ছেলেটা এমনিতেই খুব নিঃসঙ্গ। ইচ্ছে করেই এই নিঃসঙ্গতাকে বেছে নিয়েছে ও, এক কথায় বলা যায়। আর সবার মতো সকলের সাথে মিশতে ভালো লাগে না একদম। অন্যদিকে পরিবার থেকেও কিছুটা বাধা আছে। কিন্তু ইচ্ছে করলে সে বাধাটুকু এড়িয়ে চলা সম্ভবও ছিল। আসলে নিজের মধ্যে একটা আড়াল তৈরি করে ফেলেছে ও অন্যদের থেকে। সে আড়ালটা তাই ভাঙতে চায়ও না। হাজার হোক, নিজেরই গড়া আড়াল কি না! সবুজ একাকী থাকে। বসে বসে পার করে দেয় দিনের অবসরগুলো। তবে হাতে একটা বই থাকে। বিকেলবেলা স্কুলের বারান্দায় বসে থাকে আর বই পড়ে। তবে কি সে ক্লাসের বই? তা হতে যাবে কেন? ক্লাসের পড়া আর কতক্ষণ ভালো লাগে? সবুজ তাই গল্পের বই পড়ে। ও যখন স্কুলের বারান্দায় বসে গল্পের বই পড়ে, তখন ওর সামনে থাকে খেলার মাঠ। না, না, সামনে থাকে বললে ভুল হবে, মাঠটা তো ওখানেই আছে সেই কবে থেকে; বরং স্কুলের বিল্ডিং বানানো হয়েছে খেলার মাঠের ওই জায়গাটুকু রেখেই।
সবুজের যেসব বন্ধু খেলাধুলায় মত্ত থাকে, তারা সবুজকে দেখে হাসে। সে হাসির মধ্যে কেমন অবজ্ঞার একটা ভাব বোধ হয় থাকে। কিন্তু সবুজ কেয়ার করে না। বরং ও নিজেকে বেশ সুখী ভাবে। কারণ এই বয়সে ওর জ্ঞান বেশ পরিপক্বই বলা যায়। বন্ধুদের তুলনায় অনেক বেশিই জানে বলে মনে হয় নিজের কাছে। আর নিজের চেয়ে নিজের সম্বন্ধে বেশি জানলেওয়ালা কে আছে? সবুজ জানে বেশি, আর এই জানাটাকে প্রকাশ করতে কেমন একটা ছটফটে ভাব উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে ওর মধ্যে। এক সময় ওর বন্ধুরাও ওকে বেশ মান্য করতে শুরু করে। ওরা হয়তো ভাবে, সবুজ খুব পড়ুয়া ছেলে। সবুজও একবার যা পড়ে তা ওর মনের মধ্যে গেঁথে যায়। তাই একটু বেপরোয়া স্বভাবের হয়ে উঠল বইকি! মফস্সল শহরের গিন্নিরাও ওকে বেশ পছন্দ করতে আরম্ভ করল। এর কারণও আছে— সবুজের কাছে যে বইয়ের বিশাল ভান্ডার আছে। এই বইই তাকে পাড়ার গৃহিণীদের কাছে স্নেহধন্য করে তোলে। তারাও সর্বদা ওর খোঁজখবর নিতে ব্যস্ত থাকে।
সবুজ ধীরে ধীরে বইয়ের রাজত্ব দখল করে নিল। সবুজ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় যখন ও হিসাব মেলাতে বসে দুনিয়ায় কত রকম বই আছে? এই বই নিয়েই আবর্তিত হতে থাকে সবুজের জীবন। অনেক সুখ-দুঃখের কাহিনি জমা হতে থাকে ওর জীবনপাতায়। কিন্তু ওর তেমন কোনো বন্ধু না থাকায় কারোর সাথে সেগুলো শেয়ার করতে পারে না।
দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো। সবুজ ঈদগাহ থেকে নামাজ পড়ে এসে নিজের রুমে শুয়েই কাটিয়ে দিলো পুরো দিনটা।
ভালো কোনো জামা এবারও ওর জোটেনি। দরিদ্র পিতা পারেননি ওকে দামি জামা-প্যান্ট কিনে দিতে। প্রতি বছরই এই সময় চাপা একটা দুঃখ ওর মনের মধ্যে গুমরে ওঠে। কিন্তু প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে সে দুঃখটা চাপা দিয়ে দেয় ও। ও যখন ঈদগাহে নামাজ পড়তে যায়, তখন পাড়া প্রতিবেশীর ছেলে-মেয়েদের রংবেরঙের পোশাক পরা অবস্থায় দেখে একটু বিমর্ষ হয় ঠিকই। ওর পরনে তখন প্রাচীনকালের একটা আচকান শেরওয়ানি। কয়েকজন ওকে দেখে একটু যেন মুচকি হাসল। ও কিছু বলল না বা বলতে ইচ্ছে করল না। নতুন পোশাকের তীব্র ইচ্ছেটাকে ওই লম্বা শেরওয়ানির মধ্যে চাপা দিয়ে দিলো।
এই সবুজ, এই আনন্দের দিনে ঘরে শুয়ে আছিস কেন? যা, বন্ধুদের সাথে ঘুরে আয়। ভালো লাগবে। বড় চাচু কখন রুমে ঢুকেছেন সবুজ খেয়াল করেনি, তাই একটু চমকালো ও। ছেদ পড়ল ভাবনায়।
সবুজ বলল, আমার ওসব ভালো লাগে না চাচু। আমার এখন শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।
বড় চাচু আরও কিছু কথা বলে নিরাশ হয়ে চলে গেলেন। সবুজের খুব খিদে পেয়েছে। মনে পড়ল, সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। কিন্তু ভয়ানক আলস্য এসে ভীড় করল ওর কাঁধে। উঠে গিয়ে খেয়ে আসতে ইচ্ছে করল না। ওদিকে অবশ্য মা খাবার রেডি করে ছেলের অপেক্ষায় আছেন।
সবুজ এবার পাতলা কাঁথাটা গায়ের ওপর জড়িয়ে নিল। তারপর নানান কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। নিজের মধ্যে নিজেই গুটিয়ে যেতে থাকল সবুজ। ও ভালো ছাত্র, তারপরও মনের মধ্যে লেখক হবার একটা বাসনা জন্ম নিতে লাগল। মুরুব্বিরা বলতেন ওর যে মেধা তাতে ও একদিন অনেক বড় মানুষ হবে। কিন্তু ও তো জানে ও ওসব ‘বড় মানুষ-টানুষ’ হতে চায় না— হতে চায় ‘বড় লেখক’। ‘আচ্ছা, বড় লেখকও তো বড় মানুষ!’ ভাবে ও।
সবুজ মাঝে মাঝে নিজের মনেই হেসে ওঠে। তা দেখে অন্যরা ভাবে এবং বলেও, আহ্, ছেলেটা কী বোকা! আবার হঠাৎ হঠাৎ ও নিঃশব্দে কেঁদেও ওঠে।
সবুজ কল্পনায় নানান সুখের ছবি আঁকতে পারে। আকাশের পর আকাশ সে পাড়ি দিতে থাকে কল্পনার ঘোড়া দাবড়িয়ে। প্রতি রাতে সুখ-স্বপ্নের ভেতর ডুব দেয়। সাদা ধবধবে পাখির ডানায় সাঁতরিয়ে পার হয় মাঠ-ঘাট-প্রান্তর, এরাজ্য থেকে ও রাজ্য। স্বপ্ন দেখতে দেখতেই পার হয়ে যায় রাতটা।
সবুজ বেশ গর্বিত। নিজেকে নিয়ে এইসব ভাবতে ওর বেশ ভালোই লাগে। ও জানে, ওর এসব ভাবনা মোটেই অমূলক নয়। এক সময় সে তার স্বপ্ন—বড় লেখক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেই।
এভাবেই হাসি-কান্নার মধ্যে সবুজের কৈশোর পার হতে থাকে।