জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখা

  • তুষার কান্তি সরকার

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না বহতা। এও কি সম্ভব! তার থেকে ছয়-সাত হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার। চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। পলক পড়ছে না। হলুদের ওপর কালো ডোরাকাটা মোটাসোটা দেহ। আট থেকে নয় ফিট লম্বা। পেট, পা আর মুখে সাদা দাগ। এলোমেলো লম্বা গোঁফ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জিভ বের করে মুখ চাটছে। ধারালো লালচে মোটা দাঁত। বাঘের চোখ দেখে মনে হচ্ছে গাঢ় কালো কাজল পরেছে। বহতা আজ আসবে বলে সেজেছে সে। বহতার কী যে খুশি লাগছে তা কাউকে বলে বুঝাতে পারবে না। বাঘটি এবার চলে গেল খাঁচার অন্যদিকে। দাদু এসে মাথায় স্নেহের হাত রাখতেই চমকে উঠল সে। দাদুর দিকে ঘুরে এক মুখ হাসি আর এক বুক আনন্দ নিয়ে জরিয়ে ধরল তাকে।
বহতার সেভেনের পরীক্ষা শেষ হয়েছে দুদিন আগে। একমাস ছুটি। ঢাকায় আসার বায়না ধরতেই মা-বাবা-দাদু রাজি হয়ে গেলেন। থাকার কোনো অসুবিধা নেই। কল্যাণপুরে ছোট চাচা থাকেন। বড় চাকরি করেন। তাঁকে ফোন করে জানিয়ে দিলেন দাদু। সবকিছু গোছগাছ করে বহতাকে নিয়ে রওনা দিলেন। আগে সাত-আট ঘণ্টা লাগত ঢাকায় আসতে। গতকাল লেগেছে পৌনে দুই ঘণ্টা। পদ্মাসেতুর কারণে এখন ঢাকা আসা-যাওয়া সহজ হয়ে গেছে।
চিড়িয়াখানা দেখার উত্তেজনায় রাতে ভালো ঘুম হয়নি বহতার। এপাশ-ওপাশ করেছে। সকালে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করে জামা-কাপড় পরে বসে আছে। শীতকাল। তবে গ্রামের মতো ঢাকাতে শীত নেই। একটা পাতলা সোয়েটারই যথেষ্ট।
সময় যেন কিছুতেই কাটছে না বহতার। মন উশখুশ করছে। দাদুর সঙ্গে কখন যাবে চিড়িয়াখানায়। অবশেষে চাচার গাড়িতে মাত্র বিশ মিনিটে কল্যাণপুর থেকে পৌঁছে গেল মিরপুর-২-এ অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানায়। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকল। খোলামেলা সবুজে ঢাকা বিশাল জায়গা। হেঁটে হেঁটে দেখতে লাগল বানর, কুমির, চিত্রা হরিণ, বিভিন্ন ধরনের সাপ, নানা প্রজাতির পাখি, নীলগাই, ভাল্লুক, ইমপালা, এমু, জেব্রা, গন্ডার, জলহস্তী, সিংহ, মছুর আরো কত কী! বহতা এখানেই দেখতে পেল পৃথিবী সবচেয়ে বড় পাখি উটপাখি। এরা উড়তে পারে না। শুধু দৌড়ায়। দেখা মিলল ডাঙার সবচেয়ে বড় প্রাণী হাতির। এতদিন সে এই প্রাণীগুলো শুধু বই আর টিভিতে দেখেছে। আজ চিড়িয়াখানায় নিজের চোখে অবাক হয়ে দেখছে। অজগর দেখতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া, সাপ কি এত বড় হতে পারে!
বয়সের কারণে দাদুর হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। তবু হাসিমুখে কোনটা কোন প্রাণী তা চিনিয়ে দিচ্ছেন বহতাকে। অবশ্য প্রতিটি প্রাণীর থাকার জায়গায় ইংরেজি ও বাংলায় নাম লেখা আছে। দাদুর কথামতো বহতা পড়ে পড়ে দেখছে। দাদুর কাছ থেকেই বহতা জানতে পারল এই চিড়িয়াখানায় ৯১ প্রজাতির ২১৫০টি প্রাণী রয়েছে। দাদু পশু-পাখি দেখাতে দেখাতে আরও বললেন, ১৯৫০ সালে হাইকোর্ট চত্বরে চার থেকে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে বাংলাদেশের প্রথম চিড়িয়াখানা গড়ে উঠেছিল। এরপর ১৯৭৪ সালে মিরপুর-২-এ পঁচাত্তর হেক্টর জায়গার ওপর এটি সরিয়ে আনা হয়। চিড়িয়াখানাটি উদ্বোধন ও সবার জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৯৭৪ সালের ২৩ জুন।
প্রায় তিন ঘণ্টা চিড়িয়াখানা ঘুরে দাদু ক্লান্ত। বহতার চোখে-মুখে ক্লান্তির বদলে উচ্ছ্বাস, আনন্দ। অজানাকে জানার। অচেনাকে চেনার। কোনোদিন যদি শিক্ষক ‘বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানা’ রচনা লিখতে দেন তাহলে বহতার চেয়ে আর কেউ সুন্দর করে লিখতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *