- আলম তালুকদার
অনেক দিন আগের কথা। মেলা সময়তো হবেই। তবে কত দিন বা কত সময় আগে তা ঠিক করে বলতে না পারলেও এটা ঠিক বহুত রাত আর দিন আগের ঘটনা। একদেশে ছিল এক ‘হাঁ’। হাঁহাঁ নয় বা হাহাকারও নয়। শুধু ‘হাঁ’ ছিল। তো থাকতে থাকতে থাকতেই ছিল। কোনো অসুবিধায় ছিল না। এদিকে আরেকটা দেশ ছিল যে দেশে শুধু ‘না’ নামে একটা শব্দ বসবাস করত। কেউ কারো কথা অনেক অনেক বছর জানতে পারেনি। এই হাঁ আর না ইচ্ছা মতো বেড়াতো ইচ্ছা না হলে কিছুই করত না। নিজ নিজে দেশে একজন না না, না না করত আরেকজন হাঁ হাঁ, হাঁ হাঁ করত।
শব্দের তো কোনো ভিসা-পাসপোর্ট লাগে না, বুজলে কি না, তো একদিন হাঁ করছে কী, সে হাঁ হাঁ হাঁহাঁ করতে করতে পিং পং বলের মতো নাচতে নাচতে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, যাচ্ছেই।
কোথায় কোনদিক যাচ্ছে তার কোনো খেয়াল নেই। শুধু যাচ্ছে আরকি। ঐ দিকে না করছে কি, সেও যাচ্ছে। যেতে যেতে যেতেই থাকল। বুঝলে কিনা যাচ্ছে তো যাচ্ছে। কে কোনদিক যাচ্ছে ওরাও জানে আমিও জানি না। না জানলে কী হবে দুজনে যেতে যেতেই বুঝলে কী না, হঠাৎ একবারে অকস্মাৎ এই হাঁ আর না এর সাথে দেখা হয়ে গেল। কখন কোথায় তা বলতে পারছি না, তবে এটা সত্য ওদের একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হয়েই গেল। আরে দেখা ঠিক নয়। আগে ধাক্কা হয়ে গেল। এই ধাক্কা যেমন তেমন ধাক্কা নয়, একেবারে যাকে বলে রাম-ধাক্কা। রাম-ধাক্কা খেয়ে পাক্কা দুই ঘণ্টা দুই মিনিটি ‘তবদা’ মেরে খাড়াইয়া একজন হাঁহাঁ করতে করতে হ্যাঁ হ্যাঁ করতে থাকে। আরেকজনও কম নয়, নিজেকে সামাল দিয়ে সে আরেকটা গুঁতা মেরে তার না হয়ে গেল নানা, আর না না। আশা করি এইটুকুন ঘটনা সবারই জানা আছে। জানা না থাকলে সমস্যা নেই। এই লেখাটা পড়লেই জানা হয়ে যাবে। এখন আমি যেটা বলব, সেটা সবাই জানে না। তবে গুগুলের কারণে জানতেও পারে। তা জানলে জানুকগে সেটা কোনো সমস্যা না। সমস্যা হলো আমি যেটুকু জেনেছি সেটুকু তোমাদের কাছে ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারব কি না।
আচ্ছা চেষ্টা করেই দেখি না কেন? চিন্তা-ভাবনা যে দিকে যায় আমি সেই দিকে যেতে থাকব। তো ‘হাঁ’ যে দেশে বসবাস করত সে দেশে ‘হাঁ’ ছাড়া কেউ কথা বলতে জানে না। এই যেমন;
—হাঁ, তুমি কেমন আছ হাঁ।
—হাঁ আমি ভালো আছ হাঁ।
—হাঁ তুমি আমাকে পছন্দ করো হাঁ।
—হাঁ আমি তোমাকে পছন্দ করি হাঁ। এই রকমের বাক্য দিয়ে তারা তাদের মনের ভাব প্রকাশ করত। আরো আছে যেমন;
—হাঁ আমাকে দশটাকা ধার দিবে হাঁ।
—হাঁ দিব হাঁ।
—তুমি যাবে হাঁ।
—হাঁ আমি যাব হাঁ।
বুজলে কি না, সব বাক্যের শুরুতে শেষে বা মাঝখানে হাঁ দিয়ে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি বাক্য হাঁ বলাই রীতি ঐ হাঁ করা দেশের। সোজা কথা হলো ঐ দেশে সব কিছুতেই হাঁ এর ব্যবহার। হাঁ এর জয়জয়কার। হাঁ শব্দে সবার উপকার। বাড়িতে গাড়িতে, হাঁড়িতে, পড়িতে, বিদ্যালয়ে আড্ডায় হাঁ এর চমৎকার ব্যবহার। এইভাবে হাঁ হাঁ করে হুঁ হুঁ করে দেশটার মানুষ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু যেদিন ‘না’ এর সাথে ‘হাঁ’ এর আচমকা ধাক্কাটা লাগল আরকি সেদিন হতেই শুরু হলো মহা ‘সমুস্যা’।
ঐদিকে ‘না’ তো এতিম। তার খবরে যাওয়া যাক। এই ‘না’ দেশের মানুষ ‘না’ দিয়েই তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। কেমন? একটু নমুনা দেই।
—তোমার নাম বলবে না।
—বলব না কেন।
—আমাকে ভালোবাসবে না।
—না, বাসব না কেন।
—দশ টাকা দাও না।
—না দিব না কেন।
—একটা চকলেট দাও না
—না দিবো না কেন।
—তোমার বইটা ধার দাও না।
—না, দিবো না।
—তুমি পরীক্ষা দিবে না?
—না, দিবো না কেন।
এই রকমভাবে প্রশ্ন করা হতো আর জবাব দেওয়া হতো। এদেশে ‘হাঁ’ শব্দটি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তারা জানতই না। এইভাবে ‘হাঁ’ আর ‘না’ এর সাথে ধাক্কা লাগল আরকি সে দিন হতেই সমুস্যাটা শুরু।
তোমরা যারা চালাক তারা প্রশ্ন করতে পারো সমস্যাটা ‘সমুস্যা’ হয় কীভাবে? সেটাই এখন আমার প্রধান চিন্তা। ভুল করে তো ম এর নিচে একটা মোচড় দিয়ে দেখি বিপদ! দিয়ে যখন ফেলেছি তখন একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বের করা হবে। আপাতত আমার অবস্থাটা হয়েছে এক গ্রামের মোড়লের মতো। ঐ গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান মোড়ল। একবার হলো কী, গ্রামের চাষিরা মাঠে জমি চাষ করতে গিয়ে একটা অচেনা পাথর পেয়ে মোড়লের কাছে নিয়ে এসে তার কাছে জানতে চায় এই জিনিসটা কী? তো মোড়ল বিজ্ঞের মতো পাথরটা হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাচাতে নাচাতে হঠাৎ করে হেসে দিলো। আবার কিছুক্ষণ পরে কেঁদে দিলো। শেষে আবার হেসে দিলো। গ্রামের চাষিরাতো ‘তবদা’ মাইরা অবাক হয়ে গেল। তারা সাহস করে বলল, মোড়ল সাব রহস্যটা কী?
—আরে ব্যাটারা তোরা হলি মহা মূর্খ। আমি প্রথমে হাসলাম, তোরা যে এতটা গবেট তা আমার ধারণার বাইরে। এই সামান্য জিনিসটা তোর কেউ চিনতে পারলি না।
—তাইলে কানলেন যে?
—আরে বেটা কানলাম কারণ আমি না থাকলে তোদের উপায় কী হবে? তোদের করুণ অবস্থার কথা চিন্তা করেই কানলাম আরকি।
—আবার হাসলাইন যে?
—আরে ব্যাটা, হাসলাম কি সুখে? দুখে হাসি।
—ক্যান দুখ্যটা কী মোড়ল সাব?
—দুখ্যটা হইল গিয়া, বুঝলি কি না ব্যাটারা, এই জিনিসটা না আমিও চিনবার পারতাছি না। হাঁ হাঁ হাঁ হাঁ রে!
তো আমার দশা প্রায় ঐ মোড়লের মতন। তবে হার ছাড়ছি না। একটা রাস্তা বাতানো যাবেই। বাহে ‘বারে মুশকিল তেরে আছান’ একটু চিন্তা করে নেই। তোমরাও চিন্তা করতে থাকো। চিন্তা হলো মাথার ‘বাইটামিন’। ‘হাঁ’ ‘না’ এর ধাক্কা জনিত কারণে কী কী সমস্যার প্রবলেম হতে পারে?
সমস্যা আর কিছুই না। ‘হাঁ’ শব্দটা না’ এর দেশে আর ‘না’ শব্দটি ‘হাঁ’ এর দেশে ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই চলে গেল তাই না। যে যেটায় অভ্যস্ত নয় সে সেটার পাল্লায় পড়ে গেল। ‘না’ দেশের সমস্যা হলো না শব্দটি কমে গিয়ে হাঁ শব্দটি হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসে। তাতে অনেকের মাথা ঘুরতে থাকে। মাথা বোঁ বোঁ করে ঝিম ঝিম করে। ঐ দিকে ‘হাঁ’ দেশের সমস্যা হলো হঠাৎ করে ‘না’ ঢুকে যায়। তাতে অনেকের মেজাজ খিচড়ে গিয়ে বিগড়ে যায়। কারণ তাদের মাথা আর মন ঐভাবে তৈরি নয়। তারা সবকিছুতেই হোঁচট খায়। হাঁ, নাকি না, নাকি হাঁহাঁ নাকি নানা? এমন একটা চক্রের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। একই ব্যক্তি হাঁ বলে আবার না বলে। কখন যে হাঁ বলে আর কখন যে না বলে সে এক ঘোরতর ব্যাপার হয়ে গেল। একজন ব্যক্তিকে দুটো শব্দ নিপুণভাবে জব্দ করতে থাকে। উভয় দেশে একই সমস্যা দেখা গেল। শৃঙ্খলার জায়গায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। সকালে হাঁ, বিকালে না বলে। এমন অবস্থায় সমস্যাটা সমুস্যায় রূপান্তরিত হয়। প্রথম দিকে উভয় দেশের মানুষের মধ্যে পাগল পাগল ভাব দেখা যায়। শেষে অনেকেই উন্মাদ হয়ে যায়। যারা উন্মাদ উন্মাদ হয়ে যায় তারা ‘উন্মাদ’ পত্রিকাটা চালাচ্ছে বলে মনে করতে পারো। আর যারা পাগল মানে পা-কে গোলাকার মনে করে তারা
পাবনা হেমায়েতপুরের বাসিন্দা হয়েছে বলে মনে করতে পারো। এই ‘হাঁ’ এর সাথে ‘না’ এ ধাক্কা না লাগলে ‘উন্মাদ’ পত্রিকার জন্মই হতো না। এই কারণেই সোজা সমস্যাটা সমুস্যায় রূপ নিয়েছে। ইংরেজদের মধ্যে প্রবলেম হয়েছে ‘ইয়েস’ ‘নো’ ‘ভেরি গুড’ নিয়ে। প্রমাণ চাও?
—তুমি চুরি করিয়াছ?
—ইয়েস।
—মালামাল দিয়া দাও।
— নো।
—তাহা হইলে তুমি এরেস্ট হইবে।
—ভেরি গুড।
পা-গোল না হলে কি আর এমন করে বলে? এটা ঐ ইয়েস, নো, ভেরি গুড প্রয়োগজনিত সমুস্যা। কী আমার কথা বিশ্বাস হলো না? হাঁ, হাঁ মিলেই তো হাঁ হাঁ হাসি। আর না এর সাথে না মিলেই তো নানা হয়েছে। না না আছে অথচ ডাকতে পারছ না, এটা কি ঠিক হতো? না আর না মিলিত না হলে মানুষ নানা কথা বলতেই পারত না কাজেই হাঁ না মিলে হানা দিয়ে নানা বানিয়ে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে আর জানিয়ে দিয়েছে আমরা হাঁ হাঁ হাসি, ভালোবাসি আর না না করতে করতে নানান বিষয় ভালোবাসি।
—তাই না?
—জি হাঁ।