ভাই-বোনের গল্প

  • ফরিদা হোসেন

ছোট একটি গ্রামে থাকত দুই ভাই-বোন খোকা আর খুকু। ওদের আর কেউ ছিল না। এক দুর্ঘটনায় বাবা-মাকে হারিয়েছে ওরা বেশ ক’বছর আগে। সারাদিন দুজন একা-একা ঘুরে বেড়ায়। গাছ-গাছালি থেকে ফলমূল যা পায় তা খেয়েই ওদের পেট ভরে। আর আছে ঝরনার পানি। কারো বাড়ির সামনে দাঁড়ালে দূর দূর করত সবাই।
বলত অলুক্ষনে।
বাপ-মা দুটোকেই খেয়েছিস একসাথে। দূর হয়ে যা সামনে থেকে।
মানুষের বকুনি শুনতে শুনতে দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসত দুভাই-বোনের। ভাবত কেন সবাই এমন করে ওদের…?
কী দোষ করেছে ওরা?
এমনি একদিন ঝরনার ধারে বসেছিল ভাইবোন দুটি।
মনটা খুবই খারাপ ছিল।
দেখছিল দূরে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কুয়াশা জমছে একটু একটু করে। আকাশে হলুদ গোলাপি রংটা কালচে হয়ে আসছে।
অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। দূর পাহাড়ের গায়ে টিম টিম করে আলো জ্বলতে দেখা যাচ্ছে। তবুও নড়ার নাম নেই দুটি ভাই-বোনের। সবুজ জোনাকিদের টিম টিম জলসায় ভরে গেল ঝোপঝাড়গুলো। সাথে ঝিঁঝি পোকার নূপুর ধ্বনি।
আকাশে অসংখ্য তারার দেওয়ালি।
ছোট্ট দুটি ভাই-বোন একে অন্যের হাত ধরে তখনো বসে আছে।
ঠান্ডা হাওয়া বইছে তিরতির করে।
রাত কত হয়েছে ওদের জানবার কথা নয়। বাচ্চা দুটি যেন অন্য কোনো লোকালয়ে আছে। এই গ্রাম এই পৃথিবী কোনোকিছুই যেন ওদের আপন নয়।
ওদের ধারণা।
শুধু ধারণা কেন?
ওরা ধরেই নিয়েছে যে এ জগতের কেউ তাদের ভালোবাসে না। মানুষের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ছাড়া কিছুই তো পায়নি জীবনে।
বাবা-মা দুজনে একসাথে মারা গেছেন— সে কি ওদের দোষে? ভাবতে গেলে দু-চোখ কান্নায় ভেসে যায় খোকা-খুকুর।
রাত তখন অনেক। আকাশ পারের তারার দেওয়ালি।
একটা নীল তারা ছুটে আসতে লাগল মাটির পৃথিবীর দিকে।
এসে থামল পাহাড় কোলের সেই ঝরনার ধারে।
হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চমকে উঠল ভাই-বোন দুজন।
নিজের চোখকে যেন ওরা বিশ্বাস করতে পারল না।
দেখল আলোর কাঠি হাতে চারদিক আলো করে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক জ্যোতির্ময় পরি।
বিস্মিত খোকা-খুকু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
ওরা দেখল-আকাশ থেকে বৃষ্টির অজস্র বর্ষণের মতো তারার ফুলকি ঝরছে চারদিক দিয়ে…।
একসময় খোকা অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করল।
কে তুমি? কী হচ্ছে এসব।
খিল খিল করে হেসে উঠল পরি।
আলোর কাঠিটা দেখিয়ে বলল—
আলোর পরি আমি। শান্তির দূত। বাবা-মার জন্যে খুব মন খারাপ করছিল তো।
দেখতে চাও তাদেরকে?
নিশ্চয়!
তুমি নিয়ে যাবে আমাদেরকে তাদের কাছে?
পরি বলল—
অবশ্যই। সেই জন্যই তো তোমাদের কাছে আমার আসা।
সত্যি!
পরি বলল—
এই আলোর কাঠিটা তোমরা দুজন ধরো এবং চোখ বন্ধ করো। তাই করল দুটি ভাই-বোন।
পরির কাঠিটা ধরে ওরা এসে হাজির হলো। অন্য এক দেশে। মেঘের সমুদ্র যেন চারদিকে…সব, সবকিছুই সাদা ধবধবে।
মেঘের পাহাড়
মেঘের মিনার
আর মেঘের সব বাড়ি-ঘর।
পরির কথায় এক সময় চোখ খুলল খোকা-খুকু দুজন।
এবং চোখ খুলেই বিস্ময়ে অবির্ভূত হয়ে গেল।
দেখল—
সেই মেঘের দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের মতো বহু ছেলে-মেয়ে। ওরা সবাই হাসছে খেলছে দৌড়াচ্ছে…।
পরি একসময় বলল—
জানো এরা কারা?
না।
ওরাও অনেক দুঃখী ছেলে-মেয়ে।
খুব কম বয়সে ওরা বাবা-মার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে নানান কারণে।
এরা এই মেঘালয় থেকে যখন খুশি বাবা-মাকে দেখতে পারে। আর তখন ওদের মনটাও ভালো হয়ে যায়।
খুকু এক সময় চমকে উঠল কাউকে দেখে।
বলল—
ভাইয়া দেখ বাবা-মা।
খোকা দেখল তাইতো!
মেঘের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে তাদেরকে।
পরি বলল—
সত্যি তাই। ওনারা তোমাদের বাবা-মা। এখানে আরো অনেক বাবা-মা আর ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা আছে, যারা তাদের আপনজনদেরকে হারিয়েছে। ছেড়ে এসেছে ঐ মাটির পৃথিবী, ঠিক তোমাদের মতো।
খুকু প্রশ্ন করল।
এদের কি খুব মন খারাপ? আমাদের মতো?
এবার একটু চুপ করে থাকল পরি। চট করে কিছু বলতে পারল না।
পরিকে চুপ করে থাকতে দেখে খোকা বলল—
বলো না পরি। তুমিতো সব জানো।
এবার একটু হাসবার মতো মুখ করল পরি। খুকুর ঝাঁকড়া চুলে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলো একটু।
তারপর বলল।
প্রথম প্রথম যখন এখানে এসেছিল আপনজনদের ছেড়ে… তখন খুব মন খারাপ হয়েছিল।
তবে এখন আর নেই।
সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। তোমাদের বাবা-মায়ের মতো আরো অনেক বাবা-মারা এখানে আছেন।
কাজেই তোমরা একদমই মন খারাপ করবে না। বাবা-মায়ের জনেই। শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করবে আকাশ পাড়ের সবার জন্য।
ঠিক আছে, বলল খোকা।
খুকু গাল ফুলিয়ে বলল—
যদি আমরা এখানেই থেকে যেতে চাই?
যদি আর ফিরে না যাই মাটির পৃথিবীতে।
পরি হাসল খুকুর কথা শুনে। বলল—
বোকা মেয়ে। তাও কি হয়? তোমাদের ওপর পৃথিবীর অনেক আশা-ভরসা। তোমরা হচ্ছো আগামীর ভবিষ্যৎ। সৃষ্টিকর্তা তোমাদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে ভালো কিছু করার জন্য। তোমাদের জীবনটা অনেক মূল্যবান। দেখবে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে আর বাবা-মার দোয়ায় তোমরা একদিন বিশ্বজয় করবে।
সত্যি বলছ তুমি।
দু’ভাই-বোন বলল—
হ্যাঁ সত্যি সত্যি সত্যি।
হাসল পরি। বলল—
এখন চলো তো। পৃথিবীতে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
পরি ওদের মুহূর্তের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে এলো সেই ঝরনার পাশে—
চারদিকে তাকালো খুকু। দেখল পাহাড়ের পেছন দিয়ে সূর্য ওঠার লাল আভা দেখা যাচ্ছে।
ওদেরকে এখানে পৌঁছে দিয়ে কখন পরি চলে গেছে টের পায়নি ওরা।
এক সময় উঠে দাঁড়ালো দু’ভাই-বোন, ঝরনার পানিতে নেমে মুখ হাত ধুলো।
ভোরের ঠান্ডা হাওয়ায় ওদের মনঃপ্রাণ দুই-ই জুড়িয়ে গেল।
ভীষণ ভালো লাগল ওদের।
মনে হলো সত্যি পৃথিবীটা অনেক সুন্দর ও অনেক অর্থবহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *