- ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান
আমার জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান থানার কদরপুর গ্রামে। সেই গ্রামে বেশ কিছুকাল কেটেছে। আমার বাবা তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন কানুনগোপাড়ায় একটা প্রাইভেট কলেজে। পরে উনি এখান থেকে চাকরি বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে জয়েন করেন। তখন ওখানে বাসা নিলেন এবং আমরাও চট্টগ্রাম এলাম। চট্টগ্রাম কলেজে উনি ৫৪/৫৫ সাল পর্যন্ত চাকরি করেছেন। এরপর উনি জুডিশিয়ারিতে চলে যান। মুন্সেফ হিসেবে সিলেক্ট হন। ওনার প্রথম পোস্টিং হয় লক্ষ্মীপুর। তখন ওটা ছিল একটা থানা। এখানে বাবা দুবছর ছিলেন। তখন আমার বয়স চার বছর ছিল। তবুও একটু একটু স্মৃতিতে আছে। সুন্দর একটা বাংলো বাসা ছিল। পুকুর ছিল। পানি বেশি হলে মাছ ধরার স্মৃতি মনে আছে। ওখানকার গার্লস স্কুলের আমার বোন পড়ত। আমার বোন আমার পাঁচ বছরের বড় ছিল। আমি মাঝে মাঝে বোনের সাথে স্কুলে যেতাম। ওখানকার এক স্যার আমাকে টেবিলের ওপর বসিয়ে রাখত, এটুকু মনে আছে। এরপর আমরা ঢাকায় চলে আসি। আজিমপুর কলোনিতে উঠি। তখন আমার বয়স পাঁচ বছর। ওখানে পলাশী প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া শুরু। আজিমপুর কলোনিতে তখন এত বিল্ডিং ছিল না। এত বেশি মানুষ ছিল না। বেশ খেলাধুলার পরিবেশ ছিল। আমরা খেলাধুলা করতাম। তখন আব্বাকে আবার ট্রান্সফার করে দিলো। ওই সময় আমরা গ্রামে চলে গেলাম। গ্রামে প্রায় ছয়মাস থাকলাম। গ্রামের ওই স্মৃতিটা বেশি মনে আছে। আমাদের বাসা ছিল কোর্ট চত্বরের ভেতরেই। এখানে গোল্লাছুট এরপর ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে বাবার পোস্টিং হলে ওখানে চলে যাই। স্কুলে ভর্তি হই। ওখানকার স্মৃতিটা বেশ মনে আছে।
খেলতাম, দৌড়াদৌড়ি করতাম। পাশেই স্কুল ছিল। খুব জাঁদরেল হেডমাস্টার ছিলেন ওই স্কুলে।
ঈদের দিনের মজা মানেই নতুন কাপড়চোপড় পরে মাঠে আসা। সেই কাপড় সবাইকে দেখানো, নতুন জুতা, জামা এগুলোই ঈদের মূল আকর্ষণ। পাঞ্জাবি, পাজামা আর মাথায় টুপি এটাই ছিল মূল পোশাক।
১৯৬৫ সালে আব্বার পোস্টিং আবার ঢাকায় সচিবালয়ে হলো। আমরাও ঢাকা চলে এলাম। আবার আজিমপুরে। তখন ট্রেনের জার্নিটা খুব ভালো লাগত। টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবারদাবার বাড়ি থেকে আনা হতো ট্রেনে খাওয়ার জন্য, এটাও খুব ভালো লাগত। চানাচুর, বাদাম এসব কিনে খাওয়া হতো বাইরের খাবার। তখন পার্টিহাউজ ছিল নিউমার্কেটের অপজিটে। ওখানে একটা বাসায় আমরা ছিলাম। অনেক ভালো সময় কেটেছে এইখানে।
তারাবির যে হাদিয়া দিতে হতো তা মসজিদে পরিমাণে কম উঠত। তখন আমাদের মতো কিশোর, তরুণ বয়সিদের পাড়ায় পাড়ায় চাঁদা তোলার কাজে লাগানো হতো। এই স্মৃতিটা আমার খুব মজা লাগত। আমরা কখনও এই কাজে হেজিটেট বোধ করতাম না। আমরা তিনচার বন্ধু মিলে ডোর টু ডোর গিয়ে চাঁদা তুলতাম।
আমার জীবনের স্বর্ণালি সময় কাটিয়েছি এই আজিমপুর এরিয়ায়। এখানে প্রায় সতেরো বছর কেটেছে। এই চাঁদা তুলতে গিয়ে দরজায়
নক করলে ভেতর থেকে কেউ হয়তো বলছে মাফ করো, মাফ করো। আমরা বলতাম আমরা ফকির না। খালাম্মাকে ডাকো আমরা চাঁদার জন্য এসেছি।
আবার ঈদের মাঠেও আমরা মসজিদের জন্য টাকা কালেক্ট করতাম। এসব স্মৃতি খুব মনে পড়ে।
নামাজে যাওয়ার আগে সুন্নত পালন করে একটু সেমাই বা এই জাতীয় খাবার খাওয়া হতো। শুকনো সেমাইটা বেশি হতো। চিটাগাংয়ের লোক দুধ সেমাই কম খেতো। দুপুরে আম্মা কোর্মা পোলাও এসব রান্না করত। আরেকটা জিনিস খুব ভালো লাগত ঈদের দিন বিদেশিরা এসে ছবি তুলত। সব রঙিন জামাকাপড় পরে উৎসবমুখর পরিবেশের ছবি।
আগে ঈদের সময় পাড়া মহল্লায় যে সাজসাজ রব পড়ে যেত, সেটা এখন আর দেখা যায় না। আসলে তখন তো আমরা কমিউনিটি বেজড বসবাস করতাম। এবাসা-ওবাসায় যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া এসব ছিল। এখনকার বাচ্চারা সেলফ সেন্ট্রেড। নিজেকে নিয়ে ভাবে, নিজের মধ্যেই থাকে। সহজ, সরল, সাবলীল, অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল মানুষের মধ্যে। এখন আর এটা নেই। বাস্তুবাদী জীবন, আর্টিফিসিয়াল জীবন।
আমাদের কাছে ঈদের জামাত মানে ঈদের মাঠ। মাঠ ছাড়া জামাত ভাবতেই পারি না। মসজিদে নামাজ পড়ে ঈদের জামাতের আনন্দ নাই।
আমাদের সময় পত্রিকা, ম্যাগাজিন এসব ঈদসংখ্যা করত বেগম পত্রিকা, বাংলার বাণী, ইত্তেফাক এসব ছিল। আমাদের সময় মাঠে খেলাধুলার প্রচলন বেশি ছিল।
এখন শিশুদের প্যারেন্টাল গাইড কম। বিলাসী জীবনযাপন শিশুদের বিকাশে বাধা। ভ্যালুজ শিখছে না শিশুরা।