কাকতাড়ুয়া

  • হুসনে মোবারক

দৃশ্য : ১

[ফুটবল খেলার মাঠ। মাঠের ফসলি জমি। জমির ঠিক মাঝখানটায় একটি কাকতাড়ুয়া। মাঠে একদল কিশোর ফুটবল খেলা নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত।]
মুর্তজা : বললেই হলো পেনাল্টি কিক হবে। আমি ল্যাং মারিনি। ও নিজে নিজে পড়ে গেছে, এখন ভান করছে পেনাল্টি নেওয়ার জন্য।
আসাদ : ভানের কিছু নাই। ডি বক্সে ফাউল অইছে, পেনাল্টি শট পাইছি। কোনো কথা নাই।
রাইসুল : ঠিক আছে পেনাল্টি শট কর। আমরা উইঠা গেলাম। পেনাল্টি শট কর। খালি মাঠে গোল দে।
আসাদ : ল্যাং মাইরা ফাউল না করলে ভরা মাঠেই গোল দিতাম।
খবিরুল : ঠিক আছে শফিককে জিজ্ঞাসা কর। কসম খেয়ে শফিক বলুক, ওরে ল্যাং মারছে, ল্যাং খাইয়া ও পইড়া গেছে, তাইলে পেনাল্টি দিবো। সমস্যা নাই ১-১ সমতা, কিন্তু শফিককে কসম কইরা বলতে হবে।
রাসেল : এই শফিক সামনে আয়। কসম কর। কসম কইরা বল, মুর্তজা তোরে ল্যাং মারছে।
শফিক : ইয়ে মানে, আমি তো আর নিজে নিজে পইড়া যাইনি। আর ইচ্ছে করে পড়ব কেন। আমি তো বল নিয়া ঢুকেই গিয়েছিলাম। পড়ে না গেলে নিশ্চিত গোল হতো।
মুর্তজা : অত ধানাই ফানাই না কইরা সোজাসুজি কসম কর। কসম খাইয়া ক।
রাসেল : হ কসম কর। কসম কইরা বল।
শফিক : কসম। মুর্তজা আমারে ল্যাং মারছে। আহ্, থাপ্পড় মারলি কেন, এই থাপ্পড় মারলি কেন?
মুর্তজা : কে থাপ্পড় মারল?
শফিক : তুই থাপ্পড় মেরেছিস।
মুর্তজা : আমি আবার কখন থাপ্পড় মারলাম?
রাসেল : শফিক তোর কী হয়েছে? কে তোকে থাপ্পড় মারছে?
শফিক : ঠিক আছে আমি আর খেলবো না, আমি চললাম।
(শফিকের এরূপ অদ্ভুত আচরণে সবাই অবাক হয়। খেলা বন্ধ হয়ে যায়। যে যার মতো চলে যায়।)
দৃশ্য : ২
[ক্লাসরুম। আগের দিনের ফুটবল খেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবাই কানাঘুষা করছে।]
ছাত্র-২ : কী বলছিস, শফিক পাগল হতে যাবে কেন। কালকেও আমার সাথে সেকথা বলল, দিব্যি ভালো মানুষ।
ছাত্র-১ : আরে কাল আর আজ এক নয়। ওই দেখ, ক্লাস শুরু হতে বাকি নেই অথচ চুপচাপ মাঠের কোণে বসে আছে। জিনে ধরলে নাকি এরকম চুপচাপ থাকে প্রথম কয়েকদিন। তারপর আসল পাগলামি শুরু হয়।
ছাত্র-৩ : আরে ধ্যাৎ, জ্বিন টিন কিছুই না। খোঁজ নিয়ে দেখ, আজকের হোমওয়ার্ক করেনি শফিক। তাই এরকম ভাব ধরছে।
দৃশ্য : ৩
[খেলার মাঠের এক কোণে বসে আছে শফিক। মাঠ ঘেঁষা ফসলি খেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়া যেন তাকিয়ে আছে শফিকের দিকে।]
কাকতাড়ুয়া : কী হে বালক! কী ভাবছ বসে বসে?
শফিক : (চমকে ওঠে) কে, কে কথা বলছে?
কাকতাড়ুয়া : আমি, তোমার বন্ধু। কাকতাড়ুয়া। আচ্ছা বলোতো, তোমরা আমার নামটা কাকতাড়ুয়া দিলে কেন? আমি কি শুধু কাকই তাড়াই। এই যে মুরগির ছানাগুলো এখানে পোকামাকড় খেতে আসে, তখন ইয়া বড় বড় পাখাওয়ালা চিল এসে তাদের ছোবল মেরে নিয়ে যেতে চায়। ভয়ে মুরগির ছানাগুলো আমার কাছে আশ্রয় নেয়। আমাকে দেখে চিলওতো তখন পালায়। তাহলে কেন আমার নাম কাকতাড়ুয়া। চিলতাড়ুয়াও তো হতে পারত।
শফিক : (কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে) হে.. হে… তাহলে তো কাকবেচারা আবার রাগ করবে। আসলে তোমার নাম হওয়া উচিত পাখিতাড়ুয়া।
কাকতাড়ুয়া : তোমার এই নামটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমাকে দেখেতো ইঁদুরসহ আরও অনেকে ভয় পায়। মূলত তোমাদের জমির ফসল নষ্ট করতে আসে এরকম অনেক প্রাণীই আমাকে ভয় পায়। ভয়ে পালায়। কিন্তু ওরা জানেই না আমার কোনো শক্তি নেই। হ্যাঁ.. হ্যাঁ.. হ্যাঁ..।
আচ্ছা বলোতো, তুমি কী ভাবছ বসে বসে?
শফিক : আমার ভাবনার কথা শুনে তোমার লাভ কী?
কাকতাড়ুয়া : লাভ নেই, তবে আমি জানি তুমি কী ভাবছ।
শফিক : জানো কীভাবে?
কাকতাড়ুয়া : তুমি ভাবছ, গতকাল ফুটবল খেলার সময় তোমার মাথায় কে থাপ্পড় দিয়েছে। আর এই ভাবনাই তোমাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর আমি এটাও জানি, তোমাকে কেউ ফাউল করেনি, তুমি নিজেই পড়ে গিয়ে ফাউলের ভান করেছ, পেনাল্টি পাবার আসায়।
শফিক : কিন্তু তুমি এতসব জানলে কী করে? তুমি কি চোখে দেখো?
কাকতাড়ুয়া : দেখো শফিক। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আরেকটি মানুষ থাকে। ভালোমানুষ। যেটাকে বিবেকও বলতে পারো। তুমি যত কাজই করো না কেন, ভেতরের ঐ মানুষটিকে প্রশ্ন করলেই উত্তর পেয়ে যাবে, কাজটি ভালো না খারাপ।
তুমি যখন জেনেশুনে কোনো খারাপ কাজ করো, তখন তোমার ভেতরের ভালোমানুষটি তোমাকে চপেটাঘাত করে। সে তোমার এ চতুরতা সহ্য করতে পারে না।
শফিক : সে-ই কি আমাকে থাপ্পড় মেরেছে।
কাকতাড়ুয়া : হয়তো-বা, আবার নাও হতে পারে। এখন থেকে এই মাঠে খেলতে এসে যারাই এরূপ চতুরতার আশ্রয় নেবে তারাই থাপ্পড় খাবে। নতুবা আজ বিকেলে তুমি দেখো, কারা ভণিতার আশ্রয় নেয়, তখন প্রমাণ পাবে।
(কাকতাড়ুয়ার কথায় আগের দিন খেলার সময় নিজের মিথ্যে বলে পেলান্টি আদায়ের ঘটনার কথা মনে পড়ল।)
শফিক : সত্যিই! কাকতাড়ুয়া, না না পাখিতাড়ুয়া। এখন থেকে তুমি আমার বন্ধু। তোমার কথায় আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম। আমি আর কখনও মিথ্যা বলব না। কোনো কাজে চতুরতার আশ্রয় নেবো না।
(শফিকের কথায় কাকতাড়ুয়া যেন মিটিমিটি হাসছে, ভাবখানা যেন এই ঘটনা সেই ঘটিয়েছে। আসলে সেও বুঝতে পারছে না থাপ্পড়গুলো আসলে কে মেরেছে।)

পরির খোঁজে মজার দেশে
মাস্উদ জামান
চরিত্রলিপি
ফারহান : ১০ বছরের ছেলে। [খুব মেধাবী ও কৌতূহলী]
ফাহিম : ০৮ বছরের বছরের ছেলে। [সাহসী ও এলিনের ভাই]
আরিজ : ০৮ বছরের বছরের ছেলে। [শান্ত, ভদ্র, খেলতে পছন্দ করে এবং জারবার ভাই]
এলিন : ০৬ বছরের মেয়ে। [কৌতূহলী এবং সাহসী]
জারবা : ০৬ বছরের মেয়ে। [শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী]
বৃদ্ধ : বয়সে পরিচয়। [বৃক্ষ প্রেমিক]
মায়াবী পরি : ২০ বছরের মেয়ে। [ফুলের রক্ষক]
লিলি : ০৬ বছরের ছোট্ট পরি। [মজার দেশের প্রাসাদ পরি]
জুমানা : মাঝবয়সি শক্তিশালী বিনয়ী ভদ্র পুরুষ। [গাছের ঘরের ভালো জাদুকর]
কথক : ছেলে অথবা মেয়ে। বয়সে পরিচয়। [কাহিনি বর্ণনাকারী]

দৃশ্য: ১
[একটি রহস্যময় জঙ্গলের বর্ণনা করবে কথক ]
কথক : অনেক দিন আগে, দূরের এক দেশে, বিস্ময়কর প্রাণী এবং মোহনীয় রহস্যে ভরা একটি জাদুকরী বন ছিল। ঐ বনের পাশের ছোট্ট গ্রামে কৌতূহলী এবং দুঃসাহসিক বাচ্চাদের একটি দল বাস করত। আরিজ, ফাহিম, ফারহান, জারবা এবং এলিন।
[আরিজ, ফাহিম, ফারহান, জারবা মঞ্চে প্রবেশ করে। সকলে বনের দিকে বিস্ময়ে তাকায়। কিছুক্ষণ আগে খেলতে খেলতে এলিন জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করেছে। কিন্তু এখনও সে ফেরেনি।]
আরিজ : এই জায়গাটি আশ্চর্যজনক!
জারবা : এত লম্বা গাছ আমি আগে কখনও দেখিনি!
ফাহিম : তুমি কি মনে করো এখানে পরিরা আছে?
জারবা : থাকতেও পারে। এই জঙ্গলের গভীরে তো আমরা কখনও প্রবেশ করিনি।
[এসময় এলিন জঙ্গলের ভেতর থেকে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে আসে]
আরিজ : এই তো পরি এসে গিয়েছে।
সকলে : হা হা হা।
ফারহান : তাহলে সত্যিকারের পরির খোঁজে চলো ঘুরে আসি।
ফাহিম : যদি তেমন কিছুর দেখা পাই। তাহলে এই জঙ্গলের নাম হবে ম্যাজিকাল ফরেস্ট।
আরিজ : চলো সবাই। জাদুর বনে। রহস্যের সন্ধানে।
[বাচ্চারা বনের গভীরে হাঁটতে শুরু করে, প্রতি পদে-পদে তাদের উত্তেজনা বাড়তে থাকে।]
দৃশ্য: ২

কথক : শিশুরা যখন বনের গভীরে গিয়ে পৌঁছায় তখন হঠাৎ একটা গাছের শেকড়ে ফাহিমের একটি পা আটকে যায়। তারা সকলে শেকড় না কেটে অনেক চেষ্টা করেও শেকড় থেকে ফাহিমের পা মুক্ত করতে পারে না। এসময় একজন বৃদ্ধ সেখানে হাজির হয়। আর ফাহিমের পায়ের পেঁচানো শেকড়ের ওপর হাত রেখে আদর করতে থাকে। আর ধীরে ধীরে শেকড়টি নরম হয়ে যায় এবং ফাহিম পা বের করে ফেলে।
বৃদ্ধ : স্বাগত, ছোট্ট সোনামণিরা। তরুণ ভ্রমণকারীরা। স্বাগত।
ফারহান : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এর আগে আমরা কখনও এতদূর আসিনি। আপনি না এলে আজ কী যে হতো?
আরিজ : আচ্ছা, আপনি কি এই বনে থাকেন?
এলিন : আপনি কি জাদুকর?
জারবা : আপনার কথা কি গাছেরা বুঝতে পারে?
বৃদ্ধ : (সামান্য হেসে) আমাকে তোমাদের ভয় নেই। আমি এই বনের গাছেদের ওপর নজর রাখি। তাদেরকে যত্ন করি এবং তাদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। ওরা আমার বন্ধু। তাই আমিও ওদের একজন।
ফাহিম : আমরা জঙ্গলের কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। রহস্যের অনুসন্ধানে এসেছি।
জারবা : আর পরির খোঁজে এই পর্যন্ত পৌঁছেছি।
আরিজ : আপনি কি আমাদের এই বন সম্পর্কে আরও কিছু বলতে পারেন?
বৃদ্ধ : হুম, অনেক অনেক গল্প বলতে পারতাম! কিন্তু তোমরা যেহেতু রহস্য আর পরি খুঁজতে বেরিয়েছে সেহেতু আপাতত আমি তোমাদের কোনো গল্প শোনাব না। শুধু বলব সতর্ক থেকো। কারণ এই বনটি জাদু এবং বিপদ উভয়ই বিষয়ে পূর্ণ।
ফারহান : আপনি সাহস দিলে আমরা ভয় পাব না! আমরা এই বনের জাদু রহস্য নিজের চোখ দেখতে চাই।
বৃদ্ধ : খুব ভালো। এগিয়ে যাও। কেবল একটি কথা মনে রাখবে, ইচ্ছা সাহস এবং দয়া তোমাকে যে-কোনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে পথ দেখাবে।
[শিশুরা বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানায়। তিনি বিদায় নেন। এবং তারা দৃঢ় সংকল্পে তাদের যাত্রা চালিয়ে যায়।]
দৃশ্য: ৩

কথক : ছোট্ট উদ্যমী, সাহসী ছেলে মেয়েরা বনের গভীরে যাওয়ার সময় এলিন এবং জারবা একটি রহস্যময় বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে একটি ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা ফুলের বাগানের মধ্যে পড়ে যায়।
এলিন : (উচ্চঃস্বরে) ভাইয়া এই ফুলগুলো দেখো! কত সুন্দর!
জারবা : দেখো ভাইয়া এগুলো জ্বলজ্বল করছে।
ফারহান : হয়তো এগুলো জাদুর ফুল।
ফাহিম : কী চমৎকার! আশ্চর্য এমন জাদুকরী ফুল হতে পারে!
আরিজ : চলো, এই গাছগুলো আমরা বাড়িতে নিয়ে যায়।
[যেই আরিজ একটি ফুল ধরতে যায়, সেই একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে ।]
কণ্ঠ : থামো! এই ফুলগুলো জাদু দ্বারা সুরক্ষিত। এদেরকে ছুঁইয়ো না। জাগিও না। ওরা ঘুমিয়ে আছে। তোমাদের কারণে ওরা জেগে গেলে বড় বিপদ হবে ।
[বাচ্চারা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে আর গাছ থেকে একটা ঝিকিমিকি আকৃতির মায়াবী পরি বের হয়ে আসে।]
মায়াবী পরি : আমি এই বাগানের রক্ষক। তোমরা এখানকার সৌন্দর্যের কোনো ক্ষতি করতে পারো না।
ফারহান : আমরা দুঃখিত, আমরা জানতাম না।
মায়াবী পরি : বাচ্চারা, যেহেতু তোমরা জিদ করোনি এবং ক্ষমা চেয়েছ। সেকারণে আমি তোমাদের কোনো শাস্তি দেবো না। তবে বনের আরও গভীরে যাওয়ার সময় যথেষ্ট সতর্ক থেকো, কারণ এই বনের অন্যরা আমার মতো ক্ষমাশীল নয়। এটা একটা মায়াবী জাদুর বন।
[মায়াবী পরী অদৃশ্য হয়ে যায়, বাচ্চারা তার উপস্থিতিতে বেশ ভয় পায়।]
দৃশ্য : ৪
কথক : সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়। বাচ্চারা বনের আরও গভীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা গান গাইতে গাইতে যাত্রা শুরু করে। গানের শেষে তারা একটা বিশাল নদীর ধারে এসে পৌঁছায়। বনের ভেতর এত বড় নদী দেখে তারা ভীষণ অবাক হয়।
ফাহিম : আমরা কীভাবে এই নদী পার হব?
জারবা : নদীর ঐপাড়ে নিশ্চয়ই পরিদের শহর ।
এলিন : আমার মনে হয় সেখানে দৈত্যদের বাস।
আরিজ : কিন্তু আমাদের পক্ষে এই নদী পার হওয়া খুবই বিপজ্জনক।
ফারহান : দাঁড়াও। গাছের রক্ষক বৃদ্ধ দাদুর কথা মনে করো। তিনি আমাদের কী বলেছিল মনে আছে? ইচ্ছা, সাহস এবং দয়া যেকোনো চ্যালেঞ্জের মধ্যে পথ দেখাবে।
[এরপর বাচ্চারা একত্রিত হয়ে একে অন্যের হাত ধরে এবং চোখ বন্ধ করে দৃঢ় সংকল্পে বলা শুরু করে…]
ফারহান : আমরা এই নদী পার হতে চাই। চোখ খুলে যেন কোনো একটা উপায় খুঁজে পাই। (৩ বার বলার পর…)
কথক : তারা মনোনিবেশ করার সাথে সাথে, তাদের সম্মিলিত সাহস এবং বন্ধুত্বের সংকল্পের জন্য নদীর ভেতর থেকে একটি অদৃশ্য জাদুকরী সেতু তৈরি হতে শুরু করে এবং কিছুক্ষণ পর সেতুটি দৃশ্যমান হয়ে।
এলিন : দেখো! দেখো! এটা কাজ করছে!
ফারহান : আমরা পেরেছি!
জারবা : আমরা পেরেছি!
[সেতুটি সম্পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে বাচ্চারা নিরাপদে নদী পার হয়, তাদের হৃদয় গর্বে ও আনন্দে ভরে যায়।]
দৃশ্য : ৫
কথক : নদী পার হয়ে বাচ্চারা কৌতূহলী এবং দুঃসাহসী মনে, মুখে বিস্তৃত হাসি নিয়ে পথ চলতে শুরু করে। একটু হাঁটতেই ফারহান একটি রহস্যময় গাছের ঘর দেখতে পায়।
ফারহান : (উত্তেজিত হয়ে) বাহ্, কী সুন্দর রোমাঞ্চকর আজকের এই দিন! চলো সবাই দেখি, সামনে আমাদের জন্য আর কী আশ্চর্য অপেক্ষা করছে!
ফাহিম : (হাঁপাতে হাঁপাতে) এটা কী? একটি গাছের ঘর? আমি এটা আগে কখনও দেখিনি!
[ফাহিম গাছের ঘরের উলটো দিকে ছুটে যায় এবং একটি জাদুকরী দরজা আবিষ্কার করে।]
ফাহিম : (কৌতূহলী হয়ে) এপাশে এসো। দেখো একটা অদ্ভুত ধরনের দরজা।
জারবা: ভেতরে যাবে কি ?
ফারহান : এতদূর এসে নিশ্চয়ই ভেতরটা না দেখে ফিরে যাব না!
[ফাহিম কিছুক্ষণের জন্য ইতস্তত করে। কিন্তু তারপর সাহস সঞ্চয় করে দরজায় হাত রাখে। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা খুলে যায়।]
দৃশ্য : ৬
কথক : গাছের ঘরের ভেতরে প্রবেশের পর তারা বিভিন্ন জায়গায় নানান রকমের মজাদার খেলনা এবং রংবেরঙে এর সাজসজ্জা দেখে চমকে ওঠে। তখন তারা বুঝতে পারে তারা আসলে একটি জাদুর বনে জাদুর ট্রিহাউজে প্রবেশ করেছে। তারা মজা করতে থাকে। মনের মতো খেলনা নিয়ে প্রাণভরে খেলা কীরে সবাই।
ফাহিম : (অবাক হয়ে) এই জায়গাটা অবিশ্বাস্য!
[হঠাৎ, জারবা একটি রঙিন বেলুন নিয়ে খেলার সময় বেলুনটা ফেটে যায় এবং তার মধ্য হতে একজন জাদুকর বেরিয়ে আসে।]
জাদুকর : (প্রফুল্লভাবে) স্বাগতম, বাচ্চারা! আমি জাদুকর জুমানা। আমি তোমাদের জন্যই অপেক্ষা করছি!
ফারহান : (অবাক হয়ে) তুমি মানুষের মতো কথা বলতে পারো!
জুমানা : (মাথা নাড়িয়ে) হ্যাঁ, এবং আমি তোমাদেরকে একটি অ্যাডভেঞ্চারে নিয়ে যেতে চাই! তোমরা কি যাবে আমার সঙ্গে?
সকলে : অবশ্যই যাব জুমানা।
দৃশ্য : ৭

কথক : জাদুকর জুমানার সঙ্গে বাচ্চারা ট্রিহাউজের ওপরে এসে দাঁড়ায়। জুমানা একটা জাদুর আয়না হাজির করে। এরপর সবাইকে সেই আয়নার ভেতরে প্রবেশ করতে বলে। তারপর তারা আয়নার অন্যপ্রান্ত দিয়ে দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে মজার দেশে এসে পৌঁছায়। জায়গাটি খুবই প্রাণবন্ত। যেন একটি রঙিন স্বর্গ।
এলিন : (উত্তেজিত হয়ে) আমরা কোথায় আসলাম জুমানা?
জুমানা : (মুচকি হেসে) এটা হলো মজার দেশ, এখানে হাসি আর আনন্দের শেষ নেই!
সকলে : মজার দেশ!
ফারহান : (বিস্ময়ে) এটা আমার কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর!
জুমানা : তাহলে তোমরা মজার দেশে মনভরে মজা করতে থাকো। আমি ঘুরে আসি। (প্রস্থান)
দৃশ্য : ৮
[বাচ্চারা সেখানে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। বিভিন্ন মজার ক্রিয়াকলাপ উপভোগ করে যেমন দৈত্য, স্লাইডে খেলা করা, রাইডিং করা, রংধনুর দোলনায় দোল খাওয়া এবং জাম্পিং-এ ঝাঁপ দেওয়া ইত্যাদি। হঠাৎ, তারা সাহায্যের জন্য একটি কান্না শুনতে পায়।]
কণ্ঠ : (অস্থির হয়ে) সাহায্য করুন! কেউ, আমাকে সাহায্য করুন!
[সকলে সেই কণ্ঠের আওয়াজের উৎসের দিকে ছুটে যায় এবং বুদ্বুদে বাবলের ভেতর আটকে থাকা একটি ছোট্ট পরিকে খুঁজে পায়।]
আরিজ : (চিন্তিত হয়ে) চিন্তা করো না, আমরা তোমাকে সাহায্য করব!
[বাচ্চারা একসঙ্গে সেই বুদ্বুদ বাবলটা ফুটো করে এবং ছোট্ট পরিকে সেখান থেকে মুক্ত করে।]
পরি : (কৃতজ্ঞ) ধন্যবাদ, ধন্যবাদ! তোমরা আমাকে বাঁচিয়েছ!
জারবা : কে তুমি?
লিলি : আমার নাম লিলি। আমি এই দেশের রানি পরির কন্যা ।
এলিন : পরিদের রানির মেয়ে তুমি!
ফাহিম : এখানে আটকে গিয়েছিলে কীভাবে?
ফারহান : তোমার সঙ্গে কি কেউ ছিল না?
লিলি : মা আমাকে দুপুরে ঘুমাতে বলেছিল কিন্তু আমি মাকে না বলে লুকিয়ে অন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই দুপুরে একা একা খেলতে এসেছিলাম।
আরিজ : আর মায়ের কথা না শোনাতে তোমার এই বিপদ হলো।
লিলি : হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ঠিক। আমি আর কখনও মায়ের অবাধ্য হব না। মা যা বলবে আমি তা-ই করব। এখন চলো আমাদের প্রাসাদে তোমাদের নিয়ে যাই ।
সকলে : পরিদের প্রাসাদ! আহা কী মজা! কী মজা! (প্রস্থান)
দৃশ্য : ০৯
[কৃতজ্ঞতার চিহ্ন হিসেবে, পরি লিলি সবাইকে একটি মছুরপঙ্খির পিঠে চড়িয়ে তার প্রাসাদে নিয়ে আসে।]
লিলি : (উত্তেজিত হয়ে) মজার দেশে মজার এই জাদুর প্রাসাদে তোমাদের স্বাগতম! রাইড, গেমস এবং সুস্বাদু খাবার উপভোগ করো! আর এই উপহারগুলো তোমাদের জন্য। এগুলো গ্রহণ করো।
ফাহিম : আমাদের জন্য এত্ত এত্ত উপহার!
এলিন : কী মজা! কী আনন্দ!
জারবা : কত সুন্দর পরিবেশ!
ফারহান : ধন্যবাদ মজার দেশের প্রিয় পরি আমার।
লিলি : তোমরা আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছ কেন?
ফারহান : এই যে আমাদেরকে তুমি কত সুন্দর সুন্দর মজার মজার উপহার দিলে।
লিলি : দেখো তোমরা একটা সবুজ বনে সবুজ গাছের ঘরে প্রবেশ করে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছ শুধু কারও ক্ষতি করোনি বলে। কোনোকিছু নষ্ট আর ধ্বংস করোনি বলে। কাউকে কষ্ট দাওনি বলে। বরং তোমরা ভালো ভালো কাজ করেছ এমনকি আমাকেও মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছ। এজন্যই তো তোমাদের এই সকল পুরস্কার। নাও, নাও। গ্রহণ করো।
কথক : বাচ্চারা প্রাণ খুলে হাসতে থাকে। আনন্দ করতে থাকে। আর বিস্ময় অনুভব করতে থাকে । এভাবে উত্তেজনা এবং রোমাঞ্চে ভরা একটি দিন পার করে তারা। এরপর সকাল হলে জুমানা প্রাসাদে এসে বাচ্চাদের নিয়ে আবার জাদুকরী ট্রিহাউজে ফিরে আসে।
দৃশ্য : ১০
ফারহান : (খুশি হয়ে) এই দিনটি আমাদের জন্য সর্বকালের সেরা দিন! তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, জুমানা। আমাদেরকে মজার ঐ দেশে যাওয়ার পথ দেখানোর জন্য।
জুমানা : (মুচকি হেসে) এটা আমার জন্যও আনন্দের। মনে রাখবে, মজার জাদু সবসময় সকলের মধ্যে থাকে। কেবল সেটা উপভোগ করার জন্য সরল হৃদয়, অদম্য ইচ্ছা এবং অমোঘ সাহস থাকতে হয়। এখন তবে বিদায়।
[এরপর বাচ্চারা গাছের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এবং তারা যেখান দিয়ে এই বনে প্রবেশ করেছিল ঠিক সেখানে এসে উপস্থিত হয়।]
শেষ দৃশ্য :
কথক : ছোট ছেলে-মেয়েরা তাদের অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক কাজের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরে। তারা একসঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়। মন্ত্রমুগ্ধ বনে তাদের দুঃসাহসিক কাজ শেষে তাদের মন জাদু এবং বিস্ময়ের স্মৃতিতে ভরে রয়।
ফারহান : (সন্তুষ্টভাবে) আজ, আমি শিখেছি যে তুমি যেখানেই থাকো না কেন, যতদিন তোমার কল্পনা এবং বন্ধু থাকবে, ততদিন তুমি মজা এবং রহস্য উপভোগ করে যেতে পারবে!
আরিজ : আজ আমরা যা দেখেছি এবং শিখেছি তা আমি কখনই ভুলব না।
এলিন : আমিও না। এটি সর্বকালের সেরা অ্যাডভেঞ্চার ছিল!
জারবা : এবং আমরা একসাথে এগুলো করেছি।
ফাহিম : কে জানে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরও কী কী অ্যাডভেঞ্চার অপেক্ষা করছে?
[আকাশে গোলাপি রঙের সূর্য ঢলে পড়ে। আর বাচ্চারা একে অন্যের হাত ধরে গান গাইতে গাইতে ঘুরতে থাকে এবং ভাবতে থাকে পরবর্তী রহস্য নিয়ে]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *