- মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান
ভাষা এক অদ্ভুত জিনিস। এর রহস্য উদ্ঘাটন করা সত্যিই কঠিন ব্যাপার। কবে থেকে মানুষ ভাষা ব্যবহার শুরু করেছে এ নিয়ে দ্বিধার অন্ত নেই। তবে মানব জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষার ইতিহাসের ঐক্য আছে। কারণ মানুষ জন্মের পর থেকেই ভাষা ব্যবহার করেছে। সে ভাষা যদিও বর্তমানের মতো ছিল না। বনে-জঙ্গলে মানুষের বাস ছিল। ঘরবাড়ি ছিল না। গায়ে ছিল না পোশাক। পশু-পাখি যেমন করে বাঁচে তেমনি ছিল তাদের বাঁচার উপায়। প্রকৃতি থেকে যা পেত তা-ই খেয়ে মানুষ জীবনধারণ করত। পশুর মতো জীবনে মানুষ ভাষার ব্যবহার করত পশুর মতো। কিন্তু সময় যত গড়ালো ততই মানুষ অনেক কিছুই শিখতে লাগল। যেমন— আগুন আবিষ্কার, সেচ পদ্ধতির উদ্ভাবন কিংবা কৃষির প্রচলন। মানুষের সংস্কৃতি বিকাশে তিনটি স্তরের উল্লেখ করা হয়ে থাকে— বন্যস্তর, বর্বরস্তত্মর ও সভ্যন্তর। বন্যস্তর ও বর্বরস্তরে মানুষর তেমন কোনো বিশেষ চাহিদা ছিল না। সভ্যস্তরে মানুষের প্রয়োজন বৃদ্ধি পেতে থাকল। সে আর বন-বাদাড়ে থাকতে আগ্রহী নয়। তাই নির্মাণ করতে লাগল ঘরবাড়ি। পোশাক তার চাই। তাই পোশাকের ব্যবস্থা করল। এভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন অত্যাবশ্যক হয়ে উঠল। প্রয়োজনই আবিষ্কারের জনক— বাক্যটি তখন থেকেই ব্যবহৃত হতে থাকল।
মানুষের সংস্কৃতি পরিবর্তনের বেলায় ভাষার ভূমিকা ছিল। ভাষা ছাড়া কোনোকালেই মানুষের কোনো গতি ছিল না। ভাষার ব্যবহারে মানুষ মনোযোগী হলো। আজ থেকে প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে আধুনিক মানুষের জন্ম হলেও সুসংহত ভাষার আবিষ্কার হয়েছে আরও অনেক পরে। প্রায় আশি বছর আগে সুসংহত ভাষার জন্ম। পশু-পাখিরও ভাষা আছে। তারাও একে অপরের সঙ্গে ভাষার সাহায্যেই যোগাযোগ করে। পশু-পাখির ভাষার সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষের ভাষায় তা নেই। মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে কথা বলতে পারে। মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। বই প্রকাশ করে তার কথাগুলো সংরক্ষণ করতে পারে। বলা হয়ে থাকে ‘ভাষাই মানুষকে মানুষ করেছে’। ভাষার শক্তিতেই মানুষের শক্তি। পৃথিবীতে ভাষা আছে সাত হাজারের অধিক। এসব ভাষার বংশ বা পরিবার আছে। কয়েকজন মানুষ নিয়ে যেমন একটি পরিবার হয়, তেমনি কতগুলো ভাষা নিয়ে হয় একটি ভাষা-পরিবার। ভাষা-পরিবারের সংখ্যা কত তা নিয়ে মতভেদ আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেছেন, প্রায় দুশোটি ভাষা-পরিবার আছে। এর মধ্যে ২৮টি মোটামুটি ব্যবহৃত হয়; আর বেশি ব্যবহৃত হয় তেরোটি। ভাষা-পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ হলো ইন্দো-ইউরোপীয়। পৃথিবীর প্রভাবশালী ভাষা যেমন— ইংরেজি, জার্মান, ইতালি, ফরাসি, বাংলা, হিন্দি প্রভৃতি ভাষা এই ভাষাবংশের অন্তর্গত। বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা।
বাংলাদেশে চারটি ভাষাবংশের ভাষা প্রচলিত আছে। এগুলো হলো— ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ, চীনা-তিব্বতি ভাষাবংশ, দ্রাবিড় ভাষাবংশ ও অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাবংশ। বাংলাদেশে বাংলা সহ ভাষা আছে একচল্লিশটি। এদেশে চল্লিশ ভাষা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বাংলাদেশে আছে পঞ্চাশটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। তারা চল্লিশটি ভাষায় কথা বলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চাকমাদের ভাষা চাকমা, ত্রিপুরাদের ভাষা ত্রিপুরা, পাত্রদের ভাষা লালেং বা পাত্র, গারোদের ভাষা আচিক, সাঁওতালদের ভাষা সাঁওতালি প্রভৃতি। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সব ভাষার লিপি নেই। লিপি আছে মাত্র আটটি ভাষার। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চল্লিশটি ভাষার মধ্যে চৌদ্দটি ভাষা বিপন্ন। বিপন্ন মানে হলো বিপদগ্রস্ত। অর্থাৎ এসব ভাষা বিপদের মধ্যে আছে। কিছুদিনের মধ্যেই তা মরে যাবে। ভাষা মরে কীভাবে? কোনো ভাষায় যদি কথা বলার মানুষ না থাকে তবে সে ভাষা মরে যায় বা মৃতভাষায় পরিণত হয়। ভাষা মরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে বলা হয় ভাষামৃত্যু। ভাষা হারিয়ে গেলে তার সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়। বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আছে। এই সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আর থাকবে না।
বাংলা, আমাদের মায়ের ভাষা। এ ভাষার প্রতি আমাদের দরদ আছে। মাকে যেমন আমরা ভালোবাসি তেমনি ভালোবাসি দেশকে, দেশের ভাষাকে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি— এই তিনটি মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু।’
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকেই বাঙালিরা অন্য একটি পরাধীনতার জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নানাভাবে নিগৃহীত হতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এদেশের মানুষকে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি দেয়নি। দেয়নি মত প্রকাশের অধিকার। পূর্ব পাকিস্তানের উৎপাদিত পণ্য তারা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেত। ফলে এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ খুব কষ্ট করে জীবনধারণ করত। শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও এ অঞ্চলের লোকদেরকে ভালো জায়গায় চাকরি দেয়নি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা। তাই এ অঞ্চলের মানুষ ফুঁসে উঠতে থাকে।
ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার নিশ্চিত করতে চাইল পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা। ১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিস বাঙালিদের অন্যতম বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি শাসকচক্র ঘোষণা দিলো উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তখন বাংলার দামাল ছেলেরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গড়ে। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১০০ যারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। তখন পাকিস্তানি শাসকচক্র নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। নিহত হয় সালাম, রফিক, জব্বার এবং আরও অনেকে। এরপর থেকে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। পাকিস্তানি শাসকচক্র সবশেষে পিছু হটতে শুরু করে। বাঙালিদের অন্যতম দাবি পাকিস্তানের জন্যতম ভাষা হিসেবে বাংলা মর্যাদা পায় ১৯৫৬ সালের সংবিধানে। তারপর থেকে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে জাতীয়তাবোধ তৈরি হয়, তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে প্রতিটি আন্দোলনে। এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রচিত হয় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে যে মানসপট তৈরি হয়েছিল সেই প্রত্যয়েই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের অভ্যুদয় ঘটে। ভাষাভিত্তিক এমন দেশ পৃথিবীর বুকে সত্যিই বিরল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন কেবল তাই ভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল নতুন একটি দেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। আমরা পেলাম একটি পতাকা। এ পতাকা। আমাদের অনেক আশা জাগিয়ে তুলল। আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা পাব সর্বত্র। সমাজে আর কোনো অন্যায় থাকবে না, থাকবে না কোনো বৈষম্য। যোগ্য লোক যোগ্য জায়গায় আসীন হবেন। কিংবা মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার পূরণ হবে। কোনো মানুষ আর গৃহহীন থাকবে না। না খেয়ে রাত কাটাতে হবে না। কাউকে। এরূপ নানা স্বপ্ন আমাদের মনের গহিনে উঁকি দিতে লাগল। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হলো। সংবিধানের চারটি মূলনীতি— জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মরিপেক্ষতা। এ চারটি মূলনীতি মান্য হলে সমাজে অন্যায় থাকার কথা নয়। কিন্তু সংবিধানের এ ভাষা মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করে দিনের পর দিন। ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে। এভাবে চলতে চলতে ভাষাকেও আমরা গুরুত্বহীন করে তুললাম। বাংলা ভাষার চর্চার গতিতে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয় বিভিন্ন অনুষঙ্গ। এ ভাষার সর্বত্র ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করতে পারলাম না। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য ১৯৮৭ সালে একটি আইন হয়, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন-১৯৮৭— নামে।
আইন করে কোনো ভাষাকে টিকিয়ে রাখা দায়। ভাষীর মননে যদি ভাষা চর্চার ইচ্ছে না থাকে তাহলে ওই ভাষা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিংবা ভাষার প্রকৃত বিকাশ সম্ভব হয় না।