সে করতালির অর্কেস্ট্রা এখনওকানের কাছে গুনগুন করে যায়

  • কাইজার চৌধুরী

আশিক মুস্তাফা: শুভ বিকেল, শহুরে যান্ত্রিকতা মাড়িয়ে আপনার আঙিনায় এসে অন্যরকম এক প্রশান্তি অনুভব করছি। আপনি প্রিয় লেখক বলে? আপনারও কি এমন হয়; প্রিয় লেখকের বাসায় গেলে কিংবা তাঁর কাছাকাছি গেলে এমন ভালো লাগা খেলা করে মনে?
কাইজার চৌধুরী: শুভ বিকেল তোমাকেও। অনেকটা পথ কষ্ট করে এসেছ— ধন্যবাদ তো তোমারই প্রাপ্য। সাধুবাদটা তোমাকেই তো জানাতে হয়। তা বসো-চা-টা চলবে তো? কী যেন বলছিলে-প্রশান্তির কথা— তাই না? আরে বাবা-এতটা পথ মাড়িয়ে এসেছ— কেবল আমার সান্নিধ্য পেতে— প্রশান্তিটা অনুভব করার কথা তো আমার, তোমার তো নয়! তবে কি জানো, আমার মনে হয়— প্রিয় লেখক নয় প্রিয় মানুষের কাছাকাছি গেলে সে যেকোনো স্থানেই হোক না কেন— মনটা আপনা থেকেই কেমন চনমনে হয়ে পড়ে, তাই না? আমি ‘প্রিয় লেখক’ কি না— হতে পেরেছি কি না সেটি অবশ্যি আমার জানা নেই। সত্যি বলছি। বিনয় নয়— সত্যিই আমার জানা নেই।
আ. মু.: বিনয় এবং সত্যবাদিতা তো লেখকেরই থাকবে। শুনেছি ছোটবেলায় বৃত্তির টাকা বই কিনে শেষ করতেন। তখন আর এখনকার লেখায় কেমন পরিবর্তন দেখেন? আর কাদের লেখা এখনও খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েন?
কা. চৌ.: ঠিকই শুনেছ। তবে কাদের লেখা এখনও আগ্রহ নিয়ে পড়ি? এই তালিকা অনেক বড়। আসলেই। সবার লেখাই পড়ি। কাকে ছেড়ে কার কথা কই? নতুন-পুরাতন সবার লেখা গোগ্রাসে গিলি বলতে পারো। ঠাকুরমার ঝুলির মতন প্রাচীন গ্রন্থটি যেমন পড়ি এখনও, তেমনি প্রবীণদের লেখাও পড়ি— আবার আজ দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে নবীন লেখকের যে গল্পটা— সেটাও পড়েছি। আমি-আমরা সবাই মূলত পাঠক— একথাটি তো স্বীকার করবে? তাহলে নতুন-পুরাতন বাছ-বিচার করতে যাব কোন দুঃখে? তবে, গদ্য আমায় টানে বেশি— সম্ভবত আমার লেখালেখি গদ্যে সীমাবদ্ধ বলে এই টানটা বরাবর— কী যেন বলে?— হ্যাঁ, টানটান।
আ. মু.: লেখক মানেই পাঠক— এতো স্বীকার করতেই হবে। আপনার এই দীর্ঘ পাঠক এবং লেখক সময়ে শিশুসাহিত্যে কি পরিবর্তন দেখছেন? আর নিজে ঠিক কেমন পরিবর্তন চেয়েছেন এবং সেটি সম্ভব? না হলে কেন?
কা. চৌ.: দেশ-সমাজ-সমকালীন কিশোর ভাবনার পটভূমিতে কিশোর মনোরঞ্জনের জন্যে বড়দের তোড়জোড় সেকালে যেমনটি ছিল, আজও ঠিক তেমনটিই আছে— কিছু হেরফের বাদে— এবং সেটা স্বাভাবিক নিয়মে যুগের দাবি মেনে, আধুনিকতার দাবি মেনে। হিতোপদেশ বলো, পুরাণ বলো, রূপকথা বলো— এসব ছুঁয়ে-ডিঙিয়ে শিশুসাহিত্য দশকে দশকে গদ্যরীতি-বানানরীতি-বাক্যবিন্যাস ও শব্দ চয়নে পরিবর্তন এনে মধ্যবিত্ত কিশোরের আধুনিক মন মানসে ঢুকে পড়েছে। আধুনিক ব্যাপারটা অবশ্যি আপেক্ষিক। গেল শতাব্দীর চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের আধুনিক আর হাল আমলের আধুনিকতার মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে, তাই না? সেই পুতুলখেলা, ঘুড়ি-লাটাইয়ে বাহাদুরি-টিকিওয়ালা পণ্ডিতমশাই-এগুলো তো এখন আর নেই। থাকার কথাও নয়। কিশোরদের দৈনন্দিন দিন যাপনের উপাদানগুলো-আনন্দ-আমোদের উপাদানগুলো-এগুলোও তো উধাও। পারিবারিক আবহটাও তো গেছে বদলে-কি শহরে, কি গাঁও-গেরামে। তো, এগুলোর প্রতিফলন কি শিশুসাহিত্যে পড়বে না? পড়বে বইকি— এবং পড়ছেও। অনেক কথা বলে ফেলেছি— এর বাইরে আর কিছু এ মুহূর্তে বলতে পারব না।— ব্যাপারটা গবেষকদের ওপর ছেড়ে দাও না (অট্টহাসি)। আর আমি কী পরিবর্তন আনতে চাই!!?? মন দিয়ে শুনলে বুঝতে পারবে, আমি কিন্তু কথার শেষে দুটো করে আশ্চর্যবোধক আর প্রশ্নবোধক চিহ্ন জুড়ে দিয়েছি। কারণ তুমি সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন করে ফেলেছে। প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটাই তো আমার পক্ষে অসম্ভব— পরিবর্তনের কথা তো দূরের ব্যাপার। দেখো ভাই, আমি শুধু চাই-আমি যেমন কিশোর বেলায় আমার প্রিয় লেখকদের গল্প পড়ে-পড়ে আনন্দে দিন কাটিয়েছি, রাত কাটিয়েছি-ভালো চিন্তা, ভালো ভাবনা, ভালো কল্পনা করতে শিখেছি এবং বর্তমানে সবাই আমাকে ভালো মানুষ হিসেবে গণ্য করছে— কোনো প্রকার লোক ঠকানো-ধূর্তামো-ঠ্যাট্টামোর ধারেকাছে আমি নেই বলে— ঠিক তেমনি শিশুসাহিত্য চিরকাল শিশু কিশোরদের আনন্দ বিলিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতের ভালো মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করে যাবে— এটাই আমার একমাত্র প্রার্থনা।
আ. মু.: সেই প্রার্থনা আমারও। আচ্ছা, এবার মুক্তিযুদ্ধে ফিরে যাই। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার একাত্তরের রূপকথা, ঘটেছিল একাত্তরে, আমাদের একাত্তর এবং একাত্তরের একদিনসহ আলোচিত বেশকিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। আপনি ১৯৭১ সালে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তখন যুদ্ধে গিয়েছিলেন? বা কেমন দেখেছিলেন যুদ্ধদিনগুলো?
কা. চৌ.: এক কথায় বলতে গেলে— না। যুদ্ধে যাইনি আমি। অবরুদ্ধ ঢাকা শহরেই দিনগুলো কেটেছে আমার। বড় বিষাদময় ছিল দিনগুলো। তিক্ততায় ভরাট। নিষ্ঠুরতায় ভরাট। বড় কান্নাভেজা ছিল দিনগুলো। ছাব্বিশে মার্চ ভোরবেলায় রাস্তা-ঘেঁষা বাড়িটার দোতলার বারান্দার রেলিং ধরে দেখেছি— রাস্তা দিয়ে খানসেনারা খোলা পিকআপে করে স্তূপ করা বাঙালিদের রক্তে ভেজা নিথর দেহগুলো নিয়ে যাচ্ছে কোথায় যেন। গা গুলিয়ে গেল, মাথা ঘুরে গেল, পেটেও কেমন গুড়গুড় ভাব— দুদিন মুখে কোনো দানাপানি দিতে পারিনি… নিতান্ত আকস্মিকভাবেই রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর বরাত দিয়ে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছি। যে বন্ধুর সাথে নারায়ণগঞ্জে পঁচিশের দিনটি কাটিয়ে বিকেলে বিদায় জানিয়েছি, সে বন্ধুকে হারাতে হয়েছে পাঁচদিনের মাথায় খানসেনাদের বন্দুকের গুলির সুবাদে। যে বন্ধুদের মধ্যে দুজন শহিদ হয়ে গেল দিনতিনেক বাদে। মে মাসের নয় তারিখে ভোরবেলায় বৃদ্ধ পিতামহকে গাঁয়ের বাড়িতে পারিবারিক মসজিদের প্রবেশদ্বারে হাতে তসবি নিয়ে খানসেনাদের গুলি খেয়ে পরলোকে পাড়ি দিতে হয়েছে। বাড়ির ছাদ থেকে দেখেছি দূরে শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার-নয়াবাজারকে আগুনে ঝলসানো হচ্ছে দিনের পর দিন, দিনে কি রাতে হাওয়ার দমকে খাবার ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে ঢুকে পড়ে নয়াবাজারে-পোড়ানো ছাই, সে ছাই পড়ে গিয়ে আমাদের থালার বাড়া ভাতে। যে শিক্ষকদ্বয়ের সাথে ডিসেম্বরের একদিন মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে দেখা হলো ফুলার রোডের মাথায় এবং যে শিক্ষকদ্বয় আমাকে একই সুরে বকে গেলেন— ‘বাইরে ঘোরাঘুরি করছ কেন? যাও, বাড়ি ফিরে যাও। তোমার মতন ছেলেদের প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করাটা যে কত বিপদের-সে কি জানো না তুমি?’ —সেই শিক্ষকদ্বয় আমাকে নিরাপদে বাড়ি ফেরত পাঠিয়ে নিজেরাই ফেরার হয়ে গেলেন দুদিন বাদে— রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে পাওয়া গেছিল তাদের। যুদ্ধকালে ডিসেম্বরের এক অন্ধকার রাতে খানসেনাদের একটা হেলিকপ্টার উড়ে উড়ে শহরে বোমা ফেলেছে আর নিচের বিমান-বিধ্বংসী কামানগুলো নিশ্চুপ থেকেছে— বেশ আতঙ্কে কেটেছিল সে মুহূর্তগুলো। পনেরই ডিসেম্বরের রাতে ব্ল্যাকআউট ছিল— বাড়ি লাগোয়া রাস্তা দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে পথ চলছিল মুক্তিযোদ্ধারা— ওদেরই একজন চিৎকার দিয়ে উঠল— ‘আলো কোথায়? আলো?— আর আমি ঘরের দরজা খুলে টেবিল ল্যাম্পটা দোতলার বারান্দায় তুলে ধরেছি— আর তখন সে কী করতালি! সে করতালির অর্কেস্ট্রা এখনও কানের কাছে গুনগুন করে যায়…আর কত বলব?
আ. মু.: বাংলা শিশুসাহিত্যে ফেলুদা, কাকাবাবু, পিকু, টেনিদা, ঘনাদা, তিন গোয়েন্দার মতো প্রতিষ্ঠিত চরিত্র অনেক। এসবের মধ্যে কোন চরিত্র আপনাকে বেশি টানে?
কা. চৌ.: চোখ বন্ধ করে দিব্যি বলতে পারি— পটলডাঙ্গার ফেলুদা। টেনিদা আমার ছেলেবেলার একটি অংশ বই কিছু নয়। আর আমি তো চারমূর্তিরই একজন বলে মনে করি নিজেকে— ‘প্যালারাম’— কিংবা বড়জোর অদৃশ্য পঞ্চম কিশোর-যাকে আনন্দ দেবার উদ্দেশ্যে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বলে গেছেন টেনিদার নানান কাহিনি, আর আমি প্যালারামের মতন কি পঞ্চম কিশোরের মতন হাসি-আনন্দে দেখেশুনে গেছি টেনিদার কাণ্ডকীর্তি যত। মাঝে মাঝে এখনও আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে-ডি লা গ্রান্ডি, মেফিস্কোফিলিস ইয়াক-ইয়াক! তখন মনে হয়, ছেলেবেলার গণ্ডি পেরুতে আমার এখনও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। তবে ফেলুদা, কাকাবাবু এরাও ফেলনা নয় কিন্তু! আমি যে তোপসে। আমি যে পিকু! আমি যে ঘনাদার অন্যতম সাগরেদ। আমি যেন তিন গোয়েন্দার একজন!
আ. মু.: আপনার গড়া রাজু আর বিল্টু মামার মধ্যে কোন চরিত্রটি প্রিয়? আপনার চরিত্রগুলো কীভাবে গড়ে তুললেন?
কা. চৌ.: দুজনই আমার প্রিয়। এ দুজন ছিল এবং আছে বলেই তো হাসি-আনন্দে কেটেছে এবং কেটে যাচ্ছে জীবনটা। একরকম তেরেকেটে করেই কেটে যাচ্ছে। চরিত্রদুটো হঠাৎ করেই এসেছে। প্রথমেই মনে হলো, সবার জীবনে যেমন একটা করে দাদা কি কাকা থাকাটা দুষ্কর, তেমনি আমারও নিদেনপক্ষে একটা মামা না থাকলেই নয়। সেই সুবাদেই বিল্টুমামা। প্রথমে ভেবেছিলাম, বিল্টুমামাকে ‘ছিনতাই ছিনতাই’ দিয়ে শুরু আর শেষ করব— কিন্তু সেটি আর হয়ে উঠল না। বিল্টুমামার তথাকথিত গোয়েন্দা-জীবন একটা মাত্তর কেস ‘সুরাহা’ করে তামাম হয়ে যাবে-এতে কেন যেন মন সায় দিলো না। দ্বিতীয় কেস-এর জন্য যে তাহলে আরও একটা মামা খুঁজে বের করতে হয়। আর আমি— ছোটলু যার নাম— এত মামা পাব কোথায়? আর রাজু? কেন যেন একদিন মনে হলো, সব কিশোরের মধ্যে একটু-আধটু রাজু লুকিয়ে থাকে বিড়ম্বিত জীবন পোয়াতে পোয়াতে দিন কাটে ওদের— তাই একটার পর একটা বিড়ম্বনা সইতে রাজুকেই বেছে নিই— অন্য নাম নিয়ে যারা বেঁচে বর্তে আছে, ওদেরকে কষ্টে না ফেলে তাবৎ বিড়ম্বনার বোঝাটা রাজুর কাঁধেই চাপিয়ে দিতে কসুর করিনি।
আ. মু.: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ প্রকাশিত ধ্রুপদি ও চলচ্চিত্রপত্রে আপনার চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে ছোটদের চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা বা এই নিয়ে কোনো কাজ করার ইচ্ছে আছে?
কা. চৌ.: না ভাই, ছোটদের চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবাভাবি করার অবকাশ নেই আমার। তবে আমি জানি সবাই জানে ছোটদের জন্য নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণে কেউ এগিয়ে আসেননি। আসছেনও না। তেমন কোনো প্রযোজনা সংস্থাও নজরে নেই। বেশ হতাশ আমি এই ব্যাপারে। প্রেক্ষাগৃহের বর্তমান দৈন্যদশার কারণে, বড়রাই তো বেজারমুখো-ছোটদের কথা নাইবা বললাম। তবে আমার-শুধু আমার কেন বলি-নতুন-পুরনো আমাদের সকলের কোনো গল্প নিয়ে পূর্ণদের্ঘ্যরে চলচ্চিত্র কি টেলিফিল্ম-টেলিনাটক নির্মাণ করতে কি নাটক মঞ্চায়নে কেউ যদি উৎসাহ বোধ করেন— এগিয়ে আসেন তাহলে আমার মতো সবাই খুশি হবে। হঠাৎ একদিন দেখি— ‘দুরন্ত’ নামে ছোটদের জন্য একটি টিভি চ্যানেল। হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখতে পেলাম যেন!
আ. মু.: বাংলা শিশুসাহিত্যে একেবারে ছোটদের জন্য বা আর্লি গ্রেডের বাচ্চাদের জন্য অনেক বই প্রকাশিত হচ্ছে এখন। দেখেছেন এসব বই; এই নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
কা. চৌ.: এবারে এমন এক গুগলি ছাড়লে না ভাই, আমি তো ক্লিন বোল্ড। তিনটা স্ট্যাম্পই তো বেইল-সমেত উপড়ে ফেললে দেখছি! …না ভাই, দেখিনি-দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া— হা হা হা— তবে তোমার কথা শুনে বেশ আনন্দ লাগছে, মনটাতে খুশি খুশি ভাব জাগছে— এতটুকু বলতে পারি। নাহ্, নিজের অজ্ঞতাকে একটু বাড়িয়েই প্রকাশ করে ফেললাম দেখছি। তবে সত্যি বলতে কি, একটু-আধটু যে দেখিনি-তা নয়। দেখেছি। পড়েছি। ভালোই লাগছে। তবে আমি বলি কি, প্রকাশনার মাত্রাটা আরো একটু চড়িয়ে দিলে ভালো হয়। দেশি-বিদেশি ক্লাসিকগুলো সচিত্র আকারে সহজ ভাষায় প্রকাশ করলে ছোটরা মজা পাবে— আমি নিশ্চিত। ছেলেবেলায় শতশত কমিক্স পড়েছি-সংগ্রহে আছে এখনও-পড়ে, ক্লাসিকগুলোর সাথে পরিচয় হয়েছে-আরো পরে মূল বইটা পড়েছি— আনন্দে এতটুকু ভাটা পড়েনি।
আ. মু.: আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জানতে আগ্রহী অনেক পাঠক। আপনি বড় এবং লোভনীয় চাকরি করেন। এই চাকরি, পরিবার এবং লেখালেখি নিয়ে কিছু বলবেন?
কা. চৌ.: ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বলবার আছেটাই বা কী, বল? ব্যাংকের দশটা-পাঁচটার নিয়মবাঁধা চারদশকের চাকরি-জীবন থেকে অবসর নিয়েছি অনেক আগেই। বর্তমানে একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছি বটে ভাগ্যে সেটা লেখা ছিল বোধকরি। ছেলে-মেয়ে দু’জনারই বিয়ে হয়ে গেছে-চাকরি-বাকরি আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত ওরা মার্কিন মুলুকে। মা ছিলেন কিন্তু তিনিও তো চলে গেলেন না-ফেরার মুলুকে-এইতো ঠিক এক বছর আগে। উত্তরার এই বাড়িতে তাই কেবল আমি আর আমার গিন্নি। গিন্নি আছে তার সংসার-ভাবনা আর বাড়ির গাছ-গাছালি আর ডালে-ডালে উড়াল দেয়া পাখিদের তদারকিতে। আর আমি মজাসে পুরনো গল্প পড়ি, পুরনো দিনের গান শুনি, পুরনো দিনের ছবি দেখি-আর ফুরসত পেলে একটু-আধটু কলমবাজি করি রাত দুপুরে। মুশকিলটা সেখানেই-মানে এই লেখালেখির কাজ করতে গেলেই আমার দিশাহারা ভাব। কী নিয়ে লিখব? কাদের নিয়ে লিখব? পথে বেরুলেই দেখি ইশকুল-বঞ্চিত ছেলেপুলেরা রোদ মাথায় খাটা-খাটুনি করে সংসারের ঘানি টানতে লেগেছে; পত্রিকার পাতায় পড়ি, ইশকুল-পড়ুয়া বখাটেদের অকাণ্ড— কুকাণ্ডের যত ফিরিস্তি-না রে ভাই, আমি বড্ মুসিবতের মধ্যেই আছি বলতে গেলে। এই মুসিবত থেকে উদ্ধার করতে আমার লেখার টেবিলে অ-শরীরে হাজির হয় কিছু ভূতপূর্ব নাগরিক। আর নয়তো চোখের সামনে নাচানাচি করে আমাদের যুদ্ধদিনের স্মৃতি।
