুনি রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে প্রতিদিন শহিদ হচ্ছে শত শত ছাত্র-জনতা। গতকাল ১৮ জুলাই উত্তরায় পুলিশের গুলিতে প্রায় ত্রিশজন মানুষ নিহত হয়েছে। স্বজনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে আকাশ-বাতাস। সে কান্না-বিলাপের শব্দ কি খুনি বাহিনীর কানে পৌঁছে?
ঘ.
ভীষণ মন খারাপ কিশোরী। নাঈমা সুলতানার। মা আন্দোলনে যেতে দিচ্ছে না। নাঈমা মেয়ে বলে? কই কত-শত স্কুলছাত্রীকে এ আন্দোলনে দেখা গেছে। সামনের সারিতে দেখা গেছে কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রীদেরও। শহিদ আবু সাঈদসহ অসংখ্য ভাই হত্যার প্রতিবাদে জুলাই বিপ্লবের ভ্যানগার্ডের মতো তারা রাজপথে নেমে এসেছে। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে স্লোগান তুলছে, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।’ ‘আমার ভাই মরল কেন, খুনি হাসিনা জবাব চাই।’ ‘সামনে আসছে ফাগুন, এবার হবো দ্বিগুণ।’ আসলে মেয়ে বলে আন্দোলনে যেতে দিচ্ছে না তা না। কে-ই বা তার সন্তানকে হারাতে চায়।
চুপচাপ বাসায় বসে থাকে নাঈমা। গুনগুন করে একা একা দেশের গান গায়। আবার মনের খেয়ালে স্লোগান তোলে, ‘স্বৈরাচারের গদিতে-আগুন জ্বালাও একসাথে। ’ নিজের ভুবনে ডুবে থাকে নাঈমা। ছবি আঁকার খাতাটা টেনে নেয় সে। আন্দোলন শুরু হবার পর থেকে বেশকিছু ছবি এঁকেছে নাঈমা। আজও আঁকবে। বৈষম্যবিরোধী স্লোগান সংবলিত প্রতিবাদী বেশ কিছু ছবি এঁকে ফেলে। ‘বয়কট ছাত্রলীগ’ ‘কোটা সংস্কার চাই’ ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ ইত্যাদি স্লোগানের বেশ কয়েকটা বিপ্লবী পোস্টারও আঁকে সে। যার বেশ কিছু ফেসবুকে শেয়ারও করে। আঁকাআঁকি থেকে উঠে নাঈমা মাকে জিজ্ঞেস করে ‘আম্মু পিৎজা বানাব। ফ্রিজে কি চিকেন আছে?’
মা হাঁ বোধক জবাব দিতেই নাঈমা বলে ‘আচ্ছা একটু পর বানাব।’
হঠাৎ বাসার বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পায় নাঈমা। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের আধুুনিক মেডিকেলের সামনে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও তাদের সহযোগী ছাত্রলীগ-যুবলীগ হামলা চালায়। পরে অলিতে-গলিতে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে রক্তখেকো হায়নার দল।
তিনতলার বারান্দা থেকে নাঈমা দেখতে পায় নিরীহ আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে পুলিশ। তাদের সহায়তা করছে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ-যুবলীগ। হাতে থাকা মোবাইল ভিডিয়ো অন করে নাঈমা। হঠাৎ চিৎকার। তুমুল আর্তচিৎকার। কেঁপে ওঠে আকাশ-বাতাস।
‘মা-আ…। ’
‘কী হইছে।’
মা-ছোট বোন দৌড়ে এসে দেখে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছে নাঈমা। তাকে লক্ষ্য করে পুলিশের ছোড়া গুলি মাথায় লেগেছে। এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে হায়েনার বুলেট। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ড্রয়িং খাতায় আঁকা ছবিটা শেষ করা আর হয়ে ওঠে না তার। নাইমা সুলতানার নামের আগে যুক্ত হয় একটি শব্দ। ‘শহিদ’। সময় বিকাল ৪টা। ক্যালেন্ডারের তারিখ ছিল ১৯ জুলাই ২০২৫, রোজ শুক্রবার।