আমার রঙিন লজেন্স খাওয়া দিন

  • সেলিনা হোসেন

আশিক মুস্তাফা: শুভ সন্ধ্যা, কেমন আছেন আপু?
সেলিনা হোসেন: এই তো চলছে। তোমার কী অবস্থা; রাস্তায় কোনো সমস্যা হয়নি তো?
আশিক মুস্তাফা: না আপু, ভালো। আজ আপনার শৈশব আর লেখালেখির কথা শুনতে এসেছি।
সেলিনা হোসেন: (চেনা হাসি দিয়ে) আসলে করোনা ঘরবন্দি করে দিয়েছে আমাদের। তবে ব্যস্ততা কমেনি। এখন ঘরে বসে অনলাইনে দেশে-বিদেশে প্রচুর ওয়েবিনার, সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণ করছি। তবু ঘরে থাকা এই দিনগুলোতে শৈশবটা একটু বেশিই মনে পড়ছে। বলো, কী জানতে চাও?
আশিক মুস্তাফা: তার আগে বলুন, আপনি ৭৫-এ পা দিয়েছেন। এই ৭৫-টাকে উলটো করলে হয় ৫৭। লেখক হিসেবে আপনার কেটে গেল ৫৭ বছর। কেমন লাগে এটা ভাবতে?
সেলিনা হোসেন: আরে, এটা তো ভাবিনি! ৭৫-৫৭; এত মজার খেলা! আসলে আমি খুব প্রস্তুতি নিয়ে, লেখা-পড়া করে লিখতে শুরু করেছি বিষয়টা তেমন না। বরং বলতে পারো আমার একটা অসাধারণ শৈশব- কৈশোর কেটেছে করতোয়া নদীর পাড়ে। সেই শৈশব-কৈশোরই আমাকে লেখক বানিয়ে দিয়েছে।
আশিক মুস্তাফা: আপনার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোর কথা বলুন?
সেলিনা হোসেন: বগুড়া ছিল বাবার কর্মস্থল। সেখানেই কেটেছে শৈশব। এখন খুব মনে পড়ে বগুড়ার কথা। মনে পড়ে আমাদের গণ্ডগ্রামের কথা। নদী পাড়ের ছোট্ট একটা গ্রাম। যেই গ্রামের অবাধ স্বাধীনতা এবং উন্মুক্ত প্রকতি আজও আয় আয় করে ডাকে। গ্রামের মাঠ-ঘাট, প্রান্তর, নদী আর গাছ বাওয়া। উঁচু গাছে চড়ে বাবাকে দেখে বকা খাওয়ার ভয়ে লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ভাইবোন এবং অন্যান্য ছেলেমেয়ের সঙ্গে হল্লা করতে করতে স্কুলে যাওয়াই ছিল আমার রুটিন।
আশিক মুস্তাফা: আপনার বাবা কীসে চাকরি করতেন?
সেলিনা হোসেন: রেশম বাগানে। বাবা ছিলেন রেশম বাগানের বড়কর্তা। আমাদের পাশেই রেশম চাষ হতো। বিশাল তুতের বাগান। রেশম পল্লির ভেতরেই থাকত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ছিল ডাকবাংলো, রেশম-কীট পোষার ঘর। এই তুঁতের বাগান পার হয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা সড়ক ধরে পুলিশ লাইনের ভেতর দিয়ে স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে ফেরার পথে টিলায় উঠে পুলিশের বন্দুকের গুলি থেকে বেরিয়ে আসা সিসা কুড়িয়ে হানিফের দোকানে নিয়ে যেতাম। হানিফ মিয়া তা রেখে মুড়ি-মুড়কি দিতেন। কখনও ছোট ছোট রঙিন লজেন্স দিতেন। মনে আনন্দে তা চিবুতে চিবুতে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা সড়ক ধরে বাড়ির পথ ধরতাম। বাড়ির কাছাকাছি এসে কে আগে ঘরে পৌঁছাবে তা নিয়েও ভাইবোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো। স্কুল থেকে ফিরেই বই-খাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পেটপুরে খেয়ে ছুট দিতাম মাঠে। গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, ছি-বুড়ি ছাড়াও নিজেরা রাজ্যের খেলা বানিয়ে বানিয়ে খেলতাম। সন্ধ্যা নামলেই ঘরে ফিরে হারিকেনের আলোকে আপন করে পাঠে মন দিতাম। যখন যাই করতাম তাতে বাবার চোখ রাঙানি তেমন না থাকলেও বাবা ছিলেন পড়াশোনার দিক থেকে কঠোর। বড্ড রাগী ছিলেন। তাই বাবাকে ভাইবোনরা ভয় পেতাম। তবে এই বাবা হঠাৎ বদলে যান।
আশিক মুস্তাফা: কেন?
