- অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন
অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন। একজন সমাজকর্ম ও শিক্ষাবিদ। সিনিয়র পরিচালক বিপণন, উন্নয়ন ও পরিকল্পনা হামদর্দ ল্যাবরেটরীজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশ। উপদেষ্টা, হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ। অধ্যাপক, রওশন জাহান ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, লক্ষ্মীপুর। ছোটদের সময় ঈদসংখ্যার জন্য ছোটবেলার ঈদ স্মৃতি নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ছোটদের সময়ের সম্পাদক মামুন সারওয়ার।
ছোটদের সময়: আপনি ঈদের দিনে যে খেলাধুলার কথা বললেন, সেগুলো কী ধরনের খেলা ছিল?
কামরুন নাহার হারুন: আমরা ১০০ মিটার দৌড় দিতাম। তারপরে গোল্লাছুট কানামাছি খেলতাম। এগুলো খেলার নাম কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা ভুলেই গেছে।
ছোটদের সময়: আপনার শৈশবের ঈদ তো দারুণ কেটেছে। আচ্ছা, তখনকার দিনে আপনাদের ঈদের দিনের পরিবেশটা কেমন ছিল?
কামরুন নাহার হারুন: আমাদের ছোটবেলা ছিল রঙিন। আমরা সবাই রোজা রাখতাম। আমি ক্লাস ফোর কি ফাইভ থেকে রোজা রাখি।
রোজা মানে আমাদের কাছে ছিল আনন্দের। রোজা শেষে, যেদিন ঈদের চাঁদ দেখা যেত সেদিন থেকে শুরু হতো আমাদের মেহেদি পরা। লাল-নীল কাগজ কেটে বাড়ি সাজানো।
বিশেষ করে ঈদের জামা কিনে আমরা কাউকে দেখাতাম না। লুকিয়ে রাখতাম। আমরা মনে করতাম নতুন জামা দেখলেই চমকটা দিতে পারব না মনে হয়।
আর কী, আমাদের সময় তো বেশি জামাকাপড় কিনতে পারতাম না। বাবা একটা করে জামা দিত সবাইকে। ওইটাই আমরা যত্ন করে রাখতাম। আর কতবার যে বের করে দেখতাম। এই আনন্দ ছিল অন্যরকম।
ঈদের দিন সকালে আমরা সবাই একসাথে থাকতাম। মেলা হতো একসাথে ঘুরতে যেতাম। প্রাইমারি স্কুলের মাঠে মেলা হতো। আমরা সদলবলে চলে যেতাম ওইদিন। কত্তকিছু কিনে খেতাম। সে এক অন্যরকম আনন্দ।
ছোটদের সময়: শৈশবের ঈদের মজাদার স্মৃতি নিয়ে কিছু বলবেন?
কামরুন নাহার হারুন: ঈদে তো সবারই মজাদার স্মৃতি থাকত। আমারও ছিল। কিন্তু আমার মজাদার স্মৃতির চেয়ে একটা করুণ স্মৃতিও ছিল। আমাদের বাড়ির পাশে দুটো পরিবার থাকত। আমাদের পুলপার্কের কাছে। ওরা অনেক গরিব ছিল। আমরা তো সবাই নতুন জামা পরতাম। কিন্তু ওদের ঘরে ছেলেমেয়েগুলো ঈদের দিনেও চুপচাপ বসে থাকত। কারণ, ওদের নতুন জামা কেনার টাকা নাই। একটা মেয়ে বো জামার জন্য কাড়া করত। আমার কাছে সে জিনিসটা পীড়া দিত। এখনও দেয়।
তখন থেকে আমার মাথায় বুদ্ধি এলো, আমি যদি আমার মাতা একটা জামা তাকে কিনে দিতে পারতাম। ওই ভাবনাটা এখনও আমার মনে আসে। এজন্য, জামার আশেপাশে যারা আছে, আমি তাদের দেওয়ার জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাই। যদিও আমি নিজেও কিনি না। কারণ এই যে, মেয়েটার কথা মনে আসে বারবার।
আরও মনে পড়ে, আমরা খেতাম মোরগ পোলাও। আর ওরা খেত কাউনের চালের ভাত। আমার তখন থেকে মনে হতো, ইস, এদের জন্য যদি কিছু করতে পারতাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমি চেষ্টা করি।
ছোটদের সময়: তখনকার ঈদে ছোটরা কী ধরনের পোশাক পরে ঘুরঘুর করত?
কামরুন নাহার হারুন আমাদের সময় ছিল সেলাই করা জামা। লাল টুকটুকে জামা। আমার আম্মা আবার সেলাই করতে পারত। আম্মা আমাদের ফ্রক বানিয়ে দিত। অথবা আব্বাও বাজার থেকে ফ্রক কিনে আনত কোনো কোনো সময়। টুপিসও পরতাম আমরা।
কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসে, আমরা দেখি এখনকার ছেলে-মেয়েরা এগুলো আর জানে না। তারা পরে আধুনিক আধুনিক সব জামাকাপড়।
ছোটদের সময়: ঈদে তখন কেমন মজা করতেন?
কামরুন নাহার হারুন: ওই বললাম, ছোটবেলার ঈদ মানেই আমাদের মেলায় যাওয়া। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বাসায় যাওয়া। সেমাই, পিঠা আরও যে কত্তকিছু খেতাম সবাই। এটাই ছিল আমাদের আনন্দ।
ছোটদের সময়: ঈদের দিনের মেলাটা মূলত কীসের মেলা?
কামরুন নাহার হারুন: এটা ছিল গ্রামীণ একটা মেলা। বেলুন, বাঁশি অথবা লাল-নীল কাগজের ঘুড়ি পাওয়া যেত। আমরা সদলবলে গিয়ে কিনতাম। এই রকম মেলা ছিল আমাদের।
ছোটদের সময়: তখনকার ঈদ এখনকার ঈদের মধ্যে কোন ধরনের পার্থক্য খুঁজে পান?
কামরুন নাহার হারুন: আসলে কী আমরা যে সোনালি শৈশবের ঈদ পার করে এসেছি এখনকার ছেলেমেয়েরা তা বুঝবে না। আমরা ঈদের আগেরদিন চাঁদ দেখতাম হল্লা করে। দাঁড়িয়ে থাকতাম কখন চাঁদ উঠবে।
আর এখনকার ছেলেমেয়েরা চাঁদ দেখা তো দূরের কথা কীসের চাঁদ উঠল এটাই ভালো করে জানে না। সবাই মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মোবাইলেই চাঁদ দেখে নেয়।
আমরা ঈদের আগেরদিন মেহেদি পাতা বেটে তারপর নিতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো গাছের মেহেদি জানেই না। এখনকার ছেলে-মেয়েরা পার্লারে গেল, মেহেদি দিলো, চলে এলো।
আমরা তো ঈদের দিন বিশেষ করে মোরগ পোলাও খেতাম। আর এখন ঈদের দিন ব্যুফেতে খাও, বন্ধু নিয়ে দূরে ঘুরতে যাওয়া। আমরা তখন বেশি দূর মানে, ঈদের পরদিন নানাবাড়িতে যেতাম। তখনকার ঈদের সাথে এখনকার ঈদের অনেক তফাত।
ছোটদের সময়: এখনকার অভিভাবকরা কি তার ছেলেমেয়েদের তখনকার ঈদের মজা বোঝাতে পারবে বলে মনে করেন?
কামরুন নাহার হারুন: আমরা যদি ইচ্ছে করি, আমাদের ছেলেমেয়েদেরও মনস্তাত্ত্বিক দিকে খেয়াল রেখে তাদেরও সেই পুরনো ঈদের দিনে নিয়ে যেতে পারি। তাদের সাথে আগের দিনের কথা শেয়ার করে ওগুলো করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারি।
যাদের গ্রামে বাড়ি আছে, তারা তাদের ছেলে-মেয়েদের গ্রামে নিয়ে যেতে পারি। তাহলেই ছেলে-মেয়েরা কিছুটা হলেও আগের ঈদের আঁচ অনুভব করতে পারবে।
আসলে কী, কথিত আধুনিকতার ভিড়ে আমাদের সোনালি ঈদটা হারিয়ে যাচ্ছে।
ছোটদের সময়: আপনারা ঈদের দিনে কী ধরনের খাবার খেতেন? সেটা নিয়ে যদি একটু বলতেন?
কামরুন নাহার হারুন: আমাদের ঈদের সকাল শুরু হতো সেমাই পায়েস দিয়ে। ঘুম থেকে উঠে গোসল করে দেখতাম এগুলো টেবিলে আছে কি না। তারপর নামাজের পরে সবাই মিলে মোরগ পোলাও গরুর গোশতসহ বেশকিছু মজা করে খেতাম।
ছোটদের সময়: এই যে পথে পথে অনেক শিশু দিনাতিপাত করে। তাদের জন্য কী ব্যবস্থা নিতে পারি?
কামরুন নাহার হারুন: আমি তো কুমিল্লায় বড় হয়েছি। আমার শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরে। আমি ঈদের দিন পথশিশু বা নৌকায় যারা বেদে, জেলে ছিল ওদের সন্তানদের জন্য খাবার পাঠিয়ে দিতাম।
আমার মনে হতো ওরা খেলে আমারও খাওয়া হয়ে যায়। পোশাকসহ খাবার পাঠিয়ে দিতাম। মনে পড়ত, আজি মদিনার ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দের কথা। এরকমই তো হওয়া উচিত।
সবাই মিলে একসাথে আমরা আনন্দ করব। এটাই তো। প্রয়োজনে আমি কম খাব তাও সবার সাথে খাব। আমার জন্য যদি পাঁচটা ঘর ঈদের আনন্দ পায়, এটার চেয়ে তো আর বড় আনন্দ হয় না। আমাদের সবাইকে তার নিজ নিজ জায়গা থেকে ওদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ছোটদের সময়: নীতিনৈতিকতা নিয়ে আমাদের অভিভাবক কী কী করা উচিত? আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
কামরুন নাহার হারুন: সবার আগে আমাদের বাচ্চাদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। আমরা যে ধর্মের হই না কেন, সবার আগে নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে।
আমি আমার জায়গা থেকে যেমন আমার ছেলে-মেয়েদের নামাজ পড়া, কোরআন পড়া শিক্ষা দেবো। তেমনি অন্যান্য ধর্মের অভিভাবকদেরও উচিত তাদের সন্তানদের নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া।
একটা ছেলেমেয়ের মধ্যে যখন ধর্মীয় শিক্ষা থাকে তখন তাদের মনে খারাপ কোনো চিন্তা আসবে না। দেশের যে সামাজিক অবক্ষয় হয়েছে বা হচ্ছে এটা প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। তো প্রত্যেক অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে যেন ধর্মীয় শিক্ষা দিতে পারি সবাই।
আরেকটা জিনিস হচ্ছে, আমরা যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারের দিকে যাচ্ছি। যৌথ পরিবারে একটা ছেলে-মেয়ে বিভিন্ন বিষয় শেখে যা একক পরিবারে পায় না। এর জন্য আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে।
ছোটদের সময়: তখনকার দিনে কী ধরনের ম্যাগাজিন পড়তেন?
কামরুন নাহার হারুন: ম্যাগাজিন আসত কম। সামনে যেটাই আসত সেটাই পড়তাম। তবে ফেলুদা বা গোয়েন্দা কাহিনিগুলো বেশি পড়তাম। চাচা চৌধুরী পড়তাম। বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখে পড়তাম। ধন্যবাদ ছোটদের সময়কে।