সঙ্গীসাথি শুধুই পাখি

  • ইনাম আল হক

আশিক মুস্তাফা: আপনাকে পাখি বিশেষজ্ঞ বলা হয় কেন?
ইনাম আল হক: বিশেষজ্ঞ মানে বিশেষ জ্ঞান। কোনো বিষয়ে কেউ বেশি জানলে তাকে বলা হয় বিশেষজ্ঞ। আমি পাখি নিয়ে একটু পড়া শোনা করেছি। সাধারণের চেয়ে বেশি জানি হয় তো তাই হয়তো অনেকে বিশেষজ্ঞ বলে। তবে এটা বিশেষণ। একটু বেশি জানা বলে তো কোনো শব্দ নেই। শব্দটা হচ্ছে বিশেষণ; বুঝলে?
আশিক মুস্তাফা: বুঝলাম। আচ্ছা, আপনি ছবি তোলেন। একজন পর্যটকও; কেমন ছবি তুলতে বেশি পছন্দ করেন? কী লিখতে ভালো লাগে? আর কোথায় কোথায় ভ্রমণ করেছেন?
ইনাম আল হক: একসঙ্গে এত প্রশ্ন? যাক, তবু বলছি— আসলে সবকিছুই পাখির জন্য। আমার তোলা ছবির নব্বই ভাগই পাখির। এই পাখির ছবি তুলতে গিয়ে আশপাশের কিছু ছবিও তুলেছি। আমার ভ্রমণও পাখিকেন্দ্রিক। পাখি দেখতে বন জঙ্গলে-জলাশয়ে এবং পাহাড়ে যেতে হয়। এসব জায়গায় যেতে যেতে সেসব জায়গার জন্য টান অনুভব করি। আর ওই যে অ্যান্টার্কটিকার কথা বললে। সেখানেও গিয়েছি কেবল পাখির জন্য।
আশিক মুস্তাফা: বিমান বাহিনীতে চাকরি করতেন আপনি। সেখান থেকে পাখি বিশেষজ্ঞ হলেন কেমন করে?
ইনাম আল হক: বিমান বাহিনীতেও গিয়েছি পাখি ভালোবাসি বলে। ছোটবেলা থেকেই পাখি ভালোবাসি। তাই আমি চাকরির ক্ষেত্রে বিমান বাহিনী বেছে নিয়েছি। বিমান কিন্তু মানুষ পাখিকে পুরোপুরি নকল করে বানিয়েছে। যেদিন থেকে আমরা পাখিকে নকল করা শিখেছি সেদিন থেকে আমরা আকাশে ওড়ার যন্ত্র বানাতে পেরেছি। তো আমি যখন ছোট তখন নতুন এসেছে বিমান। বিমান আমাদের কাছে ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ছোটবেলায় যেসব কার্টুন দেখতাম সেগুলোও ছিল বিমান কেন্দ্রিক। সংবাদপত্রে যা পড়তাম তাও বিমান নিয়ে। এভাবে একসময় করাচিতে অবস্থিত তৎকালীন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হই। তারপর বিমানের চাকরি হয় আমার। আর পাখির প্রতি ভালোবাসা তো সেই ছোটবেলা থেকেই!
আশিক মুস্তাফা: উত্তর মেরু ও অ্যান্টার্কটিকা জয়ী একমাত্র বাংলাদেশি পর্যটক বলা হয় আপনাকে। দেশের আর কেউ এখনও যায়নি অ্যান্টার্কটিকায়?
ইনাম আল হক: আমি ছাড়াও হয়তো অনেকেই গিয়েছে। তা আমার জানা নেই। কারণ, অ্যান্টার্কটিকায় কে গেল না গেল তার হিসেব রাখা হয় না। তবে উত্তর মেরুতে যারা গিয়েছে তাদের তালিকা আছে। এই হিসেবে বলা যায়, দু’জায়গাতে গিয়েছে এমন একমাত্র বাংলাদেশি কেবলই আমি।
আশিক মুস্তাফা: উত্তর মেরু ভ্রমণে গিয়ে রাশান পাইলট ও বেস ক্যাম্পের লোকজনের কাছ থেকে সাইবেরিয়ার গ্রামে হাতে তৈরি ‘সালিঙ্কা’ নামের এক জোড়া জুতা উপহার পেয়েছিলেন। সেই জুতা এখন কোথায়?
ইনাম আল হক: আছে এখনও সেই জুতো। তবে পরা হয়নি। ফেরার পথে তারা আমাকে জুতোটা দিয়েছিলো। গরম অথচ ভারী নয় এমন জুতো বানিয়েছে তারা। রাশান ইঞ্জিনিয়ারের দেওয়া সেই জুতা নিয়ে এসেছি। মজার বিষয় হচ্ছে, তাদের ভাষা আমি জানি না। তারাও জানে না আমার ভাষা। অথচ আমরা অনেক গল্প করেছি। তাদের কাছ থেকে উপহারও পেয়েছি। আসলে মনের ভাষাই বড়।
আশিক মুস্তাফা: দেশে কত কত মেলা হয়! এই মেলার মধ্যে অন্যতম ব্যতিক্রমী মেলা আপনার পাখিমেলা। এই পাখিমেলার আইডিয়া কেমন করে এলো মাথায়? কী থাকে সেই মেলায়?
ইনাম আল হক: পাখিমেলা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই হয়। তবে বাংলাদেশে ছিল না। বাংলাদেশে আমি শুরু করেছি। শুরুর দিকে মানুষ ভাবত, পাখি মেলায় পাখি দেখা যাবে। খাঁচায় পাখি থাকবে। সে তো আমরা করব না। আমরা খাঁচার বিরুদ্ধে। পাখিমেলা হচ্ছে লালন মেলার মতো। লালন মেলায় লালনকে দেখা যায় না পাখিমেলায়ও পাখি দেখা যায় না। তবে পাখি নিয়ে অনেক আয়োজন থাকে। টেলিস্কোপ রাখা হয়। তা দিয়ে পাখি দেখা যায়। এই পাখিমেলা শুরু করেছি ২০০০ সাল থেকে। ঢাকার একটি স্কুলে প্রথম পাখিমেলা করি। দ্বিতীয় বছর পাখিমেলা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এপর দেশের বিভিন্ন স্কুলে মেলা করেছি। গ্রামের স্কুল থেকে ছোটরা চিঠি লিখে। সেসব স্কুলে গিয়েও আমরা মেলা করি। নোয়াখালীর জয়াগে একটি স্কুলে গিয়ে মেলা করেছি। এমন আরও অসংখ্য স্কুলে গিয়েছি। ছোটরা দেশের যে কোন স্কুল থেকে চিঠি লিখলে সেই স্কুলে গিয়ে পাখিমেলার আয়োজন করার চেষ্টা করি এবং সামনেও করব।
আশিক মুস্তাফা: জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস এলেই আপনি প্রতি বছর হারিয়ে যান! আপনি ‘পথ হারিয়ে কোন বনে যাই…’ এর মতো বনে হারিয়ে যান? হারিয়ে গিয়ে কী করেন?
ইনাম আল হক: ঠিকই বলেছো। গত বিশ বছর ধরে আমি এই তিনমাস ঘরের বাইরে থাকি। এই সময়টায় আসলে শীতের পাখি আসে আমাদের দেশে। জলাশয়ে যাই। আর বনে যাই বনের পরিযায়ী পাখি দেখতে পাখি গোনার দায়িত্ব যেহেতু আমার তাই।
আশিক মুস্তাফা: মানুষ গোনে টাকা আর আপনি গোনেন পাখি। কেমন করে পাখি গোনেন। এক পাখি বারবার গোনা হয়ে যায় না? হিসেবটাইবা রাখেন কেমন করে?
ইনাম আল হক: পাখি গুনেই আনন্দ পাই আমি! পাখি গোনায় মোটেও কষ্ট নেই। তবে জীবিত কোনোকিছু গোনাই ১০০ ভাগ সঠিক হয় না আমরা যে মানুষ গণনা করি ১০ বছর পরপর তাও সঠিক নয়। যেই গুনে শেষ করা হয় অমনি হাজার হাজার মানুষ জন্মায়। কয়েকশ লোক মরে যায়। আসলে সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সংখ্যা যদি ৯৫ ভাগ সঠিক হয় তবে অনেক কাজ হয়। আর জলচর পাখি গণনায় ৯৫ ভাগেরই বেশি সঠিকভাবে গণনা করা যায়। জলাশয়ের পাখি অনেক সহজেই গোনা যায়। তারা গাছের আড়ালে থাকলেও পানিতে তাদের ছায়া দেখা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *