- মাহবুবুল হক
১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। এখন থেকে ৫০ বছর আগে আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম।
অনেকদিন থেকে বারবার এ ধরনের কথা তোমরা শুনে আসছো। এ বিষয়ে তোমরা ইতোমধ্যে অনেক কিছু শুনেছ। অনেক কিছু জেনেছ। বাড়িতে দাদা দাদির কাছে এবং বাবা চাচা ফুপুদের কাছে অথবা নানার বাড়িতে নানা-নানি, মামা-মামি এদের কাছে। ওরা যখন বিজয়ের কথা তোমাদের শোনাচ্ছিল তখন ওঁরা তোমাদের মতো আমোদ-আহ্লাদে হাসিখুশি মনে কথাগুলো তোমাদের সামনে তুলে ধরছিল। আমাদের দাদা-দাদি এবং নানা নানিরা ভূত জিন পরিসহ রূপকথার গল্প শোনাতো। শোনাতো রাজা-রানির গল্প এবং নানা কল্পকাহিনি আর তোমাদের দাদা-, নানা-নানি শোনায় মহান স্বাধীনতার কথা। মুক্তিযুদ্ধের কথা। এবং বিজয়ের কথা। আমাদের দাদা-দাদি, নানা-নানিরা ঘুম পাড়ানোর সময় গল্প করতো। আর তোমাদের দাদা-দাদিরা তাদের গল্প বলে যখনই তারা সময় পায় এবং যখন তোমাদের সময় হয়। আমরা গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম আর তোমরা গল্প শুনতে শুনতে আনন্দে লাফাতে থাকো। ঘর মাত করে ফেলো। বাড়ি মাত করে ফেলো। যে রাতে তোমরা এসব শুনো সে রাতে তো তোমাদের ঘুম আসে না। নানা রকম উত্তেজনায় তোমরা ছটফট করতে থাকো। ঘুম যদিও বা আসে, ঘুমের মধ্যে তোমরা যুদ্ধ দেখো, রাইফেল, কামান, বিমান, এধরনের কতকিছু দেখো। আমাদের দাদা-দাদি এবং নানা-নানি ঘুমপাড়ানি গান গাইতে গাইতে এই দুনিয়া থেকে আরেক দুনিয়ায় চলে গেছেন। আর তোমাদের দাদা-দাদি এবং নানা নানিরাও আন্দোলনের, সংগ্রামের আর যুদ্ধের গল্প শোনাতে শোনাতে এ দুনিয়া থেকে আরেক দুনিয়ায় চলে যাচ্ছেন। গল্প চলছে গত ৫০ বছর ধরে। তোমরা তো শুনছ মাত্র কয়েক বছর ধরে। মনে হয় প্রাইমারি স্কুল পড়াকালীন সময় থেকে। তোমরা আন্দোলন-সংগ্রাম-যুদ্ধ-স্বাধীনতা-বিজয় এসবের গল্প শুনে হাসছ, আনন্দ করছ। তোমাদের মতো বয়সে আমরা যেসব গল্প শুনেছি সেগুলোর কিছু কিছু স্কুলের বইতে লেখা ছিল ঠিক। তেমনি তোমরা এখন যে গল্প শুনছ সেগুলো কিন্তু তোমাদের স্কুলের বইতে আছে। আমাদেরগুলো বইতে সব ছিল না। তোমাদেরগুলো সব বইতে আছে। সে দিক থেকে যদি আমরা বিচার করি তাহলে আমাদের সময়ের গল্পের চেয়ে তোমাদের সময়ের গল্প অনেক উত্তম। অনেক দরকারি। অনেক প্রয়োজনীয়। বিজয় বলতে কী বুঝায় এবং বিজয় দিবস বলতে কি বুঝায় তা তো তোমরা ভালোভাবেই জানো। তারপরেও আবার এসব নিয়ে কেন আমরা কথা বলছি, কেন আমরা আলাপ-আলোচনা করছি, এ নিয়ে তোমাদের মনে কৌতূহল থাকতে পারে, মনে হয় আছেও। কারণ বিষয়টা হাসিঠাট্টার বিষয় নয়, একতরফা আনন্দের বিষয় নয়, একরাশ সুখ শান্তি ও স্বস্তির বিষয় নয়। বিজয় তো এসেছে অনেক পরে। তার পূর্বে শতশত বছর চলে গিয়েছে শোক-দুঃখ, যন্ত্রণা-কষ্ট আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানা রকম যুদ্ধ। সেই বিষয়গুলো তোমরা কমবেশি জানো।
সতেরোশ সাতান্ন সালে সাত সাগর তেরো নদীর ওপার থেকে ইংরেজরা এসে আমাদের দেশ দখল করে নেয়। এই দখলের অর্থ হলো ইংরেজরা আমাদের প্রভু হয়ে যায়। আমাদের মালিক হয়ে যায়। আমাদের শাসনকর্তা হয়ে যায়। আজ আমরা যেমন স্বাধীন ইংরেজরা আমাদের দেশ দখল করার আগে আমরা তেমনি স্বাধীন ছিলাম। আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের সুখ, আমাদের শাস্তি, আমাদের স্বস্তি, আমাদের আনন্দ, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু আমাদের শিক্ষাদীক্ষা, আমাদের খেলাধুলা, আমাদের বিনোদন, এসব দেখে ওরা হিংসায় পুড়েছিল। যে ইংরেজরা আমাদের সুন্দর দেশটাকে দখল করে নিয়েছিল, যারা আমাদেরকে পরাধীন করেছিল, যারা আমাদের শাসক হয়েছিল, তারা ছিল ভয়ংকর হিংসুটে। তারা শুধু নিজেদেরকেই ভালোবাসত। অন্যদেরকে ঘৃণা করত। অন্যদের ভালো ওদের মনে কষ্ট দিত। ওরা কারো ভালো দেখতে চাইতো না। ওরা ছিল ব্যবসায়ী। ইংরেজদের তখন সহায়-সম্পদ খুব বেশি একটা ছিল না। মূলত তারা ছিল জেলে। মাছ ধরা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় পেশা। মাছ ধরার নৌকা বানানোর বিষয়ে ওরা পারঙ্গম হয়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে তারা জাহাজ বানাতে শুরু করল। এরপর তারা শিক্ষাদীক্ষায় দুর্বল দেশগুলোতে জাহাজের মাধ্যমে যেতে শুরু করল। এভাবে তারা আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ দখল করে ফেলল। দখল করলো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশ। সাথে সাথে তাদের নজর পড়ল ভারত উপমহাদেশের দিকে। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অনেক সম্পদ ছিল কিন্তু শিক্ষাদীক্ষায় এখানকার লোকেরা পিছিয়ে পড়েছিল। মোগলদের কথা তোমরা শুনেছ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই উপমহাদেশ মুসলিমদের শাসনের অধীন ছিল। তারা যখন দুর্বল হয়ে পড়ল তখন ভারতের বেশ কিছু এলাকা স্বাধীন হয়ে গেল।
উপমহাদেশটা নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেল। মোগলরা তো ভারতের অধিবাসী ছিল না। তারা এসেছিল মধ্য এশিয়া থেকে। এদেশের আদিবাসীরা মোগলদের কখনও ভালো চোখে দেখেনি। তারা সবসময় মোগলদের পতন চেয়েছিল। বাংলা বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ নিয়ে আমাদের দেশটা তখন অনেক বড় দেশ ছিল। দেশটি ছিল স্বাধীন। নবাব ছিল এদেশের শাসনকর্তা। এদেশের সনাতন ধর্মের লোকেরা ইংরেজ ব্যবসায়ীদের সাথে হাত মিলিয়ে এদেশের স্বাধীনতা ধ্বংস করে। আমাদের সোনার দেশটি পরাধীন হয়ে যায়। এরপর লড়াই-সংগ্রাম বিদ্রোহ আন্দোলন চলতেই থাকে। মুসলিমরা এসব যুদ্ধ আন্দোলন বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো স্বাধীনতা বিদ্রোহ, যার নাম দিয়েছিল ইংরেজরা সিপাহি বিদ্রোহ, খেলাফত আন্দোলন, ফকির মজনু শাহ আন্দোলন, তিতুমিরের বাঁশেরকেল্লার আন্দোলন, হাজি শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন, জিহাদ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন আরো ছোট বড় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম যুদ্ধ শেষে ইংরেজরা এই উপমহাদেশ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয় ইংরেজরা এই উপমহাদেশ শাসন করে ১৯০ বছর। ১৯৪৭ সালে সনাতন ধর্মের লোকেরা মুসলিমদের মধ্যে অর্বাচীন কিছু নেতা ও ইংরেজরা মিলে ষড়যন্ত্র করে দ্বিজাতিতত্ত্বের নামে ভারত উপমহাদেশকে দুই ভাগে ভাগ করে একটির নাম দেয় ইন্ডিয়া আরেকটি নাম দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের ভাগে পড়ে দুইটি পৃথক অঞ্চল মাঝে ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ার পূর্বে একটি অঞ্চল আর ইন্ডিয়ার পশ্চিমে আরেকটি অঞ্চল এই দুই এই দুই পৃথক অঞ্চল নিয়ে মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান নামক একটি দেশ সৃষ্টি করা হয়। এই দেশের দুটি অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান ছিল হাজার মাইলের। পর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ে বাংলা অঞ্চলের পূর্বের অংশ অর্থাৎ পূর্ববাংলা। পশ্চিমবাংলা ইন্ডিয়ার অংশ হয়। উড়িষ্যা এবং বিহারও ইন্ডিয়ার ভাগে পড়ে। পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব-পাকিস্তান রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে পাকিস্তানের রাজধানী করা হয় করাচি নগরে। পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা। যে ঢাকা এখন বাংলাদেশের রাজধানী। এভাবেই আমরা এক ধরনের স্বাধীনতা পেলাম। স্বাধীন দেশ পেলাম। কিন্তু দেখা গেল এই স্বাধীন দেশের মালিক-মুখতার হলো পশ্চিম পাকিস্তানের ধনী ও বণিক শ্রেণি। এই ধনিক-বণিক শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এরা মিলিতভাবে পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করে। ইংরেজদের আমলে আমরা যেমন ছিলাম প্রজা। স্বাধীনতার পরেও আমরা সেই ধরনের প্রজা রয়ে গেলাম। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। আমাদের প্রজা-অবস্থা ফিরে না। আমাদের দুঃখ বাড়তে থাকে। কষ্ট বাড়তে থাকে। আমরা আবার ধীরে ধীরে গরিব হতে থাকি। আমাদের স্বপ্ন এবং সাধনা ধ্বংস হয়ে যায়। আমাদের নিকট পূর্বপুরুষগণ উপলব্ধি করেন, একটি স্বাধীন দেশ অর্জন করলেও এর মালিক পূর্ববাংলার মানুষেরা হতে পারেনি। পূর্ববাংলার মানুষ আগের মতোই পরাধীন থেকে গেল। যতই দিন যায় ততই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের জুলুম অত্যাচার বাড়ে। এমনকি তারা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। এই অবস্থায় আসার পর পূর্ববাংলার মানুষ এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষার আন্দোলন। স্বাধীনতার মাত্র এক বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে। এই আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে ১৯৫২ সালে। ১৯৫৪ সালে শাসকদল ভোটে হেরে যায়।
মুসলিম লীগের পরিবর্তে আওয়ামী মুসলিম লীগ সামনে এসে দাঁড়ায়। এই আওয়ামী মুসলিম লীগের বর্তমান নাম আওয়ামী লীগ।
প্রথমে এই দলের নেতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরবর্তীতে এর নেতা হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সরাস শুরু করেন। শুরু হয় পূর্ববাংলার মানুষ ও তাদের নেতাদের ওপর জুলুম অত্যাচার। অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলন সফল হয়। আমরা ২৬শে মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভ করি। এই স্বাধীনতাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক ও সেনাবাহিনী গ্রহণ করতে পারেনি। তারা এই নতুন দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে কারারুদ্ধ করে রাখে। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করতে থাকে। বাড়ি ঘর দুয়ার আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। মা-বোনদের ইজ্জত সম্মান নষ্ট করতে থাকে। এই অত্যাচারী ও জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে দেশের সব শ্রেণীর মানুষ যুদ্ধ শুরু করে।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর পশ্চিম পাকিস্তানি বা পাকিস্তানিদের উচিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নিয়ে অবশিষ্ট পাকিস্তানে চলে যাওয়া। তারা তা না করে আমাদের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে বসে। এবং এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অত্যাচার জুলুম হত্যা ও ধ্বংস শুরু করে। এই ধ্বংসের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশের মানুষ শত্রুদের বিরুদ্ধে জীবন পণ লড়াই শুরু করে। সেই লড়াই শেষ হয় ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। এই মহান লড়াই ও যুদ্ধে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। পরাজিত হয় পাকিস্তান। মহান বিজয় লাভের এই দিন বা দিবসকে আমরা বিজয় দিবস বলি। এই দিবসটি আমাদের দেশের জন্য, জাতির জন্য এবং রাষ্ট্রের জন্য মহা গৌরবের দিন। এই দিনে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে পেরেছি। এই দিন আমাদের জন্য মহা আনন্দের দিন, খুশির দিন। আসো সবাই মিলে আমরা পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তালার দরবারে জাতিগতভাবে শোকর গুজার করি। জাতিগতভাবে আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। এবং সর্ব মুহূর্তে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে স্মরণ করেছি এবং তাঁর ইচ্ছার ওপর ভরসা করেছি। আমাদের এই মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন: ‘রক্ত দিয়েছি আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ’। এই ইনশাল্লাহ ছিল আমাদের বিশ্বাস আস্থা ও ভরসার একমাত্র স্থল। আমাদের জাতীয় চেতনার মহান উৎস।