সেলিনা হোসেন: চার-পাঁচ বছর বয়সি আমার ছোট বোন লাকির মৃত্যু বাবাকে বদলে দেয়। লাকির নেফ্রাইটিস অসুখ হয়েছিল। সে সময়ে ভালো চিকিৎসা না থাকায় লাকির নানারকম চিকিৎসা চলতে লাগল। এক কবিরাজ লাকিকে রাতে ধানের ওপর বসে থাকা শিশির খাওয়াতে বললেন। ছোট বোনকে সুস্থ করে তুলতে ধানখেতে গিয়ে শিশির ঝরিয়ে বাটি ভরে নিয়ে আসতাম। দিনের পর দিন। কিন্তু বাঁচানো গেল না তাকে। কন্যা হারানোর পর বাবা একেবারে বদলে যান। সেদিন থেকে তিনি আর তার কোনো ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তোলেননি। বাবার অবাধ স্বাধীনতা ছিল সন্তানদের জন্য। শুধু বাবাই নয় আমার মাও ছিলেন অসাধারণ গুণের অধিকারী। বাবার মতো করে মাও চাইতেন— মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে, বড় হবে। সেই ৪৭-এর দেশভাগের সময় মা তার বড় দুই মেয়েকে পড়ানোর জন্য ভারতেশ্বরী হোমস-এ পাঠান। তবে দাদা চাইতেন অল্প লেখাপড়া শিখিয়ে নাতনিদের বিয়ে দেবেন কিন্তু বাবা এর বিরোধিতা করেন। মা ছোট ছেলের জন্মের সময় প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। বড় দুই বোন মাকে এ অবস্থায় রেখে হোস্টেলে ফিরতে রাজি হতো না। মা মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি করে নিজের কাছে রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে দেন।
আশিক মুস্তাফা: আপনার বাবাও তো ডাক্তার ছিলেন?
সেলিনা হোসেন: না না বাবা ছিলেন শখের ডাক্তার। বাবার কাছে আসত খেটে খাওয়া মানুষ। যারা কখনও ডাক্তারের কথা ভাবতে পারতো না। অসুস্থ হলে কেবল ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে থাকত। সেই খেটে খাওয়া লোকদের বাবা নিজ উদ্যোগে ওষুধ দিতেন। ঢাকা থেকে মেটেরিয়া মেডিকো হোমিওপ্যাথির বই কিনে নিয়ে তাদের ছোটখাট ট্রিটমেন্ট করতেন। তাদের জন্যই বাবা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শেখেন। চাকরির পাশাপাশি গ্রামের মানুষদের তিনি ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিতেন। আর আমি ছিলাম বাবার কম্পউন্ডার। বাবার বাক্স-প্যাটরা ঘিরে বসে থাকতাম। তিনি নির্দেশ দিলেই নির্দিষ্ট শিশি বের করে পুরিয়ে বানানো শুরু করতাম। কিছুদিন বানানোর পর বেশ হাত এসে যায় পুরিয়ায়। রোগীদের অনেকেই চাইতেন আমি যেন তাদের পুরিয়া বানিয়ে দেই। কম্পউন্ডিং ভালো করায় বাবা ভীতিটাও কেটে যায়। বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। আমাদের প্রতি বাবা-মায়ের এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি তখন থেকেই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে। এর ভেতর চলছিল প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও।
আশিক মুস্তাফা: সময়ের সঙ্গে তো অনেক কিছু বদলে যায়। করোনায় ঘরে বসে এখন অনেকে অনলাইনে ক্লাস করছে। পরীক্ষা দিচ্ছে। এই সময়ে এসে আপনাদের সময়ের কথা ভাবতে কেমন লাগে?
সেলিনা হোসেন: সময় বড় অদ্ভুত জিনিস। বড় শক্তি সময়ের। এখন ছোটদের কাগজ-কলমের দরকার পড়ে না! আর তখন আমাদেরও কাগজ-কলমে লেখার রেওয়াজ ছিল না। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা স্লেটে লিখতাম। স্কুলের প্রধান শিক্ষক রোজ আমাদের একটি লাইন উচ্চারণ করাতেন ‘কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল’। সবাই চিৎকার করে লাইনটি বলতাম। এই বলাতেও কেন যেন একটা আনন্দ খুঁজে পেতাম। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বগুড়ায় ভিএম (ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল) গার্লস স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সপ্তম শ্রেণি শেষ করার পর বদলি হয়ে যান বাবা।
আশিক মুস্তাফা: তারপর?
সেলিনা হোসেন: বগুড়া থেকে আমরা চলে যাই রাজশাহীতে। অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হই রাজশাহীর পিএন গার্লস স্কুলে। এই বিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করি। এরপর রাজশাহী মহিলা কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হই প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে। এই কলেজে এসেও সবার সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
আশিক মুস্তাফা: লেখালেখি তখনও শুরু করেননি?
সেলিনা হোসেন: টুকটাক, ওভাবে না। কবিতা লিখে লুকিয়ে রাখতাম। তবে কলেজে ওঠার পর নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করি। সব আরও রঙিন আরও বর্ণিল মনে হয়। একদিন কলেজ শিক্ষক প্রফেসর আব্দুল হাফিজ অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘হাউল’ বইটি পড়তে দেন। বইটি পড়ে অভিভূত হই। লাইব্রেরির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে স্থানীয় এবং জাতীয় পত্র-পত্রিকার সঙ্গে। ঢাকা থেকে পত্রিকা আসত কলেজ লাইব্রেরিতে। তখনই পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য বই পড়ার সুযোগ পাই। লেখালেখির তাড়নাটা বাড়তে থাকে।
আশিক মুস্তাফা: কত সালের কথা?
সেলিনা হোসেন: ৬৪-৬৫ সালের কথা। মূলত তখনই আমার লেখালেখির শুরুটা হয়। স্যাররা খুব স্নেহের চোখে দেখতেন। স্বপ্ন দেখাতেন লেখালেখিকে ঘিরে। আমিও লিখতাম। পাঠাতাম বিভিন্ন জায়গায়। লেখাও আসতে শুরু করে। একদিন শিক্ষক আব্দুল হাফিজ বলেন, ‘শুধু মেয়েদের পাতায় লেখালেখি করো না। এতে একটা বৃত্তে আটকে যাবে। আর মেয়ে হয়েছ বলে ঘরে বন্দি থাকলে চলবে না। অনেক এগিয়ে যেতে হবে তোমাকে।’ স্যারের কথাটা বেশ মনে ধরে। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি তখন নিজের একটা জগৎ তৈরি করে নিচ্ছিলাম। যেই জগৎ শুধুই লেখালেখিকে ঘিরে। তখন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা হতো পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজগুলোতেও। এর ভেতর আমাদের রাজশাহী কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে রাজশাহী আন্তঃবিভাগীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতা হয়। সেই প্রতিযোগিতায় গল্প লিখে গোল্ড মেডেল পাই। প্রতিযোগিতায় বাংলা-ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা ও ইংরেজিতে নির্ধারিত বক্তৃতার আয়োজন ছিল। সব বিভাগেই ভালো করি। এতে সবার দৃষ্টি পড়ে আমার দিকে। আমি তখন চেনা মুখ হয়ে যাই। স্যারদের স্নেহ ভালোবাসাও বেড়ে যায়। সেই বছরই রাজশাহী মহিলা কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে শিক্ষকরা শওকত ওসমানের ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ করেন। আর ওই নাটকে ‘মেহেরজান’ চরিত্রে অভিনয় করার জন্য আমাকে বলে। এটাই জীবনের প্রথম অভিনয়। আমার বিপরীতে তাতারীর চরিত্রটি করেছিল বান্ধবী সুফিয়া। সুফিয়া ছিল বেশ বড়সড়। ইয়া লম্বা। ওর পাশে আমাকে খুবই ছোট মনে হতো। রিহার্সেলে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। তবে মঞ্চে ভালোই সুনাম কুড়িয়েছিলাম।
আশিক মুস্তাফা: বাংলা একাডেমিতে কবে জয়েন করেন?
সেলিনা হোসেন: ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে। বাংলা একাডেমির গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছিলাম ১৯৬৮ সালে। চাকরি পাওয়ার আগের দু’বছর বিভিন্ন পত্রিকায় উপ-সম্পাদকীয় লিখতাম। তবে ৭০ সালে আরেকটি চাকরির ইন্টারভিউয়ের চিঠি পাই। পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে সরকারি কলেজের জন্য। সেই চাকরিও হয়। কলেজের চাকরির পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল সিলেটের এমসি কলেজে। সে সময় ছোট মেয়ে লারার বয়স দু’মাস থাকায় কলেজের চাকরিটি করতে পারিনি। সরকারি কলেজের অর্ধেক বেতনে বাংলা একাডেমির চাকরিতেই যোগ দিই শুধুই লেখালেখির কথা ভেবে। আগে অনেক কিছু পারলেও লেখালেখিতে জড়ানোর পর আস্তে আস্তে লেখালেখি ছাড়া অন্য সব যেন ভুলে যেতে থাকি!
আশিক মুস্তাফা: লারা এখন কোথায়?
সেলিনা হোসেন: (চোখ ঝাপসা হয়ে আসে সেলিনা হোসেনের। দেওয়ালে টাঙানো সাদা-কালো বিশাল ছবির দিকে তাকান আর আঁচলে চোখ মোছেন। তারপর বলেন) লারা তারা হয়ে হয়ে চলে গেছে আকাশের দেশে। ১৯৯৮ সালে। লারাকে হারানোর পর থেকে আর স্মৃতিসৌধে যেতে পারি না। লারা পাইলট হয়েছিল। এক বিকেলে আমাকে নিয়ে আকাশে উড়াল দিলো। পাখির চোখে দেখিয়েছিল স্মৃতিসৌধ। উপর থেকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না স্মৃতিসৌধ কী অসাধারণ! বুড়িগঙ্গাও দেখিয়েছিল। নদীর পানি তখন এত কালো ছিল না। ওপর থেকে লারা আমাকে দেখায় খেয়া ঘাটে নৌকায় বসে থাকা পাটপাঠির মতো রোগা এক মাঝিকে। বলে, জানো মা, আমার না খুব ইচ্ছে করছে এই লোকটাকে হেলিকপ্টারে তুলে ওপর থেকে নদীটা দেখাই। তার নৌকাটা দেখাই। বলি, এমন ইচ্ছে করছে কেন তোমার? লোকটা যে কখনও পাখি হয়ে এমন ওপর থেকে নদী আর নৌকা দেখতে পাবে না। এতে নিশ্চয়ই মজা পাবে লোকটা, ভালো লাগবে তার। কথাটা শুনে আমার মনে অন্যরকম এক ভালোলাগা খেলা করে যায়! একবার পাথরঘাটার আই ক্যাম্পে গেল লারা। ফিরে এসে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কান্নায় বুঁদ। আমি তার কাঁধে-পিঠে হাত বুলিয়ে কারণ খুঁজি। লারা বিছানা থেকে মুখ তুলে ফুঁপিয়ে বলে, জানো মা, পাথরঘাটার আই ক্যাম্পের এক বৃদ্ধা জীবনে কখনও ডাক্তার দেখেনি। দেখছ মা, তারা কতটা অবহেলিত?
এমন অসংখ্য মানবিক গুণে একাকার ছিল লারা। হয়তো এজন্যই অন্য দুই সন্তান মুনা আর সাকীবের চেয়ে লারার প্রতি একটু বেশিই দুর্বলতা ছিল আমার! ১৯৯৮ সালে লারার বিমান ক্রাশ করেছিল ঢাকার অদূরে পোস্তাগোলায়। (তিনি চোখ মোছেন। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বসে থাকি! একটু পর নীরবতা ভেঙে বলেন) লারা চলে যাওয়ার পর তার নামে ‘ফারিয়া লারা ফাউন্ডেশন’ বানিয়ে নারীদের অধিকার সচেতন ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে কাজ শুরু করেছি বরগুনায়। আর রাজেন্দ্রপুরে নারীদের দিচ্ছি ফ্রি ট্রিটমেন্ট।
আশিক মুস্তাফা: পানি খাবেন আপু?
সেলিনা হোসেন: না, ঠিক আছি আমি। হ্যাঁ প্রথম বইয়ের কথা বলি, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে চাকরির ইন্টারভিউ বোর্ডে শহিদ অধ্যাপক মনীর চোধুরীর মুখোমুখি হই। এমএ পাশ করার পরে শিক্ষক আব্দুল হাফিজ আমাকে বলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে লেখা প্রকাশিত গল্পগুলো নিয়ে একটি বই করতে। যে বইটি আমার বায়োডাটা খানিকটা সমৃদ্ধ করবে। স্যারের কথামতো প্রথম বইটাও করে ফেলি। সে সময়ে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ঢাকা টেলিভিশনে বই বিষয়ে একটি অনুষ্ঠান করতেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’-এর আলোচনা করেছিলেন। ইন্টারভিউ বোর্ডে মুনীর চৌধুরী বললেন, ‘গল্পগুলোতো ভালোই লিখেছ।’
তার এই কথাটা আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তির ছিল।
আশিক মুস্তাফা: বাংলা একাডেমিতে কী কাজ করতেন শুরুতে?
সেলিনা হোসেন: অইযে বললাম না, গবেষণা সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। পরে ‘অভিধান প্রকল্প’, ‘বিজ্ঞান বিশ্বকোষ প্রকল্প’, ‘বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলী প্রকাশ’, ‘লেখক অভিধান’, ‘চরিতাভিধান’ এবং ‘একশত এক সিরিজের’ গন্থগুলো প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করি। ২০ বছরেরও বেশি সময় শিশু-কিশোরদের ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করি। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন চাকরি থেকে অবসর নিই।
আশিক মুস্তাফা: ধানশালিকের দেশ-এ কাজ করতে এসে ছোটদের জন্য লেখালেখি শুরু করেছিলেন?
সেলিনা হোসেন: না। ছোটদের জন্য স্কুলে থাকতেও লিখেছি। তবে ধানশালিকের দেশ-এ কাজ করতে এসে ছোটদের লেখালেখিতে নিয়মিত হয়েছি বলতে পারো।
আশিক মুস্তাফা: আপনার প্রথম ছোটদের বই সাগর। এই কিশোর উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৯১ সালে। এই বই নিয়ে যদি বলতেন?
সেলিনা হোসেন: এটি আসলে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লিখেছি। শুধু তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জীবনযুদ্ধের কথাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি এই উপন্যাসে। শুধু তাই নয়, ছোটদের জন্য লেখা আমার গল্পে বর্ণমালা, কাকতাড়ুয়া, আকাশ পরি, অন্যরকম যাওয়া, যখন বৃষ্টি নামে, জ্যোৎস্নার রঙে আঁকা ছবি, মেয়রের গাড়ি, হিমিরুনের বন্ধুরা, এক রুপোলি নদী, গল্পটা শেষ হয় না, বায়ান্নো থেকে একাত্তর, চাঁদের বুড়ির পান্তা ইলিশ, মুক্তিযোদ্ধারা, সোনার তরীর ছোটমণিরা, পুটুস-পুটুসের জন্মদিন, নীলটুনির বন্ধু, কুড়কুড়ির মুক্তিযুদ্ধ, ফুলকলি প্রধানমন্ত্রী হবে এবং হরতালের ভূতবাবার দিকে তাকালেও দেখবে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জীবনযুদ্ধের কথা উঠে এসেছে এসব বইয়ে।
আশিক মুস্তাফা: যে জীবন ফেলে এসেছেন তাই ছোটদের লেখায় তুলে আনেন?
সেলিনা হোসেন: বলতে পারো তাই! আমি আমার দেখার জগৎটাকেই বেশি তুলে ধরার চেষ্টা করি। সেটা বড়দের হোক কিংবা ছোটদের। তবে ছোটদের লেখায় ভাবনাও থাকে। থাকে জীবন-ঘনিষ্ঠতাও।
আশিক মুস্তাফা: এই যাপিত জীবনও উঠে আসুক আপনার সামনের ছোটদের বইয়ে; সেই প্রত্যাশা করি আপু।
সেলিনা হোসেন: (লাজুক হাসি) দেখো না, ঘরে বসে আছি তবু লিখতে পারি না রাজ্যের ব্যস্ততার জন্য। কত সভা-সেমিনার, কত ওয়েবিনার। তবু ছোটদের জন্য নতুন বইয়ে হাত দিয়েছি। আশা করছি খুব শীঘ্রই সেটি শেষ করতে পারব।
আশিক মুস্তাফা: আপনার নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকলাম আপু। সে পর্যন্ত ভালো থাকবেন।
সেলিনা হোসেন: তুমিও ভালো থেকো। সাবধানে চলাফেরা করবে। সময় ভালো না!
আশিক মুস্তাফা: ঠিক আছে আপু।
সেলিনা হোসেন: সেলিনা হোসেন: আবার কথা হবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *