প্রকৃতির জন্য ভালোবাসা

  • জাওয়াদুল ইসলাম ভুঁইয়া

অন্য দিন বিকেলে আসলেও আজ বিকেলের একটু আগেই পুকুর পাড়ে এসে বসলাম। স্রোতহীন ছোট্ট একটি পুকুর, তার চারপাশে পাড় জুড়ে কিছু নারকেল আর আমগাছ, মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো দুলছে— সবমিলিয়ে মন ভালো করার মতো একটি পরিবেশ। ঢাকা শহরে সময় কাটানোর জন্য এমন এক খণ্ড জায়গা পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। যদিও আমরা ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে থাকি।
বিকেলের কিছু পরে নীলা চুপচাপ এসে আমার পাশে বসল। ‘আজকেও কি দেরি না করলে হতো না? জানিস তো, আজকে এখানে আমাদের শেষ দিন।’
নীলা আমার কথার কোনো উত্তর দিলো না। মাথা নিচু করে একদৃষ্টিতে মাটির দিকে চেয়ে রইল। বুঝলাম, ওর মন খারাপ। নীলা আমার সহপাঠী। আমরা একসাথে একই কলেজে পড়ি। সেই ছোটবেলা থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। প্রতিদিন বিকেলবেলা এ পুকুরপাড়ে বসে গল্প গুজব করে আর প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য অবলোকন করেই আমাদের সময় কাটে। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। আজকে কেউ কারো সাথে কথা বলছি না। অনেকক্ষণ নীরবতার পর নীলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা রাহি, আমরা কি এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারি না!’
তার গলার স্বর শুনে আমি তাকিয়ে দেখি ওর চোখে পানি টলমল করছে। আসলে আগামীকাল এ পুকুরটি ভরাট করা হবে। এখানে মাটি ও বালু ফেলে এবং আশপাশের গাছপালাগুলো কেটে সমতল বানিয়ে একটি বিল্ডিং ওঠানো হবে। নীলা কোনোভাবেই এ বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না। অবশ্য মেনে নেওয়ার কথাও না। এ চিরচেনা পুকুরপাড়ে আমাদের শৈশব কেটেছে। আমাদের যত দঃখ, বেদনা, ব্যর্থতা, পারিবারিক ঝুট-ঝামেলা, কোলাহল সবকিছু থেকে দূরে এ নিস্তব্ধ প্রকৃতিই একমাত্র আশ্রয়স্থল। এ প্রকৃতিকে ঘিরে আমাদের দুবন্ধুর শৈশবের আনন্দঘন জীবনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমাদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে এখানে ইট সিমেন্টের দালান উঠবে, তা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না। আমি কীভাবে মেনে নিচ্ছি, তা নিজেও বুঝতে পারছি না। নিজেকে কেমন হৃদয়হীন মানুষ মনে হচ্ছে। যাহোক, নীলাকে শান্ত করার জন্য আমি বললাম, ‘আমাদের কথা কেউ শুনবে না নীলা। এখানে দালান ওঠানো থেকে আমরা ওদের আটকাতে পারব না।’ ‘কিন্তু আমাদের কি এর প্রতিবাদ করা উচিত না!’
‘অবশ্যই আমাদের প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু কীভাবে করব, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
নীলা আর কোনো কথা বলল না। শুধু এতটুকু বুঝলাম, তার মাথায় কোনো একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। এরপর আর আমাদের মধ্যে কোনো কথা হলো না। আমি এ স্মৃতিময় পুকুর আর গাছপালাগুলোকে শেষবারের মতো দু-চোখ ভরে দেখে নিতে থাকলাম। পুকুরের মধ্যে আজ কেমন যেন অন্যরকম এক স্রোত, মাছগুলো এ স্রোতে লাফালাফি করছে, গাছে গাছে উড়তে উড়তে পাখিগুলো যেন আজ একটু বেশিই কিচির-মিচির করছে, গাছের শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়ছে আমাদের গায়ে। যেন এ নিস্তব্ধ প্রকৃতি আমাদের কোনো ইঙ্গিত দিতে চায়, নিস্তব্ধতা ভেঙে আমাদের কাছে কোনো আকুতি জানাতে চায়। আগামীকাল শুধু আমার না, প্রকৃতির কোলে লালিত অবলা প্রাণীগুলোও তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল হারাবে। কিন্তু এ নিষ্পাপ প্রাণীগুলোর কী দোষ ছিল? তাদের সাথে কেন এ নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে? এসব কথা ভেবে ভেবেই সেদিন বাড়ি ফিরে এলাম।
পরদিন সকালে নীলা আমাকে ফোন করে পুকুরপাড়ে আসতে বলল। কথামতো সেখানে গিয়ে তো আমি অবাক হয়ে গেলাম। নীলা আমাদের কলেজের কয়েকজন নিয়ে পুকুর ভরাট করার প্রতিবাদে আন্দোলন চালাচ্ছে। তাদের সবার হাতেই প্ল্যাকার্ড উঁচু করে ধরা। সেখানে লেখা, ‘পুকুর ভরাট বন্ধ করি, পরিবেশ রক্ষা করি।’ নীলা আমাকে তাদের আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান করল। নীলার এ সাহসী পদক্ষেপ আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করল। তাই আমি নির্দ্বিধায় আমার বন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ আন্দোলনে যোগ দিলাম।
আমাদের আন্দোলনে পুকুর ভরাট করার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেখে সেখানকার কর্মীরা প্রথমে আমাদের চলে যেতে বলল, কিন্তু তাতে কোনো কাজ না হওয়ায় আমাদের হুমকি-ধামকি দিতে লাগল এবং শেষে আমাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখালো। কিন্তু আমরা তাতে দমে যাইনি বরং আমাদের মধ্যে কয়েকজন আঞ্চলিক পরিবেশ অধিদপ্তরে গিয়ে তাঁদেরকে সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললে তাঁরা এ আন্দোলনে আমাদের পাশে দাঁড়ান। অপরদিকে এলাকার স্থানীয় কিছু পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকগণও সেখানে এসে উপস্থিত হন এবং আমাদের আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে প্রচার করতে থাকেন। কিছু পরিবেশবাদী জনগণও এ আন্দোলনে আমাদের পক্ষে যোগ দেন। অবশেষে আমাদের সকলের তীব্র আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ এ পুকুর ভরাট করে দালান ওঠানোর কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হন। আমাদের আন্দোলন সার্থক হলো। আমরা আমাদের চির পরিচিত সেই পুকুরটাকে রক্ষা করতে সফল হই।
এ ঘটনার পর অনেক দিন কেটে গেছে। এর মাঝে অনেকে এ পুকুরকে দখল করার অপচেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু আমাদের প্রতিবাদে সেটি কখনও সফল হয়নি। এখন আমি বুঝতে পেরেছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করা। আমাদের এ ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের কারণেই এ প্রকৃতিকে আমরা রক্ষা করতে পেরেছি।
এখনও আমি আর নীলা প্রতিদিন বিকেলে এ পুকুরপাড়ে এসে বসে থাকি। এ নির্জন প্রকৃতির সাথে মনের সুখ-দুঃখের আলাপ করে ভালোবাসা আদান-প্রদান করি। এ নির্মল প্রকৃতিও যেন কৃতজ্ঞতা ভরা চোখে তার হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে যায় আমাদের সবার মাঝে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *