বোকা বাঘ ও চতুর শিয়াল

  • জব্বার আল নাঈম

খরগোশের বিয়েতে বনের অনেক পশু এসেছে। সবাই একযোগে আনন্দ করছে। সিংহের সামনে নির্ভয়ে গরু হাঁটছে! বাঘের সামনে হরিণ। ভেড়ার পাল ছোটাছুটি করছে দলবেঁধে। পাখিরাও মনের আনন্দে উড়ছে। এই একটাদিন সবাই স্বাধীন। কেউ কাউকে ভয় করছে না। মাস কয়েক আগে নিয়ম হয়েছে- বিয়ে, জন্মদিন, মৃত্যুদিনে কেউ কাউকে মারতে পারবে না। আর এই নিয়ম অমান্যকারীকে শাস্তি দিবেন স্বয়ং রাজা।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ। যে যার মতো বাড়ি ফিরছে। গল্প করতে করতে একসঙ্গে হাঁটছে শিয়াল আর কচ্ছপ। কিছুটা ক্লান্ত তারা। তাই বনের উঁচু টিলাতে গিয়ে বসে। বিশ্রাম নেয়। জমিয়ে আড্ডা দেয় দুই বন্ধু। আলোচনা হয়, প্রাণীদের সুখ-দুঃখ নিয়ে। যে করেই হোক, দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বন্ধ করতে হবে। কচ্ছপের কথায় সায় দেয় শিয়াল।
শিয়াল ও কচ্ছপ ভালো বন্ধু। বনের সবাই জানে। জানে বলেই তাদেরকে হিংসা করে। এ নিয়ে চারপাশে কানাঘুষা চলে। কচ্ছপের মনে ভয়— এভাবে চলতে থাকলে শিয়াল দূরে সরে যাবে! ফাটল ধরবে বন্ধুত্বে। যদিও শিয়াল কারো কথায় কান পাতে না।
শিয়াল বলে, অনেকে অনেক কথা বলবে। নিজেরা ঠিক থাকলে কিছুই হবে না। পশুদের মধ্যে যত বন্ধুত্ব বাড়বে ততই শান্তি আসবে। কারণে-অকারণে কেউ কাউকে হুমকি দেবে না, মারবে না, খাবে না। বনে ফিরে আসবে শান্তি-শৃঙ্খলা।
দুই বন্ধু গভীর আলোচনা করছে। দূর থেকে তাদেরকে দেখে ক্ষুধার্ত এক বাঘ। সারাদিনের অনাহারী। ভাবছে এবার অন্তত ক্ষুধা মিটবে, তাই নিঃশব্দে এগিয়ে আসে। চালাক শিয়াল টের পেয়ে পালিয়ে যায়। আড়ালে দাঁড়িয়ে বাঘ ও কচ্ছপের তামাশা দেখে। বাঘের নাগাল থেকে বেশ দূরে শিয়াল। বলা যায়, নিরাপদে। স্বভাব নিয়মে কচ্ছপ হাঁটে অতি ধীরে। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারে না। বাঘ ধরে ফেলে। প্রতিজ্ঞা করে, কচ্ছপের মাংস খেয়েই ক্ষুধা নিবারণ করবে। কারণ, এই মাংস খেতে বেশ মজা। এতে রয়েছে, ফসফরাস, তামা, সালফার, পটাশিয়াম, মাইক্রো এবং ম্যাক্রোট্রুটেন্টস।
বাঘ কোনো উপায়ে কচ্ছপকে খেতে পারছে না! ফেলতেও পারছে না। কচ্ছপের ওপরের অংশ খুবই শক্ত! একবার ডান গাল তো একবার বাম গাল করছে। আবার বের করছে। কচ্ছপের চোখ কোটরের ভেতরের দিকে। তবু মাঝেমধ্যে চোখ খোলে। মিটমিট তাকায়। ভয় পায়! বন্ধু শিয়ালকে খোঁজে। বিপদের দিনে বন্ধু চেনা যায়। শিয়াল বুদ্ধিমান। তার সহযোগিতা এখন দরকার ছিল। কিন্তু সে পালিয়ে গেছে! কচ্ছপ আবার ভাবে, এখন বাঁচার উপায় কী তাহলে!
কচ্ছপকে খাওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছে বাঘ। চাইলেই কচ্ছপের মাংস জোটে না। ভাগ্য লাগে। এই মাংসে দুই-তিন গুণ বেশি শক্তি থাকে। এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে না।
বাঘের মেজাজ খারাপ হয়! সহযোগিতার জন্য এদিক-সেদিক তাকায়। আশপাশে কেউ নেই। এমন সময় বাঘের কানে আসে ‘মামা’ শব্দটি। কে ডাকছে? মাথা তুলে তাকায়। কাউকেই দেখতে পেল না।
বাঘ আবারও মধুর ডাকটি শুনতে পায়। এবার চোখ যায়— আড়ালে থাকা শিয়ালের ওপর।
বাঘ : ভাগিনা, তুমি ওখানে কেন?
শিয়াল : মামা যেখানে ভাগিনাও সেখানে।
বাঘ : মামা-ভাগিনা যেখানে বিপদ নেই সেখানে।
শিয়াল : মামা, তুমি এখানে কী করছ?
বাঘ : ভাগিনা, সারাদিন না খেয়ে আছি। সামনে পেয়ে গেলাম কচ্ছপটি। জানো তো, কচ্ছপের মাংস উপকারী। খেতেও মজা। অল্পতেই ক্ষুধা মিটে। ভাগিনা, চাইলে তুমিও আসতে পারো।
শিয়াল : মামা, আমি এলে তোমার ভাগ কমবে।
বাঘ : তুমি ছোট। পরিমাণে কম খাবে।
শিয়াল : মামা, কচ্ছপ তো শক্ত! এটা খাবো কীভাবে?
বাঘ : চেষ্টা করে দেখি, উপায় একটা বের হবে।
শিয়াল : মামা, এত কষ্টের দরকার নেই। এটা খাওয়ার সহজ উপায় আমার জানা আছে।
বাঘ : ভাগিনা, জলদি বলো। জলদি বলো। ক্ষুধায় দুর্বল আমি। কোনো বুদ্ধি মাথায় কাজ করছে না।
শিয়াল : তুমি যে বোকা বনের সবাই তা জানে।
বাঘ : ভাগিনা, তুমিও বোকা বললে? মনে কষ্ট পেয়েছি। কেউ মামার বদনাম করলে, তোমার উচিত প্রতিবাদ করা।
শিয়াল : ওরা সংখ্যায় বেশি। তাই পারিনি।
বাঘ : ওসব আলাপ পরে হবে। আগে বলো কীভাবে কচ্ছপ খাব।
শিয়াল : কচ্ছপটি আগুনে ফেলো। তখন পুড়ে নরম হবে। খেতে কষ্ট হবে না। তাছাড়া পোড়া মাংসের স্বাদই অন্যরকম।
(শিয়ালের পরামর্শ শুনে কচ্ছপের জিহ্বা শুকিয়ে আসে। চোখে পানি জমে। শরীরের অর্ধেক শক্তি কমে আসে। কচ্ছপ ভাবে, শিয়াল আমার বন্ধু! বন্ধু হয়ে এমন বুদ্ধি দিতে পারল! বাস্তবে শিয়াল কারো বন্ধু না। বন্ধু হতে পারে না। বুঝলাম, শিয়াল যার বন্ধু তার শত্রুর প্রয়োজন হবে না। এরা আজীবন ধূর্ত! হতে পারে বাঘকে ডেকে এনেছে শিয়াল। এতদিন সে বন্ধুত্বের ভান করেছে। বিপদের দিনে প্রকৃত বন্ধু চেনা যায়।)
বাঘ : বনে আগুন পাব কোথায়, ভাগিনা?
শিয়াল : তাই তো। তাইতো। তাহলে আরেকটি বুদ্ধি বের করি?
বাঘ : তাড়াতাড়ি বুদ্ধি বের করো। খুবই ক্ষুধা পেয়েছে আমার। আর সহ্য করতে পারছি না।
শিয়াল : মামা, আরেক কাজ করতে পারো।
বাঘ : দ্রুত বলো। দ্রুত বলো।
শিয়াল : কচ্ছপটি নদীতে ফেলে দাও। ভিজে নরম হবে। তখনও খেতে ভালো লাগবে।
বাঘ : তোমার বুদ্ধির জবাব নেই। কিন্তু বুদ্ধি আমার মাথায় কেন এলো না! তুমি আমার যোগ্য ভাগিনা।
বাঘ নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনে-ডানে-বামে একবার করে তাকায়। এরপর কচ্ছপটি নদীতে ছুড়ে ফেলে। অপেক্ষা করে পাড়ে। কচ্ছপ ভিজে নরম হয়ে এলেই খাবে। এরপর ক্ষুধা মিটাবে। বাঘের অপেক্ষা শুরু হয়। ততক্ষণে তলিয়ে যায় কচ্ছপ। একঘণ্টা, দুইঘণ্টা, তিনঘণ্টা পরও কচ্ছপ ফিরে আসে না। এদিকে চারপাশে সন্ধ্যা নামে। ডুবে যায় সূর্য। পাখিরা ঘরে ফিরে। বাঘ বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত। রাগে-ক্ষোভে ফিরে আসে শিয়ালের কাছে। এদিকে শিয়ালও নেই।
বাঘের বুঝতে বাকি রইল না, শিয়াল আর কচ্ছপের গভীর বন্ধুত্ব। বোকা বাঘ মনের দুঃখে বনে ফিরে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *