সত্তর আশির দশকের ছোটদের ঈদ সংখ্যা

  • আহমদ মতিউর রহমান

আমার ছোটবেলার ঈদ মানে সত্তর দশকের সময়কালের ঈদ। রোজার ঈদ ও বকরি ঈদ। এই দুই ঈদের মধ্যে বেশি আনন্দের ছিল রোজার ঈদ। শুধু নতুন জামা কেনার জন্য নয়; ছোটবেলার চেনা গণ্ডিতে থাকা সমস্ত মানুষকে হাসিমুখে দেখতে পাওয়ার আনন্দ ছিল এর আসল কারণ।
ঈদ উপলক্ষ্যে সেইসময় সাপ্তাহিক রোববার বা সাপ্তাহিক বিচিত্রা ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করত। সেসব ঈদ সংখ্যায় থাকত দেশবরেণ্য লেখকদের লেখা। সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকার ঈদ সংখ্যা বের হতো। ঈদ সংখ্যা বেগম এর বৈশিষ্ট্য ছিল লেখিকাদের ছবি। পাতার পর পাতাজুড়ে ছবি। পরে অবশ্য আরো বহুপত্রিকা বাজারে আসে আর ঈদ সংখ্যা বের করে। সত্তর ও আশির দশকে বড়দের ঈদ সংখ্যার পাশাপাশি ছোটদের কয়েকটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হতো। এগুলোর মধ্যে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘ধানশালিকের দেশ’, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘নবারুণ’, অবজারভার হাউজ থেকে প্রকাশিত ‘কিশোর বাংলা’ (পরে বের হতো দৈনিক বাংলা হাউস থেকে) আর শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘শিশু’ পত্রিকা। আরো পরে প্রকাশিত হয় ‘ফুলকুঁড়ি’ ও ‘কিশোরজগৎ’ সহ কয়েকটি পত্রিকা। এক সময় আমি যুক্ত ছিলাম ফুলকুঁড়ির সাথে। ‘সবুজপাতা’ ও বের হতো ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে।
সে সময় ঈদ সংখ্যাগুলো কেমন ছিল? বেশ মোটাসোটা আর পাতায় পাতায় বিশিষ্ট শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, প্রাণেশ মণ্ডল, হাশেম খান, রফিকুন্নবী, শওকাতুজ্জামান, আফজাল হোসেন, সৈয়দ ইকবাল, ফরিদা হোসেন প্রমুখ শিল্পীদের আঁকা ছবিসহ। এসব পত্রিকায় সেইসময়ে আমাদের নতুন লেখকদের জায়গা পাওয়া সহজ ছিল না। এগুলোতে লিখতেন নামিদামি লেখক কবিরা। উপন্যাস গল্প লিখতেন এখলাসউদ্দীন আহমদ, শাহরিয়ার কবীর, আলী ইমাম, হোসেন মীর মোশাররফ, কাইজার চৌধুরী, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন, শওকত আলী, হেলেনা খান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রমুখ। কবিতা ছড়া লিখতেন সিকান্দার আবুজাফর, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আখতার হুসেন, সফিকুন্নবী, রশীদ সিনহা, শামসুল ইসলাম, আবদুর রহমান, আলতাফ আলী হাসু, খালেক বিন জয়েনউদ্দীন এবং আমাদের সিনিয়র কিছু বন্ধু। প্রবন্ধসহ বিভিন্ন লেখা লিখতেন আতোয়ার রহমান, আল কামাল আবদুল ওহাব, লুৎফর রহমান সরকার, করুণাময় গোস্বামী, মোহাম্মদ তোহা খান প্রমুখ। ঈদ সংখ্যাগুলোতে গল্প, কবিতা ও ছড়া, রহস্য গল্প, বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ নিবন্ধ ধাঁধা, শব্দ ধাঁধা কার্টুন গল্প ইত্যাদি ছাপা হতো। পেছনে ফিরে তাকালে ছোটবেলার অনেক গল্প মনে পড়ে। নানা মানুষের মুখ চোখে ভাসে। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। স্কুলের আঙিনাকে বিদায় জানানোর পর পার হয়ে গেছে চল্লিশ বছরের বেশি। অন্য অনেককিছুর মতো ঈদ উদ্যাপন-এর পাশাপাশি ছোটদের পত্রিকাগুলোর ঈদ সংখ্যাগুলোর কথাও মনে পড়ে। এর কোনো কোনোটিতে আমার লেখা ছাপা হলে তো আনন্দের সীমা থাকত না। ‘ধানশালিকের দেশ’ এর শিশু বিভাগে প্রথমে আমার লেখা ছাপা হয়। ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমার প্রবন্ধ সাধারণ বিভাগে ছাপা শুরু হয়। বিশিষ্ট লেখিকা সেলিনা হোসেন পত্রিকাটি দেখতেন (এখন তিনি বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান)। মনে আছে প্রথম লেখার বিল পাই বিশ টাকা, ধানশালিকের দেশ এর শিশুপাতায় লিখে। তখন একমাত্র ধানশালিকের দেশই শিশুবিভাগের লেখকদের বিল দিত। সেলিনা আপা এ ব্যবস্থাটা করেছিলেন। ‘কিশোর বাংলা’ ও ‘নবারুণে’ আমার অনেক গল্প কবিতা ছাপা হয়। নবারুণে নিয়মিত বিল পেতাম। ‘দীপক’ নামে পুলিশ বিভাগের একটি পত্রিকা ছিল (এখন নাম হয়েছে ডিটেকটিভ)। বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির একটি পত্রিকা ছিল ‘প্রতিরোধ’। এ দুটোতেই লেখা ছাপা হতো ও বিল পেতাম। দীপক এ ছিলেন আমেনা আপা। তিনি বিল পেতে খুব সহায়তা করতেন। মজার বিষয় হলো দীপক তো চিনতাম না, লেখাও দিতাম না। লেখা যেত সেই সময়ে ইত্তেফাকের অঙ্কনশিল্পী মাসুক হেলালের মাধ্যমে। ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে ইলাস্ট্রেশন দিয়ে আমার অনেক লেখা ছাপা হয়েছে। তখন দৈনিক ইত্তেফাক ছিল সবচেয়ে চালু সংবাদপত্র। ফলে লেখা ছাপা হলে হইচই পড়ে যেত। দাদাভাইয়ের পরামর্শ ছিল এক সঙ্গে কয়েকটা লেখা দেওয়ার। যে লেখাটা ছাপা হতো না শিল্পী মাসুক সেটা দিতেন দীপক এ, সেই পত্রিকায়ও কাজ করতেন তিনি। লেখা ছাপার পর বিল আনতে যেতে বলতেন। পরে অবশ্য সরাসরিও আমি লেখা দিয়েছি। বলছিলাম ছোটদের ঈদ সংখ্যার কথা। লেখার পাশাপাশি পাতায় পাতায় সুন্দর ছবি আমাদের আকর্ষণ করত। সম্পাদক ও শিল্পীরা যত্ন করে পত্রিকাটি সাজাতেন। এগুলোতে ছাপা হওয়া উপন্যাসগুলো ও গুচ্ছছড়া পড়ে বই আকারে প্রকাশিত হতো।
এবার ঈদের কথা একটু বলি। স্বাভাবিকভাবেই ছোটবেলার ঈদের
কথা মনে হলে মন বিষণ্ন হয়। শৈশব স্মৃতি সর্বদাই সুখকর। চলে যাওয়া দিনকেই সবাই ভালো দিন মনে করে। এর মধ্যে শৈশব থেকে কৈশোরের মধ্যবর্তী সময়টুকুর কোনো তুলনা চলে না। এই সময়ে লেখাপড়ার চাপ তেমন থাকে না, আমাদের কালে থাকত না, সে কথাই বলছি। এখন প্রচণ্ড চাপ থাকে। শিশুরা এর মধ্য থেকেই আনন্দের সময়টা বের করে নেয়। পৃথিবীর নানা জটিলতার কোনোকিছু নিয়েই তাকে দুর্ভাবনা করতে হয় না। উপলক্ষ্য খুঁজে নিলে সবকিছুতেই আনন্দের উপাদান পাওয়া যায়। আর এসব আনন্দের মধ্যে সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ্য নিয়ে আসত রমজান ও ঈদ উল ফিতর। নারায়ণগঞ্জে থাকাকালে বন্ধুরা মিলে ঈদে ছড়াকার্ড বের করতাম আর বিক্রি বা বিনাপয়সায় বিলি করতাম। অনেকেই টাকাপয়সা দিতেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফতুল্লা চলে যেতাম এই ছড়া কার্ড বিক্রি করতে। নিজের কবিতা ও বন্ধুদের ছড়াকবিতা দিয়ে ছাপাতাম এ ছড়াকার্ড। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থান থেকেও বের হতো ছড়াকার্ড বা ছোট আকারের সংকলন। এগুলো ছিল সে সময়ে আমাদের ঈদ সংখ্যা। আমার সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ মূসা রেজা (তেহরান রেডিওতে ছিলেন), ছিলেন মহিউদ্দিন আকবর, ছিলেন রতন, কামাল (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী), গোলাম মোহাম্মদ, নুরুল ইসলাম, ফতুল্লার আযম ও আরেক মহিউদ্দিন। ফতুল্লায় গিয়ে পাই খালেদ হোসাইনকে। ছড়াকার্ড করতে করতেই পরে ‘জিলিপি’ নামে ছড়াপত্রিকা বের করি। এর সঙ্গেও মহিউদ্দিন আকবর ও খালেদ হোসাইন যুক্ত ছিলেন। পরে সহযোগী সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হয় সুলতান সাঈদ হাসান। আমাদের সার্বিক দেখাশোনা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন সেই সময়ের তুখোড় ছড়াকার মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। তিনি ছিলেন জিলিপির প্রধান সম্পাদক।
এতে সারাদেশের এবং পশ্চিমবঙ্গের ছড়াকাররা লিখতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *