- আবদুস সালাম
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেমন ছাত্র ছিলেন? প্রচলিত আছে, নজরুল ছিলেন দুষ্টু প্রকৃতির বাউন্ডেলে, লেখাপড়া শেখেনি ইত্যাদি।
কিন্তু কি তাই?
না, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র। অসাধারণ ভালো ছাত্র। তিনি ডবল প্রমোশন পেয়েছেন। মাসিক বৃত্তিও।
নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত হবার আগেই কবি হলেন পিতৃহারা। দশ-এগারো বছরের বালক হলেন মৌলভী-ইমাম। মৌলভী বেশি দিন থাকলেন না। ভর্তি হলেন লেটোর দলে। কবি বুঝতে পারলেন গান গাইতে গেলে পড়ালেখার প্রয়োজন। তাই ফ্রি বেতনে সিয়ারশোল স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু মনের দুঃখে ফিরে গেলেন আপন কুটিরে। লিখে রেখে গেলেন একখানি করুণ কবিতা। ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নজরুলের অবস্থা বুঝতে পেরে মুসলিম-ছাত্রাবাসে বিনা খরচায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। নজরুল ভর্তি হলেন চতুর্থ শ্রেণিতে। শেষ পর্যন্ত কবি এ এ স্কুলও ছাড়লেন। ভর্তি হলেন বর্ধমানের মঙ্গলকোর্ট থানার মাথরুন নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশনে।
এখানে প্রধান শিক্ষক রূপে পান কবি কুমুদরজন মল্লিককে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি এখানেই সকরেন। কবি শিক্ষকদের অত্যন্ত ভক্তি করতেন। ক্লাসে শিক্ষক এলেই তিনি সর্বপ্রথম উঠে দাঁড়াতেন। শ্রদ্ধায় ভক্তিতে গদগদ কবি নজরুল এ স্কুলও ছাড়লেন। এলেন আসানসোলে রুটির দোকানে। তারপর কাজির সিমলা দারোগা রফিকউদ্দিন সাহেবের বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে কবিকে ভর্তি করে দিলেন ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাই স্কুলে। ভর্তি হলেন সপ্তম শ্রেণিতে। কবি বার্ষিক পরীক্ষা দিলেন।
বাংলার রচনা লিখলেন কবিতায়। সবাই কানাঘুষা করতে থাকে গান পাগল ছেলে কি পাশ করবে? অজানা আশঙ্কায় নজরুল ইসলাম এখান থেকে পালিয়ে বাঁচলেন। পরে শোনা গিয়েছিলো, কবি নজরুল প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হয়েছিলেন, নজরুল ইসলাম এই স্কুলের এক বিচিত্রা অনুষ্ঠানে ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতামণ্ডলীকে মুগ্ধ করেন এবং শিক্ষক মহাশয়দের প্রশংসাভাজন হয়ে ওঠেন।
কবি নজরুল ইসলাম আবার সিয়ারশোল স্কুলে ফিরে এলেন। সপ্তম শ্রেণিতে বার্ষিক পরীক্ষায় অনন্যসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়ে ডবল প্রমোশন পান এবং নবম শ্রেণিতে উঠে মাসিক সাত টাকা বৃত্তিও পান রাজবাড়ী থেকে। শিক্ষকদের স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়ে এই স্কুলে কবি দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
ছাত্র নজরুল ইসলাম সম্পর্কে শেখ আজিজুল হক লিখেছেন, ‘ছাত্র হিসেবে নজরুল ইসলাম অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় বরাবর প্রথম হতেন। সুশীল বালকের মতো স্কুল পাঠ্য বই মুখে নিয়ে তিনি বসে থাকতেন না বটে, তবে বুদ্ধির জোরে পুষিয়ে নিতেন। সিয়ারশোল স্কুলের শিক্ষক জ্যোতিষ বাবু বলেছেন, ‘নজরুল ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন।’ কবির সহপাঠী শ্রী গৌরীশংকর রায় মহাশয় উল্লেখ করেছেন, ‘নজরুল পড়াশুনায় ভালো তো ছিলেনই ব্যবহারও ছিলো সবার সঙ্গে অমায়িক। বেশ হাসি-খুশি স্বতঃস্ফূর্তভাব আর বন্ধুবৎসল।
সবসময়ই বই মুখে নিয়ে বসে থাকতেন না। খেলাধুলা আমোদ ও মার্জিত রসিকতা করতে ভালোবাসতেন। তার রচনা লিখনশৈলী বেশ সুন্দর ছিল। এই বয়সে কবির রামায়ণ, মহাভারত, মহাকাব্য দুটিও বেশ দখলে ছিল। নজরুল ইসলাম লেটোর তাগিদে এবং জ্ঞানার্জনের পিপাসায় সিয়ারশোল হাইস্কুলের পাঠাগারের সমস্ত বইই পড়ে শেষ করেছিলেন।
শিক্ষক শ্রী অজিতকুমার অধিকারী থেকে জানা যায়, ‘নজরুলের অঙ্ক ছিল না। একমাত্র তারই ছিল ফারসি। ফারাসিতে নম্বর কম উঠত, তবুও নজরুল নবম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। এবং দশম শ্রেণিতে উঠে হাফ ইয়ারলি পর্যন্ত পড়ে যুদ্ধে যান।’ কবি নজরুল ইসলাম স্কুলের পত্রিকায় গল্প লিখতেন, কবিতা লিখতেন। শিক্ষকদের বিদায় অনুষ্ঠানেও সংবর্ধনা পত্র লিখতেন কবিতায়। কবি নজরুল ইসলাম ইংরেজিতে ভালো ছিলেন। এ প্রসঙ্গে পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘নজরুল ইসলাম যখন ক্লাস নাইনে পড়তেন তখন ক্লাসে একদিন ঠঁষঃঁৎব সম্পর্কে রচনা লিখতে দেয়া হয়। নজরুল লিখেছেন, চৌদ্দ পাতার ইংরেজি প্রবন্ধ। যার একটি স্থান ছাড়া অন্য কোথাও কালির আঁচড় পড়েনি।
আসলে সত্যি। কবি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র। কবির ছাত্রজীবন সম্পর্কে যে ধারণা প্রচলিত আছে সেটা একেবারেই ভুল। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র হওয়া ছাড়া কি বিদ্রোহী কবি।