আ. মু.: তরুণ যারা লিখতে চায়, তাদের নিয়ে আপনার কোনো পরামর্শ আছে? আর আপনার একনিষ্ঠ পাঠকের গল্প শুনেছি অনেক, তাদের জন্য কিছু বলুন…
কা. চৌ.: কী পরামর্শ দেবো, বলো? শুধু বলতে পারি, লিখে যাও— যা মন চায়। লেখার অভ্যেসটুকু লালন করে যাও— যতদিন এই অভ্যেসটা পালন করার সক্ষমতা থাকে তোমার। আমি বিশ্বাস করি-লেখাজোখার প্রতি তোমরা যত্নশীল হবে। তোমাদের রচনা পড়েই তো আজকের কিশোর জানবে অনেক কিছু, বুঝবে অনেক কিছু— আবার কেউ-কেউ লেখালেখিতেও মন দেবে। দেশ-দেশের শিশু-কিশোর— এদের স্মরণে রেখ সারাক্ষণ, শেকড়কে ভুলে যেও না। লেখালেখি করে তুমি যেন ‘তুমি’ হয়ে উঠতে পারো— তোমাকে আজকের কিশোর— যারা আগামী দিনের ভালোমানুষ— ওরা সকলেই যেন তোমাকে আলাদা করে চিনতে পারে— সে চেষ্টাই তুমি চালিয়ে যাবে, এ বিশ্বাস আমার আছে। আরো একটা কথা। লেখালেখি শুরু করার এই তো সময়। ভবিষ্যতের ‘তুমি’কে গড়ে তোলার এখনই সময়। কৈশোরকে ফেলে এসেছ এই তো মাত্তর দিনকয়েক আগে। হালের কিশোর ভাবনা এবং সম্মুখের কিশোর জগতের হাল— তোমার চাইতে কে ভালো জানে, বোঝে— বলো? আমি তো জানি না— বুঝি না— আজকের কিশোর মনে কী খেলা করে— সেটা জানো তুমি। তাই না আজও যে-কোনো পত্রিকা— সাময়িকীর খুদে লেখকদের রচনা আমি মন দিয়ে পড়ি। আমার লেখায় বর্তমানের প্রতিফলন খুব একটা বোধহয় নেই সো আমার ব্যর্থতা। কিন্তু ব্যর্থ হবার সুযোগ তোমার নেই। এমন সুযোগ জীবনে একবারই আসে— সেটার সদ্ব্যবহার তুমি কেন করবে না? আর, আমার ‘একনিষ্ঠ’ পাঠকদের কথা বলছ? বড্ড মুশকিলে ফেলে দিলে হে! আমার রচনার ‘একনিষ্ঠ’ পাঠক যে রয়েছে— একথা বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। সামান্য মানুষ তো আমি— সে কারণেই বলছি। আজকের এবং গত যুগের কিশোর ধৈর্য না হারিয়ে আমার রচনা যে পাঠ করে যাচ্ছে বা যাচ্ছেন— এটা জানতে পেরে মনে কেমন একটা শিহরন-টিহরন ভাব জমে গেল— জানো? এত ভালোবাসা আমি রাখব কোথায়, বলতে পারো? আমি ধন্য। জীবনটা তাহলে বৃথা গেল না কি বলো? আমর পাঠকদের প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা শুভেচ্ছা, উজাড় করা কৃতজ্ঞতা। জীবনের শেষ রচনাটি পর্যন্ত তাদের মনোরঞ্জন যাতে করে যেতে পারি— আমার প্রতি তাদের ভালোবাসার মর্যাদাটুকু যাতে দিয়ে যেতে পারি, পাঠকদের যাতে না ঠকাই, আঘাত যাতে না দিই তাদের— এ প্রার্থনাই করি…কিঞ্চিৎ অপ্রাসঙ্গিক হলেও— অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার মতো বলতে হয়, আমার ছেলেবেলা দারুণ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে কেটেছে। যে বয়সে ‘মেঘ’, ‘ফড়িং’, ‘সমুদ্র’, ‘পাহাড়’-এসকল শব্দের সাথে পরিচিত হবার কথা, সে বয়সে শুনতে পড়তে হয়েছে— ‘হরতাল’, ‘হুলিয়া’, ‘গ্রেফতার’, ‘গুলি’— যতসব মনখারাপ করা শব্দ। তারপর বয়স বেড়েছে। বাঙালি হয়ে উঠেছি যখন সবেমাত্র-অমনি বঙ্গবন্ধুকে চলে যেতে হলো। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬-এই একুশটি বছর ছেলেপুলেরা পালা করে বড় হয়েছে বঙ্গবন্ধুহীন অবস্থায়-ভুল-বিকৃত ইতিহাস শিখে শিখে। এই দুই যুগের কিশোর বর্তমান কালের কিশোরদের বাবা-মা-অভিভাবক। কী শেখাচ্ছেন-কী শিখিয়েছেন তারা, তাদের ছেলেপুলেদের? যদি সঠিক শিক্ষাটাই ওরা পেয়ে থাকবেন এবং বিলিয়ে দিয়ে যাবেন পরবর্তী প্রজন্মকে তাহলে সমাজে এত চোর-ডাকাত-লুটেরা-অমানুষদের আনাগোনা কেন? আমি তো মনে করি, যে কিশোর এককালে ‘কচি-কাঁচা’ কি ‘খেলাঘর’-এর সাথে সম্পর্ক রেখেছিল-সেই কিশোর এখন সাবালক হয়ে কখনও বাঁকা পতে হাঁটতে চাইবে না। সে চিত্রটিই কি এখন পাচ্ছি দেখতে? কেন বর্তমানের কিশোর ‘পাহাড়’, ‘নদী’, ‘আবিষ্কার’, ‘অ্যাডভেঞ্চার’, ‘গ্যারাক্সি’-এত সব শব্দের সাথে পরিচিত হবার পরিবর্তে ‘খুন’, ‘দূষণ’, ‘লুটপাট’, ‘ভাঙচুর’, ‘অবরোধ’—এইসকল শব্দের সাথে পরিচিত হচ্ছে নিত্যদিন? ওরা কি বইপড়ায়, কি ইশকুলের লাইব্রেরিতে হানা দিতে ভুলে গেছে, কিশোর-সহায়ক পাক্ষিক-মাসিক সাময়িকীর সংখ্যা কি সংখ্যাতীত? ওরা কি মোবাইল ফেলে, নেট-সার্ফিং ফেলে গল্পের বইয়ের পাতায় নজর ফেরাচ্ছে? —এমনতর হাজারো প্রশ্ন— মাথাটাকে কামড়ে যায়। তরুণেরা আর আমরা বয়স্করা মিলে-লেখক হিসেবে, প্রকাশক হিসেবে-যতদিন না আগামী দিনের ভালোমানুষ সৃষ্টির লক্ষ্যে সত্যিকারের দায়িত্বটা পালন করতে পারছি-ততদিন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ সৃষ্টি হবার নয়-স্বপ্নটা নিছক স্বপ্নই থেকে যাবে।
আ.মু.: শুভ সন্ধ্যা। ভালো থাকবেন।
কা. চৌ.: শুভ সন্ধ্যা তোমাকেও। ভালো থেকো। সুস্থ থেকো।
হাসিখুশি থেকো। মঙ্গল কামনা করি-সবার মঙ্গল কামনা করি। সুখে থাকো-দুধে-ভাতে থাকো সবাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *