- গাজী মুনছুর আজিজ
পাখির প্রজাতি, আবাসন, খাবার:
পৃথিবী জুড়ে ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির পাখি রয়েছে। এসব পাখি নিয়ে মানুষের জানা আগ্রহ অনেক। সেজন্য পাখি নিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য গবেষক গবেষণা করছেন। আর এ গবেষণার মাধ্যমেই আমরা জেনেছি পাখি প্রকৃতির অন্যতম বন্ধু। একই সঙ্গে প্রকৃতির জন্য পাখি যেমন দরকার, তেমনি পাখিদের নিরাপদে বাঁচতেও প্রকৃতি দরকার। আর প্রকৃতি বাঁচলেই আমাদের উপকার। সেজন্য গবেষকরা বলছেন, ‘পাখি-প্রকৃতি-আমরা’ একই সূত্রে গাঁথা। তাই পৃথিবীর জন্য পাখি নামক প্রাণীটির গুরুত্ব অনেক।
প্রকতির পাশাপাশি উড়োজাহাজ আবিষ্কারের পেছনেও রয়েছে পাখির অবদান। বলা হয়ে থাকে উড়োজাহাজ আবিষ্কারক উইলবার রাইট ও অরভিল রাইট আকাশে তাকিয়ে থাকতেন পাখি কীভাবে উড়ে দেখার জন্য। হয়তো সেই ভাবনাই তাদের উড়োজাহাজ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। অন্য দিকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি উড়োজাহাজের যে স্কেচ করেছিলেন, তার পেছনেও হয়তো পাখির ভাবনা ছিল।
এছাড়া অনেক অনেক আগে সংবাদ বা চিঠি আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কবুতর পাখির ব্যবহারের কথা জানা যায়। আর বিভিন্ন সময় যুদ্ধ চলাকালীন তথ্য আদান-প্রদানেও হাজার বছর ধরে কবুতর ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রকৃতি বা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ ছাড়াও সৌন্দর্যের দিক থেকেও পাখি আমাদের অনেকের পছন্দ। এছাড়া গল্প, কবিতা, উপন্যাসে যুগ যুগ ধরে এসেছে পাখির সৌন্দর্য বা গুণের কথা।
বাংলাদেশে পাখির প্রজাতি
বাংলাদেশে প্রায় ৭১৭ প্রজাতির পাখি আছে। এর মধ্যে আবাসিক প্রজাতি প্রায় ৩৫০টি। আর পরিযায়ী প্রজাতি প্রায় ৩৬৭টি। সাধারণত যে পাখি সারাবছর দেশে থাকে তাদের বলা হয় আবাসিক। আর যে পাখি বছরের কিছুসময় অন্য দেশে থাকে তাদের বলা হয় পরিযায়ী। মূলত আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিযায়ী শীত মৌসুমেই দেখা যায়। আবার কিছু পরিযায়ী গ্রীষ্ম মৌসুমে এদেশে আসে। এদের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টি। এছাড়া কয়েকটি পাখি বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ থেকে বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে বাংলাদেশে আসে এবং খানিক সময় থেকে চলে যায়। সেজন্য এদের বলা হয় পান্থ’-পরিযায়ী।
যে কারণে পাখির নামের আগে বসানো হয় সুলভ, দুর্লভ বা বিপন্ন আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে আমাদের যে ৬৫০ প্রজাতির পাখি আছে, এর সবই কিন্তু সচারচর দেখা যায় না। কোনোটা বেশি দেখা যায়। কোনোটা কম দেখা যায়। কিছু আছে একেবারেই কম। অবশ্য বর্তমানে আমাদের দেশে ৬৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায় না। নানা কারণে এরই মধ্যে ৩০ বা ৩২টি পাখি হারিয়ে গেছে। আর কিছু আছে হারানোর পথে। সেজন্য যে পাখি বেশি দেখা যায়, তাদের নামের আগে সুলভ; যে পাখি কম দেখা যায়, তাদের নামের আগে দুর্লভ; অতি কম দেখা গেলে বিরল বা বিপন্ন বা মহা-বিপন্ন শব্দ বসানো হয়।
পাখিদের খাবার ও আবাসন
আবাসিক পাখি সারাবছর দেশে থাকতে পারলে পরিযায়ী পাখিরা পারে না কেন? এমন প্রশ্ন অনেকের হতে পারে। মূলত পাখিরা খাবার, থাকা, বাসা বানানো ও প্রজননের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে। যখন যেখানে খাবার ও থাকার নিরাপদ জায়গা পায়, পাখিরা তখন সেখানে বসবাস করে, বাসা বানায়, প্রজনন করে।
আবাসিক পাখিদের খাবার সারাবছরই দেশে থাকে। সেজন্য এরা অন্য কোথাও যেতে চায় না। এদের খাবার থাকে এ দেশের বন-বাদাড়ে, নদী-নালা, খাল-বিলে। খাবারের পাশাপাশি এসব স্থানেই আছে এদের নিরাপদে থাকা ও প্রজননের জায়গা। তাই অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ভাবে না এরা। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, আবাসিক পাখিরা খাবার খুঁজে পেলে পরিযায়ীরা পায় না কেন? আসলে বেঁচে থাকার তাগিদে একেক পাখি একেক ধরনের খাবার খায়। কেউ পানি থেকে মাছ ধরে খায়, কেউ গাছ থেকে পোকা ধরে খায়। কেউ সাপ খায়, কেউ কেঁচো খায়। কেউ ফুল খায়, কেউ ফল খায়। কেউ খায় ফুলের মধু। এভাবে একেক পাখি একেক ধরনের খাবার খেয়ে বাঁচে। এছাড়া কেউ বাস করে পানিতে। কেউ বাস করে জমিনে। আসলে মানুষ অন্য প্রাণীর মতো পাখিদেরও থাকা-খাওয়ার নানা বৈচিত্র্য আছে।
কখন আসে পরিযায়ী পাখি
আমাদের দেশে শীত মৌসুম শুরু হলেই অধিকাংশ পরিযায়ী পাখি আসতে থাকে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীর মোহনায় জেগে ওঠা কাদাচর, সিলেটের হাওড়াঞ্চলের বিল, পদ্মার চর বা স্ন্দুরবনে এরা বসবাস শুরু করে। তবে পরিযায়ী পাখিদের আমরা অনেককে অতিথি পাখি বলি। আমরা ভাবি, যেহেতু সারাবছর দেখা যায় না, তাই এরা অতিথি বা অন্য দেশের পাখি। এ ধারণা ভুল। এ পাখিগুলো মোটেই অতিথি নয়, এরা আমাদের দেশেরই পাখি। যেহেতু পাখিগুলো পরিব্রাজক বা পর্যটকের মতো ঘুরে বেড়ায়, তাই এদের পরিযায়ী বলা হয়।
মূলত আমাদের শীত মৌসুমে উপকূলের কাদাচর, হাওড়ের বিল বা জলাভূমি, পদ্মার চর বা সুন্দরবনের চরগুলোতে অল্প পানি থাকে। এ অল্প পানিতেই থাকে পরিযায়ী পাখিদের খাবার। আর খাওয়া শেষ হলে চর বা বিলের আশপাশের ঘাসের মাঠ, বালুর মাঠ, বনভূমি বা বন-বাদাড়ের নিরাপদ স্থানে এসব পাখিরা থাকে। এরপর গ্রীষ্ম মৌসুমে বর্ষার পানি বাড়তে থাকলে এসব চর ও বিল পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে পরিযায়ী পাখিরা তাদের খাবার আর খুঁজে পায় না, থাকার জায়গাও হারায়, তাই তারা খাবারের খোঁজে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যায় অন্য দেশে। এভাবেই কাটে পরিযায়ী পাখিদের জীবন।
শীত শেষ হলো আমাদের পরিযায়ী পাখিরা কোথায় যায়? প্রায় আশি শতাংশ পরিযায়ী পাখি যায় হিমালয়ের কাছাকাছি অঞ্চলের দেশে। আর প্রায় বিশ শতাংশ যায় সাইবেরিয়াসহ মধ্য ও উত্তর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
সব পরিযায়ী একই ধরনের জায়গায় থাকে না
সব পরিযায়ী পাখি একই ধরনের জায়গায় থাকে? মোটেই নয়। আমাদের দেশে আসা অধিকাংশ পরিযায়ী পাখি জলাভূমি বা সৈকতের কাছাকাছি থাকে। আর জলে থাকে বলেই এদের আমরা ‘জলচর’ বলি। আবার যারা সৈকতের কাছাকাছি থাকে তাদের বলি ‘সৈকত’ পাখি।
পরিযায়ী পাখিদের বসবাস
বাংলাদেশে জলচর পরিযায়ী পাখিদের অধিকাংশ দেখা যায় ভোলা, নোয়াখালী, পটুয়াখালী, বরগুনা, রাজশাহী, বক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, মহেশখালী, সুন্দরবন ও হাওড়াঞ্চলের চর, বিল বা জলাভূমিতে। শীত মৌসুমে উপকূলের এসব চর বা বিলে যেসব জলচর পরিযায়ী পাখি বেশি দেখা যায় তার মধ্যে আছে—
দেশি কানিবক, গো বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি চখাচখি, খয়রা চখাচখি, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, পাতি শরালি, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, উত্তুরে কুন্তেহাঁস, পাকড়া উলটোঁঠুটি, ছোট নতজিরিয়া, কালালেজ জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, জুলফি পানচিল, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাংচিল, কাসপিয়ান পানচিল, চামচঠুঁটো বাটান, খুন্তেবকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।
উপকূলের যেসব চরে পরিযায়ী পাখি দেখা যায় তার মধ্যে আছে— হাতিয়ার দমারচর, নিঝুমদ্বীপ, জাহাজমারার চর, মোক্তারিয়ার চর, গাজীপুরা চর, মদনপুরা চর, মধুপুরা চর, দাশের হাটের চর, মনপুরার চর, তুলাতুলী চর, মাঝের চর, বালুর চর, বগার চর, হাজীপুর চর, রগকাটার চর, লতার চর, যাদবপুর চর, উড়ির চর, শাহজালাল চর, আমানত চর, ঢালচর, ঠেংগার চর, কালাকাইচ্ছা চর, পিয়াল চর, পাতাইলা চর, ছোট বাংলার চর, চর মোন্তাজ, কালাম চর, খাজুর গাইচ্ছা চর, সামছু মোল্লার চর, বোয়ালখালীর চর, বড় রাণীর চর, ছোট রাণীর চর, টেগরার চরসহ নতুন নতুন জেগে ওঠা ছোট-বড় চর।
উপকূলের পাশাপাশি শীতে আসা পরিযায়ী জলচর পাখিদের বড় একটি অংশ বসবাস করে সিলেটের হাওড়াঞ্চলের বিল বা জলাভূমিতে। এর মধ্যে আছে— মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাকালুকি হাওর, হাইল হাওড়, বাইক্কাবিল, টাঙ্গুয়ার হাওড় ইত্যাদি। এসব হাওড়ে ছোট-বড় অনেক বিল আছে। শীতে এসব বিলের পানি কম থাকে বলে পরিযায়ী পাখিদের জন্য এসব বিল বসবাস ও খাবারের উপযোগী থাকে।
হাওড়ের মধ্যে হাকালুকি হাড় বেশ বড়। এ হাওরের অন্যতম বিল-জলা বিল, বালুজুড়ি, মাইসলা, কুকুরডুবি, ফুয়ালা, পোলাভাঙ্গা, হাওড়খাল, কোয়ার কোণা, মালাম বিল, গোয়ালজুড়, চাড়ুয়া, তেকোনা, ভাইয়া, গজুয়া, রঞ্চি, হারাম, বিড়াল খালসহ ইত্যাদি।
হাওড়ের বিলে যেসব পরযায়ী পাখি সচারচর দেখা যায় তার মধ্যে আছে— ছোট ডুবুরি, বড় খোঁপাডুবুরি, বড় পানকৌড়ি, ছোট পানকৌড়ি, উদয়ী গয়ার, দেশি কানিবক, ধুপনি বক, লালচে বক, বড় বগা, ছোট বগা, মাঝলা বগা, গো বগা, এশীয় শামখোল, কালামাথা কাস্তেচরা, পাতি শরালি, মেটে রাজহাঁস, খয়রা চকাচকি, পাতি চকাচকি, তিলিহাঁস, পিয়াং হাঁস, সিঁথিহাঁস, ফুলুরি হাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, উত্তুরে ল্যাঞ্জহাঁস, গিরিয়া হাঁস, পাতি ভুতিহাঁস, বেয়ারের ভুতিহাঁস, টিকি হাঁস, মরচেরং ভুতিহাঁস, কোড়া, ধলাবুক ডাহুক, পাতি মানমুরগি, বেগুনি কালেম, পাতি কুট, নেউ পিপি, দল পিপি, কালাপাখ ঠেঙ্গি, মেটেমাথা টিটি, হট টিটি, উত্তুরে টিটি, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, ছোট নথজিরিয়া, কেন্টিশ জিরিয়া, ছোট ধুলজিরিয়া, ছোট বাবুবাটান, পাতি চ্যাগা, ল্যাঞ্জা চ্যাগা, কালালেজ জৌরালি, তিলা লালপা, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, বিল বাটান, বন বাটান, পাতি বাটান, লাল নুড়িবাটান, গুলিন্দা বাটান, ছোট চাপাখি, টেমিকেংর চাপাখি, খয়রামাথা গাঙচিল, কালামাথা গাংচিলসহ বিভিন্ন পাখি।
সব চরে সব পাখি থাকে না
সব চরে সব পাখি থাকে? না, সব চরে সব পাখি থাকে না বা থাকতে পারে না। আগেই বলেছি, একেক প্রজাতির পাখি একেক জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। সেজন্য বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল বা হাওড়াঞ্চলের যেসব চর বা বিলে পরিযায়ী পাখিরা থাকে তার মধ্যে কিছু বিশেষ স্থান আছে। এসব বিশেষ স্থানে বিশেষ কিছু প্রজাতির পাখি দেখা যায়। যা সবখানে দেখা যায় না।
বিশেষ পাখির বিশেষ জায়গা
নোয়াখালী হাতিয়ার দমারচর মহাবিপন্ন দেশি-গাংচষা পাখির একমাত্র আবাসস্থল। আবার এ চরে মাঝেমধ্যে অল্প সংখ্যক মহাবিপন্ন চামচঠুঁটো বাটান পাখিও দেখা যায়। এছাড়া এ চরে কালামাথা কাস্তেচরা, ইউরোশীয় চামচঠুঁটি, নদীয়া পানচিলসহ অনেক বিপন্ন পাখিরও বসবাস রয়েছে।
পরিযায়ী পাখির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ভোলার চরফ্যাশনের চর শাহজালাল। শীতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ প্রজাতির অসংখ্য পরিযায়ী পাখি দেখা যায় এ চরে। এরমধ্যে অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখিও আছে। পরিযায়ী সৈকত পাখির আরেকটি বড় অংশ দেখা যায় কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়াদ্বীপসহ আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপে। এ দ্বীপেও প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এর মধ্যে মহাবিপন্ন চামচঠুঁটি বাটান পাখিও আছে। এ পাখির জন্য এ দ্বীপ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। গবেষকদের মতে পৃথিবীতে চামচঠুঁটো বাটান পাখি আছে প্রায় ২০০। এর মধ্যে সোনাদিয়ার সৈকত এলাকায় পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ চামচঠুঁটো বাটান পাখি বসবাস করে। এছাড়া সোনাদিয়াদ্বীপসহ উপকূলের অনেক চরেই অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখির বসবাস আছে। এ তালিকায় আছে— নর্ডম্যান সবুজপা, কালামাথা কাস্তেচরা, এশীয় ডাউইচার, কালালেজ জৌরালি, ইউরেশিয় গুলিন্দা, বড় নট, দেশি গাংচষা ইত্যাদি।
উপকূল ও হাওড়ের পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিদের আরেকটি অংশ দেখা যায় সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে। সুন্দরবন প্রায় ৮০ থেকে ১০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল। এর মধ্যে আছে অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখি। উপকূল, হাওড় ও সুন্দরবনের পাশাপাশি রাজশাহীর পদ্মার চরাঞ্চলেও অনেক প্রজাতির পরিযায়ী পাখির দেখা যায়।
পাখিবিষয়ক গবেষণা ও কার্যক্রম;পাখি শুমারি:
পাখি গবেষণায় বেরিয়ে আসছে পাখির নিত্যনতুন তথ্য। ফলে আমরা জানতে পারছি পাখির বর্তমান অবস্থার কথা। এ গবেষণার অন্যতম একটি মাধ্যম— পাখি শুমারি বা গণনা করা। আমাদের দেশেও নিয়মিত পাখি শুমারি হয়ে থাকে।
বিশ্বব্যাপী পাখি নিয়ে গবেষণা করছে ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল। এ সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের সংগঠনের নাম— এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস। এ সংস্থা প্রতিবছর শীত মৌসুমে এশিয়ার দেশগুলোয় একযোগে জলচর পাখি শুমারি করে থাকে। এ সংস্থার বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখিবিশারদ ইনাম আল হক। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে আমাদের উপকূলীয় এলাকা ও হাওড়ের জলাশয়ে জলচর পাখি শুমারি করা হয়। বাংলাদেশে এ শুমারি হয়ে আসছে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে। অবশ্য সারাবিশ্বে এ শুমারি হয়ে আসছে ৫০ বছরেরও আগে থেকে।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর শীতে বাংলাদেশের উপকূলের প্রায় ৩০টি চলে প্রায় ৭৫ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। হাওড়ের বিলেও প্রতিবছর শীতে জলচর পাখি শুমারি করা হয়। শুমারির তথ্য অনুযায়ী শীতে হাওড়ের বিলে প্রায় ৫০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি গণনা করা হয়ে থাকে।
কক্সবাজারের সোনাদিয়াদ্বীপসহ আশপাশে ছোট ছোট দ্বীপেও শুমারি করা হয়। এখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। অন্যদিকে শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবন প্রায় ৮০ থেকে ১০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল।
পাখি শুমারির গুরুত্ব
পাখি গবেষণায় শুমারির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর শুমারি করে যখন দেখা যায় পাখি কমছে, তখন গবেষণা করে বের করা হয় কেন কমছে। আবার বাড়লেও কেন বাড়ছে তা খতিয়ে দেখা হয়। আর গবেষণার উদ্দেশ্য হলো পাখি বাঁচিয়ে রাখা। সারাবিশ্বে শুমারি করা হয় একই সময়ে এবং সমন্বিতভাবে।
সারাবিশ্বে পাখি গবেষকরা জলচর পাখি শুমারি করেন টেলিস্কোপ বা দুরবিন দিয়ে। বাংলাদেশের গবেষকরাও একইভাবে গণনা করেন। এটা পাখি গণনায় বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
শুমারির ফলাফল বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের গবেষকরা গবেষণা চালান। নানা প্রকাশনায়ও ব্যবহার হয় শুমারির ফলাফল। পাশাপাশি অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও শুমারির ফলাফল কাজে লাগান। এছাড়া প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী যে জলচর পাখি শুমারি করা হয় তার ফলাফল ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল প্রতি চার বছর পরপর প্রকাশ করে। সেই প্রকাশনায় বাংলাদেশের শুমারির ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে কারণ, বিশ্বব্যাপী অনেক বিপন্ন বা মহাবিপন্ন পাখির আবাস এ বাংলাদেশে। সেজন্য পাখির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে গুরুত্বের তালিকায় রয়েছে।]
আবার গণনা করেই দেখা গেল অনেক পাখি ইতোমধ্যেই হারিয়ে গেছে বা দেখা যায় না বললেই চলে। ইনাম আল হক জানান, আগে যখন শুমারিতে হাজার হাজার দেশি-গাংচষা দেখা যেত। এখন তা অনেক কম। আবার অনেক পাখি আগে শত শত দেখা যেত, এখন দেখা যায় না বললেই চলে। যেমন নাকতা হাঁস, বাদি হাঁস, বেয়ারের ভুতিহাঁস, কালাপেট গাংচিল ইত্যাদি।
হারিয়ে যাওয়া পাখির আরেকটি বড় উদাহারণ শকুন। বিশেষ করে বাংলা শকুন। একসময় এদেশে অসংখ্য শকুন দেখা গেছে। এখন কমতে কমতে শয়ের ঘরে চলে এসেছে। সারাদেশে এখন শকুন আছে শদুয়েকের মতো। শুমারির ফলাফলের ওপর ভিত্ত করে কেবল যে বাংলাদেশেই গবেষণা হচ্ছে তা কিন্তু নয়, এ গবেষণা পুরো পৃথিবী জুড়েই। কারণ বাংলাদেশে যে পাখি আছে, তা অন্য দেশে নেই, অন্য দেশে যে পাখি আছে, তা বাংলাদেশে নেই। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে কোনো পাখি হারিয়ে গেলে সেটা পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেল। আবার কোনো পাখির সংখ্যা বাংলাদেশে বাড়লে সেটাও পৃথিবীর পাখির তালিকাতেই যোগ হচ্ছে। এ হিসেবে বাংলাদেশের পাখি শুমারি কেবল বাংলাদেশ কেন্দ্রিক পাখি গবেষণার জন্যই নয়, এ শুমারি বিশ্বব্যাপী পাখি গবেষণারও অংশ। এজন্য বাংলাদেশের পাখির শুমারির তথ্য কেবল ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশন প্রকাশ করে তা কিন্তু নয়, এ তথ্য জাতিসংঘের পরিবেশ বিভাগ থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণী গবেষণার নানা কাজেও ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের পাখি কিংবা পাখি শুমারির ফলাফল যে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তার বড় উদহারণ হলো— টাঙুয়ার হাওড় ও সুন্দরবনকে রামসার সাইট ঘোষণা করা। কারণ টাঙ্গুয়ার হাওড় ও সুন্দরবনের পাখি সারাবিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবেই এ দুটি স্থানকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে। এ দুটি স্থান ছাড়াও পাখির জন্য বাংলাদেশের নোয়াখালীর হাতিয়ার দমারচর, ভোলার চর শাহজালাল, কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া, মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড়, বাইক্কা বিলসহ বেশ কিছু স্থানই আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিন দশকের শুমারি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে পাখি কেন হারিয়ে যাচ্ছে বা কমে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে এর উত্তরণের পথও জানা গেছে।
পাখির পায়ে রিং পরানো
পাখিবিষয়ক গবেষণার আরেকটি মাধ্যম হলো— পাখির পায়ে রিং পরানো। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও পাখির পায়ে রিং পরানো হচ্ছে। মূলত শীত মৌসুমে সিলেট হাওড়ের বিভিন্ন বিলে ও উপকূলের বিভিন্ন দ্বীপের কয়েক প্রজাতির পরিযায়ী পাখির পায়ে রিং পরানো হয়েছে। এর ফলে রিং পরানো পাখিটি শনাক্ত করতে সুবিধা হয়। যেমন এটি বাংলাদেশে কখন এসেছিল বা কোথায় বসবাস করেছে। কিংবা শীত শেষে পাখিটি এবছর চলে গিয়ে আবার আগামী বছর বাংলাদেশে ফিরছে কি না ইত্যাদি। বাংলাদেশে বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখিবিশারদ ইনাম আল হক রিং পরানো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন।
পাখির গতিবিধি, বিচরণভূমি ও জীবৎকাল সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার উদ্দেশ্যে পাখির পায়ে ধাতব আংটি পরানো হয়। ২০১০ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার উদ্দেশ্যে এদেশে পাখির পায়ে আংটি পরানো ক্যাম্প বা কার্যক্রমের আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতি শীতে দুই-তিন বার এ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। এ ক্যাম্প হয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া, নোয়াখালীর হাতিয়ার দমার চর, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, কক্সবাজারের কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড়, পাশুয়া বিল ও মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে মিস্ট-নেট দিয়ে পাখি ধরে এর মাপজোখ নিয়ে, ছবি তুলে ও এর পায়ে ধাতব আংটি পরিয়ে আবার পাখিটিকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রত্রিয়ায় পাখির গতিবিধি, বিচরণভূমি ও জীবৎকাল সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।
পাখির পাখায় স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন
বাংলাদেশে ২০১০ সালে কক্সবাজারের সোনাদিয়াদ্বীপে প্রথমবারের মতো কয়েকটি পরিযায়ী পাখির পাখায় স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হয়। পাখিবিশারদ ইনাম আল হকের তত্ত্বাবধায়নে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ট্রান্সমিটার স্থাপনের ফলে পাখিটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায় বাংলাদেশ থেকে। গত কয়েক বছর ধরেই পাখির পাখায় স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার স্থাপন হয়েছে।
পাখিবিষয়ক গবেষণা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে অসংখ্য গবেষক কাজ করছেন। বাংলাদেশেও পাখি নিয়ে একক বা দলগতভাবে গবেষণা কার্যক্রম হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি গবেষণা প্রকল্প ‘বাংলা শকুন’ বাঁচানো। এছাড়া আমাদের দেশে নানা প্রজাতির পাখি নিয়ে একাধিক গবেষক বা দল কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস
কয়েক বছর আগেও আমাদের দেশের আকাশে প্রায় বাংলা শকুন উড়তে দেখা যেত। অথবা দেখা যেত নদীর তীরে বা ভাগাড়ে। কিন্তু সে দৃশ্য এখন নেই বললেই চলে। অথচ এটি আমাদের অনেক উপকারী পাখি। মৃতপ্রাণী বা বিভিন্ন পচা-গলা খেয়ে এরা আমাদের পরিচ্ছন্নকর্মীর কাজ করে। অন্যদিকে শকুনের এসব মৃতপ্রাণী বা পচা-গলা খাওয়ার ফলে আমাদের জন্য ক্ষতিকর রোগজীবাণুও ছড়ায় না। আবার এসব ময়লা-আবর্জনা খেয়ে শকুনের কোনো ক্ষতিও হয় না। কারণ এর হজমশক্তি অনেক বেশি। এরপরেও উপকারী এ পাখিটি নানা কারণে আমাদের দেশ থেকে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বের অন্যন্য দেশেও শকুন পরিবেশের জন্য অনেক উপকারী একটি প্রাণী। সেজন্য প্রতিবছর ৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালন করা হয়।
একসময় বাংলাদেশে শকুন দেখা যেত সাত প্রজাতি। এর মধ্যে ইউরেশীয় গৃধিনী, হিমালয়ী-গৃধিনী, ধলা শকুন ও কালা শকুন ছিল অনিয়মিত আগন্তুক। আর বাকি তিন প্রজাতির শকুন স্থায়ীভাবে এদেশে বসবাস করত। এর মধ্যে রাজশকুন ও সরুঠুঁটি শকুন চার-পাঁচ দশক আগেই বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন এদেশে শকুন বলতে কেবল বাংলা শকুনকেই বোঝানো হয় এবং এটিও আমরা হারাতে বসেছি।
পাখি বিশারদ ইনাম আল হক জানান, মরতে মরতে এখন এদেশে বাংলা শকুন আছে মাত্র তিন’শয়ের মতো। আর এ শকুনগুলোর অধিকাংশ বসবাস করছে সিলেট ও খুলনা বিভাগে। তাই শকুন বাঁচিয়ে রাখতে অবশ্যই গবাদি পশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেন ও কিটোপ্রোফেন ওষুধ ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এর বিকল্প নিরাপদ হিসেবে মেলোক্স্যিাম ওষুধের ব্যবহার বাড়াতে হবে। এসবের পাশাপাশি শকুনের উপকারিতা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, বন বিভাগ, আইইউসিএন বাংলাদেশ শকুন রক্ষার জন্য কাজ করছে।
বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস
পরিযায়ী পাখি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে প্রতি বছর ১১ মে পালন করা হয় বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস। এ উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় আলোচনাসভা, সেমিনার, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠান।
পাখি মেলা
পাখিবিশারদ ইনাম আল হকের উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে প্রথম পাখি মেলা আয়োজিত হয়েছিল। এখনও এ মেলা নিয়মিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এ মেলা হয়েছে। ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এ মেলা হয়েছে।
পাখির দেশ বাংলাদেশ প্রদর্শনী
বাংলাদেশে বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবছর ‘পাখির দেশ বাংলাদেশ’ শীর্ষক পাখির আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়ে থাকে। প্রদর্শনীর প্রথমটি হয়েছে ধানমণ্ডির দৃক গ্যালারিতে। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হয়েছে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরে। এছাড়া কয়েক বছর ধরে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এ প্রদর্শনী হচ্ছে।
পাখির বই ও ডাকটিকিট পাখির বই;
পাখিদের সুখদুখের কথা
‘পাখিদের সুখদুখের কথা’ নামের এ বই লিখেছেন পাখিবিশারদ ইনাম আল হক। প্রচ্ছদ ও অলংকরণও করেছেন তিনি। প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। ৪২টি পাখির বর্ণনা পাওয়া যাবে এতে। বর্ণনাগুলো সহজ ভাষায় লেখা। প্রতিটি পাখির বর্ণনার সঙ্গে রঙিন একাধিক ছবি আছে। পুরুষ পাখি ও স্ত্রী পাখির ছবিও আলাদা দেওয়া আছে।
পাখিদেরও আছে নাকি মন
‘পাখিদেরও আছে নাকি মন’ নামের এ বইয়ের লেখক ইনাম আল হক। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। পাখি দেখতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা, পাখিদের জীবন-যাপন, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পাখির নানা প্রসঙ্গসহ পাখির জানা-অজানা অনেক কিছুই বর্ণনা করেছেন ইনাম আল হক। রঙিন এ বইয়ে পাখির অনেক ছবিও আছে।
ফেদারর্ড স্প্ল্যান্ডার্স বার্ডস অব বাংলাদেশ
‘ফেদারর্ড স্প্ল্যান্ডার্স বার্ডস অব বাংলাদেশ’ বইটি ইংরেজিতে লেখা। এ বইয়ের লেখকও ইনাম আল হক। চমৎকার এ বইটিতেও রয়েছে পাখির রঙিন ছবিসহ বর্ণিল বর্ণনা।
পাখির ফিল্ডগাইড
বাংলাদেশের পাখির তথ্য নিয়ে প্রকাশিত বই ‘পাখির ফিল্ডগাইড’। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে বার্ড ক্লাব। এটি বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম পাখির ফিল্ডগাইড। লিখেছেন ইনাম আল হক। সহকারী লেখক হিসেবে রয়েছেন তারেক অণু। বইটিতে বাংলাদেশে সচরাচর দেখা মেলে এমন ৫০৬ প্রজাতির পাখির বাংলা নাম, ইংরেজি নাম ও বৈজ্ঞানিক দেওয়া হয়েছে। রয়েছে প্রতিটি পাখির রঙিন স্কেচ, আলোকচিত্র ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। প্রতিটি পাখির বর্ণনার শেষে তার আবাসের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। বইটিতে ব্যবহৃত পাখির ইলাস্ট্রেশনগুলো বিখ্যাত প্রকাশক ‘ক্রিস্টেফার হোমস’ এর অনুমোদন ক্রমে পাওয়া।
বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ (পাখি)
এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৯ সালে প্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণীকোষ’ নামের কোষ। এ কোষগুলোর অন্যতম সম্পাদক ইনাম আল হক। এছাড়া এ কোষের ২৬তম খণ্ডটি পাখিবিষয়ক। এ খণ্ডেরও অন্যতম সম্পাদক ইনাম আল হক। বইটির প্রচ্ছদও করেছেন তিনি। সম্পাদকের পাশাপাশি বইটির অন্যতম লেখকও তিনি। বইটিতে বাংলাদেশের পরিযায়ী ও আবাসিক মিলে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখির ছবিসহ বাংলা, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে আছে পাখিটির নানা তথ্য ও বর্ণনা।
‘বেঙ্গমা-বেঙ্গমীর মতো কত পাখি’
‘বেঙ্গমা-বেঙ্গমীর মতো কত পাখি’ নামের এ বইয়ের লেখকও ইনাম আল হক। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। মজার এ বইয়ে আছে পাখি বিষয়ক রূপকথা, উপাখ্যান ও লোককথা। বাংলাদেশের পাখির নিয়েও আছে মজার অনেক গল্প। সেইসঙ্গে বইয়ের প্রতিটি পাতায় আছে পাখির রঙিন চিত্র ও অলংকরণ। বইয়ের আলোকচিত্রগুলো ইনাম আল হকের তোলা।
ডাকটিকিটে পাখির ছবি
শকুন নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বিশেষ ডাকটিকিট, স্যুভেনিরশিট ও খাম প্রকাশ করেছে। পাখিবিশারদ ইনাম আল হক নিজের তোলা আলোকচিত্র দিয়ে এসব ডাকটিকিট, স্যুভেনিরশিট ও খামের নকশা করেছেন। এছাড়া ‘বাংলাদেশের পরিযায়ী পাখি’; ‘বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুদর্শন পাখি’; ‘বাংলাদেশের পাখির বাসা’; ‘বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী’; ‘ইন্দোনেশিয়া ২০১২ বিশ্ব ডাকটিকিট চ্যাম্পিয়নশিপ ও প্রদর্শন’ শীর্ষক পাখিবিষয়ক বিশেষ ডাকটিকিট, স্যুভেনিরশিট ও খাম প্রকাশ করেছে ডাক। এসবও পাখিবিশরাদ ইনাম আল হক নিজের তোলা আলোকচিত্র দিয়ে নকশা করেছেন।
বাংলাদেশের ছোট ও বড় পাখি;
বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট পাখি
সিঁদুরে পিঠ ফুলঝুরি: সিঁদুরে পিঠ ফুলঝুরি বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট আবাসিক পাখি। সুলভ এ পাখিটি দেশের সবখানেই দেখা যায়। এ গড় দৈর্ঘ্য ৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ইংরেজি নাম: Scarletbacked-Flowerpecker.
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাখি
কালাগলা মানিকজোড়
কালাগলা মানিকজোড় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাখি হিসেবে ধরা হয়। এ গড় দৈর্ঘ্য ১৩৫ সেন্টিমিটার। বিরল প্রজাতির এ পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশে খুব কম দেখা যায়। পাখিটি প্রায় বিলুপ্ত। এর ইংরেজি নাম: ইBlack-necked Stork.
পৃথিবীর দ্রুততম শিকারি পাখি;পেরিগ্রিন শাহিন
পৃথিবীর দ্রুততম শিকার পাখি বাংলাদেশের পেরিগ্রিন শাহিন। বিরল প্রজাতির পরিযায়ী এ পাখিটি ঘণ্টায় ৩২২ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে উড়তে পারে। যা পৃথিবীর দ্রুততম মানব উসাইন বোল্টের চেয়ে প্রায় ৭ গুণ বেশি। এখন পর্যন্ত এ পাখির ওড়ার রেকর্ড রয়েছে ঘণ্টায় ৩৮৯ কিলোমিটার পর্যন্ত। অন্যদিকে উসাইন বোল্টের দৌড়ের রেকর্ড সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৪৩ কিলোমিটার।
এর শরীর লম্বায় ৪২ সেন্টিমিটার, ডানা ২৮ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ২.৬ সেন্টিমিটার, পা ৪.৯ সেন্টিমিটার, লেজ ১৪.৫ সেন্টিমিটার ও ওজন মেয়ে পাখির ৯০০ গ্রাম থেকে একহাজার ৫০০ গ্রাম ও ছেলে পাখির ৪০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এদের ছেলেপাখি ও মেয়েপাখি দেখতে একই রকম। তবে ছেলেপাখির তুলনায় মেয়ে পাখিগুলোা একটু বেশি বড় হয়। এদের পিঠের দিকটা অনেকটা কালচে রঙের ও পেটের দিকটা লালচে। এছাড়া মাথার রংটাও কালো।
এরা নদী, খাল, খাড়াপাহাড়, জলাভূমি, প্যারাবন, অর্ধ-মরুভূমি ও পাথুরে জায়গায় থাকতে পছন্দ করে। ডালে, মাটিতে কিংবা আকাশে উড়ে শিকার খোঁজে এরা। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে ভূমিতে, সৈকতে, জলে বিচরণ করা ছোট পাখি, পোষাপাখি ও বাদুড়। ওর দাঁতগুলো বাঁকানো ও ধারালো। নখগুলো তীক্ষ্ম। যা দিয়ে ও সহজেই শিকারকে ধরতে পারে।
মার্চ থেকে মে মাসে এরা বাচ্চা ফোটায়। তখন এরা খাড়া পর্বতের গায়ে, কখনও গাছে ডালপালা, ঘাস ও পশম দিয়ে মাচার মতো বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। এরা একসঙ্গে ৩ থেকে ৪টি ডিম দিতে পারে। ডিমের মাপ ৫.২ঢ৪.১ সেন্টিমিটার। মেয়ে পাখি একাই ডিমে তা দেয়।
২৫ থেকে ২৭ দিনের মাথায় ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। এর ইংরেজি নাম: চবৎবমৎরহব ভধষপড়হ. এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ— অচেনা শাহিন।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় কয়েকটি পাখি
দেশি গাংচষা
কৃষক যেভাবে খেতে লাঙল চষে। ঠিক তেমনি নদীর পানিতে ঠোঁট চষে এই পাখি। অর্থাৎ নদীর পানি কেটে কেটে খাবার সংগ্রহ করে এরা। তাই এদের নাম— দেশি গাংচষা। এটি আমাদের জলচর পরিযায়ী পাখি। এর নিজের ঠোঁটটি একেবারে ছুরির মতো এবং নিচের ঠোঁটটি ওপরের ঠোঁটের চেয়ে অনেকটা বড়। তাই অনেকে এই পাখিটিকে আজব ঠোঁটের পাখিও বলে। এর খাবার সংগ্রহের ধরনটাও অদ্ভুত।
এরা যখন নদীর পানিতে খাবার সংগ্রহ করে, তখন এরা নিচের ঠোঁটটি পানিতে ডুবিয়ে দেয় এবং পানির সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে চলে। আর এভাবেই এরা পানির ওপর ভেসে বেড়ানো ছোট ছোট মাছ ধরে খায়। ক্যাপ, ক্যাপ শব্দে এরা সুর করে ডাকে।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে এরা পানচিল নামক আরেকটি পাখির দলের সঙ্গে মিলে বড় নদীর বালুতীরে বালি খোদল করে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো কিছুটা পাটল ও বাদামি রঙের। ডিমের মাপ ৪.১ ঢ ৩.০ সেন্টিমিটার। একসঙ্গে এরা তিন থেকে চারটি ডিম দেয়।
এর শরীর লম্বায় ৪০ সেন্টিমিটার, ডানা ৩৭ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৭.৭ সেন্টিমিটার, পা ২.৫ সেন্টিমিটার ও লেজ ১০.৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পিঠ অনেকটা কালচে বাদামি ও নিচের দিকে জ্বলজ্বলে সাদা রঙের। আর ঠোঁট কমলার মতো। সংখ্যায় খুব বেশি নেই বলে বিশ্বে এটি সংকটাপন্ন ও বাংলাদেশে বিপন্ন বলে বিবেচিত। এর ইংরেজি নাম: Masked Finfoot এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ— ধলাগলার ঠোঁটওয়ালা।
কালামুখ প্যারাপাখি
কালামুখ প্যারা একটু লাজুক স্বভাবের পাখি এ। সেজন্য গভীর জঙ্গলে সে লুকিয়ে থাকে। এটি বাংলাদেশের বিপন্ন জলচর আবাসিক পাখি। এর বসবাস একমাত্র সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে। এর শরীর লম্বায় ৫৬ সেন্টিমিটার, ডানা ২৪ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ৫ সেন্টিমিটার, পা .৮ সেন্টিমিটার ও লেজ ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
কাঁদায় হেঁটে বা কম পানিতে সাঁতার কেটে এরা খাদ্য খায়। এদের খাবার— ছোট মাছ, জলজ পোকা, শামুক ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের ছেলে পাখি ও মেয়ে পাখির চেহারায় পার্থক্য রয়েছে। ছেলে পাখির পুরো কপাল, গলা ও ঘাড়ের ওপরের অংশ কালো, কিন্তু মেয়ে পাখির গলার কেন্দ্রের নিচে ও ঘাড়ের ওপরের অংশ সাদা। তবে দুজনেরই ঠোঁটের রং হলুদ এবং পিঠের রং অনেকটা জলপাই-বাদামি রঙের।
জুলাই থেকে আগস্ট মাস এদের বাচ্চা ফোটানোর সময়। এরা পানি কিংবা মাটি থেকে ১ থেকে ৩ মিটার উঁচুতে গাছের বড় ডালে ঘন পাতার আড়ালে ডালপালা দিয়ে গোল বাসা বানায় ও ডিম পাড়ে। ডিমের রং অনেকটা সবুজের মতো। এরা একসঙ্গে ৫ থেকে ৬ টি ডিম দিতে পারে। ডিমের মাপ ৫.২ ঢ ৪.৩ সেন্টিমিটার। বিশ্বে এটি সংকটাপন্নের তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই এটি বিপন্ন হিসেবে পরিচিত। এর ইংরেজি নাম: গধংশবফ ঋরহভড়ড়ঃ এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ— মুখোশওয়ালা সূর্য-শিশু।
চামচঠুঁটো বাটান
এর ঠোঁটগুলো দেখতে ঠিক চামচের মতো। এটি আমাদের পরিযায়ী পাখি। এদেশে এদের থাকার অন্যতম স্থান-কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়ার সৈকত এলাকা। পাখি গবেষকদের মতে সারা পৃথিবীতে এই পাখির সংখ্যা আছে ২০০ জোড়ার মতো। এরমধ্যে সোনাদিয়া এলাকা পৃথিবীর প্রায় ১০ শতাংশ চামচঠুঁটো বাটানের শীতের আবাস হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এদেশের অন্যান্য উপকূলে মাঝে-মধ্যে এদের দুই-একটি দেখা যায়।
এর শরীর লম্বায় ১৭ সেন্টিমিটার, ডানা ১০ সেন্টিমিটার, ঠোঁট ২.২ সেন্টিমিটার, ঠোঁটের চামচের মতো অংশ ১.১ সেন্টিমিটার, পা ২.১ সেন্টিমিটার ও লেজ ৩.৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এর পিঠের অংশের রং অনেকটা ধূসর ও নিজের অংশ সাদা। ভেজা বালি বা কাদার ওপরের স্তর থেকে এরা খাদ্য সংগ্রহ করে। এদের খাদ্য তালিকায় আছে নানা জাতের অমেরুদণ্ডী প্রাণী।
শ্যাওলা বা খাটো উইলো গাছে ঢাকা প্রান্তরের মাটিতে ঘাস, পাতা শ্যাওলার বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। একসঙ্গে এরা চারটি পর্যন্ত ডিম দেয়। ২০ দিনের মাথায় ডিম থেকে ছানা বের হয় এবং চার সপ্তাহের মাথায় ছানা বাসা ছেড়ে উড়তে শেখে। এর ইংরেজি নাম: Spoon-bill Sandpiper. এর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ— খাটো চওড়াঠুঁটো পাখি।