নীল সমুদ্রের মাঝখানে একটি দ্বীপ ভানুয়ালা। সেই দ্বীপে ছিল একটি বিশাল পাথরখণ্ড। একদিন হঠাৎ করে প্রচণ্ড এক। বিস্ফোরণের ফলে সেই পাথরখণ্ড ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই টুকরোগুলো থেকে তখন জন্ম নেয় কয়েকজন মানুষ। তারা হলো কাট ও তার ভাইয়েরা। কাট ছিল মহাবীর। প্রখর বুদ্ধির অধিকারী। নতুন কোনো কিছু উদ্ভাবন করার ক্ষেত্রে তার জুড়ি ছিল না। উত্তাল সমুদ্র যেন সবসময় তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। তীরভূমিতে দাঁড়িয়ে সে ভাবত কীভাবে এই বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কোনো অজানা অচেনা দেশে চলে যাওয়া যায়।
ভাবতে ভাবতে কাটের মাথায় বুদ্ধি আসে। সে গাছের গুঁড়ি দিয়ে প্রথমে তৈরি করে ডিঙি নৌকা ক্যানু। তাতে পাল টানানোর জন্য ব্যবস্থা করে। মৌসুমি বাতাসে পাল ফুলে ওঠে পাখির ডানার মতো হয়ে যায়। তখন সাগরের বুকে তরতরিয়ে ভেসে চলে ক্যানু।
এভাবেই সাহসী কাট সমুদ্র পাড়ি দেওয়া শুরু করে। তার ইচ্ছে সমুদ্রের রহস্যকে ভেদ করার। তাকে বলা হতো সাগরপুত্র।
কাট ছিল নিত্যনতুন উদ্ভাবনে আগ্রহী। সে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি করে। তার কাছে ছিল বিশাল এক মাছ ধরার বড়শি। সেই বড়শি ফেলে সাগরের নিচ থেকে বিভিন্ন দ্বীপকে টেনে তুলে আনে কাট। আর এভাবেই সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠে অনেক দ্বীপ। কাট দ্বীপে পাহাড়, পর্বত, ঝরনা, নদী সৃষ্টি করে। গাছপালা দিয়ে বনজঙ্গল সৃষ্টি করে। সেখানে বহু ধরনের গাছপালা। অনেক গাছেরই আবার ছিল ভেষজ গুণ, যা ব্যবহার করলে মানুষের রোগব্যাধি সেরে যেত। কাট তার ভাইদের সাহায্য নিয়ে এ বিশাল কাজটি সম্পন্ন করে। দ্বীপের পরিবেশকে পুরোপুরি বদলে দেয়। অনুর্বর অঞ্চলকে ক্রমশ করে তোলে উর্বর।
এভাবে একনাগাড়ে কাজ করতে করতে কাটের ভাইয়েরা এক সময় যথেষ্ট ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এই ক্লান্তিকে লাঘব করার জন্য তখন কাট সৃষ্টি করল রাত। ভাইদের শেখালো কীভাবে রাতের বেলায় ঘুমাতে হয়। নিদ্রাদেবীর কোলে আশ্রয় নিতে হয়।। বীর কাটের সবসময়ের সাথি হলো এক মাকড়সা। তার নাম মারাওয়া। মারাওয়া ছিল খুবই বিশ্বস্ত। কাটকে সে বহুবার মারাত্মক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। বাঁচিয়েছে।
একবার ষড়যন্ত্র করে কাটের ভাইয়েরা কাটকে রাক্ষুসে কাঁকড়ার গর্তের ভেতরে ফেলে দিয়ে মারার চেষ্টা করেছিল। মারাওয়া তখন কাটকে সেখান থেকে কৌশলে উদ্ধার করে আনে। আর একবার কাট আটকে পড়ে গিয়েছিল এক গাছের ভেতরে। মারাওয়া তখন তার দীর্ঘ সাদা চুল নামিয়ে দেয় গাছের ভেতরে। কাট তখন সেই দিঘল চুলকে মইয়ের মতো ব্যবহার করে। সেই চুল বেয়ে বেয়ে ওপরে উঠে আসে।
একটি বিশাল গাছ থেকে কাট তিনটি মানব আর তিনটি মানবী সৃষ্টি করে। তাদের সাজায় তালপাতা দিয়ে। তাদের তিন দিন লুকিয়ে রাখে গাছের ছায়াতে। চতুর্থ দিন কাট বাদ্য বাজিয়ে তুমুল নাচ শুরু করে দেয়। এভাবে নাচতে নাচতে এক পর্যায়ে মানুষগুলোর অবয়বের ভেতরে আত্মা ভরে দিয়ে জীবিত করে তোলে।
কাট যখন গাছ খোদাই করে মানুষ বানাচ্ছিল মাকড়সা মারওয়া তখন তাকে অনুকরণ করে। কাট যখন মানুষ বানিয়ে গাছের ছায়ায় লুকিয়ে। রাখে মারাওয়াও ঠিক সে কাজ করে। চতুর্থ দিন কাট প্রাণ সঞ্চার করে মানবমূর্তিতে। মারাওয়া তখন ছয়টি মানব মানবীকে নিয়ে পালিয়ে যায়। গভীর এক গর্ত করে তাদের সেখানে লুকিয়ে রাখে। গর্তের মুখ ঢেকে দেয়। ডালপালা, লতাপাতা দিয়ে। সাত দিন পর মাটি খুঁড়ে মারাওয়া গলিত লাশ বের করে।
মারাওয়ার এই অপকর্মের জন্য মানুষ এক মহা সুযোগ হারালো। মানুষ আর অমর হতে পারল না। পৃথিবীতে মানুষ আসে মাত্র অল্প কিছু দিনের আয়ু নিয়ে।
কাট জন্ম দিয়েছে মানুষের। মারাওয়া নিয়ে এসেছে মৃত্যু।
কাট একদিন গভীর বনের নীল হ্রদে দেখতে পায় আকাশকুমারীকে। আকাশকুমারী তখন তার সাথিদের নিয়ে হ্রদের টলটলে পানিতে খেলা করছিল। মাঝে মাঝেই আকাশকুমারী এ হ্রদে চলে আসে। তারা তখন হাসি কৌতুক করে পানি ছিটাচ্ছিল। কাট জানে আকাশকুমারীদের ডানাগুলো কোথায় রয়েছে। ডানা খুলে রেখে আকাশকুমারী হ্রদে নেমেছে। কাট এক ঝোপের পাশে দেখতে পেল ময়ূরকণ্ঠী রঙের আশ্চর্য সুন্দর এক জোড়া পাখা। পাখাগুলোকে পাহারা দিচ্ছে এক জোড়া ঘুঘুপাখি। কাট পাখাজোড়া আর ঘুঘুপাখি দুটোকে মাটিতে পুঁতে রাখে।
ডানা হারিয়ে আর আকাশে উড়ে যেতে পারে না আকাশকুমারী। তাকে তখন বাধ্য হয়ে পৃথিবীতে থেকে যেতে হয়। ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে আকাশকুমারী। বনের মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে অসহায় আকাশকুমারী। কে তার এমন করুণ অবস্থা করল? কাট এগিয়ে এসে বলে, আকাশকুমারী, আমি তোমার পাখা জোড়াকে সরিয়ে ফেলেছি।
আকাশকুমারী আর্তনাদ করে ওঠে, কোথায় আমার সেই পাখাজোড়া?
মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। সেগুলো ভেঙে গেছে।
কী ভয়ানক সর্বনাশ যে তুমি আমার করেছ। কেন? কেন তুমি এ রকম করলে।
কারণ আমি যে তোমাকে বিয়ে করতে চাই আকাশকুমারী। তুমি যাতে আবার আকাশে উড়ে চলে যেতে না পারো সেই ব্যবস্থাই করেছি।
আকাশকুমারী তখন নিতান্ত নিরুপায় হয়ে কাটের প্রস্তাবে রাজি হয়। কাটকে বিয়ে করে। বিয়ের পর থেকে আকাশকুমারীর মন খুব খারাপ থাকে। তার শুধু মনে পড়ে যায় তাদের আকাশবাড়ির কথা। তার মন তখন হু হু করে ওঠে। গভীর বনের নীল হ্রদের কাছ থেকে তাকে ধরে নিয়ে এসেছিল কাট। সেই হ্রদের কাছে যাবার জন্যও আকাশকুমারীর মন অস্থির ওয়ে ওঠে।
একদিন সে গেল নীল হ্রদের কাছে। সেখানে এক রক্তগোলাপের ঝাড়ের কাছে কাট পাখাজোড়া আর ঘুঘু দুটোকে পুঁতে রেখেছিল। সেই বিশেষ জায়গাটিতে মাথা নিচু করে বসে আকাশকুমারী কাঁদতে লাগল। তার দু’গাল বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার চোখ দিয়ে এত পানি বেরুলো যে সেই পানিতে সেখানকার সমস্ত মাটি একেবারে ধুয়ে গেল। আর মাটির নিচ থেকে রহস্যময় ভাবে বেরিয়ে এলো পুঁতেরাখা পাখাজোড়া। পাখা জোড়া দেখে আকাশকুমারী শিহরিত হয়। সে তার হারানো পাখা ফিরে পেয়েছে! এখন তার উড়ে যেতে আর কোনো বাধা নেই!
আকাশকুমারী তখন তার পিঠে পাখাজোড়া লাগিয়ে আকাশে উড়ে যায়।
কাট যখন জানতে পারল যে তার বউ আকাশকুমারী উড়ে চলে গেছে তখন সে ভীষণ রেগে গেল। মনে মনে বলল, তুমি আকাশের যেখানেই চলে যাও না কেন আমি তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করব। আমি আবার তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসব আমাদের এই পৃথিবীতে। আমার হাত থেকে তোমার কখনও মুক্তি নেই। প্রচণ্ড জেদি স্বভাবের কাট তখন আকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিল। সে প্রথমে একটা শক্ত তীর বানালো। সেই তীরের শেষ প্রান্তে মোটা একটা রশি বাঁধল। তারপর আকাশের দিকে ছুড়ল তীরটি। আকাশের বুকে তির বাঁধার পর সেখান থেকে একটা বটগাছের শিকড় বেরিয়ে এলো। কাট তখন তীরে বাঁধা সেই রশি বেয়ে তরতরিয়ে আকাশে উঠে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল আকাশবাগানে এক দানবাকৃতির চাষি জমি নিড়াচ্ছে।
কাট তাকে অনুরোধ করল, জমি নিড়াবার সময় যাতে বটগাছের শেকড়টাকে আবার কেটে না ফেলে। শেকড় কাটা হলে তার আর পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব হবে না। কাট আকাশরাজ্যে তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল তার পালিয়ে আসা বউকে। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় পেয়ে গেল তাকে। আকাশকুমারীকে কাঁধে তুলে নিয়ে রওনা হলো কাট। কিন্তু রশি বেয়ে নেমে আসার সময় হঠাৎ করে ছিঁড়ে যায় বটগাছের শেকড়। তখন কাটের কাঁধ থেকে ফসকে পড়ে যায় তার বউ। মাটিতে পড়ে যাবার আগেই আকাশকুমারী আবার উড়ে চলে যায় আকাশে।
কাট শাঁ শাঁ করে নেমে আসে। তারপর পাথুরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল সে। তার করুণ মৃত্যু হলো।
(ব্যাংকস দ্বীপ ও নিউ হেব্রিজ অঞ্চলের লোককাহিনি)।